Search This Blog

Wednesday, May 16, 2018

এসেছিল...নাকি আসেনি! - প্রতিম দাস [ভূত/রহস্য কাহিনী]

এসেছিল...নাকি আসেনি!
প্রতিম দাস

‘আমি ভুতে বিশ্বাস করিনা । বিশ্বাস করিনা মানে বিশ্বাস করতে চাইনা । বিশ্বাস করতে চাইনা কারন আমার মন এর সম্ভাব্যতাকেই প্রশ্ন করতে চায় । চায় যুক্তি । আমার জীবনে একমাত্র মিস তনিমার ক্ষেত্রে যা ঘটেছিল তার সেই অর্থে শক্ত পোক্ত কোনও যুক্তি খুঁজে বার করতে পারিনি । যদিও এটাও বলতে পারি একাধিক বিষয় আমার মনে জেগে উঠেছিল। সেখানে অনুশোচনা, তার জন্য মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা, হ্যালুসিনেশন, নিজেকে শাস্তি দিতে চাওয়া এমন কি ডুয়াল পারসোনালিটি  জাতীয় পয়েন্টও ছিল। দ্যাখ, আমি কিন্তু কোনো সাইক্রিয়াট্রিস্ট নই । প্রাইভেট ডিটেকটিভ । আমার ভাবনা বা আমার সিদ্ধান্তের সাথে তোদের মিল নাই হতে পারে । এখন তোরা চাইলে সে ঘটনার বিবরণ তোদের শোনাতে পারি ।’
এতগুলো কথা একটানা বলে  পি সি ওরফে প্রবাহ চাকলাদারদা আমাদের মুখের দিকে তাকালেন । পাড়ার মোড়ে বুদ্ধুদার গ্যারেজে রোজ সন্ধ্যায় আমাদের আড্ডা বসে। আর বাঙ্গালীর আড্ডা মানে একবার না একবার ভূতের কথা উঠবেই। আর আজতো লোডশেডিং হয়েছিল কিছু সময়ের জন্য ।   প্রবাহদা আমাদের আড্ডার সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য । একসময় প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সীতে চাকরী করেছেন । নানা রকমের গল্প উনার কাছ থেকে আমারা শুনলেও ভুত নিয়ে কিছু শুনিনি । তাই আজ যখন বিশান জানতে চাইলো , ‘প্রবাহদা ভুত বিষয়ে আপনার মতামত কি?’  তখন ওপরের কথাগুলো আমরা শুনতে পেলাম ।
উনি যে প্রশ্নটা করেছিলেন তার উত্তর দিলেন অরুপদা । ‘না শোনার মতো কোন কারন তো নেই প্রবাহদা। আপনি শুরু করুন ।’
‘ সালটা খুব ভুল না করলে ১৯৭৪ । মাস খানেক হলো চাকরীতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ দেখিয়ে প্রমোশন পেয়েছি সিনিয়র ইনভেস্টিগেটর পদে । আলাদা কেবিন পেয়েছি । টিফিন আওয়ার হতে কিছুটা সময় তখনও বাকি । পিওন এসে একটা চিরকূট দিল । দেখলাম নাম লেখা আছে মিস তনিমা কর ।
বললাম, ‘পাঠিয়ে দাও।’
স্যুইং ডোর ঠেলে একটি বেশ সুন্দরী মহিলা ঘরে ঢুকলো  গায়ে গোলাপী রঙের কাশ্মীরী শাল জড়ানো অনুমান ২৬-২৭ বছর বয়স   । মাথায় এক ঢাল চুল। চোখের মনি কিঞ্চিৎ কটা । মুখে ও চোখে এমন একটা ভাব যা বলে বোঝানো কঠিন । এক কথায় যদি বলি বলতে হবে সন্ত্রস্ত । তাতে ও ঠিক বোঝানো যায় যায় না। ইংরেজি ‘হন্টেড’ শব্দটা ব্যবহার করলে বুঝতে সুবিধা হবে বোধ হয় । দৃষ্টি আমার দিকে থাকলেও কেমন যেন একটা উদাসী ছোঁয়া । মনে হচ্ছিল  চোখ যেন উনার নিজের নিয়ন্ত্রনে নেই ।  আমি বসেই ছিলাম মিস তনিমা ঘরে ঢোকার পরেও ।
 ওই দৃষ্টি দেখে মনের ভেতরটা কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল । ঈষৎ কাঁপা স্বরে বললাম, ‘ বসুন!’
‘ধন্যবাদ ।’ বলে আমার টেবিলের পাশের দিকে রাখা চেয়ারটায় বসলেন। হাতের ছোট অথচ দামি চামড়ার ব্যাগটা রাখলেন টেবিলের ওপর । ‘এখানে বসলে অসুবিধা নেইতো ...’ বলেই টেবিলের ওপর রাখা আমার নেমস্ট্যান্ডটার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে , ‘... মিঃ চাকলাদার?’  মিষ্টি সুরেলা গলা । সম্ভবত গানটান গাওয়ার অভ্যেস আছে ।  
‘না না অসুবিধা কিসের ।’  বুঝলি,  দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় বুঝেছি যারা মুখোমুখী না বসে পাশের চেয়ারে এসে বসে তাদের এমন কিছু গোপন কথা থাকে যা তারা যাকে বলছে সে ছাড়া  অন্য  কেউ শুনুক সেটা চায় না। অনুমান যে ভুল হয়নি সেটা কিছুক্ষন বাদেই বুঝতে পেরেছিলাম ।
দ্রতু ব্যাগটা খুলে পাঁচটা একশো টাকার নোট বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন উনি । আমি টাকাগুলোর দিকে তাকালেও হাত দিলাম না
‘এতে হবে না ,  না?’
‘মানে?’
‘মানে , আপনি যে ভাবে দেখছেন তাতে ...’
‘কি দেখছি?’
‘নোটগুলো। আপনাদের ফি । আসলে কি জানেন আমার এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি দেওয়ার ক্ষমতা নেই ।’
‘মিস কর আমি মোটেই বিশেষ কিছু ভেবে ওগুলোর দিকে তাকাইনি। পাঁচশো টাকা হয়তো বেশীও হতে পারে আমাদের কাজের জন্য। ঠিক কি করতে হবে জানতে না পারলে তো বলা যাচ্ছে না আর আপনাকে কিছু দিতে হবে কিনা। আপানার সমস্যাটা কি যদি বলেন তো...’
‘আপনাকে একটা ভুত তাড়াতে হবে।’
‘কিইইই!!!??’
‘দয়া করে না বলবেন না মিঃ চাকলাদার,’ কাতরভাবে বলে উঠলেন উনি। ‘আমি সত্যিই চাই...’
‘ভুত-’
‘হ্যাঁ একটা ভুত যে ইতিমধ্যে একজন মানুষকে খুন করেছে এবং আরো দুজনকে খুন করবে বলে জানিয়েছে । ’
টেবিলের ড্রয়ার খুলে আমি সিগারেটের প্যাকেট বার করলাম । ধীরে সুস্থে সেটায় অগ্নি সংযোগ করেললাম, ‘মিস কর, ভুত তাড়ানো আমাদের কাজ নয় । সত্যিই যদি আপনার ওই ভুত কোন মানুষকে খুন করে থাকে তাহলে আপনি ভুল জায়গায় এসেছেন। আপনার পুলিসের কাছে যাওয়া উচিত ছি...’
‘আমার পক্ষে পুলিসের কাছে যাওয়া সম্ভব নয় ।’
‘কেন নয়?’
একটু ইতস্তত করে মিস কর এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে আমার দিকে ঝুঁকে বললেন, ‘যদি আমি সেটা করি তাহলে আমি নিজেতো বটেই,  সাথে সাথে আমার ভাইদেরকেও ঝামেলায় ফেলবো ।’
‘কিসের ঝামেলা ?’
‘খুনের!’ বলেই ধপ করে চেয়ারে বসলেন ।
আমি সিগারেটে একটা বড় টান মেরে বললাম, ‘আপনি কি আমাকে আসল ঘটনাটা বলতে চান ?’
‘হ্যাঁ।’
‘সেটা করলে কোন ঝামেলা হবেনা বলে আপনার মনে হয়?’
‘ না হবে না । আমাকে সব খুলে বলতেই হবে । কারন কিছু একটা করা দরকার। আমার মনে হয়েছে আপনি সাহায্য করতে পারবেন । তবে আপনি যদি আমি যা বলবো সেটা পুলিসকে জানান তাহলে আমি সরাসরি বলে দেবো আমি কিছুই বলিনি । আর এর কোন প্রমান ও আপনার কাছে নেই । ফলে কেউ কোন ঝামেলায় পড়বে না।’
মানুষ ব্যক্তিগত নানারকমের সমস্যায় পড়লে আমাদের কাছে আসে। তার সমাধানের চেষ্টা করা আমাদের কাজ। কিন্তু সেই সমস্যার তালিকায় ভুত নেই। কিন্তু কেন জানি না কড়কড়ে একশো টাকার নোট গুলো দেখে আমার মনে হলো, কাজটা করা যেতে পারে। অতএব সিগারেটা অ্যাস্ট্রেতে চেপে ধরে নিভিয়ে নোটগুলোকে ড্রয়ারে রেখে বললাম, ‘ওকে, মিস কর, শুরু করুন আপনার গল্প ।’
‘ঠিক দু বছরের কিছু আগের নভেম্বরে এর শুরু । তার আগে জানিয়ে রাখি আমরা চার ভাই বোন। তিন ভাই আর আমি । আনন্দ সবার বড় । ও যখন মারা যায় ওর বয়েস হয়েছিল ৫০ বছর। ’
‘আর বাকিদের?’
‘জয়ন্তর বয়েস ছিল ৩৬ ।    সোমনাথের এখন ৩২  আর আমার   ২৯ ।’
‘জয়ন্তর বয়েস ছিল মানে?’
‘জয়ন্ত   সম্ভবত আত্মহত্যা করে – তিন সপ্তাহ আগে ।’
‘ওহো । আমি দুঃখিত মিস কর ।’
‘মিঃ চাকলাদার আমার মনে হয় আমাদের বিষয়ে আরো কিছু তথ্য আপনার জানা দরকার। আমি কি বলবো?’
‘অবশ্যই বলুন।’ আমি বললাম। আসলে মানুষ যত কথা বলবে ততই অজানা তথ্য সামনে এসে যাবে। এটাই গোয়েন্দাগিরির মূল ।
‘আনন্দ আমাদের চেয়ে বয়সে যে অনেকটাই বড় সেটা বুঝতেই পারছেন । প্রায় বাবার মতো ছিল ও আমাদের কাছে। অবিবাহিত, সফল ব্যবসারী । ফলে ভালো পয়সা জমিয়েছিল চিরকালই ও ব্যবসাটা ভালোই বুঝতোযে কারনে অর্থের অভাব কোনোদিন হয়নি ওর। আর আমরা সে ভাগ্য নিয়ে জন্মাইনি । ভালো রোজগারের চেষ্টা করলেও সফল হতে পারিনি। জয়ন্ত একটা জুতোর দোকানে কাজ করে । আর সোমনাথ ওষুধের দোকানে । আর আমি নাইটক্লাবে গান করি । স্বীকার করতে দ্বিধা নেই খুব ভালো নাইট ক্লাব নয় মোটেই সেটা ।’
‘কাজ কাজই । তার কোনও ছোট বড় নেই ।’
‘জানেন আমি গান গাওয়ার সাথে সাথে ওখানে আমি  মিমিক্রিও করি । যদিও সেটা করেও তেমন কিছু লাভ হয়না । ’
‘আনন্দ কিসের ব্যবসা করতেন?’
‘ঠিক কিসের করতো তা বলতে পারবো না। তবে অনেক কিছুই করতো একসাথে। আর এসব নিয়ে মেতে থাকতে গিয়েই সম্ভবত ও আর বিয়ে করেনি। আমাদেরকে ও ভালবাসতো   এটা ঠিক। তবে টাকা পয়সা দিয়ে সেভাবে সাহায্য কোনোদিন করেনি । খুব দরকার পড়লে যে একটু আধটু দিতো না তাও নয়। তবে উপদেশ আর সমালোচনা করতো মন খুলে। এটা বলবো না যে ও আমাদের সাথে বাজে ব্যবহার করতো তবে খুব ভালো ব্যবহার যে করতো তাও নয় । ঠিক কি বলতে চাইছি আশা করি বুঝতে পারছেন।’
‘একদম। কোনো অসুবিধাই হচ্ছে না মিস কর ।’
‘এবার উইলের কথা বলি তাহলে?’
‘উইল মানে?’
‘আমরা সব ভাই বোন মিলে একটা বিশেষ ধরনের ইচ্ছে প্রকাশক উইল বানিয়ে রেখেছি । আমরা একে বলি রেসিপ্রকাল উইল । এর মূল কথা কেউ একজন মারা গেলে তার সম্পত্তি বাকিদের ভেতর সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হবে। পারস্পরিক সমঝোতামূলক চুক্তিপত্র যাকে বলে। আপনি এরকম উইলের কথা শুনেছেন ?
