Search This Blog

Monday, June 5, 2017

ডসনের চিঠি [কল্প বিজ্ঞানের গল্প]


 এটি আমার লেখা প্রথম কোনও কল্পবিজ্ঞানের [এটা Science fiction নাকি fantasy সুধী পা্ঠকেরা ভালো বুঝবেন] গল্প যা ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়েছিল। ইচ্ছেফড়িং নামের একটি পত্রিকাতে ।পোস্ট করলাম নিজের একটা “নস্টালজিয়া” কে আমার নতুন বন্ধুদের জন্য।

১৬ নভেম্বর ২০১৫
অবশেষে সমাধান হল রজার পিটারসন রহস্যের, আজ। ওর মৃত্যুর  ৭ দিন পর। পিটার ডসনের চিঠিটা পাওয়ার পর । না এভাবে শুরু করলে আপনারা কি করে বুঝবেন। চলুন যাওয়া যাক  ওর মৃত্যুর ঠিক পরের দিনটিতে।
৮ নভেম্বর ২০১৫
বিশ্বাস করুন ও আমাকে খুন করেছিল- ধরা পড়ার পর থেকে একটা কথাই সমানে বলে গিয়েছিল রজার। রজার পিটারসন।
গতকাল রাত ১টা বেজে ৫৮ মিনিটে বাথরুম যাওয়ার পথে কোনো ভাবে পা পিছলে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়ে মারা গেছে রজার। দীর্ঘ ৭২ বছর এই অ্যাসাইলামে থাকার পর। ১৮ই এপ্রিল ১৯৪৩ – যেদিন গ্রেপ্তার হয় সেদিন থেকে মৃত্যুদিন পর্যন্ত। যে কথায় কেউ কোনোদিন বিশ্বাস করেনি। আমিও করিনি। আজ ডায়েরীটা পড়ার পরেও বিশ্বাস করতে পারছি না।
আট বছর আগে শৈল শহরের প্রান্ত দেশে এই মেন্টাল অ্যাসাইলামটায় আমি বদলি হই। রাঁচি থেকে এখানে পাঠানো হয় আমাকে। মাত্র ২৯ জন অসুস্থ মানুষ ছিল । আট বছরে সংখ্যাটা বেড়ে ৩৪ হয়েছে। এখন অবশ্য ৩৩। এখানকার সবচেয়ে প্রবীন ছিল রজার। ২০০৭ এ ওর বয়েস ছিল ৯০ । কেস হিস্ট্রিটা পড়েই আলাদা একটা আগ্রহ তৈরি হয় ওর বিষয়ে ।
খুন করার দায়ে আজীবন কারা দন্ড – কারাবাসের বদলে পাগলা গারদ। ফাঁসিই হত হয়তো – হয়নি অসংলগ্ন কথাবার্তা এবং সম্ভবত ব্রিটিশ বলে। রজার যাকে খুন করেছিল সেই নাকি খুন করেছিল রজার কে। অদ্ভুত এই কথাটির জন্যই আদালত রজারকে পাগল বলে রায় দেয়।
আচার আচরণ কথাবার্তা একে বারে স্বাভাবিক শুধু ওই কথাটি ছাড়া। প্রতিদিন ওকে এক বিশেষ কষ্টকর অবস্থা্র মুখোমুখী হতে হতো। রাত ১টা বেজে ১০ মিনিটে । ওই সময় ওর গোটা শরীর শক্ত হয়ে যেত, অনেকটা মৃগী রোগীদের মতো। মিনিট ৪৫ স্থায়ী হতো অবস্থাটা। তারপর আবার স্বাভাবিক। কোনও মেডিসিনেই এর সুরাহা করা যায়নি।
দেখে মনে হতোনা রজারের বয়স নয়ের কোঠায়। ৪০ এর বেশী তো মনেই হতনা। একবার জানতেও চেয়েছিলাম, রহস্যটা কি রজার? উত্তরে হেসে বলেছিল, অভিশাপ। শ্যামলালের অভিশাপ। আমার মৃত্যু নেই ডাক্তার। আই অ্যাম ইমমরটাল। আমি অমর।
গত ৮ বছরে ওর সাথে একটা আলাদা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ওকে দেখলেই আমার বৃদ্ধ বাবার কথা মনে পড়ে যেত। ও কি চোখে আমায় দেখতো তা অবশ্য বলতে পারবোনা। তবে কথাবার্তার ফাঁকে ফাঁকে ওর অনেক ব্যক্তিগত কথাই আমি জানতে পেরেছিলাম।
রজারের বাবা জ্যাক পিটারসন ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী। বর্তমান মধ্যপ্রদেশ ছিল কর্মস্থান। সেখানেই বানিয়েছিলেন বাড়ি। ভারতেই শেষজীবন কাটানোর ইচ্ছে ছিল । ইচ্ছে পূরন হয়নি। রজারের কলেজ জীবন শেষ হওয়ার আগেই আকস্মিক হৃদ গোলযোগে দেহাবসান হয় তার। মা আগেই মারা গিয়েছিলেন। ভাই বোন না থাকায় ঝাড়া হাতপা স্বাধীন জীবন হয়ে যায় রজারের। এর পরেই বিশেষ কাজে ভারতে আসে রজার এবং ঘটনাচক্রে আজ সে মানসিক অ্যাসাইলামের চিরস্থায়ী সদস্য।  
মাস পাঁচেক আগের কোন একদিন রজার আমাকে বললো, সঞ্চিতা আমাকে একটা পুরনো ডায়েরী আর গোটা কতক কলম দিতে পারবে? আর হ্যাঁ একটা ব্রাউন এনভেলপ যাতে ওই ডায়েরীটা ঢোকানো যায়।
ঠাট্টার ছলে বললাম, আত্মজীবনী লিখবেন নাকি মিঃ পিটারসন?
শুনে আমার হাতটা চেপে ধরে এমন একটা কণ্ঠস্বরে “প্লিজ সঞ্চিতা” বললো যে আর কিছু বলতে পারলাম না। অ্যডমিনিস্ট্রেটরের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে দিলাম একটা ডায়েরী। পুরনো নয় নতুনই। আর কিছু ইউজ এ্যন্ড থ্রো পেন এবং একটা এনভেলপ।
ঘণ্টা তিনেক আগে সেই ডায়েরীটা আমাকে দিয়ে গেছেন ওয়ার্ড মাস্টার। কারন ওটা ঢোকানো ছিল সেই ব্রাউন পেপারের এনভেলপে । ওপরে বড় বড় করে লেখা – ONLY FOR DR. SANCHITA
ডায়েরীটার মাস ছয়েকের পৃষ্ঠা ব্যবহার হয়েছে। প্রথম দুমাসের পাতায় কিছুই নেই লেখা জাতীয়। নাহ ঠিক বলা হলনা কথাটা! লেখা আছে ইংরেজি অক্ষ র a b c d । প্রথম দিকে বাচ্চাদের মতো আঁকা বাঁকা বড় বড়। তারপর ছোটো হয়েছে স্বাভাবিক লেখার আকারে। আসতে আসতে হয়েছে পাঠ যোগ্য।
মুল লেখার শুরু এভাবে ... “Almost after a long 70 years …. প্রায় ৭০ বছর বাদে লিখতে চেষ্টা করে দেখলাম কিছুই পারছি না। অভ্যাস নষ্ট হয়ে গেছে। অবশ্য শুধুমাত্র অনভ্যাস নয় নতুন ধরনের এই কলমগুলিও অন্যতম কারন।
তবে অভ্যাসে কি না হয়। দু মাস ধরে চেষ্টার ফল এই লেখা। অনেকটা আয়ত্তে এসেছে তবুও হয়তো পড়তে অসুবিধা হবে তোমার।
বিশ্বাস করো সঞ্চিতা যাকে আমি খুন করেছিলাম সেই আমাকে খুন করেছিল। ভাবছো তো আবার সেই পাগলের প্রলাপ। অনুরোধ একটাই , কষ্ট করে গোটাটা পড়ে তবেই রায় দিও ...”
পড়েছি গোটাটা। কিন্তু আগেও বলেছি আবারো বলছি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। অনেক অপ্রয়োজনীয় কথা আছে লেখাটায় । সে সব বাদ দিয়ে মূল ঘটনা সাজিয়ে দিচ্ছি আপনাদের সামনে। বিশ্বাস যেমন করতে পারছি না তেমনি প্রশ্নও জাগছে মনে – একজন ৯০+ বয়সী মানুষ কি শুধু শুধু একগাদা মিথ্যে কথা লেখার জন্য কষ্ট করে আবার লেখা শিখলেন?
রজার পিটারসন এবং পিটার ডসন। দুজনের নামের মধ্যে পিটার কথাটা থাকা এবং বিভিন্ন পছন্দে মিল থাকায় ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় বন্ধুত্ব জমে উঠতে সময় লাগেনি খুব বেশি। প্রথম জন খাঁটি ব্রিটিশ দ্বিতীয়জন জন্মসূত্রে দক্ষিন আফ্রিকান রক্তে ব্রিটিশ।
দু বন্ধুরই অন্যতম প্রিয় বিষয় প্রাণ রহস্য। সময় পেলেই ওরা এ নিয়ে আলোচনা করতো । এর মধ্যেই ওদের হাতে এসে যায় মেরি শেলীর যুগান্তকারী রচনা ‘ফ্রাঙ্কেন্সটাইন’। পড়ার পর দুজনেরই বিশ্বাস দৃঢ় বদ্ধ হয় যে বৈদ্যুতিক শক দ্বারা মৃত প্রানীকে জীবিত  করা সম্ভব। অবশ্য শুধুমাত্র শক দিলেই হবে  না, কিছু রাসায়নিক উপাদান ও দেহে প্রয়োগ করতে হবে। তর্ক বিতর্ক আলোচনা সমালোচনা চলতে থাকে। একদিন খাতায় কলমে তারা প্রমান পায় তাদের ভাবনা একদম সঠিক। [ এবার রজারের ডায়েরী থেকে কিছু নির্বাচিত অংশ]
... ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি পাওয়ার পর চারটে দিন ধরে অনেক ভাবলাম। খাতায় কলমে যা সত্যি তার বাস্তবায়ন করতে হবে। ব্রিটেনে সম্ভব নয় অতএব...
