Search This Blog

Sunday, August 2, 2020

এরিয়া ফিফটি ওয়ানের কিসসা - ১ ও ২



এরিয়া ফিফটি ওয়ানের কিসসা - প্রাক ইতিহাস

  খুব কম মানুষই আছেন যিনি অদ্ভুত রহস্য নিয়ে পড়াশোনা করেন অথচ এই বিশেষ রুপে বিখ্যাত নামটা শোনেননি অনেকেই সেখানকার অদ্ভুত কিম্ভুত সব ঘটনাগুলোর কথা জানেন বা শুনেছেন। এ এমন এক জায়গা যা গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা। একাধিক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব লুকিয়ে রেখেছে নিজের আস্তিনে। অনেকের মতে এই স্থান আঙ্কেল স্যামের বিশেষ এক ভবন। যেখানে অতিমাত্রায় বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন গোপন বিমান লুকিয়ে রাখা আছে। কারো মতে সেখানে আছে মৃত এলিয়েনদের দেহ। কেউ বলেন ওখানে ইউ এফ ও ক্র্যাশ হয়েছিল। যার সুত্রে পাওয়া বহিঃ জাগতীয় প্রযুক্তির চর্চা চলছে

অতিমাত্রায় সুরক্ষিত এই এলাকার গোপনীয়তা রক্ষণের দায়িত্বে আছে যারা, তারা প্রয়োজনে মানুষ মারতে দ্বিধা করেন না। বহুবিধ এবং বৈচিত্র্যময় গোপনীয়তা রক্ষা করতে মারাত্মক শক্তি ব্যবহারের অধিকার রয়েছে এখানকার কর্মকর্তাদের হাতে।

এরকম একটি স্থানের পারিভাষিক নাম এরিয়া ফিফটি ওয়ান।

নেভাডা মরুভূমির ভেতর একটি গোপনীয় কোন পরীক্ষাগার ধরনের কিছু স্থাপন করা হয়েছে এই গুজব সম্বল করে দীর্ঘদিন ধরে মানুষ আলোচনা করেই চলেছে। কাপের পর কাপ চা উড়ে গেছে আড্ডায় এর পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি দিতে দিতে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার এটাই যে ওই এলাকায় বসবাসকারী কিছু মানুষ আর কিছু আধিকারিক ছাড়া এই জায়গার কথা ১৯৮০ সালে আগে কেউ জানতোই না বলা যায়।    

বব লাজার নামের এক বিতর্কিত চরিত্র তার চমকপ্রদ গল্প শোনায় মানবজগতকে। সে বলে   ১৯৮৮ সালের শেষেরদিকে সে এরিয়া ৫১ র এস - ৪ এলাকায় কিছুদিন কাজ করেছে। সেখানে যে কাজ হচ্ছিল, তা নাকি ওখানে থাকা একাধিক এলিয়েন মহাকাশযানের বিষয়ে তথ্য অনুসন্ধান।    হ্যাঁ, যা পড়লেন ঠিক তাই মার্কিন সরকারের একটি গোপন আস্তানা আছে বাইরের মহাজগত তথা গ্যালাক্সী বা ছায়াপথ থেকে আসা যানবাহন সংরক্ষন করে রাখার জন্য!

এটা খুব আশ্চর্যের বিষয় নয় যে এরকম কোন গল্পের জন্য মিডিয়া অপেক্ষা করেই থাকে।  স্বাভাবিকভাবেই এ গল্প মিডিয়ায় শিরোনাম হয়ইউএফ ও নিয়ে করতে থাকা নানা  সম্প্রদায়  ধৈর্য সহকারে দীর্ঘকাল অপেক্ষা করেছিল এমন যুগান্তকারী খবরের জন্যই।   

 এটা নিশ্চিতভাবেই ছিল এক আশ্চর্যজনক চমকপ্রদ খবর, তাতে সন্দেহ নেই। কল্পনার জগতে প্রবেশ করার চাবিকাঠি হিসাবে এরিয়া ৫১ উপস্থিত হয়েছিল জনগনের সামনে। আর সে কারনেই হয়ত একাধিক টেলি সিরিয়াল, সাই-ফাই ভিত্তিক শো এর পাশাপাশি নির্মিত হর অন্তহীন টেলিভিশন ডকুমেন্টারি। পাঠকপাঠিকারা নিশ্চয় বিখ্যাত এক্স-ফাইলস সিরিয়াল আর ব্লকবাস্টার মুভি ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে’ এর কথা ভুলে যাননি।

অতএব সরকার না চাইলেও এরিয়া ৫১ পেয়ে যায় বিশ্বব্যাপী পরিচিতিঅদ্ভুতভাবেই মার্কিন পপ সংস্কৃতির একটা অংশে পরিণত হয় ঐ রহস্যময় এলাকাএকে আর বদলানোর কোন সুযোগ থাকে না কারোর হাতেই। আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের জিনির মতোই এ বিষয়ে গল্পগুল ভুরভুর করে বের হয়েই চলেছে

 কীভাবে এবং কেন এই এরিয়া ৫১ চালু হল?

কী কী গল্প লুকিয়ে আছে ওই রহস্যময় এলাকায়?

 00000000

 শুরু করা যাক তাহলে

মোটামুটিভাবে বেশিরভাগ লোক যখনই এরিয়া ফিফটি ওয়ানের নাম শোনে, তখনই  তাদের মনে ফুটে ওঠে এমন এক অজানা স্থানের ছবি, যেখানে একেবারে মাঝখানে নিশ্ছিদ্র পাহারার ভেতর একটা দুর্ভেদ্য দুর্গসম কিছু অবস্থান করছে কিন্তু সত্যি করে বললে এতেও সম্পূর্ণ গল্পটা বলা হয় না। লাস ভেগাস, সিন সিটি থেকে একশো মাইলের কম দূরত্বে এর অবস্থান। সোজা কথায় চাইলেই বিশ্বখ্যাত জুয়া নগরী থেকে ঘন্টাখানেকের ভেতরেই আপনি ওখানে পৌছে যেতে পারেন। এরিয়া ফিফটি ওয়ান এর মূল এলাকা শুধু নয়, এর চারদিকে দশ মাইল এলাকাই দুর্ভেদ্য   সাতদিন চব্বিশ ঘণ্টা সশস্ত্র প্রহরীরা মরুভূমিতে টহল দেয়অজস্র মোশন-ডিটেক্টর সেন্সর লাগানো আছে নানান স্থানে। সি সি টিভির মত ক্যামেরা সম্ভাব্য সব ধরনের অনুপ্রবেশকারীদের জন্য চারদিকের বিশাল প্রেক্ষাপট সব সময় স্ক্যান করে চলেছে।  আপনি যদি এসব সত্বেও এগিয়ে যেতে চান ... তাহলে কয়েকটা গরম সীসের টুকরো আপনাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেবে!   

না, আমি কোনো রং চড়ানো গল্প শোনাচ্ছি না।!  এটাই সত্যি!

আসলে  এরিয়া ফিফটি ওয়ান বিষয়ে আমরা নিজেরাই তেমনভাবে কিছুই জানি না বলে মনে হবে যখন এটা জানব যে, এরিয়া ফিফটি ওয়ান আসলে মোটেই একটা কোন জায়গা নয় এবং এটাও সত্যি!

এটা সেই সমস্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি মাত্র, যা N T & T R বা নেভাডা টেস্ত অ্যান্ড ট্রেনিং রেঞ্জের অন্তর্ভুক্তঅবশ্য এটাও ঠিক যে ১৯৫০ সালের আগে অবধি এরিয়া ফিফটি ওয়ানে সেভাবে তেমন গতিবিধি কিছু দেখা যায়নি।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকের সময়েতে এখানে   গোপনীয়তার প্রয়োজন আছে এমন কাজ করা শুরু হয়।

অতএব এই রহস্যম্য স্থানের গতি প্রকৃতি, ইতিহাস এবং কেন একে ব্যবহার করা শুরু হল  বুঝতে হলে টাইম মেশিনে চেপে চলে যেতে হবে ৮০ বছর আগে – ১৯৪০ এর দশকে – তাহলে চলুন সেটাই করি।

নেভাডার বিশালাকার যে অংশটিতে এরিয়া ফিফটি ওয়ানের অবস্থান তার বেশ ভালই একটা ইতিহাস আছে।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক যুগে এই জমির কিছু অংশ ছিল স্বরাষ্ট্র বিভাগের হাতে। ওখানে পশুদের জন্য সংরক্ষণ এবং অভয়ারণ্য  তৈরি করার একটা  বড় মাপের পরিকল্পনা ছিলকিন্তু সেই ভাবনা উল্ট পাল্ট হয়ে যায় যখন এক ‘অদ্ভুত’ উন্মাদ রক্তলোলুপ মানুষ অ্যাডলফ হিটলার ইউরোপে তার  ‘পেশী শক্তি’  থুড়ি অস্ত্রশক্তি প্রদর্শণ করতে শুরু করেন। যা থেকে ১৯৩৯ এ শুরু হয়ে যায় ২য় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৪১ এ ৭ই ডিসেম্বর জাপানিদের দ্বারা পার্ল হারবারের  ওপর ভয়ানক, মারাত্মক হামলার পরে  আমেরিকাকেও সেই যুদ্ধে যোগ দিতে হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে যে,  অনিবার্য ভাবেই তাদেরকে এ যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করতে হবেই কারন  হিটলারের বাহিনী ইউরোপের উল্লেখযোগ্য অংশকে এক অস্বাভাবিক গতিতে দখল করা শুরু করেছে। উপদেষ্টামন্ডলীর কিছু মানুষ ইঙ্গিত দেন যে, হিটলারের তালিকায় সম্ভাব্য পরবর্তী নাম      আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র হতেই পারে।   

সমুদ্র ঘেরা দ্বীপ হওয়ার কারণে তাৎক্ষনিক আক্রমণ থেকে বেঁচে গেলেও রাতের বেলায় জার্মান বিমান বাহিনীর আক্রমণ শুরু হয়ে যায়। পার্ল হারবারের ঘটনা এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাকাটাকে জোরের সাথে ঘুরিয়ে দেয়।  

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এটাই যে, সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কা ও সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য মার্কিন সরকার ইতিমধ্যেই কয়েকটি গোপন পদক্ষেপ নিয়ে নেয়।  

যুদ্ধের উপরোক্ত আশঙ্কার কথা ভেবে  বিভিন্ন নিত্য নতুন সুবিধা যূক্ত সামরিক জিনিসপত্র নিজেদের বাহিনীকে সরবরাহ করার জন্য  সারা দেশ জুড়ে তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই এই সব কাজ হতে থাকে গোপন স্থানে। এই সময়েই নেভাডায় চালূ হয়  টোনোপাহ বোম্বিং রেঞ্জ।  

