Search This Blog

Friday, April 20, 2018

জীবনের কিস্তি... প্রতিম দাস


জীবনের   কিস্তি...
প্রতিম দাস
[ বছরের শুরুতেই স্বয়ং  Robert Burton Robinson এর কাছ থেকে অনুমতি পেয়েছিলাম তার লেখা অনুবাদ করা ও আপনাদের পড়ানোর । আজ  তৃতীয় গল্প  “ Heart of Gold”   গল্পের ভাবানুবাদ  “জীবনের   কিস্তি...” ]
কার্ডিওলোজিস্ট  এর কাছে যাওয়ার দিনটাকে কোনোদিন ভুলতে পারবো না।    উনি বললেন,  "রয়, তোমাকে সসেজ, ধূমপান, ভাজা খাবার, চিপস এবং নুন খাওয়া ছেড়ে দিতে হবে।
উত্তরে   বললাম, "ডক, এর চেয়ে তুমি আমাকে এখনই একটা হাইডোজ  মারাত্মক ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলো !"
প্রত্যুত্তরে  আমাকে উনি একটি  সমাধান সুত্র বাতলে দিলেন।    হার্ট অফ গোল্ড ক্লিনিক " যতদূর  শুনেছি ওরা ওখানে প্রায় অলৌকিক কাজ করে।"
হার্ট অফ গোল্ড । শব্দটা শুনেই মনের ভেতর একটা স্বস্তির বাতাস বয়ে গেল।   মনে হলো হ্যাঁ ওরাই পারবে আমার   যথাযথ যত্ন নিতে । 
"কিন্তু খরচা হবে ভালোই।"
" সে হোক । ও নিয়ে ভাবছি না।   কিন্তু কোনোভাবেই  রাত জেগে ফুটবল খেলা দেখা ছাড়তে পারবো না।’ আর সেটা করতে হলে   ভাজা চিংড়ি, চিপস,  ফিস ফ্রাই , বাডউইজার   এর সদব্যবহার না করে থাকাও যাবে না।   নামী দামী খেলোয়াড়দের জবরদস্ত পায়ের খেলা দেখতে দেখতে  বড় মোটা  সিগার খাওয়ার মজা কাকে বলে তা তো আপনি  জানেন না ডক।’  
মুখে খরচ করবো কথাটা বললেও এই মুহূর্তে সেভাবে খরচ করার মতো  অতিরিক্ত  টাকা আমার ছিল না। কিছুদিন আগেই নতুন  ৬০  ইঞ্চির হাই ডেফিনেশন থ্রিডি টিভি কিনেছি। তা ছাড়া গাড়িটাতেও ভালোই খরচা হয়েছে।  এই মুহূর্তে জীবন উপভোগ করার মতো সব উপাদান আমার কাছে মজুত । কি করে জানবো এর মাঝেই এক মোক্ষম ঘা কষানোর জন্য আমার হৃদয় তৈরী হয়ে বসেছিল।?
আরে চিন্তার কি আছে এই সব সময়ে জন্যই তো   বীমা কোম্পানীগুলো আছে, তাই নয় কি  ? মাসে মাসে একটা ছোট্ট অ্যামাউন্ট দেওয়ার মতো ক্ষমতা আমার আছে। আর হার্ট অফ গোল্ডের কাজ করার জন্য অনেক বীমা কোম্পানীই এগিয়ে আসবে।  অতএব দেরী না করে    হার্ট অফ গোল্ড ক্লিনিকে   একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট  বুক করলাম।  আমাকে জানানো হলো দ্রুত রেজিস্ট্রেশন করার জন্য।    কোন সমস্যা নেই । বুঝতেই পারলাম আসলে ডাকা হচ্ছে ঠিক ঠাক খরচাপাতি করতে পারবো কিনা জেনে নেওয়ার জন্য।   
ওখানে যাওয়ার পর অভিজ্ঞতা কিন্তু অন্য রকম হ লো ।  আমাকে ফিল আপ করার জন্য কোনো ফর্ম দেওয়া হলো না । বদলে  ডেস্ক কর্মী আমাকে  ওদের ফাইন্যান্স বিভাগে নিয়ে গেলেন । জানতে পারলাম আমার জন্য কোনো রকম বীমার ব্যবস্থা করা নাকি সম্ভব নয় । 
" কেন বলুন তো? ঠিক কত টাকা দরকার একাজে  ?"
যে উত্তরটা এলো তাতে আমার বুকের ভেতরে দামামা বেজে উঠলো । থেমেও গিয়েছিল নিশ্চিত কয়েক সেকেন্ডের জন্য হ্রদপিন্ডের চলন।   
শুনতে পেলাম সামনের মানুষটার পরবর্তী কথাগুলো । "  চিন্তা করবেন না ।  আমাদের কাছে সব রকম   প্রয়োজনের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা আছে ।  খুব কম গ্রাহকই  পুরো অর্থ একেবারে নগদ দেয় এখানে।   "
  গ্রাহক?  রোগী নয়!  আমার তখন ই বোঝা উচিত ছিল হার্ট অফ গোল্ডের কাজ কারবারে কিছু একটা রহস্য আছে।  কিন্তু ওই মুহূর্তে আমার সামনে আর কোনো  পথ খোলাও ছিল না ভাবনাচিন্তা করার জন্য।   যদিও একটু খোঁজ খবর নেওয়া যেতেই পারতো ।
" মাসিক কি পরিমাণ  পেমেন্ট আপনি  দিতে সক্ষম  ?"
 এখন বুঝতে পারি এই সময়েও আমার বোঝা উচিত ছিল ।  পাক্কা সেলস ম্যানের মতো আচরণ ছিল মানুষটার।  যেন কিস্তিতে গাড়ী কিনতে চাইছি আমি ।  এদের মুল লক্ষ্যই থাকে ইন্টারেস্ট নেওয়া । শোধ কবে করতে পারবো  জানতে চায় না।       শুধু জানতে চায় আমি মাসে মাসে অর্থ দিতে পারবো কি পারবো কিনা।  আর তারফলে বেশীরভাগ সময়ে এরকমটাই দেখা যায়,  আসল দামের প্রায় দ্বিগুন দেওয়া হয়ে গেছে সাময়িক সুবিধা নিতে গিয়ে ।   
কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মনে তো হচ্ছে না ওদের তরফ থেকে বিশেষ কোনো সুযোগ পাওয়া যাবে। জীবন বা মৃত্যু  কোনো একটা বেছে নেওয়ার খাদের সামনে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম ওই মুহূর্তে । হতাশার অন্ধকারে ডুবে যেতে যেতে বললাম,    "আমি খুব বেশী হলে মাসে মাসে ১৫    দিতে পারবো।"
"হুম।" একটা শব্দ করে মানুষটা কম্পিউটারে কি সব হিসাব নিকাশ শুরু করে দিলেন।  ওদিকে আমার হৃদপিন্ডের গতি বাড়ছিল লাফিয়ে লাফিয়ে ।
অনেকটা সময় এভাবে উৎকণ্ঠার চরমে কাটানোর পর শুনতে পেলাম ,   " মনে  হচ্ছে  আমরা আপনাকে সাহায্য  করতে পারি।"
  ডেস্কের ওপর রাখা  প্রিন্টার থেকে বেশ কয়েকটা পাতা বেরিয়ে এলো ।    সিগনেচার করার আগে আমার ওগুলো  পড়ে নেওয়া উচিত ছিল।   
ডঃ মালিনী সিনহা   ছোটখাটো গড়নের    মহিলা  । দেখতে বেশ সুন্দর.। বিবাহবিচ্ছেদ করলে উনি আমাকে আগামী জীবন সাথী করবেন কিনা জানার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল। অত্যন্ত সপ্রতিভ মহিলা। নাহ, এর কাছে  অপারেশন হলে আমার চিন্তার কিছু নেই ।   
উনি ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিলেন আমার নতুন নকল হৃদপিন্ডটা ঠিক কেমন হবে। জানতে পারলাম ওটা স্পেস এজ  প্লাস্টিক এবং ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি দিয়ে  তৈরি । ওর মধ্যে চারটি কম্পিউটার থাকবে। সেটা জেনে আমার কোনো লাভ নেই । কারন কম্পিউটার সম্পর্কে   আমি কিছুই জানি না
  অস্ত্রোপচার সম্পূর্ণ সফল । নিজেকে এক নতুন জীবন পাওয়া মানুষের মতো মনে হচ্ছিল । সব চেয়ে বড় কথা এই যে আমার যে সব বাজে হ্যাবিট আছে সেগুলো   ছেড়ে দিতে হবে না ।   এই নতুন চিত্তাকর্ষক হৃদয় আমার সব ধমনী এবং শিরাদের  পরিষ্কার রাখার যাবতীয় ব্যবস্থা করবে।   সুতরাং,   খরচ যাই হোক না কেন,  প্রতিটি পাই পয়সার দাম এই যন্ত্র আমাকে মিটিয়ে দেবে।   