ডসনকে জানালাম সে রাজি থাকলে গবেষণার বাকি কাজটা ভারতে গিয়ে করবো। এক কথায় রাজি হয়ে গেল ও। শুধু গবেষণা নয় ভারত ভ্রমনের ইচ্ছেও ওর অনেকদিনের।
দু সপ্তাহ হল এসে পৌঁছেছি ভারতে। খোঁজ খবর নিয়ে যোগাড় হয়েছে একটা বাড়ি। বাবার তৈরী বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে। কোন এক মিঃ রবার্ট বানিয়েছিলেন। চারদিকে জঙ্গল। নির্জন। আমাদের গবেষণার পক্ষে আদর্শ। কিনেই নিলাম বাড়িটা।
আগামী সপ্তাহেই এসে যাবে সব সরঞ্জাম। মৃত পশু পাখি যোগাড় করে রাসায়নিক তরলে সংরক্ষণ করছি।
দেখতে দেখতে কেটে গেল এক বছর ভারতে আসার পর। একের পর এক পরীক্ষায় সফল আমরা। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার বেশী স্থায়ী হচ্ছে না নবজন্ম। কেবল মাত্র আমরা দুজনা বুঝতে পারি এমন সাংকেতিক ভাষায় লিখে রাখছি গবেষণার খুটিনাটি। এই লেখার শেষে সেই সংকেত ও তার মানে দেওয়া থাকলো মিরাকলের আশায়। যদি কোনদিন
কোনোভাবে নদীর জলে ভেসে যাওয়া গবেষণার নোটস ফিরে পায় কেও।
১৫ এপ্রিল ১৯৪৩
গতকাল এখানকার এক আদিবাসী  যুবকের মাধ্যমে এক ৪৮-৫০ বছরের মানুষের মৃতদেহ যোগাড় করা গেছে। কৃতিত্ব প্রাপ্য ডসনের। ইতি মধ্যে ও বেশ ভালো হিন্দী রপ্ত করে নিয়েছে। আমিও কাজ চালানো গোছের পারছি।
মৃতদেহটা থেকে গন্ধ ছাড়ছে । শক্তও হয়ে গেছে। দিন দুয়েকের মরা মনে হল। ৩০০ টাকা নিল যুবকটা। ভাবভঙ্গী ভাল লাগলো না যুবকের। কেমন যেন একটা হিংস্র ভাব চোখে। বৃদ্ধ টির মাথার পেছনে শক্ত কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। রক্ত শুকিয়ে  চুলে দলা বেঁধে গেছে। খুন বলেই মনে হচ্ছে। আমি স ন্দেহের কথাটা ডসন কে বল তেই ও বল লো, ডোন্ট ওরি।
১৬ এপ্রিল ১৯৪৩
রাত ১১টা ৫৬ নিনিটে নব জন্ম দিয়েছি মানুষটাকে। মাথার কাটা দাগ মিলিয়ে গেছে। চুড়ান্ত শক দেওয়ার ৪১ মিনিট বাদে চোখ খোলে লোকটির। হার্টবিট আরও ১৩ মিনিট সময় নেয় স্বাভাবিক হতে। চেতনা ফিরে পেয়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল লোকটি।  স্বাভাবিক। আমরাও পৌঁছে গিয়েছিলাম উত্তেজনার চরমে। পরীক্ষার নিশ্চিত সাফল্য দেখে। বাকি ২৩ ঘণ্টা ৬ মিনিট আমি দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি। শারীরিক বিভিন্ন পরিবর্তন নোট করে গিয়েছি সমান তালে।
 ডসন যখন শ্যামলাল(লোকটির নাম)কে সব কথা জানালো, ভয় অবিশ্বাস মেশানো অভিব্যক্তিতে ছেয়ে গেল মুখটা। বিস্ময়ের রেশ কেটে যাওয়ার পর একটানা অনেক কথা বলে গিয়েছিল শ্যাম। তার ভেতর আসল কথা ছিল একটাই। ভগবানের নিয়মের ওপর হাত চালানো উচিত নয়। কথাটা বুঝতে পেরে হেসে উঠেছিলাম আমি। কারন আমি জানি ভগবান টগবান সব মিথ্যে। আসলে নিয়ম মাফিক কিছু জৈবিক ক্রিয়ার একত্রতার ফসল প্রান। ডসন কিন্তু হাসেনি। উলটে আমাকে ধমকে উঠেছিল – রজার ইউ শ্যূড নট লাফ অ্যাবাউট দ্য ফেইথ অফ আ পার্সন।
-মুঝে ছোড় দিজিয়ে সাব। মুঝে ঘর জানা হ্যায়।
প্রাণ ফিরে পাওয়ার ৭ ঘণ্টা ২১ মিনিট বাদে বললো শ্যাম লাল।
সম্ভব নয়, জানালাম আমি।
-কিঁউ?
-তোমার আয়ু আর মাত্র কয়েক ঘন্টা।
-তো ফির মুঝকো পহেলে জ্যায়সা বনা দিজিয়ে। মার ডালিয়ে হামে।
-সেটাও সম্ভব নয়।
-কিঁউ সাব, কিঁউ?
- আমাদের গবেষণার মানে কাজের স্বার্থে।
- হে ভগয়ান। ভাগ মারি গই হামার। ইয়ে কাহা ফাঁসা দিয়া হামে।
দুফোঁটা জল গড়িয়ে এসেছিল শ্যামের চোখ দিয়ে।
আরো ১১ ঘণ্টা পর...
সহসাই কেশে উঠলো শ্যামলাল। সাথে সাথেই ফেটে গেল গালের চামড়া। কিন্তু কোনো রক্ত বের হল না।
ঘরঘরে স্বরে শ্যামলাল বললো – বহুত তকলিফ হো রহা হ্যায় সাব। বহুত কষ্ট হো রহা হ্যায়। ভগওয়ান আপকা ভালা করেগা, মুঝে মার ডালিয়ে। ইয়ে মেহেরবানি কিজিয়ে সাব।
ডসনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে ও। বললাম – কেন অযথা অনুরোধ করছ শ্যাম। যাকে জীবন দিয়েছি তাকে মারতে পারবো না।
শুনতে পেলাম ডসনের গলা – ডু ইট রজার। অ্যাজ হি উইশ।
-আর ইউ ক্রেজি ডসন? দিস ইজ আওয়ার রিসার্চ। ডোন্ট বি সেন্টিমেন্টাল!
-প্লিজ রজার।
- নো মোর ওয়ার্ড ফ্রেন্ড।
পরবর্তী এক ঘন্টায় শ্যামলালের দেহের অনেক গুলো জায়গা ফেটে ফেটে গেল।রক্তপাত হীন ভাবে। মাথার পেছনের কাটা দাগটা আবার পরিস্ফুট হয়েছে। শ্যাম সমানে একই আর্জি জানিয়ে চলেছে। আমি সিদ্ধান্তে অনড়। ডসন বেরিয়ে গেছে ঘর থেকে।
শ্যামলাল আমায় ডাকলো – রজার সাব জরা শুনিয়ে।
কথা বলতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল ওর তখন। জড়িয়ে যাচ্ছিলো উচ্চারণ। গেলাম কাছে।
সাব ইয়ে আখরি বার ক্যাহ রাহা হু মুঝে মার ডালিয়ে?
ওহ গড...কি করে যে তোমায় বোঝাই? আমি পারবো না।
সাব মেরা বাত মান লিজিয়ে। উপরবালে কে কানুন মে হাত মত দালিয়ে।নেহি তো একদিন এ্যায়সা আয়েগা জব আপ খুদ মওত কে ভিখ মাগেঙ্গে আউর মওত নেহী মিলেগা।
বুঝলাম আর কোনো উপায় না দেখে মেন্টাল প্রেসার দিতে চাইছে শ্যাম। তাই পাত্তা না দিয়ে সরে এসেছিলাম ওর কাছ থেকে। ডিয়ার সঞ্চিতা, সেদিন ওর কথা মানলে হয়তো আজ আমাকে এই লেখা লিখতে হতোনা।
২৪ ঘণ্টা পূর্ণ হওয়ার ১০ মিনিট আগেফিরে এসেছিল ডসন।ত তক্ষনে কমে গিয়েছিল শ্যামের হৃদপিণ্ডের গতি। রক্তচাপ।শরীরের সজীবতা। পারিনি ভাঙতে সময়ের অমোঘ বন্ধন। ঠিক ২৪ ঘণ্টাতেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সব। এক ই দেহে দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় কোন ফল হয়না জেনেও আরো একবার চেষ্টা করেছিলাম জীবনদানের। কোনও লাভ হয়নি।
২৪ ঘণ্টারও বেশি সময়ের টানটান স্নায়ুচাপের পর সারা শরীর অবসন্ন বোধ করছিল। দরকার বিশ্রামের। গবেষণা সংক্রান্ত কাগজপত্র সব কালো চামড়ার ফোলিও ব্যাগে পুরে ডসনকে বললাম – আমি বাড়ি যাচ্ছি। তুমি সব বন্ধ করে এসো।
-এতো রাতে কি না ফিরলেই নয় রজার?