আজ অবধি একটি বিতর্কের সমাধান হয়নি। ঠিক কতটা জমি জাতীয় সুরক্ষার নামে এরিয়া ফিফটি ওয়ানকে হস্তান্তর করা হয়েছিল ঠিক কত মানুষকে তাদের জমি জায়গা ফেলে বিতাড়িত হতে হয়েছিল তার ইয়ত্তা নেই।  

১৯৪০ সালের ২৯ শে অক্টোবর মার্কিন সরকার বেশি সাড়া শব্দ না করেই নেভাডার এক বিশাল পরিমাণ বাসযোগ্য জমি দখল করে। কারন দেখায়  টোনোপাহ বোম্বিং রেঞ্জ নির্মাণ। এর পর সময় যত গ্রায় সেখানে যুক্ত হতে থাকে নতুন নতুন সুযোগ সুবিধা। বদলাতে থাকে নাম।  টোনোপাহ জেনারেল রেঞ্জ, টোনোপা গানারি অ্যাান্ড বোম্বিং রেঞ্জ,  লাস ভেগাস জেনারেল রেঞ্জ ইত্যাদি ইত্যাদি। মরুভূমি প্রধান নেভাডা ক্ষনে ক্ষনে বদলাচ্ছিল তার রুপ।   

আর সেখান থেকে জন্ম নিল এই  বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময়, ‘কুখ্যাত’ এবং গুরুত্বপূর্ণ এক গোপনীয়তায় ভরা অঞ্চল । নাম, আপনারা ভাল করেই জানেন।

০০০০০

 দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অগ্রগতির সাথে সাথে এটি স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল অ্যাডলফ হিটলার আর তার নাজি বাহিনীকে খুব সহজে হারানো যাবে না । ফলতঃ, নেভাদায় সামরিক সুযোগ-সুবিধার আরও বিকাশ ঘটানো শুরু হল। চতুর্থ এয়ার ফোর্স বোম্বিং অ্যান্ড গানারি রেঞ্জ, টোনোপাহ আর্মি এয়ার ফিল্ড এবং ইন্ডিয়ান স্প্রিংস অক্সিলারি আর্মি এয়ার ফিল্ড তৈরি করা হল। 

১৯৪৫ সালে নাজিরা হেরে গেল। এবার মরুভূমির এই গোপন গবেষণাগারে এল ভাবনাগত     পরিবর্তন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর সময়ে দারুনভাবে কাজে লাগা বা বলা যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা কিছু বিভাগ একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হল। আর যা বন্ধ করা হল না, তাদের কাজের ক্ষেত্র সীমিত করে দেওয়া হল। আর এর সাথেই এই অদ্ভুত ক্ষেত্রের জীবন প্রবাহে এল নতুন দিকনির্দেশনতুন পরিবর্তনের হাওয়া।   

যুদ্ধ উত্তর সময়ে, টোনোপাহ এয়ার ফোর্স বেস এবং  লাস ভেগাস এয়ার ফোর্স বেস পেল নতুন ভূমিকাযার কৃতিত্ব দিতে হবে অ্যাটমিক এনার্জি  কমিশনকে। তাদের  পরিকল্পনাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার  অনুমোদন দিল। যার সুত্র ধরে  ১৮ই ডিসেম্বর ১৯৫০ সালে পুরানো নেলিস এয়ার ফোর্স গানারি অ্যান্ড বোম্বিং রেঞ্জ রূপান্তরিত হয়েছিল নেভাদা প্রুভিং গ্রাউন্ডেপ্রায় সাতশো বর্গমাইল স্থানীয় জমি এনপিজিকে দেওয়া হয়েছিল যাতে কাজটি দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।  জনগণের  প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে যায় ওই এলাকায়। এইভাবে অতি  সাবধানে এবং ধীরগতিতে অগণিত বর্গ মাইল জমি বাজেয়াপ্তকরণ শুরু চলতে থাকে। 

  নেভাদা প্রুভিং গ্রাউন্ডে  বাস্তবিক পক্ষেই  যা ঘটতে থাকে তাকে একই সাথে গ্রাউন্ডব্রেকিং এবং অশুভ দুটোরই তকমা দেওয়া যায়।  অনলাইন নেভাডা নোট অনুসারে, "২৭ শে জানুয়ারী,১৯৫১, থেকে  নেভাডা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোল্ড ওয়ারের কন্টিনেন্টাল নিউক্লিয়ার প্রভিং গ্রাঊন্ডে প্রিন্ট হল। কারন সেদিন একটা এক কিলোটন পারমাণবিক ডিভাইস বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেখা হল।   মার্কিন অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন (এইসি) ওনেক ভাবনা চিন্তা করে  নেভাডা টেস্ট সাইটটিকে  বেছে নিয়েছিল। একইসাথে বিজ্ঞান, জাতীয় নীতি, ভূ-রাজনীতি, সুরক্ষা এবং জনসংযোগ সব দিকে চিন্তা করতে হয়েছিল তাদের।

বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর জায়গাটি লাস ভেগাস থেকে  ছিল মাত্র পঁয়ষট্টি মাইল দূরে রেডিয়েশনের ব্যাপারে কী ভাবনা চিন্তা করা হয়েছিল কেউ জানে না। এরপর  পরমাণু বোমা পরীক্ষণ চলতেই থাকে। এসব নিয়েও কেউ [পড়ুন সাধারন মানুষ] মাথা ঘামায়নি বা বলা চলে জানতেই পারেনি। তবে ১৯৫৫ সালে এরিয়া ফিফটি ওয়ান বাস্তবিক পক্ষে তার কার্যকরী ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়। সে গল্পে পরে আসছি।

 আপাতত নেভাডায় টেস্ট অ্যান্ড ট্রেনিং নিয়ে আর কিছু কথা জানা যাক।

  ১৯৫৫ সালেরই ঘটনাজুলাই মাস।  কিংবদন্তি ইউ- টু গুপ্তচর বিমান গ্রুম লেকে NT & TR এর বিশাল রানওয়েতে উড়ান পরীক্ষা করে। যার ফলে এই রেঞ্জের ভিত্তির মাটি আরো পোক্ত হয়  বিমান উড়ানের ইতিহাসেটোনোপা টেস্ট রেঞ্জকে ঘিরে থাকা আরও জমি এই সূত্রে দ্রুত দখল করা হয়। ১৯৬০ এর দশক শুরু হয়ার আগেই পরিকল্পনা শুরু হয়ে যায় টোনোপাহ টেস্ট রেঞ্জ বিমানবন্দর এর বিশ হাজার ফুট দৈর্ঘ্যের সুবিশাল রানওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা থাকে সেখানে। কী উড়বে ওখান থেকে টেরেস্ট্রিয়াল নাক এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল কিছু? যাই উড়ুক এরকম কিছুর কথা এর আগে কেউ ভাবতেই পারেনি।

জমি দখলের গল্প কিন্তু ওখানেই শেষ হয়নি।  সবে শুরু হয়েছিল। এবার দখল হতে থাকে ভেতরের জমি।   ১৯৬১ সালে,  পূর্বে বিমান বাহিনী দ্বারা ব্যবহৃত প্রচুর জমি  তুলে দেওয়া হয় অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের হাতে।  এয়ার ফোর্সের উচ্চপদস্থ সব কর্তা ব্যাক্তি এই বিষয়টাকে ভাল চোখে দেখেননি। 

ভিয়েতনাম যুদ্ধে যে সমস্ত পাইলটদের ব্যবহার করা হচ্ছিল তাদের প্রশিক্ষণের প্রধান স্থানের ভূমিকা পালন করেছিল নেভাডা টেস্ট অ্যান্ড ট্রেনিং রেঞ্জ। ১৯৭০ এর দশকের শেষ দিক থেকে এই রেঞ্জের কর্মীরা কোন এক অত্যন্ত গোপন প্রোগ্রামের কাজ শুরু করেন। অত্যন্ত এই শব্দটি কিন্তু খুব মারাত্মক।  কর্মীদের প্রাথমিক কাজ ছিল এই রেঞ্জের ভেতর পরীক্ষা করা কিছু ‘দুর্ভাগ্যের শিকার হওয়া  "স্টিলথ" বিমান [?]এর ধ্বংসাবশেষ মাটির নিচে পুঁতে ফেলা।  সোভিয়েত মহাকাশ উপগ্রহগুলো যাতে কোন ভাবেই এই সব দূর্ঘটনাগ্রস্থ বিমানের ছবি তুলতে না পারে সেদিকে ছিল বিশেষ নজর । তার জন্য বুলডোজার ব্যবহার ওসব মরুভুমির নিচে ওদের পুঁতে ফেলতে হয়!!!  হাস্যকরভাবে, বয়ান দেওয়া হয় যে রাশিয়ানরা এই রেঞ্জের মধ্যে কী ঘটছে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলআর সেটা করতে গিয়েই নাকি   ১৯৮৪ সালে  একটি রাশিয়ান মিগ -২৩ বিমান ভেঙ্গে পড়ে সেটাকেই মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়।

০০০০০

 চলুন এবার  নেভাডা টেস্ট অ্যান্ড ট্রেনিং রেঞ্জের সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয়টাতে নজর বোলানোর সময় এসে গেছে। এরিয়া ফিফটি ওয়ান, যার টপ সিক্রেট ব্যাপার স্যাপারের কথা  প্রায় সবাই শুনেছেন, কিন্তু সম্ভবত কেউ আসল কথা জানেন না, যদি না তিনি ওই সেক্টরে কাজ করা মানুষ হন। এই মুহুর্তে, এই পৃথিবীর সিংহভাগের চেয়েও বেশিভাগ মানুষ একটা ঝলক অবধি দেখার সুযোগ পাননি ওখানকার।  চেষ্টা করা যাক এই দেখাটাকে একটু বদলানোর। অন্তত যতটা সম্ভব।   

 কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক  কর্মকর্তা রিচার্ড এম বিসেল জুনিয়র ১৯৬১ থেকে ১৯৬২ সাল অবধি  সুপার-সিক্রেট ন্যাশনাল রিকনেইস্যান্স অফিস বা এন আর ও এর প্রথম কোডিরেক্টর পদে অধিষ্ঠিত ছিলেনএই সংস্থা আমেরিকার স্যাটেলাইট বেসড  নজরদারি প্রযুক্তির বেশিরভাগটা দেখাশোনা করে। ১৯৫০ এর দশকের গোড়ার দিকে  এন আর ও তে নিজের কর্ম জীবন শুরু করার আগের সময়টাতে বিসেল অনুভব করেছিলেন, সোভিয়েতরা কী ঘোঁট পাকাচ্ছে  সে সম্পর্কে সতর্ক নজর রাখা দরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ ধরনের সুরক্ষার জন্য এক বিশেষ ধরনের বিমানের প্রয়োজন । যা একই সাথে খুব দ্রুতগামী হবে এবং অত্যন্ত উঁচু দিয়ে উড়তে পারবে । তারসাথেই সক্ষম হবে  গোপনে সোভিয়েত আকাশসীমায় প্রবেশ করে গুপ্তচরবৃত্তি করতে   আর সেই বিমান বানানোও হয়, লকহিড ইউ -২এই অপারেশনের কোড নেম  প্রজেক্ট অ্যাকোয়াটোন