 এর সবচেয়ে ভালো দিকটা হলো এর   রিমোট কন্ট্রোলটা। যা দিয়ে অনেক কাজ ই করা যায় । সবচেয়ে দরকারি কাজ যা এটা করতে পারে তা হলো এটা আমাকে ঘুম পারিয়েও দিতে পারে।   বিছানায় যাওয়ার আগে ওটাতে   ঘুমের মোডে সেট করে দিলেই , ব্যাস আর কিছু করার দরকার নেই। একেবারে ঘুমে চোখ ঢুলে আসে।   
আবার যখন   বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলার জন্য নামি তখন  অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হয় । সে কাজটাও করে দেয় রিমোট কন্ট্রোল । বিশেষ মোডে সেট করলেই আমার ভেতর ঘোড়ার মতো উদ্যম ও দম জন্ম নেয় ।  আসল হৃদপিন্ডের চেয়ে যে এটা অনেক ভালো তা স্বীকার করতেই হবে।   
কিন্তু মাসে মাসে ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার ব্যাপারটাই   সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে   আমার পুরনো   পিকআপ ভ্যানটা কিছু দিন আগেই বদলেছি । ওটা ছাড়া ব্যবসা চালানো অসম্ভব ।   নতুন মডেলটা নিতে ভালোই গচ্ছা গেছে। উপরন্তু মাসে মাসে ৩০ হাজার  করে দিতেও হচ্ছে বাকি শোধ করার জন্য।   
এমনিতেই মাসের নানান খরচা চালনোটাই মুস্কিল হয়ে পড়েছে।     চেষ্টার কমতি করছি না তবুও    সবকিছু চালানো যাচ্ছে না। ।   গৃহহীন হওয়ার ইচ্ছে আমার নেই । ইচ্ছে নেই ভ্যানটা হাতছাড়া করারও।  তাই  পরের দু’ মাস    হার্ট অফ গোল্ডের  মাসিক পেমেন্ট দিলাম না।     কি করবে ওরা ? আমার হৃদপিন্ডটাকে উপড়ে নেবে  ?
ইতিমধ্যে একদিন   টেক্সট মেসেজ এলো । পড়ে অবাক হলাম । বলা হয়েছে কন্ট্র্যাক্ট পেপার গু্লো যেন মন দিয়ে একবার পড়ে নিই ।   মাসিক পেমেন্ট জমা দেওয়া হয়নি ।  আমাকে সতর্ক করা হচ্ছে । দুদিনের ভেতর যেন আমি   আমার অ্যাকাউন্ট আপ টু ডেট করে নিই।
আমি মনে মনে বললাম, ওরা এ ব্যাপারে কি করবেটা কি ? গুন্ডা পাঠিয়ে আমাকে পিটাবে নাকি?
পরের দিন  আরেকটি টেক্সট মেসেজ  পেয়েছিলাম। আপনার একাউন্টে ৬০দিনের অর্থ ডিঊ হয়ে আছে    চুক্তি অনুসারে । আজ  মধ্যরাত্রিতে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে।   
  আমার সাথে মজা করছে নাকি? আমি এখন ওদের কোনো পেমেন্টই করবো না । এমন কি টাকা থাকলেও করবো না।   
যদিও মাঝরাতের কথা ভেবে একটা উৎকণ্ঠা আমাকে ঘিরে ধরছিল । কি হবে ওই সময়? কেউ কি এসে দরজার বেল বাজাবে? না না ওসব কিছুই হবে না ওরা আমাকে  আসলে ভয় দেখাচ্ছে।  
তবুও, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বসেছিলাম রান্নাঘরে  । ওটা বিশেষ অ্যাটোমিক ক্লক । ফলে সময়ের হেরফের হওয়ার সুযোগ নেই। ছোটো কাঁটাটা বারোটার ঘরের দিকে এগোনো শুরু করতেই   আমি ঘামতে শুরু করলাম। আর   মাত্র পনেরো   সেকেন্ড বাকি ।
দশ সেকেন্ড ।    অনুভব করতে পারছিলাম রিমোট ছাড়াই  হৃদপিন্ড রেসের ঘোড়ার মতো ছুটতে শুরু করেছে।  গতি ৯২ ।   আমার স্বাভাবিক বিশ্রামের হারের চেয়ে যথেষ্ট বেশি । তবে ভয় পাওয়ার মতো কিছু নয় ।   
পাঁচ সেকেন্ড । এখন পালস: ১০৪
চার সেকেন্ড ... তিন ... দুই ... পালস: ১২৭
মধ্যরাত্রি।
 পালস ? কিছুই দেখাচ্ছে না।
  আঙ্গুল দিয়ে   ঘাড়ের পাশে চেপে ধরলাম ।   না কোনো সাড়া নেই ।  রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে!!
মাসিক পেমেন্ট না করার জন্য ওরা আমাকে হত্যা করবে? 
 ঘড়ির দিকে তাকালাম ।  ঠিক কি দেখতে চাইছিলাম তা আমি জানি না।
মধ্যরাত পার করে   পাঁচ সেকেন্ড কেটে যাওয়ার  পর আবার   আমার হৃ্দপিন্ড চালু হলো । 
যথেষ্ট ভয়ঙ্কর ব্যাপার । তার পর মনে হলো , ধুস কি সব উলটোপালটা   ভাবছি । এটা সম্ভবত সফ্টওয়্যারের    কিছু গণ্ডগোল হয়েছিল ।   কালকেই চেক করিয়ে আনবো ।   
মন টা একটু শান্ত হতেই  আমি নিজের আচরনের কথা ভেবে নিজেই হেসে উঠলাম।    কি সব ভাবছি ? হার্ট অফ গোল্ড ক্লিনিকের কেউ কি ওখান থেকে আমার নকল হৃদপিন্ডটাকে   নিয়ন্ত্রণ করছে  ? কি হাস্যকর ! ওরা  আসলে আমার মনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে ঐ অদ্ভুত টেক্সট   সতর্কবার্তা পাঠিয়ে ।   আমাকে বিভ্রান্ত করছে।
 আর ঠিক  কুড়ি সেকেন্ড বাদেই ... আমার হৃদপিন্ড   বন্ধ হয়ে গেল !
ছয় সেকেন্ড পরে  পুনরায় চলতে শুরু করলো ।  আমি ত্রস্ত হয়ে পড়লাম ।  এ যেন এক ছকে বেঁধে করা হচ্ছে   !!!  আমার হৃদপিন্ড প্রথমে  পাঁচ সেকেন্ডের জন্য থেমেছিল ... তারপর  ছয় সেকেন্ড ... এবার হয়তো সাত ... এভাবে চললে আমি   অ্যাম্বুলেন্স ডাকার সময়টাও পাবো না ।  তার আগেই মরে যাবো!!!
  ফোনে মেসেজ আসার ধ্বনি শুনতে পেলাম ।    নতুন মেসেজ!
আগামীকাল মাঝরাতের মধ্যে বকেয়া জমা না হলে বন্ধ করা হৃদপিন্ড আর চালু হবে না ।   
আমার নিজেকে পাগল পাগল মনে হচ্ছিল ।   মনে মনে বললাম, কিছুতেই  ওই সংস্থা আমার সাথে এরকম করতে পারে না । আমি এই টেক্সট মেসেজ  পুলিশকে দেখবো।  ভাবতে ভাবতেই দেখলাম মেসেজটা মুছে গেল স্ক্রিন থেকে । আমি ডিলিট করিনি ।  নিজে নিজে অদৃশ্য হয়ে গেল!    আগের মেসেজগুলিও সব মুছে গেছে।
পরের দিন, দেরী না করে আগে গিয়েছিলাম হার্ট অফ গোল্ডের অফিসে । দুমাসের পাওনা মিটিয়ে দিয়েছি । এখনো অবধি  নিয়ম মতো দিয়েও চলেছি । 
আমার হয়তো উচিত হার্ট অগ গোল্ডের এই বিষয়টা   সম্পর্কে অন্যান্য মানুষদের  জানিয়ে দেওয়া। কিন্তু এটাও ভালো করে জানি কেউই আগাম  সতর্কবার্তা শুনতে ভালোবাসে না। শুনলেও পাত্তা দেয় না।   কেউই নিজেদের শরীরের যত্ন নিজে থেকে নিতেই চায় না । খেটে খুটে নিয়ম মেনে শরীর ভালো রাখার ইচ্ছে বেশীর ভাগ মানুষেরই নেই ।   তাদের প্রভুত অর্থ আছে আর সেটা দিয়েই তারা সব সময় সহজ সমাধানের পথ খুঁজে নেয় । 
সবাই বোকা... একদম আমার মতো । কিছুই তলিয়ে ভাবিনা আগে থেকে ।
 অন্তত এখন আমি বুঝতে পেরেছি যে   হার্ট অফ গোল্ড মানে  আসলে কি।
আপনাকে ওরা হৃদয় দেবে বিনিময়ে আপনার সব সঞ্চয় কেড়ে নেবে ।      