-না বন্ধু, আর পারছি না। শরীর আরাম চাইছে। দীর্ঘ পথচলার শেষের আরাম।
- দেন ওকে, অ্যাজ ইউ উইশ। গুডনাইট।
-গুডনাইট ডিয়ার ফ্রেন্ড। সি ইউ টুমরো।
-ইউ টু।


বাড়ি ফেরার পথটা একটু আঁকা বাঁকা। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। জমাট অন্ধকার। ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ। সাথে অচেনা রাতচরা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল। তিন ব্যাটারীর টর্চটা জ্বালিয়ে অভূত পূর্ব ঘটনাটির কথা ভাবতে ভাবতে ফিরছি। সহসা পেছন দিকে কেমন যেন একটা আওয়াজ শুনলাম বলে মনে হল। দাঁড়িয়ে গেলাম। থেমে গেল শব্দটাও। তবু সন্দেহ হওয়াতে ঘুরে দাঁড়ালাম। টর্চের আলোয় দেখতে পেলাম সেই যুবকটিকে। যে শ্যামলালের মৃতদেহ এনে দিয়েছিল। হাতে একটা লাঠি। গোটা শরীরটা কেঁপে উঠলো অদ্ভুত আশঙ্কায়। অশুভ কিছু একটা যেন হতে চলেছে। ঝোলানো ব্যাগটা বুকের কাছে চেপে ধরলাম। হৃদপিণ্ড লাফাচ্ছিল টেনিস বলের মতো। নিজের কানে নিস্তব্ধ রাতে শুনতেও পাচ্ছিলাম তার শব্দ।
কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম – হোয়াট ডু ইউ ওয়া... কেয়া চাহিয়ে?
হাত তুলে ব্যাগটা দেখিয়ে বললো – উয়ো থলিয়া।
-ইস্মে কুছ নেহি হ্যায়। অনলি সা...
- বাত মত বাড়াইয়ে। ও দে দিজীয়ে...
গবেষণার সব কাগজ ওই ব্যাগে। প্রানের চেয়ে প্রিয় ওই ব্যাগ তখন আমার কাছে। বললাম – তুম কাল বাংলো মে আজাও। যো কুছ বোলনা হ্যায় উহা পর বোলনা।
কর্কশ হিংস্রস্বরে  বললো - আপ ও থলিয়া দেগা কে নেহি? মুঝে আচ্ছি তরাহ সে মালুম হ্যায় উস্মে বহুত সারে রুপিয়া হ্যায়।
নেহি নেহি তুমকো গ লতি হো রহা হ্যায়। ইস্মে থোড়া কাগজাদ...
ঝুট মত বোলিয়ে! সিধা সিধা দে দিজিয়ে নেহিতো ...
নেহি তো কেয়া হোগা?
এক পা এগিয়ে এলো যুবকটি। লাথির মাঝখানটা একহাতে ধরে অন্যহাতে একবার ঘুরিয়ে টান দিতেই বেরিয়ে এলো চকচকে জিনিসটা। একটা সরু লোহার লম্বা ফলা। ভারতে একে বলে গুপ্তি। বুঝে গেলাম কি হতে চলেছে। দু পা পিছিয়ে ঘুরে পালাতে গিয়ে পড়ে গেলাম। সাথে  সাথেই শিরদাঁড়ার পাশে তীক্ষ্ণ ফলাটা ঢুকে গেল বুঝতে পারলাম। টর্চের আলো থাকা সত্বেও আমার চোখে নেমে এলো একরাশ কালো অন্ধকার।
 [রজারের ডায়েরীর পরের কিছু পাতার লেখনীর সারমর্ম।]
দুর্ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার মিনিট ২৫ বাদে ডসন সব গুছিয়ে গবেষনাগার বন্ধ করে ফেরার পথে রক্তাক্ত ও মৃত অবস্থায় পায় রজারকে। কালো চামড়ার ব্যাগটা ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে আবার গবেষনাগারে ফিরে যায় ডসন। অবশ্যই রজারের মৃতদেহ নিয়ে। পর পর নিয়ম মেনে প্রয়োগ করে সঞ্জীবনী শক। জীবন ফিরে পায় রজার। ডসনের কাছ থেকে জেনে নেয় যুবকটির বাড়ির ঠিকানা। কোনও কথা শোনে না ডসনের। ভোরের আলো ফোটার সামান্য পরেই পৌঁছে যায় যুবকটির বাড়ি। প্রথমে সামনে আসতে রাজি না হলেও রজারের কথায় আশ্বস্ত হয়ে কথা বলতে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। জানায় টাকা পয়সা কিছু না পেয়ে ব্যাগটা নদীতে ফেলে দিয়েছে। এটা শুনেই মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে রজারের। ব্যাগটা পেলে যা হয়তো হতোনা সেটাই ঘটে যায়। ভয় দেখাবে বলে নিয়ে আসা রিভলবারটা বার করে সকলের চোখের সামনে গুলি করে মারে যুবকটিকে।
পৈত্রিক বাড়িতে ফিরে আসার ঘণ্টা চারেক বাদেই রজারকে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ পুলিষ।ইছে ছিলনা সামান্য এক নেটিভ খুনের দায়ে রজার কে গ্রেপ্তার করার। কিন্তু তখন দেশ জুড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের ঢেউ। অতিরিক্ত ঝামেলা না বাড়াতেই ওরা এটা করে। কোনো কথা না বলে ধরা দেয় রজার। কারন সে জানতো কেওই তার আর কিছু করতে পারবে না, আইন তো নয়ই। পৃথিবীতে তার মেয়াদ আর কিছু ঘণ্টা।
[আবার রজারের ডায়েরী থেকে।]
“বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলাম। এক সময় পেরিয়ে গেল ২৪ ঘণ্টা। কোথায় মৃত্যু? কোথায় কষ্ট?? আরও বেশি সুস্থ সতেজ মনে হচ্ছিল নিজেকে।
মাঝে মধ্যেই চলছিল মামুলি পুলিশি জেরা। ব্রিটিশ বলেই কোনও শারীরিক নির্যাতন করেনি ওরা আমার ওপর। একটাই প্রশ্ন ওদের, কেন খুনটা করলাম আমি? কোন উত্তর দিইনি প্রথম দিকে। কিন্তু ২৪ ঘণ্টাতেও যখন কিছু হলো না তখন সত্যি কথাই বললাম। ওই যুবকটা আমাকে খুন করেছিল তারই প্রতিশোধ নিতে আমি এই কাজ করেছি। ওদের মুখ গুলো প্রথমে বিস্ফারিত হল বিস্ময়ে। তারপর অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। সব কথা খুলে বলা আমার পক্ষে অসম্ভব তাই আমি ওই একটা কথাই বলে গেলাম।
একই প্রশ্ন একই উত্তর। সারাদিন চল লো একই ঘটনা। ডসন কিন্তু একবারও এলো না। ঠিকানা জানিয়ে বললাম খোঁজ নিতে। ওরা জানালো তালা ঝুলছে মিঃ রবার্টের বাড়িতে। আমার নিজের বাড়িতেও কেউ আসেনি।
স্বাভাবিক ভাবেই ওদের চোখে আমি অপ্রকৃতস্থ সাব্যস্ত হলাম। আদালতও একই রায় দিলো। আমার নতুন ঠিকানা  হল মেন্টাল অ্যাসাইলাম।
ডসন আমাকে নবজন্ম দিয়েছিল রাত ১টা বেজে ১০ মিনিটে। মাস কয়েক পর থেকে ঠিক ওই সময়ে আমার শরীরে প্রতিদিন এক এমন টানাপোড়েন শুরু হয় যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব ন্য়। শ্যামলালের মতই মৃত্যু কামনা করি ওই সময়টায়। কিন্তু মৃত্যু আমাকে ছুঁয়েও দেখে না। আত্মহত্যা করার মতো মানসিক দৃঢ় আমি নই। দিন দিন আমার শরীর আরও সজীব হচ্ছে।
সঞ্চিতা যদি তোমার আগে আমার মৃত্যু হয় তবেই এ রহস্য তুমি জানতে পারবে। নচেৎ আমাকে অপেক্ষা করতে হবে আরও ... জানিনা সে অপেক্ষা হবে কতদিনের।”
লেখার শেষ এখানেই। এরপরে কিছু সঙ্কেত ও তাদের মূল অর্থ লেখা আছে। যা আর কোনওদিনই কাজে লাগবে না ভেবেছিলাম।
রজারের মৃত্যুর ২ দিন পর।
কেন বেঁচে গিয়েছিল রজার? কেন বার বার পরীক্ষিত ফলাফল পালটে গিয়েছিল আবিষ্কারকের বেলায়? এসব উত্তর হয়তো কোনোদিনই জানতে পারতাম না যদি না রজারের কেস হিস্ট্রি ফাইলটা আবার আমারহাতে আসতো। ওর মধ্যে ডেথ সার্টিফিকেটটা রাখতে গিয়ে অন্যমনস্কভাবে একটা পাতা উলটানোর সময় চোখে পড়লো নোটটা। রাঁচির পাগলা গারদে থাকে ২১ তম বছরে একটা চিঠি এসেছিল রজারের নামে। কে পাঠিয়েছিল জানা যায়নি। কিন্তু এসেছিল দক্ষিন আফ্রিকা থেকে। দক্ষিন আফ্রিকা? তবে কি??