‘হ্যাঁ ।’
‘ওকে। এবার মূল ঘটনায় আসি । গত বছর আনন্দ শেয়ার ফাটকা বাজারে টাকা লাগিয়ে বেশ বড় রকমের একটা দাঁও মারে । এর পরেই ও আমাদের সবাইকে দু সপ্তাহের জন্য কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে । সব খরচ ওর। কোথায় যাবে সেটাও ওই ঠিক করে । খুব পরিচিত একটা পাহাড়ী জায়গা । আমরা কোনোদিন যাইনি ওখানে। রীতিমতো তুষারপাত হয় ওখানে ।
‘গত বছর নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় দু সপ্তাহের জন্য আমারা চারজনে সেখানে যাই । পাহাড়ের গায়ে একটা কাঠের লজে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল ।’ কথাগুলো বলতে বলতে অজানা এক আতঙ্কে কেঁপে উঠেছিলেন মিস কর । কিছুক্ষনের জন্য চুপ করে বসে থাকলেন । তারপর আবার বলতে শুরু করলেন। ‘ঠিক বলতে পারবোনা কি ভাবে এই ভাবনা আমাদের ভেতর এসেছিল। হয়তো সকলেই কম বেশি একই কথা মনে মনে ভাবতাম । বিষাক্ত সেই ভাবনা আমাদের সকলের মনেই থাবা বসিয়েছিল । জয়ন্ত প্রথম বললো কথাটা ।’
‘কি বললো?’
‘বললো, আনন্দকে এ পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে ।’
‘আনন্দ তখন কোথায় ছিলেন?’
‘ওপরে ঘুমাচ্ছিলআমরা তিনভাই বোন নিচে ফায়ার প্লেসের সামনে বসে আগুন পোহাচ্ছিলাম । সাথে সামান্য উত্তেজক পানীয়ও ছিল। সেই পানীয়ও কিছুটা সহায়ক হয়েছিল আমাদের ভাবনা প্রকাশ করার ব্যাপারে। জয়ন্ত কথাটা বলামাত্র আমরা বাকি দুজন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ওকে সায় দিয়েছিলাম। আমি আলাদা করে কাউকে দায়ী করতে চাই না। আমরা তিন জনেই দায়ী সব কিছুর জন্য। আমাদের তিন জনের কাছেই সেভাবে কোনোদিন টাকাকড়ি ছিল না। আর ওই মুহূর্তে একটা বিরাট অঙ্কের টাকা আমাদের সামনে ঝুলে ছিল টোপের মতো । বিরাট অঙ্ক। এতো বড় যে আমাদের সবার সব আশা পূর্ণ হতে দেরি হবে না।’ বলতে বলতেই আবার নিঃসীম এক আতঙ্কে থরথরিয়ে কেঁপে উঠলেন। মিস তনিমা। দুহাতে ঢাকলেন মুখ । 
কিছু সময় বাদে হাত সরিয়ে বললেন, ‘পরের দিন আমার সবাই  মিলে পাহাড়ে চড়লাম । আগের দিনেই এদিকে একবার এসেছিলাম। একটা জায়গা দেখেও গেছি। যেখানে একপাশে বিরাট খাদ নেমে গেছে কয়েক শত ফুট নিচে। ওপর থেকে পড়ে গেলে বাঁচার আশা খুব কম । ওখানে পাথরের গায়ে তুষার পাতের কারনে বরফ জমে ছিল ।
‘আনন্দ সেই খাদের কাছে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে দেখছিল খাদের গভীরতা । নিচ দিয়ে একটা শীর্ণ নদী বয়ে যাচ্ছিল দেখতে পাচ্ছিলাম। সহসা জয়ন্ত এসে দাঁড়ালো আনন্দর পেছনে । মারলো এক ধাক্কা ... আর্ত একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার অনুরনিত হ লো নির্জন চরাচরে । তারপর আর কিছুই শোনা গেল না ।
‘আমারা ফিরে এলাম। পুলিসের কাছে রিপোর্ট করলাম । জানালাম আনন্দ পা পিছলে পড়ে গেছে । পুলিস আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলো । জায়গাটা দেখলো । ব্যাস সব মিটে গেল ।’
‘কি মিটে গেল ?’
‘পুলিস সব দেখে জানিয়েছিল আমাদের কথাই সত্যি পাথরে জমা বরফে পা পিছলে আনন্দ নিচে পড়ে যায় ।’
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। টেবিল থেকে সরে গিয়ে পাইচারি করতে করতে মিস করের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এপাশে গেলাম। ওপাশে গেলাম । তনিমা একটুও নড়লেন না । টেবিলের ওপর হাতের ভর রেখে পাথরের মূর্তির মতো বসে থাকলেন । অগত্যা জানতে চাইলাম, ‘ হুম! বুঝলাম ঝামেলাটা কোথায় । তা এবার যদি দয়া করে বলেন কার ভুত কাকে খুন করেছে?’
একই রকম পাথরের মূর্তির মতো বসে থাকলেন মিস তনিমা কর। শুধু উনার ঠোঁট দুটো নড়লো, ‘আনন্দের ভুত জয়ন্তকে খুন করেছে!’
প্রায় চিৎকার করে বল লাম, ‘মিস কর একটু আগে আপনি বললেন, জয়ন্ত আত্মহত্যা করেছে !’
‘মাফ করবেন মিঃ চাকলাদার আপনার শুনতে ভুল হয়েছে।’
‘মানে?’
‘আমি বলেছিলাম সম্ভবত আত্মহত্যা করেছে জয়ন্ত।’
কি আর করি , গোমড়া মুখে নিজের ভুলটা স্বীকার করলাম । ‘হ্যাঁ আপনি তাই বলেছিলেন। কিন্তু সেটা কি করে বোঝা গেল?’
‘আমি কি তার ব্যাখা নিজের মতো করে দিতে পারি মিঃ চাকলাদার?’
 চেয়ারে গিয়ে বসলাম আবার কিছুক্ষন তনিমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম, ‘‘হ্যাঁ বলুন না কি বলতে চাইছেন?’
‘আমি বড়বাজার নিমতলার কাছে ফড়িং দত্ত লেনের ১৭ বাই ৪ এর একটা একতলা বাড়িতে ভাড়া থাকি ।’
‘বাহ! খুব ভালো ’, কারনহীন ভাবে হেসে আমি ঠিকানাটা প্যাডে লিখে নিলাম।
‘আজ থেকে দুমাস আগে ১৭ই নভেম্বর ।  ঠিক যে তারিখে আনন্দ খুন হয়েছিল দুবছর আগে, সেই তারিখ ।  আনন্দ আমার সাথে দেখা করতে   এসেছিল।’
‘আনন্দ আপনার সাথে দেখা করতে এসেছিল! মিস কর একটু আগে আপনি বললেন আনন্দ খুন হয়েছেন!’
মৃদু স্বরে তনিমা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ বলেছি তো মিঃ চাকলাদার।’
‘আপনারা তাকে খুন করেছিলেন। তাহলে সে কি করে আসতে পারে?’
‘হ্যাঁ পারে।’
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, ‘কখন এসেছিল?’
‘দুপুরবেলায় । আমি বাজারে গিয়েছিলাম কিছু জিনিষপত্র কেনার জন্য । বাড়ি ফিরে এসে দেখি আনন্দ বসে আছে। চেয়ারে। শান্ত ভাবে । অপেক্ষা করছে । আমার জন্য !’
আমি প্যাডে লেখার ভান করতে করতে বললাম, ‘আপনি নিশ্চিত যে ওটা আনন্দই ছিল?’
‘হ্যাঁ আনন্দই ছিল, মানে আনন্দর ভূত!’
‘হ্যাঁ ভুতই তো হতে হবে। যাই হোক তাকে দেখতে কেমন ছিল?’
‘একেবারে সেই রকম যে রকমটা মারা ওকে মরার দিন সকালে দেখেছিলাম। যে পোশাক ছিল পরনে একেবারে সেটাই মোটা খদ্দরের পাঞ্জাবী । সারজের প্যান্ট । গায়ে মোটা চাদর । পায়ে বুট । মাথায় হনুমান টুপি ।
‘উনি আপনার সাথে কথা বললেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘গলার স্বর কেমন ছিল?’
‘সেই গম্ভীর বাজখাঁই স্বর। তবে ওই দিন গলায় মিশে ছিল দুঃখ । হতাশা । তবে রাগ ছিল না।’
‘কি বললেন উনি?’
‘বললো, ফিরে এসেছি । প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য!’ আবার কেঁপে উঠলেন মিস কর। মুখে ফুটে উঠলো সীমাহীন আতঙ্ক । ‘  ঠিকএটাই বলেছি  ও । প্রতিশোধ নিতে ফিরে এসেছে। প্রথমে মারবে জয়ন্তকে... তারপর সোমনাথকে এবং সব শেষে আমাকে !! বলেই উঠে দাঁড়ালো রান্নাঘরের পাশের দরজার কাছে গেল এবং ওটা খুলে বেরিয়ে গেল বাইরে।’
‘আর আপনি?’
‘আমি   ফোন করে দাদাদের ডাকলাম। ওরা এলো । খুলে বললাম সব কিছু । ওরা অবশ্য আমার কথায় বিশ্বাস করেনি । বলেছিল সবই নাকি আমার কল্পনা। আসলে আমি ওই ঘটনার জন্য মানসিক চাপে ভুগছি । আমার ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। আমি কিছুই করতে পারলাম না । পারলাম না জয়ন্তর খুন হওয়া –’
‘আত্মহত্যা মিস কর! সম্ভাব্য আত্মহত্যা ।’
‘আপনি তো জানেননা মিঃ চাকলাদার জয়ন্ত কিভাবে মারা যায়। ওর হাতের কব্জি কাটা ছিল । কিন্তু কি দিয়ে কাটা হয়েছে তা খুঁজে পাওয়া যায়নি ওর আশেপাশে বা ওর বাড়ীতে ।’
আমি আবার একটা সিগারেট ধরালাম। পর পর গোটা কয়েক বড় বড় টান মেরে ওটাকে ঠেসে দিলাম অ্যাস্ট্রের ভেতরে। তারপর জানতে চাইলাম, ‘মিস কর, সে সময় আপনি যখন কিছুই করেন নি তাহলে এতদিন পর কিছু করতে চাইছেন কেন?’
‘কারন গত রাতে আনন্দ আবার এসেছিল আমার বাড়ীতে । সেই একই চেয়ারে বসেছিল । একই পোশাক পড়ে । বললো, জয়ন্তর খেল খতম হয়ে গেছে – এবার সোমনাথের পালা । তারপরেই উঠে আগের দিনের মতো চলে গেল!’
‘আপনি?’
‘আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম । একাই থাকি । তাই নিজে নিজেই জ্ঞান ফিরে আসতেই আমি দ্রুত গিয়েছিলাম সোমনাথের কাছে। রাতের তোয়াক্কা না করেই । আমি যেখানে গান করি তার কাছেই একটা বাড়ীতে থাকে ও । বার বার ডোরবেল বাজিয়ে ওর ঘুম ভাঙ্গাই । সব কিছু বলি । কিন্তু এবারেও ও আমার কথায় পাত্তা দেয়নি । বলে ও নিজেই এবার ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করবে আমার জন্য।  বাড়ী ফিরে আসি এবং  ভাবতে থাকি কি করবো ।    প্রায় হঠাৎ করেই একটা ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাতে গিয়ে আপনাদের বিজ্ঞাপন দেখতে পাই । প্লিজ, মিঃ চাকলাদার ! আপনারা কি আমায় সাহায্য করবেন না ? কিছু অন্তত করুন ।’
‘ঠিক আছে দেখছি কি করা যায় ।’ বললাম মিস করকে । তারপর আর কিছু প্রশ্ন করে দরকারি ঠিকানা আর ফোন নম্বর জেনে নিলাম উনার কাছ থেকে। একই সাথে আমার ভিজিটিং কার্ডে নিজের বাড়ীর ফোন নম্বর লিখে দিলাম উনাকে। বললাম, ‘এখানকার ফোন নম্বরতো ওই ম্যাগাজিনেই পেয়ে যাবেন। এটা আমার বাড়ীর নম্বর । দরকার পড়লেই ফোন করবেন ।’
কৃতজ্ঞতার একটা হাসি হেসে উনি ধন্যবাদ জানাতেই বললাম, ‘চলুন যাওয়া যাক।’
‘কোথায়?’
‘আপনার বাড়ীতে । অসুবিধা নেই আশা করি।’
‘না না অসুবিধা কিসের । আপনারা কি সব সময়েই এতো দ্রুত কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন?’
‘তা বলতে পারেন। এটাই আমাদের কাজের ধরন ।’
*****
একতলা বাড়িটায় একটা শোবার ঘর । একটা ছোট্ট বৈঠকখানা, রান্নাঘর এবং বাথরুম । পেছন দিকে খানিকটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা উঠোনের মতো আছে । রান্নাঘরের গায়ের দরজা খুলে ওখানে যাওয়া যায় । জানলা গুলোয় মোটা শিক লাগানো । না ভেঙে ওই সব জায়গা দিয়ে কারোর আসার উপায় নেই।  পেছনের ফুট ছয়েক উচ্চতার পাঁচিল ঘেরা জায়গাটায় যেতে যে দরজাটা সেটার ছিটকিনির অবস্থা মোটেই ভালো নয় । ওপাশ থেকে জোরে ঠেলতেই খুলে গেল । সেটা দেখে মিস কর বললেন, ‘ছিটকিনিটা কমজোরি আছে । তাই এদিক দিয়ে হুড়কো লাগানোর ব্যবস্থা করে নিয়েছি ।
বললাম, ‘ভালোই করেছেন । একটু মনে করে দেখুন তো গতকাল রাতে বা আগের দিন যেদিন আনন্দ এসেছিলেন বলে আপনি জানাচ্ছেন ওই হুড়কো লাগানো ছিল কিনা ? এখন তো দেখছি লাগানো নেই ।’
একটু থমকে গেলেন যেন মিস কর তারপর সুরেলা স্বরে জবাব দিলেন, ‘আসলে খুব বেশিদিন ওটা লাগাইনি। তাই মাঝে মাঝে ভুলে যাই ।‘
‘হুম। বুঝলাম। দেখুন, আমি জানিনা কে আপনার সাথে দেখা করতে এসেছিল । ভুত না অন্যকিছু । কিন্তু একটু সুস্থ সবল মানুষের পক্ষে ওই দেওয়াল টপকে দরজা ঠেলে ভেতরে চলে আসা বা বেরিয়ে যাওয়াটা খুব একটা কঠিন কিছু নয়।’
কোনো কথা না বলে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন মিস কর।
বললাম, ‘একটা ফোন করতে পারি?’
মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই । অফিসে ফোন করে আমার সহকারী গুপ্তকে বললাম , বড় বাজার নিমতলার কাছে ফড়িং দত্ত লেনের ১৭ বাই ৪ এ একবার আসতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভবআসার পথে দুটো ভালো ছিটকিনি আর তোমার যন্ত্রপাতির ঝোলাটা নিয়ে এসো ।
আধ ঘন্টার ভেতরেই গুপ্ত এসে হাজির হলো । আর আধ ঘণ্টার মধ্যেই ওই দরজা এবং বাড়ীতে ঢোকার দরজায় ছিটকিনি দুটো লাগানো হয়ে গেল।
কাজ সেরে ও বিদায় নিতেই বললাম , ‘এবার থেকে একটু সাবধানে থাকবেন। আর ছিটকিনি লাগাতে ভুলবেন না। আমার অনুমান ভুল না হলে আর আনন্দর ভুত এ বাড়ীতে আসবে না।’
‘অবশ্যই লাগাবো মিঃ চাকলাদারবলছিলাম কি, অসুবিধা না থাকলে আজ রাতে আসুন না আমার নাইট ক্লাবে । খুব খারাপ লাগবে না বোধ হয় ।’
‘চেষ্টা করবো । কটায় শুরু আপনার শো ?’
‘রাত সাড়ে ন’টায় ।’

*****
সোমনাথের দোকানের ঠিকানা জেনে নিয়েছিলাম আগেই। গেলাম সেখানে এখনো যে এরকম ওষূধের দোকান এ শহরে আছে জানা ছিল না আমার । হাতে বানানো আয়ুর্বেদিক ঔষধ । ঝাঁঝালো গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিলো দোকানটার কাছে যেতেই । খুব ভালো যে চলে না সেটা দোকানের দশা দেখেই বুঝতে পারছিলাম । ছোট খাটো দৈহিক গড়নের সোমনাথ দোকানে একাই ছিল । আমাকে প্রথমে ক্রেতা ভেবেছিল তারোপর আসার উদ্দেশ্য জেনে বললো , ‘ ভেতরে আসুন। বসে কথা বলা যাক ।’
ভেতরে হাতলবিহীন কাঠের চেয়ারে বসলাম। জানতে চাইলেন, আমি চা খাবো কিনা । ইচ্ছে থাকলেও এই গন্ধের ভেতর চা খাওয়া সম্ভব নয় । সেটা জানিয়ে  সিগারেটের প্যাকেট বার করে সোমনাথের দিকে এগিয়ে ধরে বললাম, ‘অসুবিধা নেই তো?’ হাত বাড়িয়ে সিগারেট তুলে নেওয়াতেই বুঝে গেলাম উত্তর কি ।
পকেট থেকে লাইটার বার করে উনারটা জ্বালিয়ে দিয়ে নিজেরটা ধরালাম । তারপর আসতে আসতে যা যা হয়েছে সেগুলো বললাম। মিস কর যে আমাকে  এই কাজের জন্য পাঁচশো টাকা ফি দিয়েছেন সেটাও জানিয়ে দিলাম ।
নিজের সিগারেত শেষ করে পকেট থেকে বিড়ি বার করে ধরালেন সোমনাথ । বার দুয়েক টান মেরে বললেন, ‘আশা করছি আপনি কিছুটা হলেও ধারনা করতে পারছেন ওকে নিয়ে কি পরিমাণ দুশ্চিন্তায় আছ আমি !’
কিছু না বলে সামান্য মাথা নাড়লাম আমি।
‘ও যে অসুস্থ সেটা বোধহয় আপনি ধরতে পেরেছেন।’
আমি আবার একটু মাথা নাড়িয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, ‘মিঃ কর বেড়াতে গিয়ে ঠিক কি হয়েছিল আপনি কি বলবেন?’
‘বড়দার সাথে কি হয়েছিল সেটা জানতে চাইছেন তো?’
আমি এবারেও কথা না বলে শুধু মাথা ঝোঁকালাম।
‘দুর্ঘটনাটা যখন ঘটে তখন আমরা বড়দার আশে পাশে ছিলামই না। সকালে ঘুম থেকে উঠে ও একা একাই ওই খাদের এলাকায় বেড়াতে যায়। আমরা কটেজেই ছিলাম। বড়দার মৃগী রোগ ছিল । সম্ভবত সেটার কারনেই ও খাদে পড়ে যায়। কটেজ থেকে হাত পঞ্চাশেক দূরে ছিল খাদটা। আমরা পড়ে যাওয়ার পরে ওর আর্ত চিৎকারের প্রতিধ্বনি শুনতে পেয়ে বাইরে বেড়িয়ে আসি । ততক্ষণে অবশ্য ...’ খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর সোমনাথ পুনরায় বলতে শুরু করলেন, ‘ জয়ন্ত সঙ্গে সঙ্গে চলে যায় পুলিসের কাছে ব্যাপারটা জানানোর জন্য। পুলিস এসে তল্লাসি শুরু করে । খাদের গায়ে পাথরে আটকে থাকা বড়দার চাদরটা দেখতে পেয়ে বুঝতে অসুবিধা হয়নি কি হয়েছে ।’
‘শরীরটা পাওয়া গিয়েছিল?’
‘না । ওই দুর্গম খাদে নেমে শরীর তুলে আনার সরঞ্জাম পুলিসের কাছে ছিল না ।’
‘মিঃ কর আপনি কোন আন্দাজ করতে পারেন আপনার বোন এরকম একটা আজগুবী গল্প কেন বলছে?’
‘নার্ভাস ব্রেকডাউন ছাড়া আর কোন উত্তর আমার কাছে নেই।’
‘কিন্তু তারতো একটা কারন থাকবে? এমন কিছু যা ওর এই নার্ভাস ব্রেক ডাউনের কারন?’
‘আমাদের বিশেষ ধরনের উইলের কথা নিশ্চয় তনু আপনাকে বলেছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘পুলিসী ঝামেলা মিটে যাওয়ার পর আনন্দর আইনজীবী আমাদের তিন ভাইবোনকে একটি করে ১ লাখ  ৫৭হাজার   টাকার   চেক দেন । উনার কথানুযায়ী আনন্দর যাবতীয় ধার বাকি মিটানোর পর এই টাকাই আমাদের প্রাপ্য হয়েছে। আমি আর জয়ন্ত সেটাকা ব্যাঙ্কে জমা করে দিলেও আজ অবধি একটা টাকাও খরচা করিনি  । কি রকম একটা অস্বস্তি অনুভব করেছি। যে কারনে আজ ও আমি এই কাজ করেই দিন চালাচ্ছি । কিন্তু তনু তা করেনি । টাকা পেয়েই ও কাজ ছেড়ে দেয় । শুরু করে বিলাস বহুল জীবন যাপন । একা একাই দেশ দেশান্তরে ঘুরে বেড়াতে শুরু করে । নিট ফল টাকা শেষ । আবার আগে অবস্থায় ফিরে আসে । বাধ্য হয় ওই নাইটক্লাবে গান করতে । সম্ভবত এটাই ওর নার্ভাস ব্রেক ডাউনের কারন। সেখান থেকেই কোনও ভাবে ওর মনে বড়দাকে আমরা খুন করেছি এই ভাবনা ঢোকে । সাথেই ভূতের গল্পটাও বানায় ।’
‘তা নয় বুঝলাম কিন্তু জয়ন্তবাবুর ব্যাপারটা কি? ওর আত্মহত্যা? ’
‘বলার মতো তেমন কিছু আছে বলে তো আমার মনে হয় না। জয় সাধাসিধে মানুষ ছিল । আত্মহত্যা করার আগে ও জানতে পারে ওর দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। আমি বলেছিলাম বড়দার সুত্রে পাওয়া টাকা দিয়ে চিকিৎসা করাতে। কিন্তু করেনি । মাঝে মাঝেই অসহ্য যন্ত্রনা নিয়ে হাসপাতালে  ভর্তি  হয়েছে । হয়তো সেদিন আর সহ্য করতে প্পারেনি ...’ দুহাতে মুখ চেপে বসে থাকলেন সোমনাথ ।
 ‘হ্যাঁ শুনেছি উনার   কব্জি  কাটা ছিল। কিন্তু কি দিয়ে কেটেছিলেন সেটার হদিশ পাওয়া যায় নি!’
মুখ থেকে হাত সরিয়ে বিষণ্ণ হাসি হাসলেন সোমনাথ । ‘আপনি কি জানেন ওর বডির কাছেই একটা দাড়ি কামানোর রেজর পাওয়া গিয়েছিল খোলা অবস্থায় । ব্লেড ছাড়াই ।’
‘তাতে কি প্রমানিত হয়?’
‘ জয়ের আত্মহত্যা করেছিল বাথরুমে । শরীরটা পড়ে ছিল বাথরুম প্যানের কাছে । পুলিসের ভাবনা অনুসারে ওই রেজর থেকে ব্লেড খুলে নিয়ে জয় হাতের কব্জি কাটে । তারপর ওর হাত থেকে ব্লেড পড়ে যায় প্যানের ভেতরে । রক্ত ধোয়ার সময় সে ব্লেড চেম্বারে চলে যায় ।’
আমি উঠে দাঁড়ালামঅনেক ধন্যবাদ সোমনাথ বাবু ।’
একটু ইতস্তত ভাব নিয়ে সোমনাথ বলেন, ‘মিঃ চাকলাদার!’
‘বলুন।’
‘অসুবিধা না হলে আপনি ওই পাঁচশো টাকা তনুকে ফিরিয়ে দেবেন প্লিজ?’
‘কেন?’
‘ওর একজন গোয়েন্দা নয় । ডাক্তারের দরকার । আমি নিজেই কয়েক জনের সাথে কথা বলেছি এ নিয়ে। ও নিজে না গেলে আমি ওকে জোর করে নিয়ে যাবো ।’
বুঝতে পারলাম বোনের প্রতি দাদার স্নেহের দিকটাকে । প্রফেশন্যাল হলেও আমিও তো মানুষ । বললাম, ‘ওকে, তাই হবে মিঃ কর। আপনার কথার অর্থ আমি বুঝতে পারছি ।’
‘দুহাতে আমার হাত দুটো চেপে ধরে সোমনাথ বলে উঠলেন, ‘অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে মিঃ চাকলাদার ।’
‘এই মুহূর্তে টাকাটা আমার কাছে নেই । আর আমি ওটা মিস করকে ফেরত দিতেও পারবো না । তাতে উনার মনে অন্য রকম ছাপ পড়বে।   আজ রাতেই আপনাকে টাকাটা ফেরত দিয়ে আসবো । আপনার বাড়ীতে । ঠিকানা মিস কর আমাকে বলে দিয়েছেন । আপনি তো নিচের তলার সামনের ঘরেই থাকেন?’  