সমাপ্ত

Wednesday, February 7, 2018

খিল্লি করা ভা্লো...কিন্তু ... - প্রতিম দাস

[ বছরের শুরুতেই স্বয়ং Robert Burton Robinson এর কাছ থেকে অনুমতি পেয়েছি তার লেখা অনুবাদ করা ও আপনাদের পড়ানোর । আজ ২য় গল্প “ April fool” গল্পের ভাবানুবাদ “খিল্লি করা ভালো...কিন্তু ... ” ]
খিল্লি করা ভা্লো...কিন্তু ...
প্রতিম দাস
‘আরে তোমার তো দেখছি খুবই অল্প বয়েস। ’
‘হ্যাঁ।’
‘তা কি কেস? খুন?’
‘হ্যাঁ।’
‘ বয়ফ্রেন্ড। তাই তো?’
‘কি করে বুঝলেন?’
বয়স্কা মহিলা কয়েদীটির মুখের বলিরেখা আর কুঞ্চিত হলো হাসির কারনে । ‘দেখেই বোঝা যাচ্ছে তুমি রাস্তা ঘাটে চড়ে বেড়ানো মেয়ে নও । শিক্ষা দীক্ষার ছাপ স্পষ্ট। কি করেছিল বেজন্মাটা?’
‘বিরাট গল্প।’
‘ আমার অসুবিধা নেই । খরচ করার মত সময় এখন অঢেল। তোমারো তাই । অবশ্য তোমার যদি আপত্তি...’
‘নাহ...আপত্তি কিসের ।‘ একটা বড় করে শ্বাস নিয়ে কিছুক্ষন বসে থাকার পর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো মেয়েটা । ‘এসবের শুরু হয়েছিল সেই দিনটায় । যখন আমি হাইস্কুলে পড়ি ... লাস্ট ইয়ার ...’
০০০০০
‘মনে হচ্ছে ফেয়ারওয়েল ড্যান্স পার্টির জন্য যে যার মানুষ খুঁজে নিয়েছে?’ আমি বললাম ।
জেনিফার বললো, ‘হ্যাঁ । গত রাতে জনি আমাকে প্রপোজ করেছে ।’
হিদার বললো, ‘যাহ! আমি ওর সাথে যাবো ভেবেছিলাম!’
বললাম, ‘সে কিরে হিদার কি বলছিস তুই? অ্যাণ্ডির কি হলো?’
‘কিছুই হয়নি । তবু আশা করেছিলাম জনি একবার অন্তত আমাকে বলবে ওর সাথে যাওয়ার জন্য ।’
‘ তাই নাকি? তা তোর এই ইচ্ছেটা একবার অ্যাণ্ডিকে বলবো নাকি?’
‘তোর সাহস আছে বলার,’ হিদার বলে উঠলো ।
সবাই একসাথে হেসে উঠলাম। এপ্রিল চুপচাপ লাঞ্চ খেতে খেতে আমাদের কথা শুনছিল। ও খুব একটা কথা বলেনা । আমাদের গ্রুপটার সাথে আজ অবধি সেভাবে কখনোই নিজেকে মিশিয়ে নিতে পারেনি এপ্রিল । তবু ওকে আমাদের মধ্যে ডেকে নিতাম শুধু ওকে নিয়ে খিল্লি করবো বলে। ও অবশ্য সব বুঝেও কিছু বলতো না ।
‘কি রে এপ্রিল তোর কি খবর? কেউ বললো টললো?’ জানতে চাইলাম।
‘নাহ,’ এপ্রিল উত্তর দিলো । ‘ভালোই হয়েছে। জানিসই তো আমি নাচতেই পারি না ।’
‘আরে বাবা, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কোমর দুলাতেও কি পারিস না নাকি?’
সবাই হেসে উঠলো ।
‘ নাচতে না জেনেও এসব পার্টিতে অংশ নেওয়া যায় । আরে বাবা , সামনের মানুষটাকে দুহাতে চেপে ধরবি হাগ করার মতো করে। তারপর কোমর দুলাবি একটু একটু ব্যাস ।’
এপ্রিল কোনো উত্তর দিলোনা দেখে বললাম, ‘কিরে তোর ভালো লাগেনা নাকি একজন ছেলে তোকে জড়িয়ে ধরে থাকবে?’
এপ্রিলের গাল দুটো লাল হয়ে উঠলো ।
‘ কোনো ছেলে আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকবে এটা একটা দারুন অনুভুতি । কি বলিস হিদার? ’
‘আমাকে জিজ্ঞেস করছিস কেন?’ হিদার উত্তর দিলো ।
‘কারন তোর একজন স্টেডি বয়ফ্রেন্ড আছে । আর সে যে তোকে মাঝে মাঝেই জড়িয়ে ধরে সেটাতো আর মিথ্যে নয়।’
দলের বাকিরা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো আমার কথায় ।
‘তাহলে এপ্রিল তোকে কেউ প্রপোজ করেনি বলছিস । বেশ । তুই এক কাজ কর তুই নিজেই কাউকে প্রপোজ করে দে।’
‘মনে হয় না সেটা ঠিক হবে?’ এপ্রিল উত্তর দিলো ।
‘কেন? এতে খারাপটা কোথায় ?’
এপ্রিল একটু ইতস্তত করে বললো, ‘আমি ঠিক বলতে পারবো না ...’
‘হ্যারির ব্যাপারে তোর কি মত?’ প্রশ্নটা ইচ্ছে করেই করলাম। জানি এটা ওকে তাতিয়ে দেবে । কারন হ্যারি হলো আমাদের স্কুলের সবচেয়ে সেরা । স্মার্ট, হ্যান্ডসাম, হট । মনে মনে যার একটু ছোঁয়া পেতে চায় সব মেয়েই ।
জেনিফার কনুই দিয়ে এক গুঁতো মারলো আমাকে । কারন ও ভালো করে জানে আমার মনের ইচ্ছেটা। আমি নিজেই এই পার্টিতে হ্যারির সাথে নাচতে চাই ।
‘হ্যারিকে ভালোই লাগে,’ বললো এপ্রিল । ‘ওর সঙ্গে নাচা যেতেই পারে।’
‘এই তো আসল কথা বোঝা গেল? হেভি হট কি বলিস?’ হিদার বললো ।
‘বেশ তাহলে তাই হোক,’ আমি বললাম। ‘তোর যখন হ্যারিকে ভালো লাগে ওকে গিয়ে সোজা বল যে তুই ওর সাথে নাচ করতে চাস।’
‘হুম, কিন্তু কি করে বলবো বুঝতে পারছি না,’ এপ্রিল উত্তর দিলো । ‘আসলে ছেলেদের সাথে কথা বলতে গেলেই আমি নারভাস হয়ে যাই।’
‘ও তাই বুঝি,’ জেনিফার আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলো, ‘ তাহলে থাক । চেষ্টা করে লাভ নেই ।’
কিন্তু আমার মাথায় এই বদমায়েশি খেলার ছক যখন তৈরী হয়েছে এটা খেলবোই । ‘তোর কি দরকার জানিস এপ্রিল? একটা ধাক্কা।’
‘মানে? কি বলতে চাইছিস তুই?’
‘ মানে এটাই বলতে চাইছি যে হ্যারির সাথে কথা বলার একটা সুযোগ বা পরিস্থিতি তৈরী করতে হবে । আরে- তাই তো ! এটা মনে হচ্ছে ভালোই কাজ করবে। তুই একটা কবিতা লিখেছিস বললি না কালকে? ’
‘হ্যাঁ।’
কবিতাটা কালকে আমি দেখেওছি । একেবারে কাঁচা হাতের গদগদ প্রেম রসে ভরা। ওটা যদি কবিতা হয় তাহলে আমি সাহিত্যের স বুঝিনা ।
‘তুই ওটাই দিয়ে দে হ্যারিকে। একটা খামে পুরে ,ওপরে হ্যারির নাম লিখে ওকে পাঠিয়ে দে। ভেতরে লিখে দিবি টা স্পেশ্যালি ওর জন্যই লিখেছিস । আমি সিওর ওটা পড়লেই ও তোকে ডাকবে কথা বলার জন্য। তুই তখন চোখ কান বুঁজে ড্যান্সে ওর সাথে যাওয়ার প্রস্তাবটা দিয়ে দিবি । আমি এটাও সিওর যে ও তোকে ফেরাবে না। কারন আমি জানি ও কবিতা ভালবাসে ।’
‘আসলে কি জানিস । আমি না ওই কবিতাটা ওকে ভেবেই লিখেছি ।’
কথাটা শুনে আমার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার দশা । বোঝো ঠ্যালা ইয়ার্কিটা মেরে তাহলে লাভ কি হলো । তারপরেই মনে হলো । ইয়ার্কি আর হলোটা কি । গল্পর আসল ভাগই তো বাকি । ওই কবিতা পড়ে হ্যারি ওকে ডেকে যে পাঠাবে তা জানি। তারপর যেটা ঘটবে সেটা ভাবতেই আমার পেটের ভেতর হাসি কুল কুলিয়ে উঠছে।’
‘খামটা ওকে দেবো কি করে?’ এপ্রিল জানতে চাইলো ।
‘আরে সে দায়িত্ব আমার ।’
০০০
ক্লাস শেষে জ্যাককে দিয়ে খামটা পাঠিয়ে দিলাম হ্যারির হাতে । তারপর বেরিয়ে গেলাম ক্লাস থেকে । কিছু বাদেই জ্যাক ফিরে এলো । বললো, ‘এপ্রিলকে ডাকছে হ্যারি ।’
ওদের দুজনকে একা ছেড়ে আমরা একটু দূরে দাঁড়ালাম । কি কথা হলো ওদের ভেতর শুনতে পেলাম না। দেখলাম হ্যারি আর একবার খামের ভেতরের কাগজটা বার করে পড়লো । কিছু একটা বললো । তার পরেই ঘুরে দাঁড়ালো এপ্রিল । ওর চোখে জল । কিছু না বলে একছুটে আমাদের পাশ দিয়ে ছুটে চলে গেল । আমরা হো হো করে হেসে উঠলাম।
০০০০০
বয়স্কা মহিলা বললেন, ‘ও তাহলে সে রাতে তোমার সাথেই নেচেছিল হ্যারি । পরে তোমরা বিয়ে করবে ঠিকও করেছিলে নিশ্চয় । সম্ভবত সেটা হয়নি । হ্যারি অন্য কারো সাথে ... আর সেটা সহ্য করতে না পেরে তুমি ওকে খুন করেছো ।’
‘ অন্য কারো সাথে হলে হয়তো খুনটা করতাম না । ও এপ্রিলকেই ...।’
‘এ বাবা সে কি!’
‘ হ্যাঁ । সেদিন এপ্রিল কেঁদেছিল আনন্দে । কষ্টে নয় । ওই কবিতাটা হ্যারির এতোই ভালো লেগেছিল যে ওই এপ্রিলকে নাচের পার্টনার হওয়ার জন্য প্রপোজ করে । আর সেটা শুনেই এপ্রিল কেঁদে ফেলেছিল । সে রাতে আমি জ্যাকের সাথে নাচ করেছিলাম। কিন্তু চোখ ছিল হ্যারির দিকে ।’
‘অর্থাৎ তোমার করা ইয়ার্কি তোমার দিকেই ফিরে আসে ?’
‘হ্যাঁ । এপ্রিলকে বোকা বানাতে গিয়ে নিজেই বোকা বনে গিয়েছিলাম । কিন্তু হ্যারি আমার ছাড়া আর কারো হতে পারে না । হতে দিই নি । ’
সমাপ্ত