খোঁজ নিয়ে জানলাম চিঠিটা এখনো রাঁচিতেই আছে।
আরও ৪ দিন পর।
অপেক্ষার অবসান। ঘন্টা  দুয়েক আগে চিঠিটা হাতে পেয়েছি। সে সময়ে খুলে দেখেছিল ওখানকার আধিকারিকেরা। কিছু বুঝতে না পেরে পাঠিয়ে ছিল গোয়েন্দা দপ্তরে। তার প্রমানও আছে। কিন্তু ওরাও বিফল হয়েছিল রজারদের সঙ্কেত ডিকোড করার ক্ষেত্রে। ডায়েরীতে লেখা সঙ্কেতলিপি কাজে লেগে গেল। আমার অনুমান সঠিক, চিঠিটা পিটার ডসনের।
ডিয়ার
রজার
জানিনা এ চিঠি তোর হাতে পৌঁছাবে কিনা? চিঠি পেলে অবাক যে হয়েছিস এটা নিশ্চিত। হয়তো বা গালাগালিও দিচ্ছিস। দিতেই পারিস ওটা আমার প্রাপ্য। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তোর সাথে আর কোন যোগাযোগ না রাখার কারন জানাতেই এই চিঠি লিখলাম। এটাও জানিনা এ কথা গুলো কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে তোর কাছে।আমার সাক্ষ্য তোকে পাগ লাগারদ থেকে বাঁচাতে পারলেও কারাবাস তোর হতই। কারন খুন যে তুই করেছিলি এটাতো সত্যি। আরো বড় সত্যি হল আমি ভয় পেয়েছিলাম। যে সময়ে আমরা ভারতে ওই পরীক্ষা করছিলাম সে সময়ের পক্ষে ওই গবেষণা অনেক এগিয়ে থাকা সময়ের। যুগে যুগে যা হয়েছে আমাদেরও তাই হতো। কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ হয় ডাইনীবিদ্যা অথবা ভগবানের বিরোধিতা করার অপ রাধে আমাদের মেরে ফেলতো। কোনও আইনই আমাদের বাঁচাতে পারতো না জনরোষ থেকে।
এছাড়াও বেআইনি ভাবে যোগাড় করা শ্যাম লালের মৃত দেহটার পক্ষে কোন সঠিক যুক্তি ওই সময়ে দেওয়ার কথা আমি ভাবতেও পারিনি। আরো একটা খুনের দায় চাপতো । নিজেকে বাঁচানোর তাগিদে আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম। হ্যাঁ আমি বন্ধুকৃত্য পালন করিনি। আমি ক্ষমা চাইছি তার জন্য। করা বা না করা তোর হাতে।
অবশ্য আরও একটা যুক্তি আমার আছে নিজের সাফাই এর জন্য। একটা প্রশ্নর সমাধান করা। সেটা হল তোর জীবন রহস্য। ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েও কি ভাবে বেঁচে থাকলি তুই? এর উত্তর খূঁজে বের করার আগ্রহও অন্যতম কারন আমার পালিয়ে যাওয়ার। বিগত বছর গুলোতে আবার কেঁচে গণ্ডূষ করেছি। সব কাগজ পত্র তো ওই হতভাগাটা জলেই ফেলে দিয়েছিল। নাহ নতুন করে কাউকে জীবন দেওয়ার চেষ্টা করিনি। অত আর্থিক সামর্থ্য আমার নেই। তাই খাতায় কলমেই শুরু করি উত্তর খোঁজার কাজ। পেয়েছি সম্ভাব্য উত্তর। আর তাই এই চিঠির অবতারনা।
আমরা শ্যামলাল পর্যন্ত যতগুলো পরীক্ষা করেছিলাম সবগুলোই দুই বা তিনদিনের পুরনো মরা দেহ ছিল। দেহ এবং মস্তিষ্ক কোষেরা সম্পূর্ণ ভাবে মৃত। হারিয়েছে কর্মক্ষমতা। আমাদের তৈরি রাসায়নিক তাকে সাময়িক উজ্জীবিত করছিল মাত্র। যার ফলে শক পেয়ে কাজ শুরু করলেও ওরা পারেনি নতুন করে কোষ গঠন করতে। ফলে নবজন্ম কখনই দীর্ঘায়িত হয়নি।
তোর ক্ষেত্রে ঘটনাটি ঘটেছিল সম্পূর্ণ আলদা রকম। মৃত্যুর ১ ঘণ্টার মধ্যেই প্রয়োজনীয় পদ্ধতি প্রয়োগ হয়েছিল তোর শরীরে। দেহ ও মস্তিষ্ক কোষেরা তখন পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়নি। আমাদের রাসায়নিক অনেক বেশী প্রানবন্ত করে দেয় ওগুলোকে। বাকি কাজটা ওরাই করে নেয়। আমার অনুমান সঠিক হলে তোর শরীরে বয়সের ছাপ পড়বে সাধারন মানুষের চেয়ে অনেক ধীরগতিতে। দুর্ঘটনা না ঘটলে তোর মৃত্যু কবে হবে তার কোন ঠিক ঠিকানা থাকবে না।
ওকে বন্ধু, এখানেই থামলাম। আরও একবার ক্ষমা চাইছি। সঙ্কেত মাধ্যমেই লিখলাম। আশা রাখছি ভুলে যাসনি।
তোর
একান্ত প্রিয়
ভীতু ক্ষমা প্রার্থী বন্ধু
পিটার ডসন
১৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৬৪
সমাপ্ত।





অদল বদল [কল্প বিজ্ঞানের গল্প]

কল্প বিজ্ঞানের [Science Fantasy] গল্প
“অদলবদল”
শারদ সংখ্যা "ইষ্টিকুটুম" ১৪২৩ এ প্রকাশিত

ক্যুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারি ম্যানের কাছ থেকে লালরঙের রয়াল সাইজ খামটা হাতে পেয়ে ভাবলাম বছরের  মাঝামাঝি সময়ে কে আবার গ্রীটিংস কার্ড পাঠালো। ওপরে কালো মোটা স্কেচ পেন দিয়ে আমার নাম ঠিকানা লেখা থাকলেও কোন প্রেরকের উল্লেখ নেই। ডাক টিকিটও নেই যে অনুমান করবো।
বেশী মাথা না ঘামিয়ে খুলেই ফেললাম খামটা। ভেতর থেকে বের হল একটু ছোটো মাপের আর একটা হলদে খাম । যার ওপর লেখা, ইংরাজিতে ।। ফ্রম রিচারড জন বোল্টন, ৩/৭ মেইলর স্ট্রিট, লন্ডন, ইউ কে। জনের চিঠি এতদিন পর!!!
“  হেল্লো ...গুডমর্নিং... আই অ্যাম রিচারড জন বোল্টন ফ্রম লন্ডন।”-কানে ভেসে এলো বছরকয়েক আগে শোনা কণ্ঠের ধ্বনি।সেদিন দাঁড়িয়ে ছিলাম গ্লোবট্রটার জাহাজের দোতলার ডেক রেলিংএ। উপলক্ষ্য, ইউনিভার্সিটি অফ পিটসবারগ এর সাথে যুক্ত একটি সংস্থা আয়োজিত ‘সেমেস্টার অ্যাট সি’। বিদেশের বিভিন্ন কলেজের ছাত্রছাত্রীদের একই সাথে দেশভ্রমণ ও বিশেষ ডিগ্রী লাভের সুযোগ হয় এতে।আয়োজক সংস্থার অনুরোধে ভারতীয় চিত্রকলা বিষয়ে চার সপ্তাহের অনারারী ইন্টার পোর্ট লেকচারারের দায়িত্ব পেয়েছিলাম।
জাহাজে তৃতীয় দিন ছিল সেটা।ঘূরে তাকাতেই দেখতে পেলাম ক্রিকেটার ডেভিড গাওয়ারের মতো দেখতে একটি মানুষ আমার দিকে এগিয়ে আসছেন।
“গুডমর্নিং মিঃ বোল্টন। ডিউক ব্যানারজী ফ্রম ইন্ডিয়া।”
প্রাথমিক আলাপচারিতা শেষে জনই আমন্ত্রণ জানিয়েছিল কিছু সময় ওর সাথে কাটানোর জন্য। কোন কাজ ও ক্লাস না থাকায় আপত্তির কোন ব্যাপারই ছিল না। একঘণ্টার বেশী সময় ধরে চলেছিল আমাদের কথাবার্তা। বাকি দিনগুলোতে এরকম একাধিক আড্ডায় আমরা একে অপরের অনেক কথাই জেনে ফেলেছিলাম।
ইউনিভার্সিটি অফ পিটসবারগ এ জন গবেষণা করছিল শরীর ও মনের ওপর বিশেষ সম্পর্ক নিয়ে। নিরিবিলি সেই কাজের ব্যাপারে আরও কিছু ভাবনা চিন্তার জন্য এই সফরে ও এসেছে ডেপুটি অ্যাডমিন হয়ে। পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান। দাদা বউদি কাজ করতেন সেক্রেটারিয়েট ডিপার্টমেন্টে। এক মর্মান্তিক অ্যাকসিডেন্টে জনের ভাইপোটি ছাড়া সকলেই মারা যায়। পারিবারিক সুত্রে অগাধ সম্পত্তির মালিক।
কোনো ভ্রমণ শেষে যা হয় এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।প্রথম তিন চার মাসে বেশ চিঠি পত্রের আদানপ্রদান। তারপর আস্তে আস্তে সব থেমে গেল। শেষের দিকে পর পর দুটো চিঠির  কোনো উত্তর না পেয়ে আমি আর উৎসাহ দেখাইনি। এতদিন বাদে জনের মনে পড়লো তাহলে আমাকে... তাও আবার রহস্যময় লাল খামে হলুদ খাম।
ভাবনা চিন্তার জগতে তালা দিয়ে হলুদ খামটাও খুললাম। ভেতরে হাল্কা সবুজ রঙের একটা ভাঁজ করা কাগজ শুধু। ভালো করে দেখলাম , না আর কিছু নেই। দামী কাগজে চিঠি লেখা জনের একটা শখ। আগের সব চিঠিগুলোই তার প্রমান। শখের পরিবর্তন হয়েছে নাকিরে বাবা? ভাঁজ খুলে আরও বিস্ময়! কিছুই লেখা নেই কাগজটায়। একি ধরনের রসিকতা। কি মনে হতে আলোর দিকে তলে দেখলাম। না কিছু সারি বদ্ধ বারকোড ধরনের দাগ ছাড়া আর কিছু নজরে এলো না। কাগজ কোম্পানির ওয়াটার মার্ক হবে সম্ভবত। হ লুদ খামটা আরও একবার দেখলাম। নাহ । জনের কোনও ফোন নাম্বার ও নেই। ও ফোন ব্যবহারই করে না। ওরমতে ওটা কাজে ব্যাঘাত ঘটানোর আদর্শ জিনিষ। কি যে করি ???