  পৃথিবীর সব দেশ সব সময় একে অপরের সাথে একটা অদ্ভুত খেলায় মেতে রয়েছে। তার নাম গোপনীয়তার। সবাই এতে জিততে চায়। তার জন্য চলে নিত্য নতুন কৌশলের পরিকল্পনা।   মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য সূত্র জানিয়ে দেয়  সোভিয়েতদের গুপ্তচর তাদের দেশের প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই বসে রয়েছেঅতএব আপাতদৃষ্টিতে দারুন সুরক্ষিত কোন স্থানেই এই নতুন প্রকল্পর কাজ করা যাবে না। দরকার সম্পূর্ণ নতুন, বিশেষভাবে  নির্মিত কোন জায়গা। আর সেটাই করে দেখালেন বিসেল।

 উনি সবার আগে পুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্রের যত্ন সহকারে অধ্যয়ন করলেনখূঁজতে থাকলেন এমন কোন জায়গা যেখানে সহজে পৌঁছানো অসম্ভব।  স্বাভাবিক প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য দ্বারা   সুরক্ষিত এবং এটির আশেপাশের প্রেক্ষাপট এমনই যা দেখে  সেখানে কিছু করা হচ্ছে এরকম   ভাবনাই কারো মাথায় আসবে না।   

বিসেল যাদের সাথে কথা বলেছিলেন তাদের মধ্যে একজনের নাম  ক্লারেন্স "কেলি" জনসন।   অত্যান্ত দক্ষ বিমান ইঞ্জিনিয়ার এবং ডিজাইনারযার মাথা কাজ করেছিল ইউ-টু  এবং এস আর -৭১ ব্ল্যাকবার্ড বিমান নির্মানের পেছনে। এই মানুষটাই খুঁজে বার করেন সেই স্থান যা  বিসেল এবং সি আই এ খুঁজছিলেন 

জনসন বিসেলকে জানিয়েছিলেন নেভাডা টেস্ট অ্যান্ড ট্রেনিং রেঞ্জের বিশাল, শুকনো গ্রুম লেকের কথা। জন্ম নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল এরিয়া ফিফটি ওয়ানের।   

  যে স্থানের কথা  বলা হল সেখানে  মরণান্তক গরম, চূড়ান্ত রকম ধরনের অবসবাসযোগ্য এক এলাকা। শুকনো খটখটে মরুভূমি, শুকনো  ফুটিফাটা জমি এবং পাহাড় ছাড়া সেখানে কিছুই নেই।   জনসন এর নয়া নামকরণ করলেন প্যারাডাইস র‍্যাঞ্চ।  ১৯৫৫ সালের প্রথম সপ্তাহে শুরু হয়ে গেল হালচাল। এসে গেল সমীক্ষক দল। বিশাল একটি  রানওয়ে নির্মাণের সাথে যুক্ত বিষয় আসয় খতিয়ে দেখা শুরু হল। শুধু রানওয়ে বানালেই তো হবে না। সাথে কর্মক্ষেত্র ভবন, এক জোড়া সাধারন দর্শন বিমান  হ্যাঙ্গার এবং সাথেই  শ্রমিকদের থাকার জায়গাও বানানো হল। সেই সময় এরিয়া ফিফটি ওয়ানকে আমরা উত্তর মেরুর আউটপোস্টের মত একটা কিছুর সাথে তুলনা করতেই পারি। ফারাক শুধু এটা ছিল মরুভুমির ভেতর। কয়েক মাস যেতে না যেতেই সেখানে  খেলাধুলা করার জায়গার সাথে সাথেই স্থাপিত হল একটা ছোট সিনেমা হলরিয়া ফিফটি ওয়ান বাড়ছিল আকারে প্রকারে।

 এখানে কী হচ্ছে সে্টা রাশিয়ানরা  যাতে কোন ভাবেই জানতে না পারে সেটা নিশ্চিত করার    প্রতিটি মুহুর্তে সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিলসাইটে লোকের সংখ্যা ন্যূনতম রাখা হয়েছিল। কাউকেই খুব দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে থাকতে দেওয়া হত না।  শ্রমিকদের লকহিড প্ল্যান্ট থেকে নিয়ে আসা যাওয়ার গোপন ব্যবস্থা করা হয়েছিল। লাস ভেগাস থেকে মাত্র একশো মাইলের দূরত্ব কী  চলছে তা নিয়ে আলোচনা সর্বাধিক মাত্রার কঠোরতা দিয়ে  সীমাবদ্ধ করার ব্যস্থা হয়েছিল।

 ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে দুটি ঘটনার পর, একটি ছোট কিন্তু স্থায়ী সিআইএ টিম এর ঘাঁটি স্থাপন করে এবং  প্রথম ইউ – টু বিমান ওখানে নিয়ে আসা হয় বিরাট মাপের একটা কার্গো বিমানে চাপিয়ে, গোপনীয়তার মাত্রা আর বেড়ে যায়। এর কয়েক দিন পরেই,  লকহিড বারবাঙ্ক ফেসিলিতি আর এরিয়া ফিফটি ওয়ানের ভেতর শুরু হয়ে যায় বিমানের আনাগোনা।  

এর পরের বছরগুলিতে, চমকে দেওয়ার মতো নজির সৃষ্টিকারী কিছু বিমানের টেস্টিং হয় এখানে। যার ভেতর ছিল  ইউ – টু,  ব্ল্যাকবার্ড এবং এ –টুয়েলভ। মূলত, সোভিয়েত ন জরদারিকে ন্যূনতম রাখার উপায় হিসাবে ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন হাইলি ক্ল্যাসিফায়েড লেজিলেশন পাস করায়। যার সূত্রে অফিসিয়াল ক্লিয়ারেন্স বিনা ওই এলাকায়   আকাশসীমা ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। 

১৯৭০ এর দশক যখন গড়িয়ে চলছে  তখন এরিয়া ফিফটি ওয়ানের লোকেরা  মন দিয়েছে একটি দুর্দান্ত বিষয় উদ্ভাবনে। বিশেষ এক স্টিলথ প্রযুক্তিন এমন এক বিমান বানানোর চেষ্টা চলছে যা যে কোন রকম রাডারের নজর থেকে ব্যবহারিকভাবে অদৃশ্য থাকবে।

তৈরি হয়েও গেল  এফ -১১৭ নাইটহক, পরিচিতি   স্টিলথ ফাইটার নামে এবং নরর্থপ বি - টু স্পিরিট  ওরফে স্টিলথ বোম্বারএই সময় বাস্তবিক পক্ষেই এরিয়া ফিফটি ওয়ানের আকার দাঁড়িয়েছে ‘বিশালকায়’। অগুনতি বিমান  হ্যাঙ্গার, অসংখ্য ভূগর্ভস্থ ল্যাবযাদের প্রাকৃতিক সুরক্ষার বেষ্টনীতে ঘিরে রেখেছিল আশেপাশের পাহাড়  

 মিলিটারির কিছু উচ্চ স্তরের ব্যক্তিত্ব,  বিশেষ গোয়েন্দা বিভাগ এবং মার্কিন সরকার ছাড়া ১৯৫০ এর শুরু থেকে ১৯৮০ র দশকের শেষভাগ পর্যন্ত কেউই এরিয়া ফিফটি ওয়ানে ঠিক কী কাজ  চলছে কেউ জানতেই পারেনি। আশির দশকের শেষের দিকে  সব কিছু হঠাৎ বদলে গেল।  এরিয়া ফিফটি ওয়ান হয়ে উঠল একটা ফেনমেনন।  আর তখন থেকেই চিরস্থায়ীভাবে এর সাথে ইউ এফ ও শব্দটাও জড়িয়ে গেল।   

১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে জন্ম নিল কিংবদন্তিসেই বিশেষ রাতে রবার্ট স্কট ল্যাজার নামের এক  লাস ভেগাস মিডিয়া সুত্রে জন্ম দিলেন এমন এক ঝটকার। যাতে কেঁপে  উঠল এরিয়া ফিফটি ওয়ানের সাথে যুক্ত কর্মীবৃন্দ এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্তা ব্যক্তিরা।  

 লাজারের মতানুসারে মতে যিনি অবশ্য "ডেনিস" ছদ্মনামে কথা বলেছিলেন – তিনি ১৯৮৮ সালের শেষের দিকে এরিয়া ফিফটি ওয়ানের একটি সহায়ক এলাকায় কয়েক মাসের জন্য কাজ করেছিলেনযার নাম এস – ফোর। KLAS-TV টিভির টক-শো হোস্ট জর্জ ন্যাপ, মন দিয়ে শুনেছিলেন লাজারের গল্পঅস্বীকার করার উপায় নেই, তৎকালীন সময়ে সে গল্প ছিল গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতই । এমন কী আজও আমরা ল্যাজারের  কথাগুলো নিয়ে ভেবেই চলেছি। তার প্রমান আমার এই লেখা। 

ল্যাজার দাবি করেছিলেন, এরিয়া ফিফটি ওয়ানে কমপক্ষে নটি ভিনগ্রহী মহাকাশযান সংরক্ষণ করে রাখা আছে। যে গুলোকে অত্যন্ত গোপনে বৈজ্ঞানিদের একটি ছোট দল নিরন্তর  পরীক্ষা করে চলেছে। সে পরীক্ষায় সাফল্য বা ব্যর্থতার নানান মাত্রা  দেখেছে ল্যাজার। কারন সেখানে চেষতা হচ্ছিল বহিরাগত আপাত অবাস্তব প্রযুক্তিটিকে বোঝার এবং নকল করার নিশ্চিতভাবেই এই রহস্য ফাঁস করে দিয়ে ল্যাজার  হয়ে গিয়েছি্লেন কিছুটা ফাঁদে পড়া ইদুরের মত । যা মোটেই ভাল কথা নয়। 

১৯৮৯ সালে জর্জ ন্যাপকে  ল্যাজার যা দেখার দাবি করেছিলেন তা এরকম। ইউ এফ ও গুলোকে বিমান হ্যাঙ্গারের এলাকায় রাখা ছিল। যার কিছু একেবারে আদিম স্তরের। যতদুর তার মনে আছে  দুটো সামান্য ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল।   

ল্যাজার জানান  পরিস্থিতির গুরুত্বের বিশালত্ব উনি সেদিন স্পষ্ট করে বুঝতে পারেন, যেদিন তাকে, পৃথিবীতে বহিঃ জগতের সত্তাদের উপস্থিতি সম্পর্কে পড়ার জন্য হাই ক্ল্যাসিফায়েড ফাইল পড়ড়তে দেওয়া হয়।  সেখানে এলিয়েনদের সাথে ধর্মের সম্পর্ক, তাদের প্রযুক্তি, এলিয়েন শরীরের ময়নাতদন্তর প্রতিবেদন, চমকপ্রদ অমানবিক প্রযুক্তির নকল করার চেষ্টা সব বিষয়েই নোটস ছিল।  

 এসবের ভিত্তিতে অনুমান করে নেওয়া যেতেই পারে এরিয়া ফিফটি ওয়ান নিঃসন্দেহে এই গ্রহের  সবচেয়ে গোপনীয় এবং  বিতর্কিত একটি স্থান। 

০০০০০০


এরিয়া ফিফটি ওয়ানের কিসসা

ইউ এফ ও বিষয়ক একটি ফাঁস হওয়া নথি এবং ...