Tuesday, January 30, 2018

স্প্রিং - প্রতিম দাস [সম্পূর্ণ] "হিমায়ন" গল্পের প্রিক্যুয়েল

  
স্প্রিং  
প্রতিম দাস
ইউনাইটেড ক্লাবে বিদ্যাদেবীর আরাধনা হয়, জানি। কারন ওটা আমার ছোট বেলার ক্লাব। এবার হঠাৎই বাবন এসে বললো, “প্রতিমদা মণ্ডপের দায়িত্বটা নাও। একটা নতুন ধরনের কিছু করো তো।”
২০০৭ সালে নরেন ক্ষ্যাপা স্মৃতি মন্দিরে আয়নার দুর্গা প্রতিমা এবং ২০০৮ সালে আইসক্রিম খাওয়ার কাঠের চামচ দিয়ে প্রতিমা বানানোর পর পরিচিতি এসেছে। বললাম,“আমি তো মণ্ডপের কাজ করি না।”
ও বললো, “ওসব জানিনা তুমি ক্লাবের পুরনো মেম্বার। এটা আমাদের আব্দার। দুদিন বাদে সন্ধে বেলায় মিটিং আছে। তো মায় আসতে হবে। সাথেই তোমার পরিকল্পনা কি সেটা নিয়ে আসবে।”
গেলাম দুদিন বাদে। মধ্যে ১৬টা বছর পেরিয়ে গেলেও ক্লাবের কিছুই বদলায়নি। প্রায় সবাই একই আছে শুধু নতুন একটা ঘর হয়েছে। ঘরটায় কিছু চেয়ার পাতা। একটা সোফা। বাবন ছিল ঘরে। দেখতে পেয়েই, ভেতরে আসার জন্য ডাকলো। এঁকে নিয়ে গিয়েছিলাম ভাবনাটা। কিছুক্ষনের মধ্যে আরো ১৪-১৫ জন এসে গেল। দু তিন জন ছাড়া সব নতুন। বুঝিয়ে বললাম ব্যাপারটা কি হবে – পছন্দ হল ওদের। কথা ফাইনাল করে চলে আসছি, দরজায় মুখোমুখী হলাম একজন শীর্ণকায় মানুষের। মুখটা খুব চেনা চেনা লাগলো। কোথায় যেন দেখেছি?
পেছন থেকে বাবনের গলা শোণা গেল, ‘আরিব্বাস আজ সূর্য কোন দিকে উঠেছে! জিডি এসেছে রে! বসতে দে। প্রতিমদা একটু দাঁড়িয়ো কথা আছে।’
দাঁড়ালাম ঘরের বাইরে ...মাঠে ।
‘বসুন দাদা, ঐ সোফাটাতে বসুন’, ভেতরে কেউ একজন বললো।
জিডি নামের লোকটির গলার আওয়াজ পেলাম এবার, ‘নতুন আমদানি মনে হচ্ছে। ভেতরে স্প্রিং আছে তো? নারে ওতে বসবো না। ১৯৭৪ সালের পর থেকে স্প্রিং এর কোনো চেয়ারে আর বসি না।’
‘কেন দাদা! স্প্রিং এর চেয়ারে আবার কি হলো?’
‘সে এক কাহিনী। বললে তদের আবার বিশ্বাস হবে না। বলবি গুল মারছি।’
‘না, না আপনি বলুন। তাছাড়া আমাদের বলায় আপনার কি আসে যায়। আপনি তো সত্যি ঘটনাই বলবেন।’
‘তা শুধু মুখে শুনবি? একটু অনুপান না হলে কি আর এসব জমে ভায়া।’
‘আগে এটা তো ধরান, আপনার স্পেশাল ব্র্যান্ড। শ্যামল, ঝালমুড়ি আর চা বলে দে তো মানিকদাকে।’
এতোটা শুনেই আবার ভেতরে ঢুকলাম। আসলে একটু লেখালিখির নেশা আছে। যদি কোনো মাল মশলা জুটে যায়।
বাবন আমায় দেখতে পেয়ে বললো, ‘আরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? একটা চেয়ার নিয়ে বসে পড়ো।’
বসেই পড়লাম।
জোরে একটা সুখটান মেরে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থেকে শুরু করলেন জিডি।
‘সময়টা ১৯৭৪ এর শেষের দিকে। কোম্পানির খরচায় গিয়েছি আয়ারল্যান্ডে। জানিসই তো আমি বিদেশি কোম্পানি ছাড়া চাকরি করিনি কক্ষনো। আমি ছিলাম এক নম্বর সেলসম্যান। তাই বস যখন বললো
– ডস আয়ারল্যান্ডে যাবে নাকি আমার সাথে। জেনারেল মিটিং এ যাচ্ছি। একজন হেল্পিং হ্যান্ড দরকার।
সময়টা শীতকাল। আর ওখানে মাইনাসের নিচে ঠাণ্ডা। তবুও নতুন দেশ দেখার সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না।
‘তোমার আয়ারল্যান্ড যাওয়ার সাথে চেয়ারে না বসার কি সম্পর্ক তা তো বুঝতে পারছি না?’ প্রশ্নটা করলো কৌশিক।
‘ধীরে হে অর্বাচীন বালক। সব বলবো। চা মুড়িটা আসতে দাও।’
‘গল্পটা বানাতে একটু সময় দিবিতো জিডিকে নাকি...’, আলটপকা মন্তব্য ছুঁড়ে দিল  আবার একজন। জিডির মধ্যে অবশ্য কোন হেলদোল দেখলাম না। বুঝলাম এ ধরনের মন্তব্যে উনি অভ্যস্ত।
চা মুড়ি পর্ব শেষ করে আরও একটা স্পেশাল ব্র্যান্ড ধরিয়ে জিডি পুনরায় শুরু করলেন –
‘জেনারেল মিটিং এ কি হলো বা কি খেলাম, কোথায় থাকলাম এসব না শুনলেও তোদের চলবে কি বলিস?
কেউ কোনও উত্তর দিল না।
‘মিটিং শেষের দিন রাতে বস বল লো – ডস চলো কাল আমার জন্মস্থান থেকে ঘুরে আসি।
পরেরদিন সকাল আটটার ট্রেনে চললাম সেই স্থান অভিমুখে। জায়গাটার নাম বলছি না। সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে।
এবার ক্লাব ঘরে বয়ে গেল একটা হাসির রেশ। “একেবারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা!” ব্যঙ্গের সুরে কথাটা  ভেসে গেল জিডির দিকে।
উঠে দাঁড়ালেন জিডি, “আমি চললাম।“
বাবন বললো, “ কল্পনার দিক থেকে সুজয় আসছে। মোড়ের মাথা থেকে কিং সাইজ বেগনি আনতে বলে দিয়েছি।”
জোঁকের মুখে নুন দেওয়া হল যেন। জিডি ধপ করে বসে পড়লেন।
‘হ্যাঁ কি যেন বলছিলাম। আমার বসের জন্মস্থানটা একটা গ্রাম। অবশ্য সে গ্রাম আমাদের এদোঁ গ্রাম নয়। তখনকার দিনে সেটা প্রায় একটা আমদের মফস্বল শহরের সমান। ওরা বলে কান্ট্রি সাইড। বসের পৈত্রিক সম্পত্তি আর বাস গৃহের দেখাশোণা করেন মিঃ উইল্কিনন্সন নামক এক ৬০এর চেয়ে কিছু বেশি বয়সের মানুষ। নম্র, ভদ্র, শান্ত স্বভাবের এবং গাছপালা ভালবাসেন। বসই বলেছিলেন। কিন্তু ওখানে পৌঁছে যা দেখলাম তাতে সংশয় সৃষ্টি হল মনে। আমাদের দেখে উনি এগিয়ে এলেন বাগানের ফুলগাছ গুলো পায়ে দলে মাড়িয়ে। চোখের মনি দুটো কেমন যেন স্থির। রোবটের মতো আচরনে আমদের স্বাগত জানালেন।
দুপুরের খাওয়া সেরে আমি চারপাশটা ঘুরে দেখার জন্য বের হলাম। কিছুদূর হেঁটে যাওয়ার পর চোখে পড়লো এক অদ্ভুত ঘটনা। একজন লোককে দুজন চেপে ধরে নিয়ে আসছে, আর লোকটা একভাবে বলে চলেছে- কোনো ভয় নেইরে বাবা। আমি ডুবে যাবো না। আমি জলের ওপর দিয়ে হাঁটতে পারি।
এগিয়ে গেলাম কি ব্যাপার জানার জন্য। পাগল নাকি?
 লোক দুজনার সাথে কথা বলে  জানা গেল গত কয়েকদিন ধরে এই গ্রামে বেশ কয়েকজন মানুষ এরকম অদ্ভুত আচরণ করছে । সেই কাজটাই ঐসব মানুষ গুলো করতে চাইছে যা তারা করতে অভ্যস্ত নয় বা করতে চায়ই না। যেমন এই মানুষটা জলাশয়ের কাছে যেতে ভয় পায় অথচ এখন জলের ওপর দিয়ে হাঁটতে চাইছে।