 ‘ হ্যাঁ । ঢোকার দরজাও রাস্তার ওপরেই ।   বলছিলাম যে, আমার তো ফিরতে রাত হয়। ১০টা বেজে যায় । ও হ্যাঁ আর একটা কথা । আপনি আমাকে চারশো টাকা ফেরত দিলেই হবে   । বাকিটা আপনার একদিনের খাটা খাটনির পারিশ্রমিক আমাদের তরফ থেকে ।
‘ অসুবিধা নেই আমি তার পরেই যাবো
*****
পকেটে চারশো টাকা নিয়ে ঢুকলাম মায়বিনী রাত নাইট ক্লাবে । ঘড়িতে তখন ৯টা বেজে ২৫ মিনিট । দেওয়ালের দিকের একটা টেবিল বেছে নিয়ে বসলাম। ওয়েটার কে আমার প্রিয় পানীয় দিতে বললাম এক পেগ সাথে ফিস বল ।
ঠিক সাড়ে ন’টাতেই মঞ্চে এলেন মিস তনিমা কর। পরের দেড় ঘণ্টা আর দুপেগ পানীয় নিয়ে ভালোই কেটে গেল। গানের গলাটা সত্যিই ভালো । সাথে প্রশংসা করার মতো মিমিক্রি করেন মহিলা। এর মাঝে আধঘণ্টার একটা বিরতি ছিল । ম্যাজিক দেখালেন একজন । শো শেষ হওয়ার আগেই উঠে পড়লাম । চললাম সোম নাথের বাড়ীর উদ্দেশ্যে ।
দোতলা বাড়ীটা ।   দরজার পাশে বেল লাগানো । টিপলাম । ডিং ডং শব্দ ভেসে এলো ভেতর থেকে। সেকেন্ড কুড়ি হয়ে গেল । আবার টিপলাম । আবার ভেসে এলো একই শব্দ। আরো তিরিশ সেকেন্ড অপেক্ষা করে দরজায় টোকা দিতে যেতেই বুঝতে পারলাম দরজাটা খোলা । ভেতরটা অন্ধকার । পকেট থেকে পেন্সিল টর্চ বার করে জ্বালালামবাঁপাশেই দেখতে পেলাম সুইচ বোর্ড । পর পর দুটো স্যুইচ অন করলাম টর্চের পেছনটা দিয়ে । আলো জ্বলতেই দেখতে পেলাম সামনের চেয়ারে হেলান দিয়ে উল্টোদিকের ফাঁকা চেয়ারটার দিকেই তাকিয়ে বসে আছেন সোমনাথ । সামনে ফাঁকা গ্লাস, একটু পানীয় তখন অবশিষ্ট আছে সেখানে । পড়ে আছে বিড়ির প্যাকেটটাও দেশলাই সমেত । কাছে গিয়েই বুঝলাম সে দেহে প্রান নেই ।
দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে প্রায় দৌড়ে  পৌছালাম রাস্তার মোড়টায় । দুটো রিক্সা দাঁড়িয়ে ছিল । একটাতে চেপে জলদি থানায় যাওয়ার নির্দেশ দিলাম ।  চলতি গোয়েন্দা গল্প পড়ে পড়ে মানুষের ধারনা হয়েছে প্রাইভেট ডিটেকটিভদের সাথে পুলিসের সম্পর্ক ভালো থাকে না। আমাদের বস অবশ্য এদিক থেকে করিতকর্মা মানুষ । ভালো সম্পর্ক বানিয়ে রেখেছেন থানার সাথে । ফলে কিছুক্ষনের ভেতরেই অল্পবয়েসী অফিসার ইন চার্জ সৌরভ দুজন কনস্টেবলকে নিয়ে রওনা দিলেন আমার সাথে ।
সৌরভের সাথে আমার আগে থেকেই পরিচয় থাকায় যাওয়ার পথেই ওকে মোটামুটি কি দেখেছি জানালাম । কি করে দেখলাম তার উত্তরে ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলা, ‘তুমি , ভুতে বিশ্বাস করো?’
‘দরকার পড়লে করি বৈকি । কেন? তুমি কি আমাকে ভূতের গল্প শোনাবে নাকি প্রবাহদা?’
‘তা বলতে পারো ।’ শুরু থেকে সব কথা জানালাম ওকে।
‘আইব্বাস ! তাহলে তো সময় নষ্ট না করে আগে মিস তনিমা করের সাথে দেখা করা দরকার মনে হচ্ছে । দাস, রায় তোমরা পাহারায় থাকো । আমি যাওয়ার পথে লোক পাঠিয়ে দিচ্ছি ।’
‘কোথায় যেতে চাইছো তুমি?’
‘নাইটক্লাব। যেটুকু খবর আছে তাতে প্রায় দেড়টা দুটো পর্যন্ত শো চলে ।’
*****
পাওয়া গেল মিস তনিমা করকে । সৌরভ নিজের পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলো শো শুরু হওয়ার পর থেকে উনি এখান থেকে একবারও বেরিয়েছিলেন কিনা? সরাসরি না বলে দিলেন মিস কর । নাইটক্লাবের সাথে যুক্ত কর্মচারী বা অন্য পারফরমারদের জিজ্ঞেস করে কিছুই জানা গেল না। কারন যে যার নিজের কাজে ব্যস্ত ছিল । তবে এটা প্রমান হলো তনিমা কর তার শোর এর নির্দিষ্ট বিরতিগুলোর সময় পার করে কাঁটায় কাঁটায় যখন মঞ্চে প্রবেশ করা দরকার তখন  করেছেন ।   
আমি জানতে চাইলাম, ‘সৌরভ, তুমি কি মিস করকেই সন্দেহ করছো?’
‘তা ছাড়া আর উপায় কি বলুন।  আপনি দেখেছেন কিনা জানিনা মিস করের ড্রেসিং রুম থেকে বেরিয়ে একটা করিডোর আছে । সেটা ধরে ১০-১২ পা হাঁটলেই একটা দরজা আছে পেছনের রাস্তায় বের হওয়ার । ওই রাস্তা থেকে মিঃ সোমনাথের বাড়ী যেতে মিনিট দশেক লাগে ।’
‘হুম, বুঝলাম। তা এখন কি করবে ?’
‘ আপাতত কিছু না ,’ বলেই মিস করের দিকে ঘুরে বললো। ‘ আপনার শো তো   শেষ   মিস কর?’
‘না আর একটা পারফরম্যান্স বাকি আছে ।’
‘ওকে । ওটা শেষ করে সোজা বাড়ী চলে যাবেন । ওখানেই থাকবেন। কোথাও পালানোর চেষ্টা করবেন না।’
‘পালাবো! কেন?’
‘সেটা আপনিই ভালো জানেন।’ সৌরভ কেটে কেটে উত্তর দিলো । ‘চলুন প্রবাহ দা । আপাতত আমাদের এখানে আর কোন কাজ নেই
থানায় ফিরে আসার পর সৌরভ বললো, ‘প্রবাহ দা আমি নিশ্চিত ওই মহিলাই সব কিছু করছেন। যদিও প্রমান নেই কিছুই । আমি উনার ওপর নজর রাখার ব্যবস্থা করছি। ’
‘হ্যাঁ সেটা তো করতেই হবে। খুনী যদি অন্য কেউ হয়। সে ভুতই হোক বা মানুষ এবার তো তার টার্গেট মিস কর স্বয়ং।’
‘কিন্তু তুমি মিস করকে সন্দেহ করছো কেন?’
‘আপনার মতো গোয়েন্দার কাছে এ প্রশ্ন আশা করিনি। পারস্পরিক সমঝোতামূলক চুক্তিপত্রর কথাটা কি ভুলে গেলেন?’
‘না ।’
‘বড় ভাই মারা যেতে সেই উইল অনুসারে সম্পত্তি ভাগ হয়েছিল বাকি তিন ভাইবোন এর ভেতর । এবার এক এক করে দুই ভাই মারা গেলো । লাভটা কার? এ তো সিম্পল ইক্যূয়েশন প্রবাহদা?’
 রাত জাগার ছাপ পড়েছিল আমার মুখে চোখে । সম্ভবত সেটা দেখেই সৌরভ বললো, ‘আপনি বাড়ি যান দাদা। বাকিটা আমি সামলে নিচ্ছি । ’
০০০০০
বাড়ি যখন এলাম তখন ঘড়ির কাঁটা তিনটের ঘর পেরিয়ে গেছে ।
মুখ হাত ধুয়ে এক গ্লাস জল খেয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে সবে বিছানায় যাওয়ার উদ্যোগ করছি ফোন বেজে উঠলো । উঠে গিয়ে রিসিভার তুলে কানে ঠেকালাম । ওপ্রান্তে মিস কর ।
‘মিঃ চাকলাদার! সম্ভব হলে এক্ষুনি আমার বাড়ীতে আসুন। প্লিজ!’ উচ্চারনে এমন একটা আতঙ্কের ছোঁয়া মিশে ছিল যে আমার গায়ের রোম খাড়া হয়ে গিয়েছিল ।
‘কি ব্যাপার ? কি হয়েছে মিস কর?’ জানতে চাইলাম।
‘সে ফোন করেছিল?’
‘কে?’
‘আনন্দ!’
‘কখন?’
‘এইতো, একটু আগেই। বললো সে আসছে... আমার জন্য।’ কথা কেঁপে গেল মিস করের ।
‘মিস কর!’ কোনো সাড়া পেলাম না । ‘মিস কর!’
ক্ষীনস্বর ভেসে এলো, ‘বলুন...’
‘আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘আপনি দরজার ছিটকিনি ভালো করে লাগিয়ে দিন।’
‘দিয়েছি। আপনাকে ফোন করার আগেই।’
‘একমাত্র আমার ডাক ছাড়া কা্রো ডাকে সাড়াও দেবেন না দরজাও খুলবেন না । আপনি আমার গলা চিনতে পারবেন আশা করি?’
‘হ্যাঁ মিঃ চাকলাদার।’
‘ওকে । আপনি অপেক্ষা করুন আমি যাচ্ছি ।’
ফোনের রিসিভার নামিয়ে আবার উঠালাম । সৌরভকে ফোন করলাম । সবকিছু বলে পর্যাপ্ত পুলিস নিয়ে মিস করের বাড়ীর কাছে যেতে বলে আমিও রওনা দিলাম ।
০০০০০
খুব দ্রুতই ওখানে পৌছে গেছে সৌরভ । সাথে চারজন   সশস্ত্র পুলিস । আরো তিনজনকে পাঠিয়ে দিয়েছে পেছনের পাঁচিলের দিকে ।
সদর দরজার কাছে গিয়ে বেল বাজালাম ।
ভেসে এলো গম্ভীর পুরুষ কণ্ঠ । ‘কে? কাকে চাই?’
‘আমি প্রবাহ চাকলাদার । মিস করের সাথে একটু কথা বলতে চাই।’
‘সে এখানে নেই।’
‘  আপনি যেই হোন । জানিনা কেন মিথ্যে কথা বলছেন।’
‘তনি আপনাদের সাথে কথা বলতে চায় না ।’
‘আপনি কে বলুন তো?’
‘সেটা জেনে আপনার কি দরকার?’ তার পরেই ভেসে এলো বাজখাঁই চিৎকার, ‘যান, চলে যান এখান থেকে।‘
‘সরি মিস্টার । সেটা করতে পারছি না।’ বলেই দরজায় ঘা মেরে বললাম । ‘দরজা খুলুন!’
রাগে চিড়বিড়িয়ে উঠে সেই অদৃশ্য কণ্ঠ বলে উঠলো, ‘ওই ভাগ এখান থেকে ! সরে যা দরজার ওদিক থেকে। আমার হাতে বন্দুক আছে। চালিয়ে দেবো ।’
এবার সৌরভ বলে উঠলো, ‘দরজাটা ভালোয় ভালোয় খুলে দিন । এ বাড়ী পুলিস ঘিরে ফেলেছে । আপনার পালানোর পথ বন্ধ ।’
আবার গর্জে উঠলো কণ্ঠ, ‘ওসব পুলিস ফুলিসের ভয় দেখাবেন না। আমি শেষ বারের মতো বলছি দরজার কাছ থেকে সরে যান না হলে গুলি চালাবো।’
সমান তেজে সৌরভ বলে ঊঠলো, ‘ আমিও আপনাকে একটা সু্যোগ দিচ্ছি মিস্টার। তিন গুনতে গুনতে দরজা খুলুন না হলে আমরাই গুলি চালাবো ।’
আমি ডাক দিলাম, ‘মিস কর! মিস কর!’
ভেসে এলো সেই হাড় হিম করা শীতল কন্ঠ । ‘কাকে ডাকছেন সে আর বেঁচে নেই?’
সৌরভ চিৎকার করে বললো, ‘এ্যা আ আ আক!’
কোনো আওয়াজ নেই দরজা খোলার ।
‘দুইইইই!’
ভেসে এলো জান্তব হাসির শব্দ।
‘তিইইইন!’
বেড়ে গেলো সে হাসির মাত্রা।
সৌরভ ইশারা করলো এক জন পুলিসকে দরজার দিকে আঙুল তুলে ।  কাঁধে ঝোলা কারবাইন তাক করলো পুলিসটা  । 
‘শেষবারের মতো বলছি দরজা খোলো !’ সৌরভ হাঁক পাড়লো ।
উত্তর এলো না  কোনো । আঙুল টা আর এক বার নড়ে উঠলো সৌরভের । এক ঝাঁক বুলেট ছূটে গেল দরজার ভেদ করে । কানে তালা লেগে গেল তার শব্দে। সেকেন্ডের ভেতরে ওদিক থেকে ভেসে এলো এক মরনান্তিক চিৎকার । তার পরেই ধপ করে একটা শব্দ । সেকেন্ড পাঁচেক অপেক্ষা করে সৌরভ আবার হাত তুলে ইশারা করলো । তিন জন পুলিস এক সাথে ছুটে গিয়ে কাঁধ দিয়ে মারলো সজোরে ধাক্কা । একবারে কিছু হলোনা । মজবুত ছিটকিনি আর হুড়কো সামলে নিলো সে আঘাত। কিন্তু বার পাঁচেক ওই ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা ছিলনা ওদের ।
দরজা খুলে যেতেই দেখতে পেলাম মেঝেতে পড়ে আছেন মিস কর । রক্তের ধারা বয়ে যাচ্ছে ঘরের ড্রেন অভিমুখে । কাছে গিয়ে পরীক্ষা করতেই বোঝা গেল যে আঘাত ওর এই অবস্থা করেছে সেটার কারন কারবাইনের বুলেট!
ঘরে আর কেঊ ছিল না। পেছনের উঠোনে যাওয়ার রাস্তা যেমনকার তেমনি বন্ধ । বন্ধ ছিল জানলাগুলোও ।  
অবাক হয়েছিলাম আমারা সবাই । সৌরভের চোখেমুখে অবিশ্বাস, আতঙ্ক, প্রশ্নর ছাপ পড়েছিল স্পষ্ট । বাকি পুলিসরাও থ মেরে গিয়েছিল ঘটনার প্রেক্ষিতে। কথা না বললেও সবার মনেই যে প্রশ্নের ঝড় উঠেছিল তা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না ।
‘প্রবাহদা কি হলো বলুন তো?’