 

খুব অল্প সংখ্যক অফিসিয়াল ডকুমেন্টেশন এরিয়া ফিফটি ওয়ান বিষয়ে প্রকাশ্যে এসেছে তার ভেতর কিছু নথি আবার একটু বিশেষ ধরনের বলা যায় যাদের বলা যেতে পারে  ওই গোপন এলাকায় কাজ করতে থাকা কর্মীদের দ্বারা  ফাঁস হওয়া নথি যা ইউ এফ ও গবেষণাকারীদের হাতে আসে এসব নথির একটাই সমস্যা এগুলো আসল না নকল তার সঠিক কোন প্রমান নেই   

 ফাঁস হওয়া নথি নিয়ে কাজ করা সময়  ইউ এফ ও গবেষকদের সব সময় ভাবতে হয় যা পেলেন তা আসল নাকি সরকার থেকে ইচ্ছে করে তৈরি করা বিভ্রান্তি যা বোঝা প্রায় অসম্ভব 

 ১৯৯৪ সালে এরিয়া ফিফটি ওয়ান নিয়ে এ জাতীয় একটি দলিল পাওয়া যায় যা প্রমান দেয়   ঐ রহস্যময় স্থানে ঠিক কী ঘটছে তা বোঝা কতটা মুশকিল  

 নথিটি আসল হলে  এরিয়া ফিফটি ওয়ান সম্বন্ধে অনেক উল্লেখযোগ্য তথ্য সামনে আসবে যার ভেতর অবশ্যই ইউ এফ ও ক্র্যাশ হওয়া এবং তাদের ফিফটি ওয়ানের এলাকায় নিয়ে যযাওয়ার ব্যাপারটাও আছে আবার যদিও  মিথ্যে হয়, তাহলেও একটা প্রশ্ন কিন্তু সামনে এসেই যায় -    কেন  অভ্যন্তরীন সরকারী কর্মচারীরা এটা দেখাতে চাইছেন  অবিশ্বাস্য ইউএফও বিষয়ক কিছু  এরিয়া ফিফটি ওয়ানের ভেতর ঘটে চলেছে? 

 এই নথিটিকে অতি সাবধানতার সাথে অধ্যয়ন করেন গবেষক  পিতা-পুত্র ডঃ রবার্ট উড এবং রায়ান উড যারা বছরের পর বছর ধরে এই ধরনের  বিপুল সংখ্যক প্রশ্নচিহ্ন সম্বলিত নথির সত্যিটা জানার চেষ্টা করে চলেছেন  

 আনঅফিসিয়ালি এভাবে  প্রকাশিত নথিগুলির মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়টার কথা এবার বলা যাক   

সে এক দীর্ঘ নথি যা স্পেশাল অপারেশনস ম্যানুয়ালহিসাবে পরিচিত   

 ১৯৯৪ সালে আন ডেভেল পড ৩৫ মিমি ফিল্মের রুপে কুইলিনস ড্রাগ স্টোর থেকে  স্পেশাল অপারেশনস ম্যানুয়াল এস ও এম ১-০১  আসে লেখক এবং ইউ এফ ও গবেষক ডন বার্লিনারের কাছে ডেভেলপ করার পর দেখা যায় ওটা ১৯৫৪ সালের এপ্রিল মাসের এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল এন্টিটিজ অ্যান্ড টেকনোলজিস-রিকভারি অ্যান্ড ডিসপোজালশিরোনামের একটি ম্যানুয়াল   

 যা থেকে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে স্পষ্টত উদ্দেশ্য ছিল, যা ঘটছে তাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রন করতে হবে এবং জনসাধারণকে যেভাবেই হোক বোঝাতে হবে  সেই অর্থে গুরুত্বপূর্ণ কিছুই ক্র্যাশ হয়নি

 উড লক্ষ করেন যে, সন্দেহপ্রবণ প্রকৃতির ইউ এফ ও গবেষকেরা ওটা পড়ে মোটেই প্রভাবিত হননিতার কারণ ওই নথিতে থাকা পরস্পরবিরোধী বা বিতর্কিত তথ্য কেউ বলেন নথিটি সরকারী প্রোটোকল অনুসরণ করেনি উড অবশ্য এই সুত্রে বলেন এরিয়া ফিফটি ওয়ানের মত গোপন বিষয় যখন সংযুক্ত থাকে তখন  নির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনে চলার ব্যাপারটা অনেক ক্ষেত্রেই    অপ্রাসঙ্গিক বিবেচিত হয়এটা এমন কিছু বড় ব্যাপার নয়

ওই ডকুমেন্ট ডিসইনফর্মেশন বিশেষজ্ঞদের দ্বারা বানানো উন্নত মানের জালিয়াতি হতেই পারে যদি তাই হয় তাহলে সেক্ষেত্রে এরকম একটা বিষয়, প্রোটোকল, সংক্রান্ত ব্যাপারটা নিয়ে তারাও ভাববেন না এটা কী সম্ভব? তারা কী অতি বোকা যে এরকম একটা ব্যাপার বাকিদের মাথাতে আসতে পারে সেটা ভাববেন না?

 নথিটির মুল বক্তব্য এরকম। আমেরিকায় একটি  ইউ এফ ও ক্র্যাশের মত ঘটনা ঘটেতাকে ঢাকতে একটি কভার স্টোরি বানানো হয় ।  ওই  ইউ এফ ও আসলে একটা আমারিকার নিজস্ব হোম মেড স্পেস স্যাটেলাইট।   

কিন্তু এই যুক্তি মানার ক্ষেত্রে একটা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। প্রথম মহাকাশ উপগ্রহসোভিয়েত ইউনিয়নের স্পুটনিক ১ তখনো উৎক্ষেপণ হতে তিন বছর বাকি। তারিখটা মনে আছে নিশ্চয় পাঠক পাঠিকাদের। ১৯৫৭ সালের ৪ঠা অক্টোবর।

 আশা করি কী বলতে চাইছি আপনাদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। কিছু বিশেষ মিথ্যে ধামাচাপা দিতে একটা অন্য মিথ্যে বলা হয়েছে ওই নথিতে।

 এরিয়া ফিফটি ওয়ানের কিসসা যারা পড়েছেন তারা জানেন ১৯৫৫ সালে এরিয়া ফিফটি ওয়ানের তথাকথিত শিলান্যাস বা কাজ কর্ম শুরু হয় । কিন্তু এই বিশেষ নথি যদি সামান্যতম সত্যিও বলে থাকে তাহলে তার অনেক আগে থাকেই ওখানে কাজকর্ম শুরু হয়ে গিয়েছিল।

 কিন্তু স্যাটেলাইটের গল্পই ফাঁদা হল কেন? তার কারন সেই সময় মানুষের মনে এই স্যাটেলাইট বিষয়ক আলোচনার একটা সুত্রপাত ঘটেছিল। যে ভাবেই হোক জনগন আন্দাজ করেছিল স্যাটেলাইট জাতীয় কিছুর গবেষনা চলছে। টাইম ম্যাগাজিনে একটি আর্টিকলও প্রকাশিত হয় এ বিষয়ে।  সুতরাং জনসাধারণের মনে এ নিয়ে একটা ছবি তৈরি হয়ে ছিল, আর সেটাকেই সুকৌশলে ব্যবহার করা হয়।    

১৯৫৪ সালে এরিয়া ফিফটি ওয়ানের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল না এটা যদি ধরে নেওয়া হয়, তাহলে এই নথি যে জাল সেটাই মেনে নিতে হবে কিন্তু লাস ভেগাস রিভিউ জার্নাল এর একটি সংখ্যা থেকে একটা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে যা প্রমান দিচ্ছে ১৯৫১ সালে ইন্ডিয়ান স্প্রিং এর কাছে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিরাট মাপের কন্সট্রাকশন নির্মানের কাজ চলছে আমারা যে ধরনের পরীক্ষাগারের কথা জানতে পেরেছি এর আগের নিবন্ধ সুত্রে তাতে এটা বেশ ভাল পরিমাণ অর্থই বলা যায় যাদিয়ে ওইসব অনায়াসে নির্মাণ করা সম্ভব   

 প্রথমেই বলেছি এ পরস্পর বিরোধী তথ্য সম্বলিত নথি যাকে বিশ্বাস করা বেশ কঠিন কেন সেটা এবার দেখা যাক নথিতে মহাকাশযান বা অন্যান্য কিছুর একেবারে নিখুঁত বিবরণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিছু বিশেষজ্ঞদের মতে ১৯৫০ সালের রাডার ব্যবহার করে তা করা নাকি অসম্ভব। কিন্তু যেখানে উন্নত [এলিয়েন?] প্রযুক্তি নিয়ে কাজ হচ্ছে, সেখানে উন্নত রাডার থাকবে না এটাও বোধহয় মেনে নেওয়া যায় না অতএব ওই ম্যানুয়াল নথিকে বিশ্বাস করাই যায় সোজা কথায়  ইউ এফ ও বিশেষজ্ঞরা ঐক্যমতে আসতে পারেননি

 এই নথির  ছিল কভারে লেখা ছিল রেস্ট্রিকটেড শব্দটি। যা টপ সিক্রেট বিষয়ের সাথে মানানসই নয় বলেই দাবি একাধিক গবেষকের রেস্ট্রিকটেড শব্দটি যে ব্যবহার হয় না তা নয় তবে তাকে কনফিডেনশিয়াল শব্দর গুরুত্বের থেকে কম মাত্রার বলে মনে করা হয়। আসলে রেস্ট্রিকটেড বাসীমাবদ্ধশব্দের এরকম অর্থই হয় যে, নির্দিষ্ট কিছু মানুষ এতা ‘অ্যাক্সেস’ করতে পারবেন।   ম্যানুয়ালটির প্রকাশক  হয়তো সেটাই চেয়েছিলেন কারন টপ সিক্রেট কিছু নির্দেশ নামা ওখানে ছিল। 