ফিরে এসে দেখি বস মুখ গম্ভীর করে বসে আছেন। কি ব্যাপার জিজ্ঞেস করায় বললেন – মিঃ উইলকিনন্সন ওনার সাথে অভব্য আচরণ করেছেন কিছুক্ষণ আগে। যা একদমই আশাতীত।
আমি বললাম – এ গ্রামে সপ্তাহখানেক ধরে এরকম সব ঘটনা ঘটছে। কিছু মানুষ কল্পনায় আনা সম্ভব নয় এমন সব আচরণ করছে। আপনিতো জানেন আমি সাইকোলজির ছাত্র ছিলাম।[এখানেও দু চারজন খুক খুক করে কেসে বা হেসে উঠলো] যদি অনুমতি দেন তাহলে ব্যাপারটা একটু...
-      দ্যাখো কি করতে পারো। হাতে তো সময় সাকুল্যে মাত্র তিনটে।
-      সে ক্ষেত্রে আপনার সাহায্য দরকার সবার আগে।
-      কেন?
-      কারন একটাই এখানে কেউ আমাকে চেনে না।
-      বলো কি করতে হবে?
-      শেরিফ বা গ্রাম প্রধানের সাথে পরিচয় করতে চাই।
-      সে আর এমন কি ব্যাপার। বর্তমান শেরিফ যতদূর জানি আমার চেনা মানুষ।
জোসুয়া রেনল্ড। শেরিফ। বসের শুধু চেনাই নয়, ক্লাস মেট। কথা বলে বুঝলাম উনিও খুব চিন্তিত ঘটনাগুলো নিয়ে। আমি যেচে এ রহস্যের সমাধান করতে চাওয়ায় উনি খুবই খুশি। সাথেই বসের সুপারিশ থাকায় যে কোনো রকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেন।
প্রথমেই ঐ সব মানুষগুলোর নাম, তাদের বাসস্থান জানতে চাইলাম। বেশি সময় লাগলো না ওগুলো জোগাড় করতে। মোট ৯ জন। ৩ জন মহিলা। ৬ জন পুরুষ। বয়স ২৭ থেকে ৮৪ বছর।
গোটা দিনটা কেটে গেল ঘুরে ঘুরে এদের সাথে এবং এদের বাড়ির লোকদের সাথে কথা বলে।
ছোট গ্রাম ফলে একে অপরকে চিনলেও কোন প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বা সম্পর্ক ওদের মধ্যে গত ১০-১২ দিনে হয়নি। তার অর্থ এর মধ্যে কোন সংক্রমণ জাতীয় ব্যাপার নেই। তাহলে সূত্রটা কি?
শেরিফের সহযোগিতায় ঐ ৯টা মানুষের চেনা পরিচিত আরও অনেক মানুষের সাথে কথা বললাম। কিন্তু এমন কোনো তথ্য হাতে এলো না যা রহস্যটার সমাধান করতে পারে।
পরের দিনটা ছিল রবিবার। গ্রামের ছোট্ট প্রাচীন চার্চটায় প্রায় সকলেই জমায়েত হয়েছিলেন। আমিও গেছিলাম বসের সাথে। ফাদার জন সারমন পাঠ এবং উপাসনা করালেন। অনুষ্ঠান শেষে  যে যার বাড়ির পথে ফিরে গেলেন। আমিও বেরিয়ে এলাম।  একটি গাড়ি এসে  থামলো। বেশ ঝকঝকে গাড়ি। ভেতরে একজন সুবেশা মহিলা বসে। ফাদার জন বেরিয়ে এলেন চার্চ থেকে। দেখেই  সামনের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো একটি ছেলে। খুলে দিল পেছনের দরজা। মহিলা বেরিয়ে এগিয়ে গেলেন ফাদারের দিকে। ফাদার মাথা নাড়লেন এবং হাঁটা শুরু করলেন চার্চ সংলগ্ন একটি বাড়ির দিকে। মহিলা অনুসরন করলেন ওকে। পরে জানতে পেরেছিলাম ওটা ফাদারের বাসভবন। আমি আর দাঁড়ালাম না।
হাতে আর মাত্র একটা দিন। সমস্যাটার সমাধান করা আমার পক্ষে সম্ভব নয় এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছি। সহসাই একটা গাড়ি এসে থামল । সেটা থেকে যিনি নামলেন তার গলাখাঁকাড়ির শব্দেই ঘর থেকে বুঝতে পারলাম শেরিফ মিঃ রেনল্ড এলেন। ঘড়িতে রাত তখন যথেষ্টই।
ডোরবেল বাজার আগেই দরজা খুলে স্বাগত জানালাম।
উনি তার প্রত্যুত্তর না দিয়ে বললেন- মিঃ ডস, আরো এক জন আক্রান্ত। তবে উনি এই গ্রামের কেউ নন।  শহর থেকে আগত অতিথি। মিসেস ম্যাকফারসন। আমি চাই আপনি একবার চলুন, এখনি।
দেখেই চিনলাম। সকালে চার্চের সামনে দেখা সেই গাড়িটা। যে বাড়িতে শেরিফ আমাকে নিয়ে এলেন তার সামনেই রাখা আছে । কিন্তু একি দশা! উইন্ড স্ক্রীন, হেড লাইট ভাঙা। সামনের বনেট বেঁকে তুবড়ে চেপ্টে গেছে। সামনের ঘেরা বারান্দায় সকালে দেখা ছেলেটি বসে আছে ।
মাথায় ব্যান্ডেজ। ওই গাড়ির ড্রাইভার।
ওর কাছ থেকে যা জানা গেছে –
সকালে ফাদারের বাড়ি থেকে চলে আসার মিনিট দশেক বাদে চলন্ত গাড়ির মধ্যে মিসেস ম্যাকফারসন অকথ্য গালাগাল দিতে থাকেন ছেলেটিকে, কোনও কারন ছাড়াই। তারপর সহসাই পেছন থেকে ওর গলা টিপে ধরেন উনি। সময় মত ব্রেক কষেও গাছের সাথে ধাক্কা লাগা ও উল্টে যাওয়া আটকাতে পারেনি  সাইমন । ছেলেটির নাম। এরপর  ও আর ম্যাডাম গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে । কিন্তু মিসেস ম্যাকফারসন এর আচরণ বদলায় না। হাতের কাছে যা পান তাই ছূঁড়ে মারতে থাকেন সাইমনকে। একটা পাথরের আঘাতে মাথা ফাটে ওর। কোনও মতে দূরে পালিয়ে গিয়ে লোকজন ডেকে আনে সাইমন। তাদের সাহায্যেই গাড়ি এবং ম্যাডামকে বাড়ি আনা হয়।
বাড়ির ভেতর ঢুকে সেই ঘর টিতে গেলাম যেখানে মিসেস ম্যাকফারসনকে বেঁধে রাখা হয়েছে বিছানার সাথে। না হলে হাতের কাছে যা পাচ্ছেন তাই ছূঁড়ে ছূঁড়ে মারছেন। চোখের মনি দেখলাম এই উপসর্গে আক্রান্তদের মতই স্থির।
গ্রামের একমাত্র ডাক্তারটি উপস্থিত। কি করবেন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। ঘুমের ইনজেকশন দেওয়ার কথা বলে ফিরে এলাম বসের পৈত্রিক বাসভবনে।
মিঃ রেনল্ড বিদায় নেওয়ার পর পুরো ব্যাপারটা নিয়ে আবার ভাবা শুরু করলাম। ফাদারের বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর ঘটনাটি ঘটেছে। তাহলে কি ফাদারই কিছু করছেন। সেক্ষেত্রে আগে আমাকে জানতে হবে বাকি আক্রান্তরা সবাই ফাদারের বাড়ি ইতিমধ্যে গিয়েছিলেন কিনা? সকাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। বসকে জানালাম আমার অনুমানটা।
সকালে প্রাতঃরাশ সেরেই ছুটলাম শেরিফের বাড়ি। দেখা হতেই জানালাম - যত দ্রুত পারেন একটা খবর আনার ব্যবস্থা করুন আর ফাদার জনকে ডেকে পাঠান।
-      কি খবর?
-      ফাদারের বাসভবনে আক্রান্তরা সপ্তাহ খানেকের মধ্যে গিয়েছিল কিনা?
-      আপনি কি মাননীয় ফাদারকে এ ব্যাপারে ...
থামিয়ে দিয়ে বললাম – সে উত্তর পরে দেব। আমার হাতে সময় খুব কম। যতটা পারেন জলদি করুন।