চিঠিটা পাওয়ার পর সময় স্রোতে বয়ে গেছে ঘণ্টা ছয়েক। এখন সময় বিকেল চারটে দশ। নিতান্তই কৌতূহল বশে সবুজ কাগজটার একটা ফটো কপি করে কাছের চেনা মলটায় গিয়েছিলাম। ওদের বারকোড টার্মিনাল ওয়ান্ডটার ওপর ওটা রেখেও কোন লাভ হয়নি।
দুটো ইমেইল করেছি ইতিমধ্যে। প্রথমটা দিল্লীতে। কমপিউটার বিশেষজ্ঞ বন্ধু নক্ষত্র প্রকাশ রায়কে। ফটোকপিটার স্ক্যান করা ফাইলটা অ্যাটাচ করে। আর দ্বিতীয় ই-মেল পাঠিয়েছি ইউনিভার্সিটি অফ পিটসবারগ এর অফিসে।
সন্ধে সাতটার মধ্যে দুটো ইমেলেরই জবাব এসে গেল।নক্ষত্র জানিয়েছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আ্মাকে  দিল্লী যেতে হবে। দ্বিতীয় উত্তরটা বেশ চিন্তাজনক। ওটার বয়ান অনুসারে রিচারড জন বোল্টন অনেকদিন আগেই ইউনিভার্সিটি অফ পিটসবারগ থেকে বিদায় নিয়েছে। এখন ও কোথায় আছে কি করছে সেটা ওরা জানেন না।
তিনদিন পর....
পৌঁছে গেছি দিল্লী।নক্ষত্রর বাড়িতে।
ফোর সি থ্রী । নক্ষত্রর তৈরি বিশেষ ডিকোডার ডিভাইস। যার সাহায্যে পাঠ উদ্ধার হয়েছে সবুজ চিঠির। সেটাই আমি পড়ছি ল্যাপটপে।
ডিউক, মাই ডিয়ার ইন্ডিয়ান ফ্রেন্ড
জানিনা এ চিঠি কোনও দিন তোমার কাছে পাঠানোর দরকার হবে কিনা। না হলেই ভালো । আমার ওপর তুমি অনেক অভিমান করে আছো আমি নিশ্চিত। তোমার পাঠানো শেষ দুটো চিঠির উত্তর দিইনি কারণ স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছিলাম গবেষণাটা দ্রুত শেষ করবো বলে। অনেকটা তোমাদের মুনিঋষিদের তপস্যার মতো বলতে পারো।
ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও সহকারীর কাজটা আমার ভাইপো স্টিফেনই করে দিতো। তোমায়তো জানিয়েইছিলাম ওর বাবামা এর কথা। মানসিক ভাবে ওকে আমি আমার ছেলের মতই মানুষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তাই বিয়েটাও করিনি। ২০১৪ এর প্রথম দিকে আমি সফল হয়েছি আমার গবেষণায়। তারপর থেকেই শুরু হয়েছে গণ্ডগোল। স্টিফেন কেমন যেন বদলে গেছে। ছুতোনাতায় জানতে চাইছে বুঝতে চাইছে আমার গবেষণার খুঁটিনাটি। কি বিষয়ে আমি কাজ করছি এটা ওর জানা থাকলেও, কি ভাবে কি করছি বা হচ্ছে সেটা ওকে আমি জানাই নি।
গোপন সূত্রে খবর পেয়েছি ও ভিনদেশীয় কিছু মানুষের সাথে ইদানীং মেলামেশা করছে। সাথেই খোঁজ খবর নিচ্ছে পারিবারিক সম্পত্তির।
এই চিঠি আমি আমার এটর্নি মিঃ ফ্রেড স্ট্যাফোরডকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না স্টিফেনকে। এখন থেকে রোজ মিঃ  স্ট্যাফোরডকে সকালে একবার করে ফোন করবো। পর পর তিনদিন আমার ফোন না পেলে এই চিঠি যেন তোমায় পাঠিয়ে দেওয়া হয় তার নির্দেশও দিয়ে দেব ওকে।
জানিনা কেন তোমায় বিশ্বাস করছি। ভরসা করছি। হয়তো ভারতীয় বলেই।

আর কিছু লেখা ছিল না। দুজনেই চুপ করে বসেছিলাম। নিস্তব্ধতা ভাঙল নক্ষত্রই।
-      কিরে কিছু বল?
-      তোর কি অভিমত?
-      আজকের কাগজে রাশিফলটা দ্যাখতো একবার...
-      মানে!!! তোর আবার এসব বাই কবে থেকে হল?
-      হয়নি তো । কুম্ভ আর বৃশ্চিক রাশিতে বিদেশ ভ্রমণ লিখেছে কিনা জানতে খুব ইচ্ছে করছে।
-      তারমানে আমরা যাচ্ছি।
-      ইয়েস ডিয়ার ফ্রেন্ড। এতটা বিশ্বাস যখন তোর ওপর ওই মানুষটার তাকে কি করে অস্বীকার করবি...
সাতদিন  পর...
লন্ডন। নক্ষত্রএর ওপর মহলে পরিচিতির সুবাদে ভিসা বার করতে বেশি সময় লাগেনি।
আমরা বসে আছি এটর্নি মিঃ ফ্রেড স্ট্যাফোরড এর শীততাপ নিয়ন্ত্রিত চেম্বারে। বিখ্যাত আইন ব্যবসায়ী ‘স্ট্যাফোরড এ্যন্ড ক্রিপস’দের চেম্বার খুঁজে বার করতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি।
পরিচয় জানানোর কিছুক্ষনের মধ্যেই হাজির হয়েছিলেন মিঃ ফ্রেড স্ট্যাফোরড। বয়স ৫০-৫৫ হবে। সাদর অভ্যর্থনার বহরেই প্রমানিত জন বেশ ভালোই দক্ষিনা দেয় এদের।
মিনিট চল্লিশ পর যখন বেরিয়ে এলাম স্ট্যাফোরড এ্যন্ড ক্রিপস হাউস থেকে তখন ভবিষ্যৎ দিশার ভাবনায় দুজনেই বাক্যহারা।
উনি আমাদের আরও দুটো খাম দিয়েছেন। যার মধ্যে এক্তিতে আছে একটি মাইক্রো চিপ। আর অন্যটিতে ১০ হাজার পাউন্ড। এরকমই নাকি নির্দেশ দেওয়া আছে মিঃ রিচারড জন বোল্টন দ্বারা।

ওইদিন বিকেল। স্থান – ৩/৭ মেইলর স্ট্রীট।
দেখা পেয়েছি স্টিফেন বোল্টনের।উচ্চতা জনের মতোই তবে স্বাস্থ্য আরও ভাল।আচরণে কেমন একটা ইতস্তত ভাব। মুখ চোখে অপরাধীসুলভ ছাপ। জানালাম , আমরা রিচারড এর ভারতীয় বন্ধু । বেড়াতে এসেছি লন্ডনে। দেখা করতে চাই ওর সাথে।
শুনে বললো- কিছু দিন আগে এলে সুস্থ দেখতে পেতেন।
-      সেকি!!কি হয়েছে জনের?
-      সেটা যদি জানতে পারা যেত তাহলে তো ভালই হতো।
-      ডাক্তার দেখানো হয়নি।
-      হবে না কেন। পারিবারিক ফিজিসিয়ান রোজ আসছেন। কিন্তু তিনিও তো কিছুই বুঝতে পারছেন না। আঙ্কল কোনও কথাই বলছেন না।
নক্ষত্র বললো – একবার দেখা করা যাবে?