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক।  ১৪ই জুলাই, ১৯৫৪, একটি মেমো যাচ্ছে  কাটলারের কাছ থেকে টোয়াইনিং এর কাছে। যার ট্যাগ, ‘টপ সিক্রেট রেস্ট্রিক্টেড সিকিউরিটি ইনফর্মেশন’।  যেখানে ন্যাশনাল সিকিউরটি কাউন্সিলের এম জে – ১২ বিষয়ক স্পেশ্যাল স্টাডিজ প্রোজেক্ট মিটিং  এর স্থান কাল পরিবর্তন করার আবেদন জানানো হয়েছে।   মেমোটির উৎস ন্যাশনাল আর্কাইভ এবং এটি প্রমান দিচ্ছে এম জে -১২র অস্তিত্বের  

এভাবেই, আসল হোক বা নকল এই অদ্ভুত নথি বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় দুলিয়েছে সবাইকেই। হাতে লেখা এই নথি দেখে কেউই কিন্তু এর আসল কপি খুঁজে দেখার চেষ্টা করেননি। কারন তারা বলেছেন যদি আসল টা খুঁজতে গিয়ে না পাওয়া যায়, তার অর্থ তো এটাই দাঁড়াবে এরকম কোন কিছুর অস্তিত্ব কোথাও ছিল না। অর্থাৎ না চাইলেও সবাই যেন মনে মনে বিশ্বাস করতে চেয়েছেন এরকম কিছু থাকুক।

তবে পাওয়া না গেলেই যে এরকম কিছু কোন দিন ছিল না তাও ভেবে নেওয়াটা ঠিক নয়। কারন আগে ছিল পড়ে নেই এরকম হয়েই থাকে। বিশেষ করে কোন ফাঁস হওয়া নথি যা থেকে জাতীয় সুরক্ষার পক্ষে প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে  এমন সম্ভাবনা দেখা দিলে আসল নথি অনেক সময় সরকার থেকেই নষ্ট করে দেওয়া হয় বা অতি গোপন ক্ল্যাসিফিকেশনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যা বাইরে আসার আর সুযোগই থাকে না। সোজা কথায় তাদের অদৃশ্য করে দেওয়া হয়।   

 একটা  কথা বলাই যায়, এরকম নথি আসল কিনা তা প্রমান করা খুব কঠিন। কিন্তু নকল বা জাল বলে দেওয়াটা খুব সোজা। আবার সত্যিই সেটা নকল কিনা তা প্রমান করা আরো কঠিন হয়ে যায় যদি তার পেছনে থাকে রহস্যমাখা এরিয়া ফিফটি ওয়ান।

 বিতর্কিত এই নথি বিষয়ে নিশ্চিতভাবে যা বলতে পারা যায় তা হ'ল, এটি এলিয়েন প্রযুক্তি নিয়ে অতি উচ্চমাত্রার গোপনীয় গবেষণা যে কয়েক দশক ধরে নেভাডায় চলছে বলে অনেকে বিশ্বাস করেন, তার দাবিগুলোকে আরও জোরদার করেকিন্তু তার সুত্র ধরে মহাকাশ থেকে আগত এলিয়েনদের গল্পগুলোর পেছনে দৌড়ানো সঠিক কাজ হবে কিনা সেটা বিতর্কের বিষয়।  

 যাইহোক এরপর খুব জলদি নিয়ে আসছি সেই এলিয়েনের গল্প

“কিংম্যান শহরের এলিয়েন রহস্য”

 


Saturday, July 11, 2020

জগন্নাথ মন্দিরের ইতিহাস - প্রথম অধ্যায়



জগন্নাথ মন্দিরের ইতিহাস

প্রথম অধ্যায়

মুসলিম শাসন কালে জগন্নাথ মন্দিরের ইতিহাস

নিয়ামত-উল্লাহ তার মাখযান-ই-আফগানা পুস্তকে লিখেছেন, কালাপাহাড় জাজপুরের দিক থেকে পুরীতে গিয়েছিলেন

 জগন্নাথ মন্দিরের দিনলিপি বা মাদলাপঞ্জী জানাচ্ছে,  কালাপাহাড়ের আগমনের কথা শুনে জগন্নাথ মন্দিরের প্রধান পরিচালক বা পারিছা জগন্নাথ মন্দির থেকে মূর্তি সরিয়ে নিয়ে চিলকা হ্রদের ভেতর অবস্থিত ছাপালাই হাতিপদ নামক দ্বীপে নিয়ে চলে যান

খুর্দায় পাওয়া একটি পান্ডুলিপি অনুসারে, খুর্দায়  কাছে  কোক্লো  গ্রামের গ্রামের প্রধান দনপাহন্ত সিং এর সাথে কালাপাহাড়ের দেখা হয় কালাপাহাড় জানতে চান, “উড়িষ্যা রাজ্যের প্রধান  দেবতা এই মুহূর্তে কোথায়?” দনপাহন্ত সিং তাকে বলে, কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে আমি জানি কালাপাহাড় তার নির্দেশ অনুসারে যায় এবং জগন্নাথের মূর্তিটি খুঁজে পায়এর সূত্রে পুরী জেলাতেই ওই বিশ্বাসঘাতক দনপাহন্ত সিংকে জায়গির দেওয়া হয়

মাদলা পঞ্জী অনুসারে জানা যায়, কালাপাহাড় সেই মূর্তি হাতির পিঠে চাপিয়ে নিয়ে চলে যান। সাথেই জগন্নাথ মন্দিরের সমস্ত সম্পত্তি লুট করেন। মন্দিরের অন্য বাকি মূর্তিগুলোকে ভেঙেচুরে নষ্ট করে দেন।  কল্পব্রত  গাছটিকে মাটি খুঁড়ে তুলে তাতে আগুন লাগিয়ে দেন।

নিয়ামাত-উল্লাহ এটাও লেখেন, সুলাইমান জগন্নাথ মন্দিরের ধ্বংসের দিকে মন দেন এবং তার সৈন্যদল নিয়ে সেখানে যান মন্দির ভেঙ্গে ফেলার আদেশের সাথে সাথেই  খুব সুন্দর করে বানানো সোনার যে কৃষ্ণ মূর্তি ছিল সেটাকে ভেঙে কোথাও ফেলে দিতে। ওই মূর্তির চোখে দুটো বাদাকশান রুবি বসানো ছিল। সেটা উপড়ে নেন তার আগে। শহরের নানা স্থানে আরো সাতটি সোনার মূর্তিকেও ভাঙা হয়।  তৎকালীন আকবরী ওজন অনুসারে পাঁচ মনের সমান ওজন ছিল সেগুলোর।  সেই সোনা অবশ্য সাথে করে নিয়ে যান। সেই সময় ওই এলাকার মানুষেরা পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারেননিযখন মুসলিম সেনারা আক্রমণ করে তখন ব্রাহ্মণ  মহিলারা নিজেদের সমস্ত রকম ধনসম্পত্তি গয়নাগাটি মণিমুক্তো ফেলে দিয়ে আশ্রয় নেন  জগন্নাথ মন্দিরে যখন তাদের কে জানান হয়, মুসলিমরা মন্দির আক্রমণ করতে আসছে, তারা মন্দির ভেঙে দেবে এবং তাদের বন্দী করে নিয়ে যাবে। তখন  অনেকেই এই আক্রমণের কথা বিশ্বাস করতে পারেননি অবাক হয়ে বলেছিলেন, “সেটা কী করে সম্ভব! তাদের ক্ষমতাই হবে না এই দেবতার কোন ক্ষতি করার।”  যার ফলস্বরুপ বিষ্ময়াহত চোখে তারা প্রত্যক্ষ করেন  কালাপাহাড়ের আক্রমণনিজেরা বন্দীও হন।  

 নিয়ামাত-উল্লাহ কিছুটা কল্পনার আশ্রয় নিয়েই জগন্নাথ মন্দিরের এই আক্রমণের ঘটনা লিখেছিলেন জগন্নাথের মূর্তি বানানো হত কাঠ দিয়ে সোনা দিয়ে নয় উড়িষ্যার মানুষেরা এতটাও বোকা ছিলেন না যে, তৎকালীন সমাজে মুসলিমদের আক্রমণ হতে থাকার  ঘটনা জানতেন না কারণ ১৫১১ তেই সুলতান হুসেন শাহ উত্তর উড়িষ্যার অনেক মন্দির ধ্বংস করেছিলেন

 আবুল ফজল এর বক্তব্য এক্ষেত্রে অনেকটাই সত্যের কাছাকাছি যায়কালাপাহাড়, সুলাইমানি কারনানির সেনানায়ক, ওই দেশ দখলের জন্য অগ্রসর হন ওখানকার মূর্তিগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে দেন এবং তারপর সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দেন

 বাদাওনির লেখনি অনুসারে, সুলাইমান বেনারস এবং উড়িষ্যার এলাকা দখল করে ওই স্থানকে মুসলিমদের বাসস্থানে পরিণত করেন

মাদলা পঞ্জীর লেখা অনুসারে,  কালাপাহাড় জগন্নাথের মূর্তিকে [দারু ব্রহ্ম] যতদুর জানা যায় গঙ্গা নদী অবধি নিয়ে এসেছিলেন। ওখানেই চেষ্টা করেন মূর্তিটাকে পুড়ানোর। আগুনের তাপে যখন সেই মূর্তির কাঠে ফাটল ধরে, তখন  আধপোড়া সেই মূর্তি ছুঁড়ে ফেলে দেন গঙ্গার জলেএকজন মুসলিম আমির সেটাকে নদী থেকে তুলে নেন এবং নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখেন বেসরা মহান্তি নামের এক বৈষ্ণব সাধু  কালাপাহাড়ের পিছু নিয়েছিলেন উনি সেই পুড়ে যাওয়া মূর্তি আমিরের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন এবং সেটাকে অত্যন্ত গোপনে নিয়ে যান কটক জেলার কুজাঙ্গে।   

গ্রন্থ সুত্র

দ্য কারনানি অ্যান্ড লোহানি রুল ইন বেঙ্গল – এন বি রায়, বেঙ্গল পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট, ভলিউম  ৭২ পৃষ্ঠা ২২

আইন-ই-আকবরী ভলিউম ২, পৃষ্ঠা ১২৮

মুন্তাখাবুত তারিখ ২য় খন্ড পৃষ্ঠা ১৬৩

মাদলা পঞ্জী [প্রাচী সংস্করণ]