এক ঘণ্টার মধ্যেই করিৎকর্মা শেরিফ মিঃ রেনল্ড দুটো কাজই সুসম্পন্ন করলেন। হ্যাঁ আমার অনুমান সঠিক আক্রান্তরা সকলেই ফাদারের বাড়ি গিয়েছিলেন। মানসিক শান্তির আশায়। বিশেষ ধর্ম উপদেশ শুনতে। মনে হচ্ছে জাল গুটিয়ে ফেলেছি। কিন্তু সমস্যা জটিল হল যখন স্বয়ং ফাদার জনও অকপটে একজন সুখ্রিস্টান নাগরিকের মতো সত্যি কথাই স্বীকার করলেন।
-      হ্যাঁ ওরা সকলেই আমার কাছে এসেছিলেন মানসিক শান্তি লাভের আশায়। আমিও খুবই দুশ্চিন্তায় আছি মাই সন ওদের মানসিক বিকলন বিষয়ে। কবে থেকে এই কাজ করে আসছি এরকমতো কোন দিন হয়নি।
তাহলে কি হচ্ছে এটা??? ভৌতিক কান্ড!! নাহ , এর শেষ দেখে তবে ছাড়বো। প্রয়োজনে এদেশে থাকার মেয়াদ আরও কিছুদিন বাড়ানোর জন্য বসকে বলতে হবে।
-      ফাদার আপনার ব্যক্তিগত উপদেশ দেওয়ার জায়গাটা একবার দেখা যাবে?
-      অবশ্যই মাই সন। ইউ আর অলয়েজ ওয়েল কাম।
-      থ্যাঙ্ক ইউ ফাদার।
মিঃ রেনল্ডকে নিয়ে গেলাম ফাদারের বাসভবনে। ভেতরে দুটি ঘর। তারই একটাতে কাঠের পার্টিশন দিয়ে তৈরি হয়েছে একটা অ্যান্টি চেম্বার। সেখানে একটি ছোট টেবিল পাতা। যার দু দিকে দুটি চেয়ার। একটি কাঠের হাতলবিহীন। আর একটি গদিসহ লোহার। কাঠের চেয়ারের পেছন দিকে একটি ক্রুশ বিদ্ধ যীশুর মাঝারি মাপের মূর্তি। টেবিলের ওপর একটি বাইবেল। পার্টিশনের ওপাশে দরজার ডানদিকে একটা ফায়ারপ্লেস, বেশ বড়ই। যার জ্বলন্ত আগুনের তাপে ঘরটা বেশ আরামদায়ক । আয়ারল্যান্ডের শীত থেকে বাঁচতে এটা খুব দরকার।
না, তেমন কিছু তো নেই এঘরে। তবু কি মনে হতে ফাদারকে  বললাম – ফাদার জন, কিছু অসুবিধা না হলে আপনি একবার আপনার আসনে বসবেন প্লিজ। ঠিক যেভাবে বসে আপনি উপদেশ দেন।
বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে উনি কাঠের চেয়ারটায় বসলেন। এবার মিঃ রেনল্ডকে বললাম – আপনিও যদি অনুগ্রহ করে বিপরীত চেয়ারটায় বসেন।
উনিও অনুরোধ রাখলেন। ফাদারকে বললাম কিছু ধর্ম উপদেশ পাঠ করতে।
প্রায় মিনিট সাতেক ধরে উচ্চনিচ স্বরক্ষেপনে  চললো ফাদারের উপদেশ দান পর্ব। বিভিন্ন দিক থেকে পর্যবেক্ষণ করেও কিছু হদিশ করতে পারলাম না।
অযথা বিরক্ত ও সময় নষ্ট করার জন্য ফাদারের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম, আমি আর মিঃ রেনল্ড। ফিরে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইতে গিয়েই চোখে পড়লো পরিবর্তনটা। চোখের মনি স্থির মিঃ রেনল্ডের। এমন ভাবে তাকচ্ছেন যেন আমাকে চেনেনই না। সহসাই রিভলবারটা বার করলেন হোলস্টার থেকে। তাক করলেন আমার দিকে। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ। ওহঃ মাই গড!!! “ক্লিক” করেএকটা শব্দ হল। ভাগ্যিস পরিবর্তিত মানুষটা আসল কাজটা , মানে সেফটি ক্যাচ এর লকটা খোলেননি। বেঁচে গেলাম এযাত্রা। শরীরের সব শক্তি দিয়ে ওকে ধাক্কা মেরে ছুটলাম ফাদারের ঘরের দিকে। আমাকে সম্ভবত দেখতে পেয়েছিলেন ফাদার জন। দরজাটা খুলে গেল। ঢুকেই ছিটকিনি লাগিয়ে দিলাম। হাঁফাতে হাঁফাতে একটা ছবি ভেসে উঠলো মনের পর্দায়—মন দিয়ে উপদেশ শুনছেন মিঃ রেনল্ড। তবেতো আমার অনুমান মনে হচ্ছে এক্ষেত্রেও ভুল নয়।
চেপে ধরলাম ফাদারকে – বলুন কি করছেন আপনি? হিপ্নোটিজম? ধর্ম উপদেশ দেওয়ার ছলে নিরীহ মানুষদের পরিনত করছেন শয়তানে!!
-      প্লিজ বিলিভ মি মাই সন। বাই দ্য সেক অফ দি হোলি স্পিরিট, আমি নির্দোষ। কি করে কি হচ্ছে আমি সত্যিই কিছু জানি না।
তাহলে কেন হচ্ছে এটা? আবারো একটা ছবি ভেসে উঠলো মনে। একটা বিসদৃশতার। দুটো চেয়ার। একটা কাঠের আর একটা লোহার। কেন? দুটোই এক নয় কেন? তবে কি?
-ফাদার দুটো চেয়ার দু রকম জিনিষে তৈরি কেন?
- সপ্তাহখানেক আগেও এক রকমই ছিল। উত্তরাধিকার সূত্রে লোহার চেয়ারটি স্কটল্যান্ড থেকে আমার কাছে এসেছে দিন কুড়ি আগে। ফার্নিচারের দোকান থেকে নতুন করে সাজিয়ে নিয়ে শান্তি কামনায় আসা মানুষদের স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়ার জন্য ওটাকে ওখানে রেখেছি।
- উত্তরাধিকার সূত্রে মানে? কতদিনের পুরনো ওটা?
- সঠিক বয়স কত তা ঠিকঠাক বলতে পারবো না। তবে অন্ততঃ দেড়শ পৌনে দুশো বছরতো হবেই। আমার বাবার তৃতীয় পূর্ব পুরুষ মিঃ লনবার্ন বার্নস্টাইন ছিলেন ওটার মালিক।
- উনি কি করতেন টরতেন আপনার জানা আছে?
- হ্যাঁ। উনি ছিলেন প্যারাসাইকলজিস্ট এবং অ্যালকেমিস্ট। যত দূর জানি এই চেয়ারটা উনার চেম্বারে থাকতো রোগীদের চিকিৎসা করার জন্য। আসল তামা দিয়ে তৈরি ওটার স্প্রিংগুলো। ছোটবেলায় যখন গেছিলাম , দেখেছিলাম চেয়ারটার সাথে বেশ কিছু বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম যুক্ত ছিল।
লোহার চেয়ার, তামার স্প্রিং, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম!!! প্যারানরম্যাল স্টাডিজ পড়ার সময় পড়ে ছিলাম এরকম চেয়ারের কথা। ইউরোপের মধ্যযুগের আবিষ্কার। চেয়ারে বসিয়ে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো উন্মাদগ্রস্থদের । বেশিক্ষণ এরকম চেয়ারে বসিয়ে রাখলে অবচেতন মনে একটা পরিবর্তন ঘটে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেটা নেতিবাচক হত। আর সেজন্যই এর ব্যবহার করা হত অপরাধীদের ওপর। নেতি নেতি কাটাকূটি হয়ে সদ্গুনের আগমন হবে এটা ভেবে।
সজোরে দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ শুনতে পেলাম। মিঃ রেনল্ড । আগেকার দিনের মজবুত দরজা। আপাতত চিন্তার কিছু নেই  ওদিক থেকে। দ্রুত ভাবতে থাকলাম। কি করা যায়? যা পড়েছিলাম তাতে এর প্রভাব ছাড়াতে সেই যুগে আক্রান্তকে আগুনের ছ্যাঁকা দেওয়া হত। তাতে অনেকেরই মৃত্যু ও ঘটতো। এটা করা এখানে সম্ভব নয়। তাহলে...
অন্য পথে হাঁটতে হবে। বাঁশ যদি না থাকে বাঁশী তৈরি হবে কি করে ... আইডিয়া... মনে হচ্ছে কাজ হবে ...
-      ফাদার , আপনি কি চান এ সমস্ত আক্রান্তরা পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক?
-      অবশ্যই মাই সন।
-      তাহলে এ চেয়ারটাকে ঐ ফায়ারপ্লেসে ফেলে দিন।
যাকে আমি সন্দেহ করেছিলাম তিনি যে কত সাচ্চা মানুষ তার প্রমান পেলাম। কোনো প্রশ্ন না করে আমার কথা শেষ হতেই এগিয়ে গেলেন চেয়ারটার দিকে। তারপর ইশারা করলেন আমাকে ওটা ধরার জন্য। বেশ ভারী চেয়ারটা। দুজনে মিলে ওটাকে নিয়ে গেলাম ফায়ার প্লেসটার কাছে। তারপর ঠেলে ঢুকিয়ে দিলাম ভেতরে। আগুনের পরিমাণ বড়াতে কয়েক টুকরো কাঠ ও উনি দিলেন ভেতরে। চামড়া পোড়া গন্ধে ভরে গেল ঘর। আগুনের স্পর্শ পাওয়া মাত্র ওদিকে থেমে গেল দরজা ধাক্কানো।
মিনিট দশেক বাদে চামড়া পুড়ে বেড়িয়ে এলো লোহার চেয়ারটার কঙ্কাল। আগুনে লাল টকটকে। আগুন খোঁচানোর শিকটা দিয়ে জোরে জোরে আঘাত করে চেয়ার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলাম তামার স্প্রিংগুলোকে।
শুনতে পেলাম মিঃ রেনল্ডের গলা।
-      ফাদার! ফাদার! আপনি ঠিক আছেনতো। কিছু একটা পুড়ছে মনে হচ্ছে?