স্টিফেনের মুখে অনিচ্ছার ভাব ফুটে উঠলেও কিছু একটা ভেবে নিয়ে ও রাজি হয়ে গেল।
নিয়ে গেল  বাড়িটার ভেতর। বাড়িতো না যেন প্রাচীনকালের দুর্গ। ঘরের উচ্চতা সাধারন মাপের তিন চার গুন। বড় একটা চত্বর পেরিয়ে স্টিফেন আমাদের নিয়ে গেলে একটা তালা বন্ধ ঘরের কাছে। জানলার বাইরের কাঠের খড়খড়ি তুলে দিতেই দেখতে পেলাম জনকে। ছয় ফুট উচ্চতার মানুষটা কুঁজো হয়ে হেলেদুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে গোটা ঘরটায়। জন বলে ডাকতেই একবার তাকালোও আমাদের দিকে। তারপরই একলাফে উঠে গেল একপাশে রাখা টেবিলটার ওপর। আশ্চর্যের বিষয় এই ঠাণ্ডায় জনের গায়ে কেবল মাত্র একটা পাতলা জামা। তার বেশিরভাগ বোতাম খোলা। আর একটা বারমুডা প্যান্ট। কিছু আধখাওয়া ফল পড়ে আছে এদিক ওদিকে।
মাস খানেক হতে চললো এই অবস্থা, জানাল স্টিফেন। মিঃ স্ট্যাফোরড ও সকালে জানিয়েছিলেন, বর্তমান মাসের তিন তারিখে এসেছিল শেষ ফোন। আজ ২৮ তারিখ। তিনি নিজে এসেছিলেন ৭ তারিখে। আমরা যা দেখছি তিনিও প্রায় একই অবস্থা দেখেছিলেন। শুধু সেদিন ঘরের এক কোনে চার হাতপা এক করে কুঁকড়ে বসে ছিল রিচারড। এরপর পরই উনি চিঠিটা আমার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন।

একই দিন। সময় রাত ৯টা। স্থান মিঃস্ট্যাফোরড মনোনীত হোটেলের ঘর।
ফিরে আসার পর থেকে নক্ষত্র ল্যাপটপ আর চিপটা নিয়ে খুটুর খুটুর করেই চলেছে। পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড চিপ ফলে কি তথ্য অতে সঞ্চিত আছে তা এখনো অজানা। একের পর এক কল্পিত পাসওয়ার্ড ‘ডিনাই’ করার শব্দ ভেসে আসছিল কানে। মোট ১৮টা ক্যারেক্টার আছে পাসওয়ার্ড টায়। যার মধ্যে দুটো ব্ল্যাঙ্ক স্পেস আছে, জানিয়েছে নক্ষত্র।
আরও কিছু সময় কেটে যাওয়ার পর আমি বললাম, ডিয়ার ফ্রেন্ড চল ডিনার টা সেরে আসি। পেটে খাদ্য আর মাথায় ফ্রেস হাওয়া লেগে যদি বুদ্ধিটা খোলে।
-      ওয়েট আ সেকেন্ড! কি বললি ... তাইতো ...
কথাটা বলেই কি বোর্ডে ঝটপট কিছু একটা টাইপ করলো নক্ষত্র। আর সাথে সাথেই ধ্বনিত হলোও কাঙ্খিত সেই শব্দ যার অর্থ পাসওয়ার্ড অ্যাকসেপ্টেড।
রুম সার্ভিসে ফোন করে খাবারটা ঘরেই পাঠিয়ে দিতে বল ডিউক। প্রথম দুটো শব্দ আগেই ধরে ফেলেছিলাম, তৃতীয়টার নাগাল পাচ্ছিলাম না। তোর উদ্দেশ্যে চিপ অর্থাৎ তুই, তার মানে ডিউক। চিঠিতে লেখা তিনটে শব্দ ভুলে যাসনি বোধ হয় - “হয়তো ভারতীয় বলে”- ভারতীয় মানে ইন্ডিয়ান। বিশ্বাস কাকে করা যায়? এটাই ধরতে পারিনি। তোর সাথে রিচারডের সম্পর্ক টা মাথা থেকে বেমালুম হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। বন্ধু অর্থাৎ ফ্রেন্ড। আসলে পাসওয়ার্ডটা তোকে পাঠানো চিঠির সম্বোধনেই দেওয়া ছিল। ডিউক মাই ডিয়ার ইন্ডিয়ান ফ্রেন্ড
ডিনার সারার পর দেখলাম চিপের তথ্য ভান্ডার। তিনটে ফোল্ডার। ১. বাড়ির নকশা, ২. গবেষণার বিষয় এবং ৩. রিচারডের আশংকা সম্বলিত বয়ান।

নকশা নিয়ে কিছু বলার নেই। গবেষণা সংক্রান্ত বিষয়টা যথেষ্টই কৌতূহলজনক। মাইন্ড এক্সচেঞ্জ। মনের অদল বদল। কেরলমাত্র মানুষ নয় মানবেতর প্রানীদের ও মন আছে এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে তবেই এ গবেষণার সূচনা করে রিচারড। একাগ্র তপস্যার ফলও মেলে। প্রথম সফলতা আসে দুটি মানবেতর প্রাণীর মধ্যে মানসিক অদল বদল ঘটিয়ে। পাল্টে যায় তাদের আচার আচরণ খাদ্যাভাস। ক্রমে ক্রমে বড় প্রানীর ক্ষেত্রে পরীক্ষণের সফলতা বাড়িয়ে দেয় আশার পারদের উচ্চতা। এবার ল ক্ষ্য স্থির হয় মানুষের সাথে মানবেতর প্রানীর মনের রদবদল ঘটানোর। স্টিফেন যেচে এ পরীক্ষায় গিনিপিগ হতে রাজি হয়।। এক্ষেত্রেও ১০০% সফলতাই প্রাপ্তি হয় গবেষকের। স্টিফেনকে ফিরিয়ে আনে আগের সত্তায়। আর এ ঘটনার পর থেকেই বদলে যায় স্টিফেনের মতিগতি। চিঠিতেই জানিয়ে ছিল স্টিফেনকে বিশ্বাস করতে পারছে না রিচারড। চিপ এর আশঙ্কা বয়ান পড়ে জানতে পারলাম প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিয়েছিল গবেষণার ফর্মুলা হাতে পাওয়ার জন্য। রিচারড লিখেছে – “ডিউক প্রানের ভয় আমার নেই। গবেষণার সফলতাতেই আমার সব পাওয়া হয়ে গেছে এ জীবনে। স্টিফেন আমাকে মেরে ফেলার সাহস দেখাবে না এটা বুঝতে পারছি। কারন তাহলে ফর্মুলা হাত ছাড়া হবে। কেবলমাত্র যন্ত্রপাতি দেখে কিছু করার মতো বোধবুদ্ধি ওর নেই। আমার ভয় অন্য জায়গায়। লোভের বশে বোকামো করে আমার কোনও রকম অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে উলটো পালটা কিছু না করে দেয়। কিন্তু উলটো পালটা কি করবে সেটাও আমি ঠিক বলতে পারছি না। কিন্তু কেন জানিনা আমার মনটা কুডাক ডাকছে।”
সকালে মেইলর স্ট্রীটের বাড়িতে দেখা রিচারডের ভাবভঙ্গী ভেসে উঠলো মনের পর্দায়। হেলে দুলে হাঁটা। ঘরে পড়ে থাকা ফলের ভুক্তাবশেষ। শীতের অনুভুতি না হওয়া। নাহ, আশংকা ভুল ছিল না রিচারডের। স্টিফেন উল্টো পালটা কাজটা করেই ফেলেছে। ঘটিয়েছে অদল বদল। কিন্তু কোন প্রাণীর সাথে? কি ভাবে করলো?
নক্ষত্রর দিকে তাকালাম। ও বললো – একই কথাই আমরা ভাবছি মনে হয়। মিঃ স্ট্যাফোরডকে একটা ফোন কর। জানিয়েদে কাল সকাল দশটায় আমরা ওর অফিসে যাচ্ছি।
-মিঃ স্ট্যাফোরড...কিন্তু...
- কোনও কিন্তু নয়। এ ব্যাপারে যা কিছু সাহায্য এক মাত্র উনিই করতে পারবেন আমাদের। আমার মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে।
পরেরদিন। স্ট্যাফোরড এ্যন্ড ক্রিপস হাউস।
আমার ক্লায়েন্ট মিঃ রিচারডের নির্দেশ অনুসারে আমার পক্ষে সম্ভব যে কোনও রকম সাহায্য আপনাদের করতে আমি দায়িত্ববদ্ধ।
মিঃ স্ট্যাফোরড একথাটা বলতেই নক্ষত্র কিছু প্রশ্ন করলো এবং কিছু কাজ করার নির্দেশ দিল ওনাকে।
দুদিন পর। হোটেল। বিকেল বেলা।
ফোন বেজে উঠলো। নক্ষত্রই ধরল।
-      ওকে, আমরা যাচ্ছি।
মোবাইল ফোনটা পকেটে পুরেই জানালো মিঃ স্ট্যাফোরড এর ফোন। মক্কেলরা হাজির। চল যাওয়া যাক।
১০ মিনিট পর... মিঃ স্ট্যাফোরডের চেম্বার।
ঘরে আমরা চারজন। মিঃ স্ট্যাফোরড, নক্ষত্র, আমি এবং বব গুড উইন। শেষজন  জীবজন্তু সরবরাহকারী ও ট্রেনার। জন্মসূত্রে আফ্রিকান। চেহারা সাদামাটা। গায়ে লাল হলুদ স্ট্রিপ দেওয়া জ্যাকেট আর ডেনিম জিন্স এর ট্রাঊজার। পায়ে স্নিকার।
নক্ষত্রর নির্দেশ মত মিঃ স্ট্যাফোরড নিজের চেনা পরিচিতির গণ্ডি কাজে লাগিয়ে ববকে খূঁজে বের করেছেন। রিচারডের গবেষণার জীবজন্তু ববই যোগান দিত।
নক্ষত্র শুরু করলো জিজ্ঞাসাবাদ।
-      মিঃ বব কতদিন ধরে তুমি মিঃ বোল্টনদের চেনো?