এটা কোন ভাবেই বিশ্বাস করা যায় না যে, কালাপাহাড় জগন্নাথের ওই ভারী মূর্তিটা বহন করে চিলকা হ্রদ এর এলাকা থেকে গঙ্গার তীর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন  এমন কি পবিত্র কিছুকে অপবিত্র করার কারনে  তার চটজলদি মৃত্যুও  ঘটেনি

 অতএব স্বাভাবিক মানসিকতা থেকে যে কথা মনে করা যেতে পারে, তাতে মনে হয় জগন্নাথ দেবের মূর্তিকে কুজাঙ্গের কাছেই কোন সমুদ্রতীরে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় এই তত্ত্বকে সমর্থন করার জন্য বেসরা মহান্তির ওই সময় কুজাঙ্গে অবস্থানকে ধরে নেওয়া যেতে পারে

 আঠারো শতকের শেষের দিকে দানাই দাস বিষ্ণু জগন্নাথ দেবের মূর্তি পোড়ানোর একটি ঘটনা তার    তার গোপী ভাষা [ বিষ্ণু প্রতিমা আনালে দাহিলু] নামক কবিনর শুরুতে লেখেন। এটা  সেই সময়ের কথা যখন খুর্দার   রাজা ছিলেন রামচন্দ্রদেব যার কথা এই সময় থেকেই বেশি করে মানুষের সামনে আসে রামচন্দ্র দেব গঞ্জাম জেলার উত্তর দিকে এবং পুরী জেলার দক্ষিণ প্রান্তে একটা ছোট্ট রাজ্যের শাসক ছিলেনখুর্দা ছিল তারই রাজধানী

 জগন্নাথ মন্দিরের দিনলিপি বলছে, নবম অঙ্ক বা স্থানীয় হিসাব অনুসারে সপ্তম বর্ষের রাজত্বকালে  রামচন্দ্র দেব   সেই দারুব্রহ্ম বা পবিত্র মূর্তিটিকে কুজাঙ্গ থেকে নিয়ে আসেন এবং খুর্দায় তার অনুকরণে  নতুন মূর্তি বানিয়ে স্থাপন করেন। একাদশ [দশম হওয়াই উচিত] অঙ্কে পুরীতে  এই মূর্তি জগন্নাথ দেবের মন্দিরে স্থাপন করা হয়কর্কটকের ১৮ তম দিনে, ১৭ জুলাই ১৫৭৫ সালে, উৎসাহ-উদ্দীপনা উৎসবের সঙ্গে   এই বিশেষ অনুষ্ঠান হয়েছিল

 বলা হয়ে থাকে রামচন্দ্রদেব মোঘল সেনানায়ক খান--খানান মুনিম খান দ্বারা দাউদের পরাজয়ের সুযোগ নিয়ে জগন্নাথ দেবের মন্দিরে এই মূর্তি স্থাপন করেনমাদলা পঞ্জীর এই তথ্যকে মেনে নেওয়ার জন্য আরো কিছু সঠিক প্রমাণের প্রয়োজন আছে। কুতলু খান লোহানী, যার তত্ত্বাবধানে দাউদ আকবরের শাসনকে অস্বীকার করার ঘোষণা করেন লোহানী এই সময়টাতে জগন্নাথ দেবের এলাকা এবং তার আশেপাশের এলাকায় নিজের কর্তৃত্ব চালাচ্ছিলেন

১২ এপ্রিল ১৫৭৫ সালে দাঊদ একটি সন্ধি চুক্তি করেন মুনিম খানের সাথে।  তাবাকাত- ই- আকবরী থেকে জানা যায় এই সূত্রেই উড়িষ্যার শাসন ক্ষমতা তার হাতে  চলে যায়

 কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই যে দাউদ বা কুতলু ১৫৭৫ সালের জুলাই মাসে জগন্নাথ দেবের মন্দির সংস্কারের  অনুমতি দিয়েছিলেন মাত্র দশ বছরের কম সময় আগেই আফগান সেনারা সেই মন্দির ধ্বংস করে দিয়ে গিয়েছিল

 রাজা টোডরমল যিনি মোঘল সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় সেনানায়ক ছিলেন, তিনি নাকি জগন্নাথ মন্দির সংস্কারের কথা চুক্তির মধ্যে রেখেছিলেন কিন্তু দুটো তথ্য এই কথাকে সমর্থন করে না এক,   আবুল ফজল বা নিজাম-উদ্দিন যিনি তাবাকাত-ই- আকবরের লেখক, জগন্নাথ দেবের মন্দির এর এই সংস্কার কার্যের টোডরমলের সমর্থনের কোনো তথ্য লিখে রেখে যাননিদুই,    রাজা টোডরমল শান্তি চুক্তিটির নিয়ম নীতি স্থির করেননি। যেটা ১৫৯১ সালে রাজা মানসিংহ উড়িষ্যায় মুঘলদের শাসনকালে করেছিলেন বাস্তবিক পক্ষে টোডরম্লের সঙ্গে কোনো রকম আলোচনা না করেই মুনিম খান দাউদের সঙ্গে সন্ধি চুক্তি করেছিলেন

 এরপর দাউদ আবার বিদ্রোহ করেন খান--জাহান এবং রাজা টোডরমলের বিরুদ্ধে   ১৫৭৬ সালের যুদ্ধে তিনি হেরে যান এবং তার মৃত্যুদণ্ড হয় মুঘলদের শাসন উড়িষ্যাতে খুব সামান্য সময়ের জন্যই ছিল ১৫৮০ সালে আফগানরা উড়িষ্যার মোঘল গভর্নর   কুইয়া খানকে হত্যা করে  মোঘল এবং আফগানদের ভেতরে উড়িষ্যা কে নিয়ে যুদ্ধ চলে ১৫৮৪ সাল অবধি।   তারপরে একটি সন্ধিচুক্তি দ্বারা উড়িষ্যা কুতলু খানের দখলে আসে এরকম কোন প্রমাণ নেই যে, কুতলু খান জগন্নাথ দেবের উপাসনা করার অনুমতি দিয়েছিলেন।    সোজাসুজি ভাবে এটাই ধরে নেওয়া যেতে পারে,    সমর্থনযোগ্য তথ্য থাকা সত্বেও,    দাউদ এবং কুতলু খান লোহানীর শাসনকালে পুরীতে জগন্নাথ দেবের মন্দিরে তার উপাসনা হতো না

 এর সূত্র ধরে অবশ্য রামচন্দ্র দেবের গজপতি উপাধি, যা উড়িষ্যার স্বাধীন রাজারা গ্রহণ করতেন, নেওয়াটা কোনও রকম প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়ছে না।   তার শাসন কালের নানান সূত্র নানান জায়গায় লিপিবদ্ধ আছে। হিন্দি এবং ওড়িয়া ভাষায় লেখা ১৫৮৭ সালের একটি দ্বিভাষিক পান্ডুলিপি  থেকে জানতে পারা যায় ১৫৮৭ সালের অর্থ ২৪ অঙ্ক।   রাজার নাম সেখানে উল্লেখ নেই কিন্তু আমরা তাকে খুর্দার রাজা রামচন্দ্র দেব হিসেবেই ধরে নিতে পারিশ্রীজংগ এবং বালাসোর জেলা থেকে পাওয়া দুটি পাণ্ডুলিপিতে  রামচন্দ্র দেবকে ‘শুদ্র গজপতি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে তার ২৮ থেকে ৩০ বছরের স্থানীয় রাজত্বকালের উল্লেখ মিলছে।   

 আফগানরা উড়িষ্যাতে রাজত্ব করে ১৫৬৮ থেকে ১৫৮৯   সাল পর্যন্ত এই সময়ে রাজা মানসিংহ উড়িষ্যা অভিযানে যান সীমানা পার হয়ে মুঘল সেনাবাহিনীকে আটকাতে আসেন কুতলু খান এবং মৃত্যুবরণ করেন তার উজির ইসা খান শান্তির চুক্তি করতে বাধ্য হন আর সেই চুক্তির একটা অংশ ছিল জগন্নাথ মন্দির এবং তার আশেপাশের সমস্ত এলাকাকে বিশেষ স্থান বলে ঘোষণা করা হবে

তথ্যসূত্র

লেজেন্ড অ্যান্ড হিস্ট্রি [ওড়িয়া] – ডঃ কে সি পানিগ্রাহি পৃষ্ঠা ৬৮

তাবাকাত-ই-আকবরী ভলিউম ২ পৃষ্ঠা ৪৩১

বাইলিঙ্গুয়াল স্টোন ইন্সক্রিপশন অফ দ্যা বারিপদ মিউজিয়াম – এস দে, ও এইচ আর জে ভলিউম ৩ পৃষ্ঠা ৯৪

শ্রীজং ইন্সক্রিপশনস – এস পটনায়েক – জার্নাল অফ ওড়িষ্যা  অ্যাকাডেমি, মে ১৯৪০

আকবর নামা


পূর্বোক্ত সুত্র থেকে বোঝা যাচ্ছে ১৫৮৯ সালের সন্ধির পরেই মন্দির সংস্কার করা হয় এবং জগন্নাথ মূর্তি স্থাপন করা হয়,  ১৫৭৫ সালে নয়যা মাদলা প ঞ্জীতে বলা হয়েছে আবুল ফজল লেখেন,  মানসিংহ চলে যাওয়ার পর আফগানরা পুনরায় মুঘলদের শাসনকে অমান্য করে এবং জগন্নাথ মন্দিরকে উপাসনা অযোগ্য করে দেয়১০০০ হিজরী সন [১৫৯১-৯২],   মানসিংহ আবার উড়িষ্যায় আসেন আফগানরা পরাজিত হয় এবং পুনরায় ওড়িষ্যা মুঘলদের হাতে যায় মানসিংহ, খুর্দার রাজা রামচন্দ্র দেবের ক্ষমতা কমাতে চান কিছু আফগান আমীরকে উনি  আশ্রয় দিয়েছিলেন এই অজুহাতে।

 এবার আমরা আবুল ফজলের কিছু লেখা পড়ে দেখতে পারি যেখানে উনি তার প্রভুর[আকবর] পক্ষ নিয়েই লিখেছেন রাজা [মান সিংহ] রামচন্দ্রকে ডেকে পাঠালেন কিন্তু উনি এলেন না এর ফলে একটা অন্যরকম সমস্যার সৃষ্টি হলখুর্দার   উদ্দেশ্যে পাঠানো হলো সেনাবাহিনী“এই কথা শুনে সম্রাট রীতিমত রেগে গেলেন এবং এর বিরুদ্ধে নিজের আদেশ প্রেরণ করলেন যে কথা ভিত্তিতে রাজা মানসিংহ তার সেনা ফিরিয়ে নিলেন এবং ক্ষমা চাইলেন।  রামচন্দ্রদেব সম্রাটের এই মহানুভবতা দেখে নিজের শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন।     ২১ বাহমান[ হিজরি ক্যালেন্ডারের ১১ তম মাস] দিনে উনি রাজা মানসিংহের সঙ্গে দেখা করলেন এবং অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে তার সাথে ব্যবহার করলেন মান সিংহ।”  আকবর সম্ভবত উড়িষ্যার হিন্দুদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার রাখতে চেয়েছিলেন এবং রামচন্দ্র দেবকে সেই জন্য সহায়তা করেছিলেন জগন্নাথ মূর্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে এটা একজন হিন্দু প্রধান এর উদ্দেশ্যে সম্রাটের মহানুভবতার পরিচয় তো অবশ্যই