বার কয়েক ঢোঁক গিলে‘ বললাম, ‘আমি ভুতে বিশ্বাস করি না সৌরভ। কিন্তু...’
০০০০০
‘ভুতে আমি আজ ও বিশ্বাস করিনা । কারন সেই সম্ভাবনার প্রতিই আমার মন সায় দিতে নারাজ। আমি খুঁজেছি এর অন্য রকম যুক্তি গ্রাহ্য উত্তর । মিস তনিমা করের ক্ষেত্রেও জোড়াতালি দিয়ে সে রকম একটা উত্তর আমি খাড়া করেছিলাম। পরে সৌরভকে বলেও ছিলাম।’
‘কি যুক্তি প্রবাহদা?’ জানতে চাইলাম আমি।
‘গিলটি কন্সাসনেস । প্রচুর পরিমাণ অর্থ হাতে পেয়ে তাকে টিকিয়ে রাখতে না পেরে মিস করের অবচেতন মন জন্ম দিয়েছিল আনন্দের প্রেতাত্মার । আর অর্থের লোভে এক এক করে খুন করে ছিল নিজের ভাইদের । হয়তো সে সময় তার অবচেতন মন তাকে ভাবতে সাহায্য করেছিল যে সে তনিমা নয় । আর তনিমার মনটা জ্বলে পূড়ে খাক হয়ে যাচ্ছিলো অনুশোচনায়। তার থেকেই জন্ম নেয় নিজেকে শাস্তি দেওয়ার ভাবনা । সবটাই ডুয়াল পারসোনালিটির খেল । আবার নাও হতে পারে। এ বিপুলা জগতের কটা রহস্যই বা আমরা বুঝতে পারি ।’

সমাপ্ত

Friday, April 20, 2018

বিশ্ব জোড়া বিশ্ব সৃষ্টির ১০টি “মিথ” কথন - প্রতিম দাস

বিশ্ব জোড়া বিশ্ব সৃষ্টির ১০টি “মিথ” কথন
প্রতিম দাস
**********
এ ধরাধামে আছে শত শত দেশ । সেখানে বাস করে নানান জাতি উপজাতি ।আমরা সকলেই মানুষ নামক একটি জাতি । অথচ প্রায় সক লে্র ই   আছে নিজ নিজ গল্প কথা বা মিথ এই জগতের সৃষ্টি বিষয়ে । তার কোনটা অতি ক্ষুদ্র আবার কোনটা বেশ বড় । কোথাও আকারে ইঙ্গিতে বোঝানো হয়েছে বিশেষ তত্ব আবার কোথাও বিস্তারিত ভাবে । পড়ে মনে হয় গল্প গুলো যেন বাস্তব নয় । যেন স্বপ্নকথন ।
প্রথম গল্প
আছোমাউই [ACHOMAWI]
উত্তর ক্যালিফোরনিয়ার এক শান্তিপ্রিয় উপজাতি এরা । এদেরকে কো’ম্ম ইদাম বা তুষারের মানুষ নামেও ডাকা হয়ে থাকে। শিকার, মাছ ধরা এবং নানান ঔষধি গাছ গাছড়া উৎপাদন এদের জীবিকা। মধ্য ১৯ শতকে কুখ্যাত গোল্ড রাস ভায়োলেন্স এর  দুর্ভাগ্যজনক শিকার হয়েছিল এই উপজাতির মানুষেরা। আছোমাউই রা তাদের বিশ্ব সৃষ্টি লোক গ্লপে দুটো প্রানীর উল্লেখ করে । প্রথম এক রুপালী শিয়াল এবং দ্বিতীয় চিরন্তন ধোঁকাবাজির প্রতীক, কয়োটি [বুনো কুকুর] ।
সেই আদি সময়ে কেবল মাত্র জল আর পরিষ্কার আকাশ ছিল ।সহসাই এক মেঘের আবির্ভাব হল আর সেটা বদলে গেল কয়োটিতে  আর জলের অপর যে কুয়াশা জমে ছিল সেটা রুপ নিলো রুপালী শেয়ালের। দুজনেই কোনো অজানা এক কারনে একটি নৌকার মতো কিছুর চিন্তা করলো একসাথে আর একটা নৌকার আবির্ভাব হল সাথে সাথেই। অনেক অনেক দিন ধরে রুপালী শেয়াল আর কয়োটি ওই নৌকায় ভেসে রইলো । কিন্তু কাঁহাতক আর ভালো লাগে এই একঘেয়েমি । তাই একটা অন্য কিছু করার জন্য রুপালী শেয়াল ঘুম পাড়িয়ে দিলোকয়োটিকে । তারপর ওর গায়ের লোমে আঁচড় কেটে কিছু লোম ছাড়িয়ে নিয়ে একটা মাদুরের মতো জিনিষ বানালো । তারপার সেটাকে বিছিয়ে দিলো জলের ওপর । তার পর মনে মনে কল্পনা করলো গাছপালা, পাথর, লতা গুল্ম, ঘাস এবং ফলের । সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো সৃষ্টি হলো । এবার শেয়াল জাগিয়ে দিলো কয়োটিকে ।সে জেগে উঠে সব কিছু দেখে শুনে অবাক হয়ে গেল।  খিদেও পেয়েছিল খুব । শুরু করে দিলো খেতে । আপাতত ওই স্থানেই ওরা থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নিলো । রুপালী শেয়াল বানালো জগতের প্রথম ঘর।
***
###জল থেকে এ জগত জন্ম নেওয়ার গল্প এই ক্ষুদ্র কাহিনীতে বিবৃত হয়েছে । রুপালী শেয়াল আর কয়োটি আসলে আমাদের জীবনে অবস্থা্নকারী দু ধরনের চরিত্রের প্রতিনিধি । প্রথম দলে থাকে বুদ্ধিমান এবং ইতিবাচক সত্তারা। আসলে এটা মানবতার প্রতীকআর দ্বিতীয় দলে যারা কিছু না করে অলস জীবনযাপন করে এবং ভোগের জন্য বাঁচে । মজা এটাই যে সবকিছুতেই ভারসাম্য দরকার সেটাও জানানো হয়েছে সুকৌশলেশুধু এক ধরনের দিয়ে কিছু সৃষ্টি হয় না। বৈপরীত্য বা বৈষম্যও দরকার । ###
দ্বিতীয় গল্প
ACOMA[AA’KU]
বর্তমান দিনে নিউ মেক্সিকো এলাকার পুয়েব্লো সংস্কৃতির মানুষ এই আকোমা[আ’কু] নেটিভ আমেরিকান উপজাতি । ৬০০ ফুট উঁচূ এক টেবিল টপ পাহাড়ের ওপর এদের পবিত্র গ্রামের অবস্থান। ওরা যাকে বলে “আকাশ নগরী” । ওদের মতে আজ যেখানে আমেরিকার অবস্থান সেটাই ছিল এই জগতের সবচেয়ে প্রাচীন গ্রাম । ১৬  শতকে স্পেনীয়দের হাতে ওদের স্বাধীনতা খর্ব হয় । শুরু হয় নতুন ধর্ম পালন । তবু নিজেদের প্রাচীন বিশ্বাস ও আচার প্রথা পালন বন্ধ করেনি ওরা ।  ওদের ভাষার নাম কেরেস । সেই কেরেস ভাষায় প্রচলিত বিশ্ব সৃষ্টি কাহিনীটি নিচে দেওয়া হলো ।
আদিকালে মাটির নিচের অজানা অন্ধকারে দুই বোনের আত্মার জন্ম হয়েছিল । যেহেতু ওরা অন্ধকারেই বড় হয়েছি তাই একে অপরকে ওরা বুঝতে পারতো কেবলমাত্র স্পর্শ দিয়ে। কিছু সময় ধরে ওদের খাওয়ানোর দায়িত্বে ছিলেন সিচতিনাকো [যে মহিলা ভাবতে পারে] নামের এক আত্মা। উনিই ওদের কথা বলতে শিখিয়েছিলেন । সেই আত্মার যখন মনে হলো বোনেরা বড় হয়ে গেছে তখন উনি   একটা ঝুড়িতে করে সমস্ত রকম গাছের বীজ ওদের দিলেন । সাথেই দিলেন আগামী দিনের সব রকম জীব জন্তুর মূর্তি । জানালেন এই ঝুড়ি ওদের বাবার দেওয়া। ওটাকে মাটির ওপরের জগতে আলোয় নিয়ে যেতে হবে । এরপর উনি বোনেদের সাহায্য করলেন  চারটে বীজ খুঁজে নিতে বোনেরা সেই বীজগুলোকে অন্ধকারেই রোপ করলো । অনেক অনেক সময় পার করে সেই চারটে বীজ থেকে চারা বের হল । ওদের ভেতর একটা – পাইন গাছ – বিরাট লম্বা হয়ে মাটি ফুঁড়ে ছোটো একটা ফুটো দিয়ে উঠে গেল বাইরের জগতে । সিচতিনাকোর সহায়তায় বোনেরা এবার খুঁজে পেলো ব্যাজারের [এক ধরনের প্রানী] মূর্তি । ওরা ওকে প্রান দান করলো এবং নির্দেশ দিলো ওই ফুটো টাকে বড় করার । সাথে এটাও বললো, খবরদার যেন বাইরের আলোর জগতে না যায় । ব্যাজারটা সেটা মেনেও নিলো । এর বিনিময়ে সে পেলো বাইরের জগতে চিরন্তন আনন্দে বসবাস করার আশীর্বাদ । এবার বোনেরা ঝুড়ি থেকে খুঁজে বার করলো পঙ্গপালের মূর্তি । ওটাকেও জীবন্ত করে নির্দেশ দিলো গর্তের মুখটাকে মসৃণ করার । একইসাথে গর্তের বাইরে যেতে বারন ও করলো । পঙ্গপাল কাজ সেরে এসে জানালো সে বারন সত্বেও কৌতূহল সাম্লাতে না পেরে বাইরের জগতটাকে দেখে এসেছে । বোনেরা জানতে চাইলো, “ কেমন সে জগত ?” পঙ্গপাল জানালো, “সমতল।”
ঠিকঠাক কাজ করার জন্য বোনেদের সাথে  বাইরের জগতে যাওয়ার অনুমতি পেলো পঙ্গপাল । কিন্তু কথা না শোনার অপরাধের দন্ডস্বরুপ শাস্তি হল ওকে বসবাস করতে হবে জমির ওপরে । আয়ু হবে খুব কম  এবং প্রত্যেক বছর নতুন করে জন্ম নিতে হবে ।
সিচতিনাকোর কথা মতো এবার পাইন গাছের গুঁড়ির সাহায্য নিয়ে বাইরের জগতে বেরিয়ে এলো যমজ বোনের আত্মারা। সাথে থাকলো সেই ঝুড়ি, ব্যাজারটা আর পঙ্গপাল । অপেক্ষা করলো সূর্য ওঠা পর্যন্ত । সিচতিনাকো বলে দিয়েছিল ওটার আগমন হবে পূর্ব দিকে । উনিই ওদের চিনিয়ে দিয়েছিলেন বাকি তিনটে দিক   । সাথেই শিখিয়ে দিয়েছেন সূর্য বন্দনা । সূর্য উঠতে দেখে ওরা সেই বন্দনা গান জোরে জোরে উচ্চারন করলো । এটাই ছিল এ জগতের আদি সঙ্গীত।
সিচতিনাকো ওদের জানিয়েছিল সে এই কাজ করছে স্রষ্টা উচতসিতির নির্দেশ অনুসারে। যিনি এই জগত বানিয়েছেন এক দলা রক্ত পিন্ড থেকে। বোনেদের কাজ হলো সেই জগতে ঝুড়ির জিনিষগুলোকে ছড়িয়ে দেওয়া এবং প্রান দান করা। ওরা সেই কাজটাই করলো । বীজ রোপণ করলো আর   জীবন্তুর মূর্তিগুলোতে দিলো প্রান ।
ওদের জীবনে এলো প্রথম রাত । অন্ধকারে ভয় পেয়ে ওরা স্মরণ করলো সিচতিনাকোকে। তিনি এসে জানালেন এটা হল ঘুমানোর সময় । চিন্তার কিছু নেই সূর্য আবার ফিরে আসবে ।
### আকোমাদের সমাজ মাতৃতান্ত্রিক । যে কারনে এদের গল্পে সেই অর্থে  পুরুষ দেবতার অস্তিত্ব নেই । জগতের সৃষ্টি হচ্ছে মাটির তলায় বা পৃথিবীর ভেতরে । আসলে এতো মাতৃ গর্ভের প্রতীকী রুপ । একবার মাত্র মহান স্রষ্টার কথা উল্লেখ হয়েছে । মেয়েদের হাতে শাসনের ভার অতএব স্বাভাবিক ভাবেই গল্পেও তার প্রতিচ্ছবি । মহান স্রষ্টার কাজ বীজ দিয়েই শেষ বাকি সব কিছুই করছে মহিলারা । সিচতিনাকো নামক চরিত্রটি আসলে চিরন্তন   ওঝা বা পুরোহিততন্ত্রের প্রতিনিধি । যদিও আকোমাদের কাহিনীতে তার উদ্দেশ্য সব সময়েই ইতিবাচক পথ নির্দেশকের।
আত্মা বলে উল্লেখ করলেও আমরা আত্মা বলতে যা বুঝি তা ঠিক নয় এরা । আসলে এরা এক ধরনের বিশেষ সত্তা ।  সময়ের সাথে সাথে নিয়ম অনুসারেই উপরিউক্ত কাহিনীতে অনেক কিছু যুক্ত হয়েছে। কোথাও দুই বোনের মধ্যে ঝগড়া দেখানো হয়েছে। কোথাও  মহান পিতার আদেশ না মেনে রামধনুর থেকে ঝড়ে পড়া গরম বৃষ্টির ফোঁটা নিজের শরীরে ধারন করে নউতসিতি গর্ভবতী হয়েছে। জন্ম দিয়েছে দুই সন্তানের । আর এর শাস্তি স্বরুপ সিচতিনাকো ওদের ছেড়ে চলে গেছে। এদের মধ্যে একটিকে মানুষ করেছে প্রথম বোন ইয়া-তিকু । পরে সে ওর স্বামীতে পরিণত হয়েছে । ওদের থেকেই জন্ম হয়েছে এই জগতের প্রথম মানুষদের ।