-      বছর চারেক হবে।
-      কি ভাবে?
-      জীবজন্তু সাপ্লাই এর সূত্রে।
-      আইন মেনে কাজটা হয়?... নক্ষত্রর আওয়াজে কাঠিন্য।
-      না ...মানে সব সময় সম্ভব হয় না।
-      শেষ কি দিয়েছিলে ওখানে মনে আছে?
-      হ্যাঁ । একটা শিম্পাঞ্জী। আমারই পোষা।
উত্তরটা শুনেই আমি নক্ষত্রর দিকে তাকালাম। ওর ঘাড়ও ঘুরেছিল আমার দিকে।
-কতদিন আগে?
একটু চিন্তা করে বব বললো – তা মাস পাঁচেকতো হবেই।
-      ওটা কেনার ব্যাপারে কে যোগাযোগ করেছিল তোমার সাথে? ...জানতে চাইলাম আমি।
-      অন্যান্য বারের মতই মিঃ স্টিফেন।
-      কততে বিক্রি করেছিলে ওটাকে?
একটু ইতস্তত করে বব জানালো – আট হাজার পাউন্ড।
নক্ষত্র বলল – শোনো বব তোমাকে একটা কাজ করতে হবে।
-কি কাজ?
- শিম্পাঞ্জীটাকে স্টিফেনের কাছ থেকে কিনে আনতে হবে।
- মিঃ স্টিফেন কি রাজি হবেন?
- যাতে হন তার ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে। আপাততঃ ১০ হাজার পাউন্ড দিচ্ছি। যদি বেশী লাগে দেব আর কমে করতে পারলে যা থাকবে সেটা তোমার।
চকচকে চোখে উৎ সাহের সুরে বব বললো – দেন ওককে।
নক্ষত্র বলল – মিঃ স্ট্যাফোরড ওকে ১০ হাজার পাউন্ড দিয়ে দেবেন এখান থেকে যাওয়ার সময়।
মিঃ স্ট্যাফোরড সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে সেক্রেটারিকে নির্দেশটা দিয়ে দিলেন।
 আর একটা কথা মিঃ বব , সম্ভবত শিম্পাঞ্জিটা তোমার সাথে আসতে চাইবে না।
-      ও নিয়ে ভাব্বেন না স্যার। নিক্সিকে আমি ছোট থেকে মানুষ করেছি। ও আমায় ভালোমতই চে...
-      আমি বলছি ও আসতে চাইবে না। ...কথাগুলো কেটে কেটে উচ্চারন করলো নক্ষত্র। ... তুমি এই কাগজটা ওকে দেখাবে। তবেই ও রাজি হবে।

কাগজটা হাতে নিয়ে দেখলো বব।  অবাক চোখে তাকিয়ে দেখলো ওটাকে। ওটা রিচারডের পাঠানো হলুদ খামের ভেতরের সবুজ রঙের কাগজটা। তার পর যন্ত্রের মতো ‘গুডবাই’ বলে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। নক্ষত্র ওকে থামালো।
-      কে বা কারা শিম্পাঞ্জিটাকে কিনতে চাইছে সেটা জানার অহেতুক কৌতূহল দেখিয়ো না। সাথে সাথেই স্টিফেন কে কিছু বলার চেষ্টাও কোরো না। ২৪ ঘণ্টা তোমার ওপর পুলিসের নজরদারি থাকবে যতক্ষণ না কাজ হাসিল হয়। নিক্সির ডেলিভারি কোথায় নেব সেটা তোমার ফোন পেলে জানাবো।
বব ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নক্ষত্র বলল – এবার আপনাকে দ্বিতীয় কাজটা করতে হবে মিঃ স্ট্যাফোরড।
-      ওহ ইয়েস। ... পুনরায় ফোন করলেন , বললেন – মিস ব্লেয়ার,  সেন্ড ডাঃ স্টুয়ারট হোপ ইন মাই কেবিন।
আরো দু দিন পর। হোটেলের ঘর। সময়, বিকেলবেলা।
একটি বিশেষ ধরনের চেয়ারে হাত পা ও কোমরে  স্টিল বেল্ট দিয়ে আটকানো অবস্থায় বসে ছটপট করছে রিচারড বোল্টন। ডাঃ হোপ মিঃ স্ট্যাফোরড এর নির্দেশ মতো[নক্ষত্রর কথানুসারে] মানসিক হাস পাতালে নিয়ে যাওয়ার ছুতোয় রিচারডকে এখানে পৌঁছে দিয়েছেন। ওদিকে জানলার পাশে একটি চেয়ারে বসে আছে একটি জামা প্যান্ট পড়া শিম্পাঞ্জী। যার সামনে রাখা আছে নক্ষত্রর ল্যাপটপটা।
বব কাজ হাসিল করেছে কোন রকম সমস্যা ছাড়াই। মাত্র ৫ হাজার পাঊন্ডে স্টিফেন নিক্সিকে ওর হাতে তুলে দিয়েছে। বাকি ৫ হাজার পেয়ে ববতো দারুন খুশী। শুধু জানতে চেয়েছিল নিক্সি ওকে চিনতে পারলো না কেন? ওকে বলা হয়েছে বৈজ্ঞানিক এক্সপেরিমেন্ট এর কারনে এটা হয়েছে।
দরজায় দুবার টোকা এবং শোনা গেল মিঃ স্ট্যাফোরড এর কণ্ঠ – মে আই কাম ইন।
ইয়েস প্লিজ মিঃ স্ট্যাফোরড ... উত্তরটা আমিই দিলাম।
ঘরে ঢুকেই থমকে গেলেন উনি যখন শিম্পাঞ্জিটা চেয়ার থেকে নেমে হেলে দুলে এগিয়ে এলো ওর দিকে। হাতটা হ্যান্ডসেকের জন্য বাড়াতেই উনি এক লাফে পিছিয়ে গেলেন বেশ খানিকটা। সাথেই আতঙ্কের সাথে কোনোমতে বললেন – মিঃ বানারজি!!!
-      কোনো ভয় নেই মিঃ স্ট্যাফোরড। আপনি স্বচ্ছন্দে হ্যান্ডসেক করুন এবং বসুন।... বললো নক্ষত্র।
কোনক্রমে হ্যান্ডসেকটা সেরে চেয়ারে গিয়ে বসলেন মিঃ স্ট্যাফো্রড। শিম্পাঞ্জীটাও ফিরে গেল নিজের চেয়ারে।
-      কফি মিঃ স্ট্যাফোরড? নাকি হার্ড ড্রিঙ্কস বলবো?
-      ক...কফি... কিন্তু আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
আওয়াজেই মালুম হল উনি এখনও ধাতস্থ হননি।
থারমোফ্লাস্ক থেকে কফি ঢালতে ঢালতে নক্ষত্র প্রশ্ন করলো – মাইন্ড এক্সচেঞ্জ বলে কোনো কথা শুনেছেন মিঃ স্ট্যাফোরড?
-      মাইন্ড এক্সচেঞ্জ!! নাহ । কেন?
-      আপনার মন আমার শরীর, আমার মন আপনার শরীর। ব্যাপারটা কেমন হবে বলে আপনার মনে হয়?