 বুদ্ধিমান রাজা মানসিংহ আকবরের আচরণ দেখে নিজের কলাকৌশল বদলে ফেলেন বুঝতে পারেন রামচন্দ্র দেব আকবরের স্নেহের বা বিশেষ বিশ্বাস ভাজনের তালিকায় আছেন এরফলেই   মানসিং দ্বারা রামচন্দ্র দেব জগন্নাথ মন্দিরের অভিভাবক হওয়ার দায়িত্বও পান

রামচন্দ্রদেবের ১২ অঙ্ক বা শাসনকালীন বছরে তেলিঙ্গার এক ব্যক্তি, মান কুন্ডদেব,  দিল্লির বাদশাহর উদ্দেশ্যে নিজের ক্ষোভ জাহির করেন বাদশা, রাজা মানসিংহ পাঠান   যে এই মুহূর্তে উড়িষ্যার নেতাকে কে সেটা তদন্ত করে দেখে আসতে।  তাকেই রাজা বলে ঘোষণা করে আসার নিরদেশো দেন তিনি । মানসিংহ উড়িষ্যাতে আসেন মান কুন্ডদেবের ছেলের সঙ্গেরাজা  রামচন্দ্র দেব তার সঙ্গে দেখা করেন

 চন্দন যাত্রা যখন অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, তখন ওখানকার পুরোহিতরা রাজা মানসিংহকে জিজ্ঞেস করেন গদি প্রসাদ [যা বিশেষভাবে দেবতার উদ্দেশ্যে অর্পণ করা হয় সেই প্রসাদ] কাকে দেওয়া হবে?  মানসিংহের বলেন, “প্রসাদ এখানে  নিয়ে আসুন।”   সেই প্রসাদ যখন তারা নিয়ে আসেন, মানসিং সেটা রামচন্দ্র দেবের হাতে তুলে দেন এভাবেই উড়িষ্যার রাজা হিসাবে রামচন্দ্রদেবকে তিনি স্বীকৃতি দেন যদিও এটা একটা নেহাতই সাম্মানিক স্বীকৃতি ছিল, তবু এই সূত্রেই রামচন্দ্রদেব জগন্নাথ মন্দিরের অভিভাবক পরিণত হন

 মাদলা পঞ্জী থেকেই জানতে পারা যাচ্ছে,  রাজা মানসিংহের  মহিষী গৌরী মহাদেবী জগন্নাথ মন্দিরের সঙ্গে সংযুক্ত এলাকায় মুক্তি মণ্ডপ নির্মাণ করে দেন।    হিস্ট্রি অফ ওড়িষ্যা গ্রন্থে স্টিরলিং জানাচ্ছেন,  ১৫৯১ সালের সময় রাজা মানসিংহ একটি অজানা সূত্র থেকে রাজস্ব আদায় করতেন  এই থেকেই সম্ভবত অনুমান করা যেতে পারে রামচন্দ্রদেব কে আসলে সাড়ে তিন হাজারী মনসবদার   নিযুক্ত করা হয়েছিল

জগন্নাথ  মন্দির মুঘল সাম্রাজ্যের সময়ে সবচেয়ে বিখ্যাত হিন্দু মন্দির পরিণত হয়েছিল এমনকি মুসলিমরাও এটা বিশ্বাস করতেন যে জগন্নাথ দেবের অসাধারণ কিছু ক্ষমতা আছে মাখযান-ই- আফগানাতে, যা জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে সম্ভবত লেখা হয়েছিল, সেখানেও এইরকম সবকথার উল্লেখ পাওয়া যায় জগন্নাথ মন্দির ধ্বংস করার পর সেখানে কি ঘটেছিল নিয়ামত-উল্লাহ সেইসূত্রে লেখেন, “যারা ওই মন্দিরের মূর্তিগুলো তুলে নিয়ে গিয়েছিল তাদের জীবনে নেমে আসে দুর্ভাগ্যতারা   নানারকম সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ে ওদের মধ্যে কেউই নাকি আর এক বছরের বেশি বাঁচেনি

হাফত-ইকলিম বা সপ্ত ঋতুর লেখক আহমেদ রাজি তার লেখায় লিখেছেন, যা লেখা হয়েছিল আকবরের শাসনকালের একবারে শেষ মুহূর্ত অথবা জাহাঙ্গীরের শাসনকালে শুরুতে, পুরুষতম গ্রামে একটা মন্দির ছিল সেখানে একটি অসাধারণ মুহূর্ত ছিল যে মূর্তিকে সবাই বলতেন জগন্নাথ ভারতের মানুষেরা জগন্নাথ এর উপর অসম্ভব পরিমানে বিশ্বাস করেন এই মন্দিরে এসে হিন্দুরা তাদের রক্ত দান করেন এবং প্রয়োজনে   সেই রক্তদান করা হয় জিভ কেটে।  এরপর যখন সেই  ক্ষত স্থান মূর্তিতে ছোঁয়ানো হয় সঙ্গে সঙ্গে সেই ক্ষত সেরে যায় বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী কেউ যদি ওই মূর্তির সঙ্গে অসম্মান জ্ঞাপক  আচরণ করে তাহলে তার তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয়

তথ্যসুত্র

ওড়িষ্যা হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ জার্নাল, আসগর আলি, ভলিউম ২ পৃষ্ঠা ৮১-৮২

ট্র্যাভেলস অফ ট্যাভারনিয়ের, পৃষ্ঠা ৪৩২

আকবর নামা


 

বর্তমান গ্রন্থ লেখকের পিতামহ লোকমুখে প্রচলিত এরকম একটি গল্প সংগ্রহ করেছিলেন। নিশাপুরের মৌলানা লুতফুল-উল্লাহ তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে জগ্ননাথ দর্শনে গিয়েছিলেন। ব্রাহ্মণদের তারা রাজি করান একবার মুর্তিটা দেখতে দেওয়া জন্য। অবশ্যই এই শর্তে যে তাদের ভেতর কেউ কোন রকম অসম্মান প্রদর্শন করবেন না। মৌলানার দলবল মন্দিরের ভেতর প্রবেশ করার খানিকক্ষণ বাদেই দলের এক সদস্য মূর্তি লক্ষ্য করে থুতু নিক্ষেপ করেন। সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু হয়। মৌলানা এই ঘটনা দেখে বিষ্ময়াহত হয়ে গিয়েছিলেন। একটা অনড় পাথরের মূর্তির এরকম ক্ষমতা কি করে সম্ভব?

উনি এই প্রশ্নের উত্তর পান নজফের পবিত্র মহজিদে গিয়ে। ওখানে তাকে কেউ একজন জানান, “জগন্নাথের এই মহা শক্তির উৎস সেই সমস্ত মানুষ যারা তাকে বিশ্বাস করেন। তাদের সামগ্রিক শক্তি ওই মূর্তির ভেতর সমাবদ্ধ হয়ে আছে। সময়ে সময়ে তার বহিঃপ্রকাশ হয়।”

রিয়াজ-আস-সালাতিন এর লেখক তার কল্পনাশক্তির পরিচয় দিয়েছেন এরকমই একটি লেখায়। “জগ্ননাথ, হিন্দুদের একটি সুবৃহৎ মন্দির, অবস্থান ওড়িষ্যা সুবাতে। বলা হয়ে থাকে হিন্দুরা জগ্ননাথের অর্চনা করার জন্য আগে পারুস্তম গ্রামে যান । সেখানে তারা মহান সন্ত কবীরের বাড়ির দরজার কাছে নিজেদের মস্তক মুন্ডন করেন। এই কবীর ছিলেন তাঁতির সন্তান। সেখানে তারা খাবার ও জল গ্রহণ করেন। যাকে ওই স্থানের ভাষায় বলা হয় ‘তোরানি’। এই কাজ করার পর ওরা জগ্ননাথের উপাসনা করার জন্য এগিয়ে যান। একমাত্র এই পারুস্তম গ্রামেই হিন্দুরা মুস্লমান বা অন্যান্য জাতের মত এক পাত্র থেকে সবাই খাদ্য গ্রহণ করেন। যা আর কোথাও দেখা যায় না। এখানকার বাজারে নানা রকম রান্না করা খাবার পাওয়া যায়। যা কিনে হিন্দু ও মুসলমানেরা একসাথে বসে খান। পানীয়ও গ্রহণ করেন।”

[পুরীতে কবীর পন্থীদের একটি ছোট মঠ আছে । ওড়িয়া ভাষায় তোরানি মানে ভাতের ফ্যান। ]

পুরীতে জাতপাতের ভেদাভেদ না করে একসাথে বসে খাওয়ার এই রীতির উল্লেখ মেলে ১৭৯০ সালে লেখা আই ক্রফোর্ডের লেখা বই “হিস্ট্রি, রিলিজিয়ন অ্যান্ড লার্নিং অ্যান্ড ম্যানার্স অফ হিন্দুস” পুস্তকের ৩৮ পৃষ্ঠায়।

এবার দেখা যাক দুই মুসলিম কবির লেখা দুটো হিন্দী কবিতার সুত্র, যেখানে জগ্ননাথ মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। শেরশাহের রাজত্বকালে মালিক মহম্মদ জৈসি  লিখেছিলেন ‘পদ্মাবতী’ ।  কবি তার নায়িকা  মেবারের রতনসিকে ওড়িষ্যা নিয়ে গিয়েছিলেন। উনি সেখানে দেবতার উপাসনা করেন । কবিতা সুত্রেই জানা যায় সেখানে “রিন্দা [রাঁধা] ভাত” বিক্রি হয়।

জাহাঙ্গীরের শাসনকালে গাজিপুরের কবি ওসমান একটি রহস্যময় ভালোবাসার কবিতা লেখেন ‘চিত্রাবলী’ নামে। সেই কবিতার একটি অংশ ‘জগন্নাথ খন্ড’। নেপালের রাজপুত্র সুজন রাই এর জাহাজডুবি হয় ওড়িষ্যার উপকুলে। উনি কোন মতে তীরে পৌছে এক স্নানরত ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞেস করেন, “এই এলাকার অধিপতি কে?” ব্রাহ্মণ ক্ষুব্ধ স্বরে জবাব দেন, “আপনি কী অন্ধ? এই এলাকার অধিপতি জগন্নাথ। যিনি সারা জগতের আলোক স্বরুপ। যাকে সারা পৃথিবীর মানুষ অর্চনা করেন। যার পদস্পর্শে সমস্ত পাপ বিলীন হয়ে যায়।” নেপালের রাজপুত্র জগন্নাথ মন্দিরে গিয়ে দেবতার অর্চনা করেন।