এই উপজাতির ভেতর আর একটি গল্প চালু আছে। যেখানে বলা হয়েছে কাচিনা নামক একদল আত্মার কথা। নিউ মেক্সিকো আর অ্যারিজোনা অঞ্চলের পুয়েব্লো মানুষদের কাছে এ এক অতি পরিচিত নাম । কোনো গল্পে এই কাচিনাদের সৃষ্টি করেছে ইয়া-তিকু । ###
তৃতীয় গল্প
AINU [আইনু]
জাপানের উত্তর প্রান্তের দ্বীপে বসবাস কারী এবং জাপানী ভাষায় কথা না বলা মানুষের গোষ্ঠী আইনু বা ইজো । যার অর্থ মানুষ বা জনগণ ।
একেবারে শুরুর সময়ে কাদা এবং জলের এক মিশ্রন ছিল । তার থেকেই এই জগতের সৃষ্টি । সে সময় কোন জীবন্ত প্রানী ছিল না। ভগবান, শয়তান এবং নানান পশু বসবাস করতো আমাদের এই জগতের ওপর এবং নীচের দুটো আলাদা জগতে ।  ওপরের জগতকে বলা হয় স্বর্গ । সবচেয়ে উঁচু স্বর্গে বসবাস করেন স্রষ্টা ভগবান কামুই । তার এলাকা ঘেরা আছে সুউচ্চ প্রাচীর দিয়ে । তাতে লাগানো আছে লোহার এক দরজা ।  কামুই ঠিক করলেন বিশাল এক মাছের পিঠে একটা জগত বানাবেন । যাকে ছেড়ে দেবেন জলে । সে নড়াচড়া করলে সমুদ্রের ঢেউ সৃষ্টি হবে।
সবার আগে উনি বানালেন একটা ছোট্ট ওয়াগটেইল পাখি । চারদিকে তো জল । বেচারী পাখি কি করে । সে তার ডানা ঝাপ্টাতে থাকলো জোরে জোরে । সেই হাওয়া লেগে কাদামাটি শুকালো । জন্ম হল একটা দ্বীপের । সেই দ্বীপেতেই এখন আইনু রা বসবাস করে ।
### আর একটি গল্প অনুসারে শয়তান স্রষ্টার কাজে বাধা দেওয়ার জন্য সূর্যকে গিলে নিয়েছিল । সেটাকে উদ্ধার করার জন্য কামুই একটা কাককে পাঠিয়ে দেন । সূর্যের আলোয় নতুন জগতটা খুব ভালো লাগে কাকটির । সে অনুরোধ জানায় তার ওখানে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক । তখন কামুই মাটি আর কিছু কাঠি দিয়ে আইনুদের দ্বীপটাকে বানিয়ে দেন।
আইনু গোষ্ঠীর লোকেদের গায়ে বড় বড় লোম । তারা মনে করে তাদের আদি ভগবান   ভাল্লুক ছিল । ওদের সভ্যতায় ভাল্লুকের টোটেম বা চিহ্ন অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় ।
আরো একটি কাহিনী অনুসারে, যেখানে জাপানী প্রভাব দেখা যায়, জানা যায় এক স্বর্গীয় দম্পতির কথা। ওকিকুরুমি এবং তুরেশ ।   যাদের সাথে জাপানী উপকথার ইজানামি এবং ইজানাগির খুব মিল ।   এদের নির্মাণ করে এ জগতে পাঠিয়েছিলেন মহান স্রষ্টা । ওরা বসবাস করতো এক পাহাড়ের ওপর। এদের প্রথম সন্তানই হল প্রথম আইনু । কারো মতে তার নাম ছিল আইয়োনিয়া। এই ছেলে ওদের সংস্কৃতিতে একজন নায়ক । যে ওদের শিখিয়েছিল কি ভাবে বেঁচে ও টিঁকে থাকতে হয় । সে যখন স্বর্গে যায় তখন নাকি তার পোশাক থেকে মানুষের গন্ধ মুছে যায়নি । তাই তাকে আবার এ জগতে ফিরে আসতে হয় ।  আইয়োনিয়া সে পোশাক ত্যাগ করলে সেটা থেকে নানান জীব জন্তুর জন্ম হয় । এই গল্পের আরো একটি রূপান্তর অনুসারে আইয়োনিয়া আসলে স্রষ্টা নিজেই । যিনি মানুষের রুপে মানুষকে পথ দেখানোর জন্যই তাদের সাথে বসবাস করতেন । ###
চতুর্থ গল্প
ALGONQUIN [অ্যালগনকূইন]
অ্যালগনকুইন নামে একটি ভাষাও আছে । যা ব্যাপকভাবে অনেক নেটিভ আমেরিকান গোষ্ঠীরা ব্যবহার করে থাকে। আনিশিনাবে, ব্ল্যাকফুট বা পেনবস্কট তাদের ভেতরে উল্লেখ্য। আজকের অ্যালগনকুইনরা কানাডার একটি নেটিভ ইন্ডিয়ান উপজাতি । যাদের অ্যানিসিনাপে বা ওমানি উইনিনিওয়াক নামেও ডাকা হয় ।
এদের একটি গল্প অনুসারে মহান পৃথিবী মাতা এই জগতের নির্মাণ করেছেন । উনি সৃষ্টি করেন দুই সন্তানকে । ওদের নাম দেন গ্লুস্ক্যাপ [ বা মিছাবো ] এবং মালসুম । প্রথম জন সংস্কৃতির নায়ক এবং ইতিবাচক নির্মাতা । দ্বিতীয়টি ধ্বংসাত্বক নির্মাতা এবং শয়তান। রুপ নেকড়ের ।
পৃথিবী মাতা একদিন মারা গেলেন । গ্লুস্ক্যাপ নিজের শরীরের অংশ দিয়ে নির্মাণ করলো এ জগতের সব কিছু । বানালো নানান প্রানী এবং মানুষ । অন্যদিকে শয়তান মালসুমও বসে রইলো না। সেও বানালো যত রাজ্যের ভয়ানক প্রানী এবং গাছপালাদের ।
এই দুই বিপরীতমুখী ভাইয়ের ভেতর সংঘাত নিশ্চিত ছিল । দুজনেরই ছিল একটি করে দুর্বল বিষয় । মালসুম এর মৃত্যু হবে এক বিশেষ ফার্ন গাছের শিকড়ের সহায়তায় । আর গ্লুস্ক্যপ এর মৃত্যুর কারন হবে একটি প্যাঁচার পালক ।
মালসুম প্যাঁচার পালকের তীর বানিয়ে হত্যা করলো গ্লুস্ক্যাপকে । শুরু হল শয়তানের রাজত্ব । যদিও অলৌকিক উপায়ে বেঁচে গেল গ্লুস্ক্যাপ । কারন ভালোর কখনো খারাপ পরিণতি হয় না । এবার সে শেষ করে দিলো মালসুমকে । কিন্তু মালসুমকেও সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করা গেল না। এটাই চিরন্তন ভারসাম্য । ভালো থাকলে খারাপকেও থাকতে হবে। এবার তার স্থান হল মাটির নিচে পাতালে । অন্যদিকে গ্লুস্ক্যাপ তার সাদা ক্যানো [এক ধরনের নৌকা] তে করে চলে ওপরে, স্বর্গে।
এরপর এক বছর কেটে গেল । মানুষের বসতির পাশ দিয়ে যে জল ধারা বয়ে যেত সেটা শুকিয়ে গেল । মানুষদের এক জন উত্তর দিকে দেখতে গেল এরকম হওয়ার কারনটা কি ।  চলতে চলতে সে জলধারার এক অপেক্ষাকৃত  চওড়া স্থানে এসে উপস্থিত হল । দেখতে পেলো সেখানকার জল হলুদ এবং দুষিত হয়ে গেছে। মানুষটার খুব তেষ্টা পেয়েছিল । যে কারনে ওখানে বসবাসকারি মানুষদের কাছে একটু জল চাইলো খাওয়ার জন্য। উত্তরে, মানুষগুলো জানালো ওরা জল দিতে পারবে না। জল নিতে হলে আরো উত্তর প্রান্তে গিয়ে এই জল ধারার মালিকের অনুমতি নিতে হবে। অগত্যা মানুষটা চললো সেই মালিকের কাছে। মালিক আসলে ছিল এক দৈত্য । একটা বিরাট গর্ত খুঁড়ে সে সব জল সেখানে আটকে রেখে দিয়েছিল ।
তৃষ্ণার্ত মানুষটা জল চাইলো দৈত্যটার কাছে। সেটা শুনে বিশাল এক গর্জন করে দৈত্যটা হাঁ করলো । দেখা গেল ওটার বিরাট বিরাট দাঁতের ফাঁকে নানা পশুপাখী ও মানুষের দেহাবশেষ লেগে আছে।  বোঝাই যাচ্ছে সে ওদের চিবিয়ে খেয়েছে।
এই দেখে এক ছুটে মানুষটা পালিয়ে এলো নিজেদের এলাকায় । সবাইকে জানালো কি দেখেছে সে। এদিকে ওপরে স্বর্গ থেকে সব কিছু দেখতে পেলো গ্লুস্ক্যাপ । নিজের সৃষ্টি করা সন্তানদের সাহায্য করার বাসনা জাগলো তার মনে । পড়লো যুদ্ধের সাজ। রন হুঙ্কার এবং ওজনদার পদক্ষেপে কাঁপিয়ে দিলো জমি । লোহা পাথরের একটা পাহাড় উপড়ে নিয়ে বানাল এক অতিকায় ছোরা । তারপর উপস্থিত হল দৈত্যের ডেরায়। লেগে গেল ধুন্ধুমার যুদ্ধ । দৈত্য গিলে ফেললো গ্লুস্ক্যাপকে। সাথে সাথেও ছোরা দিয়ে পেট চিরে বেরিয়ে এলো উপকথার নায়ক গ্লুস্ক্যাপ ।
আটকে রাখা গর্তের জল আবার বইতে শুরু করলো জলধারা দিয়ে। দৈত্যটাকে দুমড়ে মুচড়ে ছোট্ট করে একটা বড় কোলাব্যাঙে রূপান্তরিত করে ছুঁড়ে ফেলে দিল কাদায় ভরা জলাভুমিতে। 
### আকাশ থেকে নয় এই জগত থেকেই সব কিছুর জন্ম হয়েছে এই ভাবনা পৃথিবীর অনেক জনগোষ্ঠীই বিশ্বাস করে । এই গল্প তার একটা প্রমান । পৃথিবী মাতার শরীর থেকেই সব জীব জন্তু গাছপালার জন্ম হয়েছে আর উনি নিজের আত্মাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন তাদের ভেতরে। নিজের শরীরটাকে দান করেছেন তাদেরই বাসস্থান রুপে।  জন্ম- জীবন - মৃত্যু – পুনঃ জন্ম এই চক্রে চলে সব কিছু । কোনো দেবতার নিয়ন্ত্রনে নয় এটাই মানে অ্যালগনকুইনরা ।   শিকারের চেয়ে চাষাবাদে বেশী ভরসা করে ।  তাই এ কথনে শিকারের কোনও উল্লেখ নেই । ###
পঞ্চম গল্প
ALTAIC [ অ্যালতেইক ]
অ্যালতেইক শব্দটি তুর্কী, মঙ্গোলিয়া এবং টাঙ্গুস এই তিন প্রধান ধারার একত্রিত রুপ বলেই মানা হয় । যদিও বিষয়টি সার্বজনীন মান্যতা পায়নি । এশিয়া মাইনর থেকে মধ্য, পূর্ব এবং উত্তর এশিয়া জুড়ে এই ভাষায় প্রচুর মানুষ কথা বলেন ।  তুর্কী ও মঙ্গোলিয়ার মানুষ ছাড়াও সেখানে আছে মাঞ্চুরিয়ান এবং ককেশাসের মানুষ । নিম্নলিখিত কাহিনী প্রচলিত আছে ককেশাসের এলাকায় ।
সৃষ্টির আদিকালে এ জগতে জল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। একদিন সেই জলের ওপরে দুটো কালো রাজহাঁস এদিকে ওদিকে উড়ে বেড়াচ্ছিল । ওদের ভেতরে একটি আসলে স্রষ্টা স্বয়ং । আর দ্বিতীয় টা প্রথম মানুষ । একই সাথে সে আবার শয়তান। সে চেষ্টা করছিল স্রষ্টা ভগবানের চেয়ে উঁচুতে ওড়ার । এটা বুঝতে পেরে রেগে গিয়ে ভগবান মানব-শয়তানকে ফেলে দিলেন জলে। হাবুডুবু খেতে খেতে সে সাহায্য চাইলো । ভগবান বললেন, যাও ডুব দিয়ে জলের তলা থেকে একটা পাথর তুলে নিয়ে এসো । মানব-শয়তান সেটাই করলো । ভগবান সেটা পরিবর্তিত করলেন পৃথিবী রুপে। এবার পৃথিবীকে সাজানোর জন্য আরো কিছু পাথর তুলে আনতে বললেন। শয়তান সেটা করলো   কিন্তু কিছু পাথর নিজের মুখের ভেতর লুকিয়ে রাখলো । ভগবান মন্ত্রবলে পাথরগুলোকে বড় করতে শুরু করতেই শয়তানের মুখের পাথরগুলোও বড় হতে থাকলো । ভয় পেয়ে সে আবার সাহায্য চাইলো । বেশ কিছুক্ষন কষ্ট ভোগ করানোর পর ভগবান মানব-শয়তানকে বললেন পাথরগুলো উগড়ে দিতে । সেই সব লালা মাখা পাথর থেকে এ জগতে জন্ম হলো জলাভুমির।