ঐ দিন বিকেলবেলা।
হঠাৎ করেই আক্রান্তরা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসায় গ্রামটির সকলেই বেশ স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন।
মিঃ রেনল্ড আর বস ছাড়া কাওকেই বলা হয়নি আসলে কি ঘটেছিল। পুরো কৃতিত্বটা ফাদারের প্রার্থনার কারনে ঘটেছে বলেই প্রচার করা হয়েছে।
মিঃ রেনল্ড কি ভাবে যে আমার কাছে ক্ষমা চাইছিলেন সেটা বলে বোঝানো মুশকিল। অনেক কষ্টে বোঝাতে পেরেছি ওর ঐ আচরণের দায় ওনার নয়। আর ফাদার জনতো মনে হচ্ছিল ক্ষমতা থাকলে আমাকে সশরীরে স্বর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন।’
কোনও এক দুর্মুখ ক্লাব সদস্য ফোড়ন কাটলো – ভালোই হত উনি ওটা করলে। একরাশ গুলগল্প শুনতে হত না।
জিডি উঠে দাঁড়ালেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন –  ওরে বাবা! সাড়ে দশটা বেজে গেছে!! ভাই বাবন তোমার কিং সাইজ বেগনির লোভে মনে হচ্ছে আজ আমার কপালে মেসের ভাতটা আর জুটল না । চলি।
কাওকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উনি হনহনিয়ে হেঁটে গেলেন দরজার দিকে। আমিও পিছু নিলাম এবং পিছু ডাকলাম।
-      দাদা একটা কথা ছিল।
হাঁটতে হাঁটতেই মাথা না ঘুরিয়ে উনি বললেন – কি কথা?
-কিছু মনে না করলে আপনার নামটা জানতে পারি?
- নয়া চিড়িয়া মনে হচ্ছে। হুম ... আমার নাম জিডি... ঘনশ্যাম দাস।
শুনেই আমি থমকে গেলাম।
ঘনশ্যাম দাস! ঘনশ্যাম!! মানে ঘনা......দা!!!
এজন্যই এতো চেনা চেনা লাগছিল... আবারো একটা কথা জানার জন্য চিন্তার জগত থেকে বাস্তবে ফিরে সামনে তাকিয়ে দেখলাম... কেউ নেই ...