    -হোয়াআআ...ট!!! আপনার মন আমার শ রী ...কথা থেমে গেল মিঃ স্ট্যাফোরড এর বিস্ময়ের আধিক্যে।
 **প্রসঙ্গত উল্লেখ্য , যদিও বাহুল্য, কথাবার্তা সবই হচ্ছিল ইংরাজিতে। গোটা ব্যাপারটা নিয়ে বলার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছি নক্ষত্রর ওপর। আসলে প্রথম থেকে প্ল্যান পরিকল্পনা সবইতো ও করেছে। আমি দর্শক মাত্র। মিঃ স্ট্যাফোরডকে সব কথা খুলে বলার অনুমতি অবশ্য দিয়েছে স্বয়ং রিচারড।**
-ঠিক তাই। তার প্রমান আপনার সামনে এই ঘরেই। যে শিম্পাঞ্জী চেয়ারে বসে আছে তার মধ্যে ই আপাতত অবস্থান করে আছে আপনার ক্লায়েন্ট মিঃ বোল্টন এর মন। আর স্টীল বেল্ট বন্দী রিচারড শিম্পাঞ্জীর মনের ধারক।
মিঃ স্ট্যাফোরড এর মুখ চোখে অবিশ্বাস আর বিস্ময়ের ছাপ সুস্পষ্ট। কুঁচকে গেছে কপাল, নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে নিঃশ্বাসের চাপে।
নক্ষত্র আবার বলা শুরু করলো – জানি বিশ্বাস করা অসম্ভব। আমাদেরও হয়নি প্রথমে। বলে রাখা ভালো মিঃ স্ট্যাফোরড এটাই মিঃ রিচারড জন বোল্টনের যুগান্তকারী গবেষণার গোপন ফলাফল।যার সুযোগ নিয়েছে ওর ভাইপো স্টিফেন। রিচারডের সামনে যে ল্যাপটপটা রাখা আছে ওটাতে আপনি যা খুশী একটা প্রশ্ন করুন টাইপ করে। দেখুন তো কি জবাব পান । আশা করি সেটা আপনার সন্দেহ নিরসনে সহায়তা করবে।
মিঃ স্ট্যাফোরড জানতে চাইলেন ‘স্ট্যাফোরড এ্যন্ড ক্রিপস’ অফিসের ঠিকানা । কিবোর্ডে ধীরে ধীরে টাইপ করে যার উত্তর দিতে কোনও সমস্যাই হল না শিম্পাঞ্জিরুপী রিচারডের।
দারুন কোন ঘটনা যেভাবে মানুষকে হতভম্ব করে দেয় মিঃ স্ট্যাফোরড ও তার প্রভাব এড়াতে পারলেন না। ধপ করে বসে পড়লেন কাছের চেয়ারটায়।
এবার আমি বললাম লাল খাম পাওয়া থেকে এ পর্যন্ত ঘটনার খুঁটিনাটি বিবরণ।
সবশুনে তৎক্ষণাৎ স্টিফেনকে গ্রেপ্তার করার উদ্যোগ নিচ্ছিলেন মিঃ স্ট্যাফোরড। বাধা দিল নক্ষত্র। বললো- এখনো পর্যন্ত যখন সব ঠিক ঠাক প্ল্যান মাফিক এগোচ্ছে তখন শেষটাও হতে দিন। প্লিজ মিঃ স্ট্যাফোরড।
-      ওকে অ্যাজ ইউ লাইক।
শিম্পাঞ্জিরুপী রিচারড ও দুবার টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানালো নক্ষত্রর কথায়।
-      মিঃ স্ট্যাফোরড আপনি অফিস ফিরে গিয়ে স্টিফেনকে ডেকে পাঠান। বলুন রিচারডের সম্পত্তি হস্তান্তর নিয়ে কিছু আলোচনা আছে। যেভাবেই হোক ঘণ্টা দুয়েক ওকে আটকিয়ে রাখার দায়িত্ব নিতে হবে আপনাকে। এসময়টার খুব প্রয়োজন মিঃ বোল্টন কে নিজের মন ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। সাথে সাথেই পুলিসে খবর দিন এবং মিঃ বোল্টনের বাড়িতে আমাদের ঢোকার ব্যবস্থা করে দিন। স্টিফেন এ টোপ গিলবেই আমার ধারনা। ও চেম্বারে এসে পৌঁছালেই আপনি আমাকে ফোন করবেন। আমরা রওনা দেব।
মিনিটের কাঁটা পঞ্চাশবার পাক দেওয়ার আগেই মিঃ স্ট্যাফোরডের ফোন এসে গেল। আমরা চললাম রিচারডের বাড়ির পথে।
দু ঘণ্টা পর। স্ট্যাফোরড এ্যন্ড ক্রিপস হাউস।
মিঃ স্ট্যাফোরড এর সাথে চেম্বারে খোসগল্পে মগ্ন স্টিফেন। দরজায় নক না করেই দুজন মানুষ প্রবেশ করলো ঘরটিতে। তার পেছনে আমরা। সবার শেষে রিচারড। এবার নিজের দেহ ও মন সহ।
-      গুড এভিনিং মিঃ স্ট্যাফোরড... অ্যান্ড ইউ টু মাই ডিয়ার স্টিফেন!
চেনা গলা শুনে ফিরে তাকালো স্টিফেন। রিচারডকে দেখে আতঙ্কে বিস্ময়ে সাদা কাগজের মতো রক্তশূন্য হয়ে গেল ওর মুখাবয়ব। দুবার ঢোক গিলে খসখসে স্বর ধবনিত হল ওর গলায় – আ...আঙ্কল!! হাও...ইউ ...হি ...
-      কন্সপিরেসি ফর অ্যাটেম্পট টু মার্ডার মিঃ রিচারড জন বোল্টন, অফিসার প্লিজ অ্যারেস্ট মিঃ। স্টিফেন বোল্টন...... ভারি গলায় বলে উঠলো নক্ষত্র।
পরের দিন। ৩/৭ মেইলর স্ট্রীট।
সব কিছু এত সহজে সমাধান হবে আমি আশাই করিনি। সৎ উদ্দেশ্য ছিল বলেই বোধহয় কোনো রকম বাধার সম্মুখীন আমাদের হতে হয়নি। হোটেল ছেড়ে আমরা আপাতত রিচারডের অতিথি। ভিসার মেয়াদ আছে আরও দিন কয়েকের। এই কদিনের ব্যস্ততায় লন্ডন ঘুরে দেখাই হয়নি। সে দায়িত্ব নিয়েছে রিচারড স্বয়ং। ওরও তো এখন অখণ্ড অবসর।
কাহিনীর সমাপ্তি এখানে টানলে পাঠক পাঠিকারা আমাকে ক্ষমা করবেন বলে মনে হয় না। তাই স্টিফেন বোল্টনের স্বীকারোক্তিটা পেশ করাই শ্রেয় বলে মনে করলাম।
“আই অ্যাম স্টিফেন বোল্টন। সন অফ টিমোথি এ্যন্ড সান্দ্রা বোল্টন।.... পড়াশোনায় খারাপ ছিলাম না। কিন্তু কুসঙ্গে সে সব সোজা পথে কাজে লাগাতে পারিনি।.... রেস আর জুয়ার নেশায় সব বরবাদ হয়ে গিয়েছিল। কলেজ জীবনেই এর সূত্রপাত। হারতে হারতে রোখ চেপে গিয়েছিল বড় দাঁও মারার। বরাদ্দ হাত খরচে আর চলছিল না। শুরু করি ধার করা। একসময় সেটা এমন পরিমাণ হয়ে দাঁড়ালো যে তা শোধ করা আমার অসাধ্য। এরই মধ্যে কোনও ক্রমে বায়োলজির ডিগ্রীটা হাসিল করি। যেটা দেখে আঙ্কল আমাকে তার সহকারী করে নেন। আর্থিক চিন্তায় জেরবার আমি সে কাজেও মন দিতে না পারায় উনি ভাবতেন আমি একটা অপদার্থ, বোকা। ফলে খুব একটা আড়াল রেখে উনি গবেষণার কাজটা করতেন না।মনোযোগী ছাত্র না হলেও বোকা আমি মোটেই নই। ফলে আঙ্কল কি করছেন না করছেন সবটা না বুঝলেও একবারে না বোঝার মত আকাট অবস্থাতেও ছিলাম না।
রেস কোর্সেই পরিচয় হয় টমের সাথে। একদিন নেশার ঝোঁকে ওকে বলেছিলাম আঙ্কলের গবেষণার কথা। দিনকতক বাদে ও আমাকে প্রস্তাব দেয় ফর্মুলাটা এনে দেওয়ার। বিনিময়ে এত অর্থের লোভ দেখায় যে আমি রাজি হয়ে যাই। কিন্তু মুস্কিল হল গবেষণার খূঁটিনাটি উনি কোথায় লিখে রাখেন সেটা খুঁজে বার করতে পারলাম না। খুন করিয়ে সব হাতিয়ে নেওয়ার ভাবনাও বাদ দিতে হয় ঐ জন্যই। কারন তাতে তো ফর্মুলাটা পাওয়া যাবে না।
অনেক ভেবে চিন্তে সমগ্র পদ্ধতিটা কি ভাবে কি করছেন দেখার জন্য নিজেকে মানব রুপী গিনিপিগ  এর মতো সমর্পণ করি আঙ্কলের হাতে। আঙ্কল সফল হবেন কিনা জানা ছিল না। কিন্তু এই জুয়াটা খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া আর কোন পথ আমার সামনে খোলা ছিল না।
এবার কিন্তু আমার ভাগ্য আমার সাথে থাকে। আঙ্কল সফল হন তার পরীক্ষায়। শিম্পাঞ্জীর চোখ দিয়ে স্টেপ বাই স্টেপ দেখে নিয়ে ছিলাম সব খূঁটিনাটি।
নিজ রুপে ফিরে আশার একদিন পর আঙ্কলের খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিই। তার পরই ঘটাই মাইন্ড ট্রান্সফারের ব্যবস্থা। স্মৃতি ঠকায়নি আমাকে। যা চেয়েছিলাম তাই ঘটে। জানতাম কি হবে এর ফল। শিম্পাঞ্জী কথা বলতে পারবে না। আর আঙ্কল চিরন্তন ডাক্তারি পরীক্ষায় পাগল প্রমানিত হবেন। কারোর ক্ষমতা হবে না আসল ঘটনা কি হয়েছে বোঝার। একমাত্র ওয়ারিশ রুপে আমি হয়ে যাবো সব সম্পত্তির মালিক। টমকে ফর্মুলা না বেচেও আমি সব ধার শোধ করে দিতে পারবো।
পারিবারিক চিকিৎসক ডাঃ হোপ যখন আঙ্কল কে মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইলেন আমি কথা বড়ালাম না। কারন আমিও তো সেটাই চেয়েছিলাম। সায় দিয়ে দিলাম। এর ফলে দুটো প্রাণীর কাছা কাছি আশার সম্ভাবনা আর থাকবে না। উপরি পাওনা রুপে এসে গিয়েছিল বব। শিম্পাঞ্জিটা কিনতে। মেঘ না চাইতেই জল। চলে যাক ওটা যেখানে খুশী। আমি একবারে নিশ্চিন্ত। এবার আমার লাক খুলে গেছে। তখন তো জানতে পারিনি এর পেছনে......
মিঃ স্ট্যাফোরড যখন সম্পত্তি নিয়ে আলোচনার জন্য ডেকে পাঠালেন তখন পর্যন্ত ভেবেছিলাম আমার স্বপ্ন সফল হতে চলেছে.... বাট, দ্যাট টু ব্লাডি ইন্ডিয়ানস ...”
আর একজনের কথা না বলাটাও অপরাধ হবে। সে হল নিক্সি। মনের আদানপ্রদানের কারনেই বোধহয় ও এখন রিচারডকেই ওর প্রিয়জন রুপে ভাবে। আর রিচারডও ওকে পেয়ে বেশ আনন্দেই আছে।
সমাপ্ত।