  সাইবেরিয়া এলাকা থেকে প্রাপ্ত আর একটি অ্যালতেইক কথন ।
কাহিনী অনুসারে  জানা যায় স্রষ্টার নাম আলজেন এবং মানুষের নাম এরলিক । আলজেন আদিম জলের ওপর দিয়ে কাদা মাটির ঢেলা ভেসে যেতে দেখছিলেন একদিন। তার ভেতরেই একটাতে তিনি দেখতে পান প্রথম মানুষের মুখাবয়ব । তাকেই প্রান দান করেন । সেই হয় এরলিক । কিছু দিনের ভেতরেই এরলিকের মনে হয় সেও আলজেনের মতো মানুষ নির্মাণ করতে পারে । এই ঔদ্ধত্য দেখে ভগবান ওকে পৃথিবীর শেষ প্রান্তে ছেড়ে দিয়ে আসেন । এখানে সে শয়তানে পরিণত হয় । তারপরেই ফিরে আসে ।
এরলিককে তাড়িয়ে দেওয়ার পর ভগবান পৃথিবী নির্মাণ করেন । আটটা গাছ বানিয়ে তার ওপর   আটটা মানুষকে স্থাপন করেন । সোনার পাহাড়ের ওপর অবস্থান কারী অষ্টম গাছের   অষ্টম মানুষটার নাম ছিল মেইদেরে । ভগবানের ইচ্ছানুসারে মেইদেরে নির্মাণ করেন প্রথম মানবীকে। কিন্তু তাকে প্রান দিতে পারে না। সাহায্য নেওয়ার জন্য   চলে যায় আলজেনের কাছে।  মানবীকে রেখে যায় এক লোমহীন কুকুরের তত্ত্বাবধানে   । এই সময়  এরলিক আসে কুকুরটার কাছে । লোমের একটা কোট দেওয়ার লোভ দেখায় । বিনিময়ে চায় মানবীকে একবার দেখতে । শুধু দেখেই না সে তাকে শোনায় সপ্তসুর । এর ফলে মানবী প্রান পায় । সাথেই নানা রকম ধরনের বাজে ব্যবহার করার প্রবণতাও ঢুকে পড়ে মানবীর ভেতরে।
মেইদেরে ফিরে এসে মানবীকে জীবন্ত দেখে অবাক হয়ে যায় । জানতে পারে এরলিকের আগমনের কথা সাথেই কুকুরটার বেইমানী । অভিশাপ দেয় এখন থেকে  সারাজীবন লাথি ঝাঁটা খেয়েও মানুষের প্রতি তাকে অনুগত্য দেখাতে হবে ।
### দ্বৈত সত্তার অবস্থান অ্যালতেইক মিথের মূল ভিত্তি । ইসলাম, বৌদ্ধ, জরাথুস্ট্র এবং খ্রিষ্টান ধর্মের প্রভাব গল্প গুলিতে দেখতে পাওয়া যায় ।   এরলিকের   শয়তানে পরিণত হয়ে মানবীকে মানসিক ভাবে দুষিত করা  আর    হিব্রু কাহিনীতে সাপের দ্বারা জগতের আদিম মহিলাকে প্রলুব্ধ  করার উল্লেখ এ প্রসঙ্গে করা যেতেই পারে ।
এদের কাহিনীতে শয়তানের এক বিশেষ ভুমিকা লক্ষনীয় । জগত নির্মাণ প্রক্রিয়ায় এদের সক্রিয় অংশ গ্রহণ থাকে। মূল কাজ হল আদিম মানব মানবীর মানসিকতাকে দুষিত করা । প্রচলিত নানান গল্প ভালো করে পড়লে কেন জানিনা মনে হয় স্বয়ং ভগবানই যেন চেয়েছেন এরকম কিছু হোক । ###
ষষ্ঠ গল্প
ANATOLIAN [আনাতোলিয়ান]
খ্রিস্ট পূর্ব দ্বিতীয় সহ স্রাব্দের শুরুর দিকে এক ইন্দো ইউরোপীয়ান ছিল। যাদের পরিচিতি ছিল হিত্তি নামে । এরা দখল করেছিল তত্কালীন এশিয়া র তুর্কী এলাকা । যার নাম ছিল তখনকার দিনে আনাতোলিয়া । এরা কিউনিফরম লিপি ব্যবহার করলেও হিত্তি ভাষাই ছিল প্রধান। এদের প্রতিবেশি ছিল হুরিয়ান রা। অনেক রকম ভাষা এবং ধর্ম প্রচলিত ছিল সেখানে । ফল এ এক জগাখিচুড়ী সংস্কৃতি বজায় ছিল বলা যেতে পারে। তার কারনেই এদের পৌরানিক কাহিনীতে শুধু হিত্তি বা হুরিয়ান বা হাত্তিক ভাবনার প্রকাশ দেখা যায় না।  প্রাক গ্রীক এবং প্রাক ইসলামিক আনাতোলিয়াতে মিলে মিশে গিয়েছিল নানা ধরনের গল্প কথা । যার সাথে যুক্ত হয়েছিল মেসোপ টেমিয়া এবং কান্নাইট দের ভাবনা।
হাত্তিয়ান দের এক অতি প্রাচীন দেবী মাতার উল্লেখ পাওয়া যায় । যার উ ৎ প ত্তির শিকড় নিও লিথিক ক্যাটাল হুইউক এর সাথে জুড়ে আছে । ইনিই সমস্ত জীবনের উৎস এবং ঝড়ের দেবতার স্ত্রীএই ঝড়ের দেবতা জিউস, ইন্দ্রম থর বা ওই ধরনের দেবতাদের সমগোত্রীয় বলা যায় । অবস্থান করেন পর্বতের চুড়ায় নিজের রাজ ধানীতে । বেশীর ভাগ সময় ব্যস্ত থাকেন নিজের সিংহাসন বাঁচানোর যুদ্ধে ।
দেবী মাতা এবং ঝড়ের দেবতার দুই মেয়ে । মেজুল্লা এবং ইনারা । প্রথম জন, মানুষ এবং স্বর্গের ভেতর সংযোগ রক্ষা কারীনি । দ্বিতীয় জন , বাবার সাথে ব্যস্ত থাকেন যুদ্ধ বিগ্রহে ।
###  আনাতোলিয়ান সংস্কৃতি তে সেইভাবে কোনও   গল্প পাওয়া যায় না যার সাহায্যে বিশেষ কোনো সৃষ্টি তত্ব বর্ণিত হয়েছে । কিন্তু আদি মাতা যে আসলে উর্বরতার প্রতীক এবং ঝড়ের দেবতা মানেই বৃষ্টিপাত এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না ।  অর্থাৎ  সেই চিরন্তন কাহিনী । শুধুমাত্র ইঙ্গিতে বলা আছে।###
সপ্তম গল্প
ANISHINABE [OJIBWE, CHIPPEWA]
অ্যানিশিনাবে [অজিবুই, চিপ্পিউয়া ]
অ্যালগনকুইন ভাষায় কথা বলা একটি প্রজাতির মানুষদের ডাকা হয় অ্যানিশিনাবে নামে।  অজিবুই বা চিপ্পিউয়া নামেও পরিচিত এই মানুষদের বসবাস ক্ষেত্র ছিল গ্রেট লেক এলাকা । যা এখন আমেরিকা ও কানাডা নামে পরিচিত। অ্যানিশিনাবে নামের অর্থ “জনগণ” । এদের পৌরানিক গল্প কথায়  নানাবোঝো বা মানবোঝো বা মিছাবো বা মিশাবুজ বা বিরাট খরগোশ ইত্যাদি নামধারী পথপ্রদর্শক সংস্কৃতি নায়ক এবং কৌশলবাজ আত্মার উল্লেখ পাওয়া যায় । এই নানাবোঝোর সাহায্যে একটি ভগ্নপ্রায় জগত পুনঃ নির্মাণের কাহিনীই মূল বিষয় ।
মহান সত্তা বা আত্মা কিচি-ম্যানিতু আসল জগত এবং তার আসল অধিবাসী অ্যানিশিনাবেদের নির্মাণ করেছিলেন। সে জগত ছিল দারুন সুন্দর । কিন্তু মানুষ আস্তেস্তে শয়তানে পরিণত হয়। নষ্ট করতে শুরু করে সব কিছু। এর ফলে প্রকৃতির সাথে তাদের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় । এসব দেখে মহান সত্তা এক বিশাল বন্যার জন্ম দেন । যার ফলে নানবোঝো এবং কিছু সাঁতার কাটতে ও উড়তে সক্ষম প্রানী ছাড়া সব ধ্বংস হয়ে যায় । একটি ভাসমান গাছে গুঁড়িতে আশ্রয় নেয় নানাবোঝো আর ওই প্রানীরা
বেশ কিছু সময় কেটে যাওয়ার পর নানাবোঝো বলে সে জলের তলায় ডুব দিয়ে মাটি তুলে আনবে এবং নতুন জগত নির্মাণ করবে। অনেক অনেক দূর পর্যন্ত ডুব দিয়েও নানাবোঝো মাটি দেখতে পায় না। ওর সাথে যে প্রানীরা ছিল তাদের অনেকেই জলে ডুব দিতে ওস্তাদ । তারা নানা বোঝোকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেলুন নামক বড় জলজ পাখি ব্যর্থ লো । এক এক করে হেল্ডাইভার হাঁস, মিঙ্ক এবং কচ্ছপ ও কিছুই খুঁজে পেলো না । প্রায় মরো মরো হয়ে ফিরে এলো সব । তখন মাস্কর‍্যাট অনুমতি চাইলো একটা চেষ্টা করে দেখার । বাকি প্রানীরা ওই ছোট্ট প্রানীর কথা শুনে বারন করলো কাজটা করতে । কিন্তু নানবোঝো বললো, ঠিক আছে দেখো একবার চেষ্টা করে ।
জলে ডুব দিলো মাস্ক র‍্যাট । অনেক অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার ভেসে উঠলো ছোট্ট প্রাণীটা । নানাবোঝো ওকে তুলে নিলো গুঁড়ির ওপর  এবং বুঝতে পারলো প্রাণীটা মরে গেছে। কিন্তু দেখা গেল মাস্কর‍্যাটের থাবায় আটকে আছে মাটি । অর্থাৎ জলের একেবারে নিচে যেতে পেরেছিল ছোট্ট মাস্ক র‍্যাট ।
এবারে কচ্ছপটা প্রান উৎসর্গ করলো এবং নিজের শরীরকে স্থাপন করলো জলের ওপর । মাস্কর‍্যাটের থাবায় থাকা মাটি দিয়ে  ছোট্ট একটা  গোলক বানিয়ে রাখা হল কচ্ছপের পিঠের ওপর । বাকি প্রানীরা কিচি-ম্যানিতুর কাছে সাহায্যের প্রার্থনা জানালো । কিচি- ম্যানিতু চারদিক থেকে হাওয়া পাঠালেন। কচ্ছপের দেহর পর থাকা মাটির গোলকে সেই হাওয়া  লাগতেই ওটা বাড়তে শুরু করলো এবং একসময় সেটা পরিণত হল একটা দ্বীপে । এমন এক দ্বীপ যা অবস্থান করছে কচ্ছপের পিঠের ওপর। এসব দেখে নানাবোঝো আর বাকি প্রানীরা আনন্দে নাচতে ও প্রার্থনা করতে থাকলো । ধীরে ধীরেরো অনেক কিছু জন্ম নিলো সেই বিশাল গোলকে। সেই গোলকই আজকের পৃথিবী যেখানে আমরা বসবাস করি ।
### আদি জগত, সেখানে বিশাল মাপের বন্যা এবং নতুন জগতের বিনির্মাণের কাহিনী অনেক অনেক দেশের সংস্কৃতিতেই দেখতে পাওয়া যায় । অ্যানিশিনাবেদের এই কথনে একাধিক নেটিভ আমেরিকান গোষ্ঠীর মতোই জলে ডুব দিয়ে মাটি তুলে আনার উল্লেখ রয়েছে।  কচ্ছপের দ্বারা এ জগতের ভার নেওয়ার গল্পও বেশ কিছু মিথ কথনে অতি প্রচলিত। সামান্য দৈবিক সাহায্য ব্যতীত নতুন জগত নির্মাণ এজগতের প্রানীদের দ্বারাই হচ্ছে এটাও এ কাহিনীর এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য । ছোট্ট মাস্কর‍্যাটের আত্ম বলিদান ইঙ্গিত করে মহান সত্তা যতই বড় হোন না কেন ক্ষমতাবান হোন  না কেন  ক্ষুদ্র প্রানীদের অবদান কিছুতেই অস্বীকার করা উচিত নয় কোনও কাজের ক্ষেত্রে। ###
অষ্টম গল্প