সমাপ্ত।









Thursday, January 11, 2018

দরজার ওপাশে... - প্রতিম দাস

দরজার ওপাশে ...
প্রতিম দাস
[ বছরের শুরুতেই স্বয়ং Robert Burton Robinson এর কাছ থেকে অনুমতি পেয়েছি তার লেখা অনুবাদ করা ও আপনাদের পড়ানোর । আজ “ Screen 13” গল্পের ভাবানুবাদ “দরজার ওপাশে ...” ]
00000
জেসিকা লোকটার টিকিটটা ভালো করে দেখলো । তারপর একটা কোনা ছিঁড়ে নিয়ে বাকিটা ফেরত দেওয়ার সময় বললো, ’১৩ নম্বরে । ডানদিকে চলে যান । ওই কোনার দিকে। একেবারে শেষে ।’
আরে! ডেবি অবাক হয়ে গেল। জেসিকা লোকটাকে ১৩ নম্বরে যেতে বললো কেন? সবে মাত্র এই সপ্তাহেই জেফারসন সিনেমা হলে কাজটা পেয়েছে। তাসত্বেও ও ভালো করেই জানে নামে সিনেমা হল হলেও এই মাল্টিপ্লেক্সে কোনও ১৩ নম্বর হল নেই ।
কৌতূহল দমাতে না পেরে লোকটার পিছু নিলো ডেবি ।
ততক্ষনে লোকটা কোনার দিকের ঘরটার কাছে প্রায় পৌঁছে গেছে। ডেবির ইচ্ছে টিকিটটা দেখে সঠিক হলের পথ বলে দেওয়ার। 
কোনার দিকে একেবারে শেষের ঘরটার দরজা খুলে লোকটা ভেতরে ঢুকে গেলো ।
আরে, কি মুস্কিল । লোকটা কি চোখে দেখতেও পায়না নাকি । ওটাতো স্টোর রুম ।
ডেবি দ্রূত এগিয়ে গেল। দরজাটা ধরে টেনে খোলার চেষ্টা করলো । লাভ হলো না । লকড!!! মুখ তুলে অপরের ইলেক্ট্রিক লেখাটা দেখতে গিয়ে আরও একবার অবাক হলো । কিছুই লেখা নেই ওখানে। অদ্ভুত ব্যাপার!!!
লেখা ছিলও না কোনোদিন । ডেবি জানে ওটা স্টোর রুম।
বার কয়েক হাতের চাপড় মারল দরজায় । 
কোনও সাড়া এলোনা ভেতর থেকে ।
পাশের ১২ নম্বর হল থেকে বেরিয়ে এল জ্যাক । ‘হ্যালো ডেবি । শো শেষ হলে বার্গার খেতে যাবে নাকি আমার সাথে?’
‘জ্যাক এই হলটার কি ব্যাপার বলোতো?’
‘আরে ওটাতো হল নয় । ট্রেনিং এর সময় তোমাকে কেউ বলেনি?’
‘বলেছিল বলেইতো-
‘-হুম, আসলে হলের মালিক খুবই কুসংস্কারচ্ছন্ন মানুষ। যে কারনে ১৩ নম্বর হলটাই রাখেননি ।’
‘সেটাও জানি। কিন্তু একটু আগে একটা লোক ওটার ভেতরে ঢুকে গেল ।’
‘একটা লোক? ধুসসস... হতেই পারেনা ।’
‘জেসিকা লোকটার টিকিট দেখে ওকে এই ঘরেই যেতে বললো । আমি স্পষ্ট শুনেছি ওকে বলতে ।’ 
‘ তা কি করে হয়। দ্যাখো বোধ হয় ভুল করেছে। গতকাল লেট নাইট পার্টিটারটি করে হ্যাঙ্গওভার কাটেনি মনে হয় ।’
‘হতে পারে । কিন্তু লোকটা ভেতরে ঢুকেছে এটাতো আমি দেখেছি !’
জ্যাক দরজা ধরে বার দুয়েক টানলো । ‘দূর, এটাতেতো তালা মারা আছে। ’
‘সেটাও দেখতে পাচ্ছি । বিশ্বাস করো আমি কিন্তু সত্যিই দেখেছি ।’
জ্যাক বার কয়েক টোকা মারলো । কেউ সাড়া দিল না।
জ্যাক কাঁধ নাচিয়ে বললো, ‘রাতে বার্গারের প্রোগ্রাম...’
‘আজকে হবে না।’
‘ওকে । নো প্রব্লেম। কাল যাবো । ঠিক আছে । বাই ।’
জ্যাক চলে গেল । ডেবি বাকি সময়টা কাজের ফাঁকে ফাঁকে দরজার দিকে নজর রাখলো । লোকটা কিন্তু বেরিয়ে এলো না । 
০০০০০
পরেরদিন ডেবি কান খাড়া করে রইলো জেসিকা কাকে কি বলছে সেটা শোনার জন্য। অবশেষে রাতের শোয়ে শুনতে পেলো জেসিকার একই নির্দেশ । এবার একজন মাঝবয়সী মহিলা। দ্রুত মহিলার পিছু নিলো ডেবি । কিন্তু পুরোটা যেতে পারলো না । তার আগেই পেছন থেকে একজন ডেকে উঠলো, ‘এক্সকিউজ মি!’
‘হ্যাঁ বলুন,’ ডেবি হেসে উত্তর দিলো । ওদিকে মহিলাটি অনেকটা এগিয়ে গেছেন।
‘না মানে আমি পপকর্ণ কিনতে গিয়েছিলাম । টিকিটটা আমার স্ত্রী কেটেছিল। কত নম্বর হল সেটা জানা নেই । এই যে টিকিটটা । একটু বলে দিন না প্লিজ ।’
‘ ২৪ নম্বর। ওই দিকে সোজা গিয়ে লাল ফুলের টবের পাশের দরজা ।’ বলেই টিকিট ফিরিয়ে দিয়ে ডেবি ১৩ নম্বরের দিকে তাকালো ।
মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন স্টোর রুমটার সামনে। দেখছেন ওপরের সাইন ।
ডেবি দূর থেকেই দেখতে পেলো সাইনটার আলো।
দরজা খুলে মহিলা ঢুকে গেলেন ভেতরে ।
ডেবি না ছুটে যতটা দ্রুত হাঁটা যায় সেভাবেই এগিয়ে গেলো ।
মহিলা ভেতরে ঢুকে যেতেই ডেবিকে অবাক করে সাইনটা নিভে গেল।
ডেবি এবার ছুটতে শুরু করলো । এসব হচ্ছেটা কি?
দরজার কাছে গিয়ে কিছু লাভ হলো না। ওটা আগের মতোই লকড !
‘হেই ডেবি ! হাতে কাজ না থাকলে। এদিকে আমদের একটু সাহায্য করোতো!’
ডেবি ঘুরে দেখলো, জ্যাক আর হেনরী । ট্রলিতে চাপিয়ে ঠেলে নিয়ে আসছে তিনটে বড় বড় নোংরা ফেলার জায়গা ।
‘যাচ্ছি।’ 
মাল্টিপ্লেক্সের বাইরে বেরিয়ে এসে বড় ডাস্টবিনের ভ্যাটের কাছে এসে হেনরী নোংরা ফেলার ড্রামগুলোর ঢাকনা খুলতেই ভক করে একটা দুর্গন্ধ এসে লাগলো ডেবির নাকে । ‘অ্যাহহহ! কি বিশ্রি গন্ধ!’
‘কি রকম গন্ধ পাবে বলে আশা করেছিলে সুইটি?’
‘তা বলতে পারবো না। তবে এরকম যে আশা করিনি তা বলতেই পারি । বাসি পপকর্ণ, আধ খাওয়া ক্যান্ডি, বার্গারের সস...এসব মিশে এরকম গন্ধ হয় জানতাম না। জ্যাক তোমার টর্চটা একবার দাওতো!’
‘এই নাও।’
জ্যাকের কাছ থেকে টর্চটা নিয়ে ডেবি একটা ড্রামের ভেতর আলো ফেললো ।একটু দেখে বললো, ‘ওটা কি?’
জ্যাক তাকালো ভেতরের দিকে । ‘কোনটা?’
‘ওই যে লাল রঙের কি লেগে আছে!’
না বুঝতে পারার ভঙ্গী করলো জ্যাক ।
হেনরী ইয়ার্কির সুরে বললো, ‘ভ্যাম্পায়ারের আধ খাওয়া রক্ত ।’
হেসে উঠলো জ্যাক ।
‘সবেতেই ইয়ার্কি ভালো লাগে না ।’
‘ঠিক! ঠিক! তা ম্যাডাম ব্যাপারটা কি বলা যাবে কি?’
উত্তরটা হেনরী দিলো, ‘ডেবির মনে হয় ধারনা হয়েছে ওখানে কাউকে খুন করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে । উওওওওওওও!!! বাবারে! আমার ভয় লাগছে!’ বলেই হি হি করে হেসে উঠলো ।
‘ তা হতেও পারে । আমাদের ম্যানেজার যা রাগী মানুষ । কেউ বোধ হয় ফ্রী পপকর্ণটা মিইয়ে গিয়েছিল বলে উনাকে টেম্পার দেখিয়েছে আর উনিও দিয়েছেন তার গলা কেটে।’
‘এটাও হতে পারে,’ হেনরী বললো গম্ভীর ভাবে, ‘স্ন্যাক্স বারে বার্গারের সাথে আচারের প্যাকেটটা ছোটো দিয়েছিল বলে কেউ গালিগালাজ করেছে, ব্যাস!! খ্যাচাং!!’
‘আচারের প্যাকেট ছোটো দিয়েছিল বলে...উও ওওও ...পারিস বটে হেনরী তুই,’ বলেই হেসে হো হো করে হেসে উঠলো জ্যাক । তাতে যোগ দিলো হেনরীও।
‘সত্যি তোমাদের সাথে সিরিয়াস কথা বলে আরাম নেই। সবেতেই ইয়ার্কি।’ 
‘ওহ, কাম অন ডেবি । তুই বোধ হয় জানিস না আমাদের স্ন্যাক্সবারে মূরগী জবাই করা হয় । ওটা তারই রক্ত হবে সম্ভবত ।’
০০০০০
ঘণ্টাখানেক বাদে হাতের কাজগুলো সেরে ডেবি আবার ১৩ নম্বর ঘরটার কাছে গেল । ঠেলে দেখলো । একই রকম, লকড ।
‘ডেবি?’
গলাটা শুনেই ঘুরে তাকালো ডেবি । জেসিকা। একেবারে ওর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে । চমকে একপা পিছিয়ে গেল ।
‘ওখানে কোনও দরকার আছে নাকি?’
‘না তো, কেন?’
‘না মানে বার কয়েক দেখলাম তুমি দরজাটার কাছে এলে । বার কয়েক টেনেও দেখলে।’
‘না না, সেরকম কিছুই নয় ।’
জেসিকা বার কয়েক এদিক ওদিক আকিয়ে দেখে ফিসফিস করে বললো, ‘তুমি বোধহয় লক্ষ্য করেছো তাই না? যে আমি কিছু মানুষকে ওই ঘরে যেতে বলেছি।’
ডেবি পুতুলের মতো মাথা নাড়লো ।
‘তুমি কি জানতে চাও তার কারন?’
‘ইয়ে...মানে ...’
‘আরে অত চিন্তার কি আছে। ঠিক আছে আমি দেখাবো তোমাকে ওখানে কি হয়।’ জেসিকা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে একটা চাবি বার করে দরজা খুলে ডেবিকে ইশারা করলো ভেতরে যাওয়ার জন্য ।’
ডেবি ভেতরে ঢোকার পর ওর পেছন পেছন জেসিকাও ঢুকলো ।
‘অন্ধকারে কিছুই তো দেখতে পাচ্ছিনা!’
‘ভয় নেই, আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগিয়ে যাও।’
হাল্কা আলো ফুটে উঠলো ঘরে । একটা টেবিলের অন্য দিকে বেশ কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সামনে একটা কেক রাখা ।
‘হ্যাপি বার্থ ডে ডেবি,’ শোনা গেল জেসিকার কন্ঠস্বর ।
‘কিন্তু আজতো আমার জন্মদিন নয় ...’
‘জানি তো । আমরা সব কিছু একটু আগেই পালন করি ।’
‘এর মানে কি এটাই যে তোমরা ওই সব লোক যাদের এঘরে ঢুকতে দাও তাদেরও জন্মদিন পালন করো । সারপ্রাইজ পার্টি?’
‘একদম তাই,’ জেসিকা উত্তর দিলো ।‘ কত মানুষ আছে যারা একা থাকেন । যাদের কোনও বন্ধু বান্ধব আত্মিয় স্বজন নেই । আমরা তাদের খুঁজে বার করে সিনেমার টিকিট পাঠাই পোস্টে । তারপর এরকম বার্থ ডে পার্টি করে একটু আনন্দ দিই।’
সব শুনে ডেবি যখন প্রায় উত্তেজনা ঝেড়ে ফেলেছে অর চোখ গেল ঘরের একটা কোনায় । কালো কম্বল চাপা দিয়ে কি একটা রাখা আছে। ভালো করে তাকাতেই দুটো মানুষের পা বেরিয়ে আছে দেখতে পেলো ডেবি । 
ওটা কার পা? যার পা সে কি বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে?
যদি মরা হয় তাহলে? জেসিকারা কি বেছে বেছে একাকী মানুষদের এখানে লোভ দেখিয়ে নিয়ে আসে...এমন মানুষদের যাদের খোঁজ করার কেউ নেই ...তারপর তাকে মেরে তার শরীরের নানান অংশ বিক্রি করে দেয় ... সে নিজেও তো একাই থাকে ... এবার কি তার পালা?
‘আগে হৃদপিন্ডটাকেই কাটা যাক, নাকি?’ চকচকে একটা চাকু মোমবাতির আলোয় ঝলসে উঠলো সামনের মানুষটার হাতে ।
ডেবি বুঝে গেল পালানোর আর পথ নেই। বল লো, ‘যা খুশী করো তোমরা!’
লোকটা থমকে দাঁড়িয়ে গেলো । মুখে বিস্ময় । তারপর বললো, ‘বেশ তাই হোক। একটা বড় টুকরো কেটে নিলো কেকটা থেকে । লাল দিয়ে বানানো হার্ট এর আইসিংটা সমেত। ‘ হ্যাপি বার্থ ডে। এই নাও!’ হাসি মুখে ডেবির দিকে প্লেটটা এগিয়ে ধরলো ।
কালো কম্বলটার তলা থেকে হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলো জ্যাক ।
সবাই একসাথে গেয়ে উঠলো সেই চিরন্তন সুরটা । ডেবির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে এলো । যদিও জন্মদিন নয় তবু এটা ওর জীবনের সেরা সারপ্রাইজ পার্টি ।
০০০০০
এরপর থেকে ডেবি আর কোনোদিন ১৩ নম্বর হল নিয়ে মাথা ঘামায়নি । কেউ যখন ওটার ভেতরে যায় তখন দরজাটা আপনা আপনি দরজাটা লক হয়ে যায় । ভেতরে না গিয়েও ডেবি ছবির মতো দেখতে পায় সেই মানুষটার সাথে কি হচ্ছে । 
ও কথা দিয়েছে কাউকে বলবে না ১৩ নম্বর হলের ভেতরে কি হয় । সে রহস্য ওর সাথেই নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। সারা পৃথিবীর চোখে ওটা এই মাল্টিপ্লেক্সের নিছক একটা স্টোর রুম ।
তবুও ওর কেন জানি না মনে হয় ও “সত্যি”ই জানে না একাকী মানুষগুলোর সাথে “আসলে” কি হয় যখন কেউ বিশেষ টিকিটটা পায় সিনেমা দেখার ... ১৩ নম্বর হলে । কেউতো বেরিয়ে আসে না !!!
সমাপ্ত