ARANDAN [ARUNTAN]
আরান্ডান [আরুন্টান]
মধ্য অস্ট্রেলিয়ার আপার ফিস্কে নদীর এলাকায় বসবাসকার উপজাতি আরান্ডান  বা আরুন্টানরা। এদের কথনটি নিম্নরুপ ।
একেবারে সুরুর সময়ে স্রষ্টা কারোরা , ইল-বালিন্তজা নামক জায়গায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন । যা পরবর্তী সময়ে জলাভুমিতে পরিণত হয় । উনার শরীর ঢেকে যায় ভালো উর্বর মাটি এবং এক গাছপালার বাগানের তলায় । সে সময় চারদিক অন্ধকার ছিল। সহসাই জমি ভেদ করে  এক জীবন্ত দারুন ভাবে সাজানো নাতান্তজা বা জুরুঙ্গা নামের দন্ডের  আবির্ভাব হয় এবং সেটা উঠে যায় আকাশের দিকে। ওই দন্ডের ঠিক তলায় থাকে স্রষ্টা ভগবানের মাথা। এই মাথা যা ভাবে সেটাই বাস্তবে হতে থাকে। সেই রকম ভাবনার ফলেই তার নাভিকুন্ড আর বগল ভেদ করে বেশ কিছু  বিরাট মাপের ইঁদুর বেরিয়ে এলো  এবং মাটি কেটে উঠে গেল ওপরে ।ওই য় সূর্য উঠতে শুরু করলো ইল-বালিন্তজাতে । সূর্যের আলো গায়ে লাগতেই কারোরা মাটি সরিয়ে এক ঝটকায় উঠে পড়লেন। এর ফলে উনি যেখানে শুয়েছিলেন সেখানে একটা বিরাট গর্তের জন্ম হলো । যার নাম ইল-বালিন্তজা গর্ত । ওই গর্ত ভর্তি ছিল রক্তের মতো দেখতে মধুতে। মাটির ভেতর থেকে উঠে আসার প্র কারোরার সব জাদু ক্ষমতা হারিয়ে গিয়েছিল সাথেই পেয়েছিল খুব খিদে । কাছেই চড়ে বেড়ানো দুটো ধেড়ে ইঁদুর ধরে সূর্যের আলোয় ঝলসে খেলেন ।
একসময় রাত ঘনিয়ে এলো । কারোরার মনে হল এক জন সাহায্যকারী থাকলে ভালো হতো । ভাবতে ভাবতেই উনি ঘুমিয়ে পড়লেন । তার পরেই উনার বগলের তলায়    দেখা গেল একটা বিশেষ বাদ্যযন্ত্র যার নাম বুল-রোয়ারার বা রোম্বাস বা টারন্ডান   । যেটা বদলে গেল  এক তরুণ যুবকের দেহতে । কারোরা ঘুম ভাঙতেই দেখতে পেলেন সেই দেহ । সে দেহে প্রান ছিল না।   ঘুমের প আবার বিশেষ শক্তি সব ফিরে এসেছিল কারোরার ভেতরে । উনি পবিত্র রায়াঙ্কিন্তজা চিৎকার ছাড়লেন । সেই শব্দে প্রান পেলো যুবক । সেটা দেখে নেচে উঠলেন স্রষ্টা। সাথে সাথে নাচতে থাকলো যুবকটিও ।
পরের দিন রাতে কারোরার দেহ থেকে আর অনেক দেহ জন্ম নিলো । সবাইকে প্রান দিতেই ওরা খাবার খেতে শুরু করলো । আর একটাও ধেড়ে ইঁদুর র ইলো না কোথাও ।  তৃতীয় রাতে নতুন মানুষেরা শুনতে পেলো বুল-রোয়ারার এর শব্দ  । কোথা থেকে আসছে সে শব্দ খুঁজতে শুরু করলো ।    ওদের সামনে এসে উপস্থিত হল একটা অদ্ভুত রোমশ প্রানী। একজন চেঁচিয়ে বল লো, ‘এটা হল বালি পাহাড়ের ওয়ালাবি ।’ হাতে থাকা লাঠি দিয়ে মেরে প্রানীটার একটা পা খোঁড়া করে দিলো ওরা। সাথেই সাথেই প্রাণীটা চেঁচিয়ে বলে উঠলো, ‘তোমারা আমার পা ভেঙে দিলে। আমি কিন্তু কোনও পশু নই । আমি জেন্তেরামা, তোমাদের মতোই একজন মানুষ । ’ কারোরা সৃষ্ট মানুষগুলো পিছিয়ে আসতেই ওয়ালাবিটা পালিয়ে গেল ।
ওরা ফিরে আসার পর কারোরা ওদের নিয়ে গেলেন ইল-বালিন্তজা গর্তর কাছে নিজের সন্তানদের  গোল করে গর্তটার চারপাশে বসতে বললেন বসার প্রায় সাথেই সেই লালছে মধুর রস ওদের টেনে নিলো গর্তের ভেতরে। নিয়ে গেল সেইখানে যেখানে আহত জেন্তেরামা ছিল । যে ওদের নতুন নেতায় পরিণত হলো । ওখানেই থেকে গেল কারোরার সন্তানেরা । আগামীদিনের মানুষদের জন্য ওরা  হয়ে গেল দেবতা  
কারোরা আবার ঘুমিয়ে পড়লেন তার আগের জায়গায়মানুষেরা এখনো প্রকৃতির জিনিষপত্র দিয়ে কারোরাকে সম্মান ভক্তি জানায় ।
### নাতান্তজা বা জুরুঙ্গা নামের যে দন্ডের  উল্লেখ করা হয়েছে সেটাকে ওই গোষ্ঠীর ওঝা সম্প্রদায়ের  মানুষেরা জাদুদন্ড রুপে মান্যতা দেয়। মনে করে ওটাই তাদের সব শক্তির উৎস। ওটা তাদের বাঁচিয়ে রাখে সমস্ত রকম চুরি চামারির হাত থেকে। বুল-রোয়ারার থেকে যে গুন গুন শব্দ সৃষ্টি হয় তাকে ওরা মনে করে ভগবানের কণ্ঠস্বরএকটি কাঠের টুকরোর ওপরে করা ফুটতে চুলের মতো জিনিষ লাগানো থাকে। যাকে আঙুল দিয়ে নাড়লে গুন গুন শব্দের উৎপত্তি হয়। এই শব্দ ওরা ব্যবহার করে ভুতপ্রেত তাড়াতে, রোগ সারাতে, জীব জন্তুকে ফাঁদের কাছে ডেকে আনতে বা সম্মোহন করতে বা নতুন কিছুর আগমনকে স্বাগত জানাতে।
ইল-বালিন্তজা গর্ত বা ইল-বালিন্তজা সোক সত্যি করেই আছে । আর ওই নাতান্তজা দন্ডকেও দেখা যায় একটি বিশেষ গাছ রুপে। যাকে ওরা মানে এ জগতের কেন্দ্র স্থল রুপে। ###
নবম গল্প
ARAPAHO [আরাপাহো]
আল গন কুইন ভাষায় কথা বলা পূর্ব আমেরিকার জঙ্গল এলাকায় বসবাস কারী এক উপজাতি ছিল আরপাহোরা। পরে চলে আসে গ্রেট প্লেইন নামে পরিচিত স্থানের উয়োমিং, নেব্রাস্কা এবং কলোরাডোতে।  এদের ভেতর থেকে অনেককে আমেরিকান সরকার পরে  ওক্লাহামাতে পাঠিয়ে দেয় । যেখানে ওদের সাথে দেখা হয় চেয়েন্নেদের ।
ওদের কাহিনী অনুসারে শুরুতে সব জায়গা ছিল জল মগ্ন। ফ্ল্যাট পাইপ একা একা জলে ভেসে বেড়াচ্ছিল। মহান আত্মা ওকে বললেন সে যেন নিজের আশেপাশে এক জগত নির্মাণ করে। ফ্ল্যাট পাইপ হাঁসেদের কথা ভাবলো । হাঁসেদের জন্ম হলো । সে ওদের বললো জলে ডুব দিয়ে দেখে আসতে তলায় কি আছে। হাঁসেরা সে চেষ্টা করলেও সফল হল না । ফ্ল্যাট পাইপ আরো অনেক রকম জলজ পাখীর নির্মাণ করলো কিন্তু কেউই জলের তলায় কি আছে দেখে আসতে পারলো না।
অবশেষে মহান আত্মার ইচ্ছানুসারে ফ্ল্যাট পাইপ এক প্রানীর কথা ভাবতে সক্ষম হল যে একই সাথে জলে ও স্থলে বসবাস করতে পারে। আসলে মহান আত্মা চাইছিলেন ফ্ল্যাট পাইপের আগে আর কেউ যেন জলের তলায় কি আছে সেটা জানতে না পারে। ফ্ল্যাট পাইপের ভাবনা অনুসারে এবার জন্ম নিলো কচ্ছপ । সে গেল জলের তলদেশের উদ্দেশ্যে । অনেকটা সময় পার হয়ে যাওয়ার পর সে ফিরে এলো এবং তার স্রষ্টার সামনে উগড়ে দিলো কিছুটা মাটি । সেই মাটি থেকেই আজকের পৃথিবীর জন্ম হয়েছে। সব পশু পাখীদেরকেও বানিয়েছিল ফ্ল্যাট পাইপ ।
### বুঝতে অসুবিধা হয়না এ গল্পে অন্যান্য আলগনকুইন উপজাতিদের কথনের প্রভাব বর্তমান । জলের তলা থেকে মা্টি আনা বা ভাবনা থেকে নতুন প্রজাতির জন্ম কাহিনী অনেক গল্পেই শোনা যায় । ###
দশম গল্প
AYMARAN [আইমারান]
বলিভিয়ার একটি উপজাতি এই আইমারান । মনে করা হয় তিয়াহুয়ানাকোর বিখ্যাত নগর এর স্রষ্টা ছিলেন আইমারান এবং কুয়েক হুয়ান উপজাতি বা ইনকারা।   যে কারণে আইমারান এবং কুয়েক হুয়ান দের ভাষায় সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। আইমারানদের সাথে কুয়েক হুয়ানদের যুদ্ধ হয়েছে । স্প্যানিশদের বিরুদ্ধেও এরা রুখে দাঁড়িয়েছিল । বেছে নিয়েছিল বিপ্লবের পথ।
আইমারানদের স্রষ্টা ভগবানের নাম কুন । যিনি তুষারের দেবতা। মানব জাতির ওপর রেগে গিয়ে কুন বরফ আর তুষার দিয়ে সমগ্র জগতকে ঢেকে দেন । কেবল মাত্র শয়তান আত্মারা সেই জগতে বিচরন করে বেড়াচ্ছিল । বরফের এই ভয়ানক সময় পার হলে উর্বরতার দেবতা তার ছেলেদেরকে জগতে পাঠান। যাদের পরিচিত  ঈগল মেন  নামে । ওরা নির্মাণ করে পাকা-জেক্স বা নতুন মানুষের দলকে আজও টিটিকাকা হ্রদের কাছে বসবাস করে এদের বংশ ধরেরা  
উপরিউক্ত কাহিনীকে মাথায় রেখেও এটাও আর এক প্রচলিত কথন যে আইমারানদের আসল স্রষ্টা ভগবান সূর্য দেবতা পাচাকামাক । যিনি তিয়াহুয়ানাকোর স্থপতি । পাচাকামাক উঠে এসেছিলেন টিটিকাকা হ্রদের ভেতর থেকে। পৃথিবী নির্মাণ করার পর সৃষ্টি করেন দৈত্যদের । তাদের আচরণে তাকে ক্রুদ্ধ করে এবং এক ভয়ানক বন্যার মাধ্যমে ওদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেন । এরপর মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেন মানুষদের  । নানান উপজাতিতে তাদের ভাগ করে পাঠিয়ে দেন নানান প্রান্তে।
### আইমারানদের মিথ কথনের সাথে অনেক সাদৃশ্য দেখা যায় কুয়েক হুয়ান ভাষায় কথা বলা ইনকাদের কাহিনীর সাথে। এতোটাই সে মিল যে এই দুই সংস্কৃতিকে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করা বেশ মুশকিল । এর ফলে প্রমানিত হয় এরা এক সময় একটাই জাতি ছিল ।
প্রথম সৃষ্টি করা জগতকে ধ্বংস করে দেওয়া কাহিনীও এ পৃথিবীর অনেক মিথ কথনেই পাওয়া যায়। এ আসলে ভুল ভ্রান্তিতে ভরা এক সৃষ্টিকে ধ্বংস করে নতুন নিখুঁত নির্মাণের ইঙ্গিত বহনকারী গল্প । নতুন কিছু বানাতে হলে  অনেক নির্দোষীকে মরতে হয় যা আসলে বলিদানের নামান্তর । ###


 ** কেমন লাগলো এই প্রচেষ্টা সম্ভব হলে জানাবেন ।  
## বিনীত অনুরোধ আরো অনেক লেখা আছে আমার ব্লগে । সাবস্ক্রাইব করুন এবং পড়ুন । অন্যদের পড়তে ব্লুন যদি ভালো লাগে।##
*** জলদি মোট ৫০ টি গল্প নিয়ে আসছে এই সিরিজের প্রথম ই-বুক। পাওয়া যাবে কিন্ডল ও গুগল এ।