যাই হোক আবার আমরা বাস্তব ইতিহাসের পাতায় ফিরে আসি। জাহাঙ্গিরের শাসনকালে জগন্নাথ মন্দিরকে অনেক ঝড় ঝাপটা সহ্য করতে হয়। কারন  সম্রাট দক্ষিন ওড়িষ্যাতে সাম্রাজ্য বিস্তার করবেন ঠিক করেন। ওড়িষ্যার মোঘল সুবাদারেরা একের পর এক আক্রমণ চালান মন্দির সংলগ্ন এলাকায়। ১৬০৭ সালে ওড়িষ্যাকে যখন সুবা বলে ঘোষণা করা হয়, তখন হাসিম খানকে এর সুবাদার নিযুক্ত করা হয়।

কেসোদাস মারু নামের এক রাজপুত প্রধান তার রাজত্বকালে জগন্নাথ মন্দির আক্রমণ করেন। মির্জা নাথান নামের এক সমকালীন লেখক তার ‘বাহারিস্তান-ই-গাইবি’ নামক পুস্তকে এই আক্রমণে বিবরণ লিখে গেছেন।

“কেসোদাস মারু আর তার সাথীরা তীর্থযাত্রীর ছদ্মবেশে মন্দিরের ভেতর প্রবেশ করেন এবং গায়ের জোরে মন্দির দখল করেন। মন্দিরে থাকা প্রায় দুই থেকে তিন কোটি টাকা মূল্যে সম্পত্তি লুঠ করেন এবং ব্রাহ্মণদের আরো ঢং সম্পত্তি নিয়ে আসার আদেশ দেন। এই সংবাদ পৌছে যায় রাজা পুরুষোত্তমের কাছে। উনি সিদ্ধান্ত নেন বর্ষা ঋতু শেষ হওয়ার আগে এবং রাজকীয় সেনানায়কদের আগমনের পূরবেই উনি কেসোদাস মারুকে আক্রমণ করবেন। খুর্দা থেকে দশ হাজার অশ্বারোহী, তিন চার লাখ সাধারন সেনা এবং অজস্র রথ নিয়ে উনি অগ্রসর হন। এক একটি রথে পাঁচশো থেকে হাজার মানুষ ছিল। যেগূলো দু তিন হাজার মানুষ টেনে নিয়ে গিয়েছিল।

“কেসোদাসের সেনারা কাপড়ের গোলকে আগুন লাগিয়ে ছুঁড়তে শুরু করেন। শতাধিক রথ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ইতিমধ্যে বাংলা থেকে কেসোদাসকে সাহায্য করার জন্য রাজকীয় সেনানায়কদের পাঠানো হয়। পুরুষোত্তম এবার ভয় পেয়ে যান। উনি সম্রাটের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ এবং তিন লক্ষ টাকা ‘পেসকি’ বা নজরানা রূপে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।”

তথ্যসুত্র

রিয়াজ-আস-সালাতিন, পৃষ্ঠা ১৮

বাহারিস্তান-ই-গাইবি, প্রথম খন্ড পৃষ্ঠা ৩৫-৩৮

খড়ের গাদায় সূচ খোঁজা আর এই কাহিনী থেকে সত্যি বুঝে নেওয়া একই ব্যাপার। খুর্দার রাজা পুরুষোত্তমের কাছে খুব বেশী হলে এক লাখ সৈন্য ছিল সে সময়। উড়িষ্যার সেনাবাহিনীতে রথের ব্যবহার হত না। খুর্দা থেকে পুরীর দূরত্ব মোটামুটি ৫০ মাইল। ফলে পদব্রজে যাওয়াটা কোনো বাপার না সেই সময়ের নিরিখে। এছাড়াও ওই লেখনীতে পাওয়া যায় জগন্নাথ মন্দির ঘিরে এক দেওয়াল ছিল যা তাকে দুর্গের মত রক্ষা করত। এটাও ভুল।

মাদলা পঞ্জী, প্রাচী সংস্করণের ৬৫ পাতা থেকে যা জানা যায় তা অনেকটাই বিশ্বাসযোগ্য। কেসোদাস মারু পুরীতে তীর্থ যাত্রা করতে এসেছিলেনএই সময় জগন্নাথ দেবের অধিষ্ঠান ছিল গুন্ডিচা মন্দিরে। সেখানে স্থিত তিনটি দেব রথ কেসোদাস পুড়িয়ে দেন এবং একটা পাল্কিতে করে জগ্ননাথের মূর্ত্রকে নিয়ে যান মূল মন্দিরে। তারপর সেই মন্দির এক মাস ধরে অবরুদ্ধ করে রেখে দেন। এরপর খুর্দার রাজার সাথে তার সন্ধি চুক্তি হয়

মাদাল পঞ্জীর বিবরণ থেকেই জানা যাচ্ছে, হাসিম খান পুরী আক্রমণ করেন এবং মন্দির থেকে জগ্ননাথের মূর্তি বার করে দেন। বাহারিস্তান-ই-গাইবি অনুসারে, খুর্দার রাজা পুরুষোত্তম, কেসোদাস মারুর সাথে হওয়া চুক্তির কারনে দারুন ভাবে ভেঙে পড়েন। ১৬১১ সালের জুলাই মাসে রাজা কল্যাণকে হাসিম খানের বদলে উড়িষ্যার সুবাদার নিযুক্ত করা হয়। রাজা পুরুষোত্তম আশা করেছিলেন রাজা টোডরমলের ছেলে এ বিষয়ে তাকে সাহায্য করবেন, কিন্তু সে আশা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

[বাহারিস্তান-ই-গাইবির ৩৫-৩৮ পৃষ্ঠা অনুসারে, ১৬০৯ বা ১০ সালে এই অবরোধের ঘটনা ঘটেছিল। ১৬১০ সালের ১০ই এপ্রিল মুঘলদের তরফ থেকে ভালো কাজের নজরানা স্বরুপ একটি ঘোড়া পাঠানো হয় কেসোদাস মারুকে। জগন্নাথ মন্দিরে উপাসনা বন্ধ করে দেওয়ার সুত্রেই,   কোন আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে না এই শর্তে   তাকে চার হাজার অশ্বারোহী সেনা সাথে রাখার অনুমতি ও দেওয়া হয়।

জার্নাল অফ ইন্ডিয়ান হিস্ট্রির একাদশ খণ্ডর, ৩৯৬ পাতায় শ্রী রাম শর্মা জানিয়েছেন, কেসোদাস ১৫০০ অশ্বারোহী সেনা থেকে ২০০০ অশ্বারোহী সেনা রাখার স্তরে উন্নীত হন। যা ঘটেছিল জাহাঙ্গীরের শাসনকালের প্রথম বছরে।]

রাজা কল্যাণ, কেসোদাস মারুর সাজানো ছকেই হাঁটতে থাকেন। উনি খুর্দার সীমানা ধুলোয় মিশিয়ে দেন। কেসোদাস যে সমস্ত শর্ত আরোপ করেছিল সে সবই পুরুষোত্তমকে মানতে বাধ্য করেন। যার কারনে উনি নিজের মেয়েকে সম্রাটের হারেমে পাঠাতে বাধ্য হন এক বিপুল পরিমাণ অঙ্কের নজরানা সহযোগে। সাথেই তার হস্তীশালার সেরা হাতিগুলোকেও পাঠাতে হয় সম্রাটের সেনা ছাঊনিতে।

মাদলা পঞ্জীতে খুর্দার রাজার সাথে রাজা কল্যাণের এই গন্ডগোলের উল্লেখ থাকলেও একটা ভুল তথ্য লিপিবদ্ধ হয়েছে। ওই লেখা অনুসারে খুর্দার সেনাদের হাতে রাজা কল্যাণ নিহত হন ।

জাহাঙ্গীর তার স্মৃতি কথায় লিখেছেন, ১৬১৭ সালে রাজা কল্যাণ উড়িষ্যা থেকে ১৮টি হাতি নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু খুর্দার রাজকুমারীর হারেমে আসার কোন উল্লেখ সেখানে নেই।

 মুকাররম খান, যিনি রাজা কল্যাণের পর সুবাদার হন তিনি খুর্দার রাজার সমস্ত ক্ষমতাই কেড়ে নেন। সাধারন জমিদারে পরিণত করেন তাকে।

পঞ্জীর বিবরণ অনুসারে মুকাররম খান বেশ কিছু হিন্দু মন্দির ভেঙে দেন। তৎকালীন জগন্নাথ মন্দিরের পুরোহিতেরা পুনরায় দেব মূর্তি নিয়ে চিল্কা খাঁড়ি এলাকায় পালিয়ে যান।

১৬২৩ সালে বিদ্রোহী শাহজাহান দক্ষিন দিক থেকে উড়িষ্যাতে প্রবেশ করেন। এই সময় পঞ্জী অনুসারে পুরুষোত্তমের উত্তরাধিকারী হয়ে ছিলেন নরসিংহদেব। উনি শাহজাহানের পক্ষ নেন। শাহজাহানের সাথে থাকা রাজপুত প্রধান ভীম সিং মন্দিরে মূর্তি স্থাপনায় সাহায্য করেন। শাহজাহানের রাজত্বকালে জগন্নাথ মন্দিরে মুসলিমদের আক্রমণ হয়নি।  ১৬৩৬-৩৭ সালে  মন্দির ভালো ভাবেই সংস্কার করা হয় ।

তথ্যসুত্র

বাহারিস্তান-ই-গাইবি, পৃষ্ঠা ১৪৪-১৪৫

তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরি, পৃষ্ঠা ৪৩৩

জার্নাল অফ বিহার অ্যান্ড উড়িষ্যা রিসার্চ সোসাইটি, জে এন সরকার, সপ্তম খন্ড পৃষ্ঠা ৩৩৮

জার্নাল অফ বিহার অ্যান্ড উড়িষ্যা রিসার্চ সোসাইটি, জে এন সরকার, সপ্তম খন্ড পৃষ্ঠা ৪৩৫

 

১৬৬০ সালে আওরংজেব দ্বারা উড়িষ্যার সুবাদার নিযুক্ত হন খান-ই-দৌরান । এই সময় খুর্দার রাজা মুকুন্দদেবকে তার প্রকোপ সহ্য করতে হয়। তার সাথেই যারাই মূঘল শাসনের বিরোধিতা করেছিল তাদের শাস্তি পেতে হয়।

কেন্দ্রাপাড়াতে অবস্থিত বলদেব এর মন্দির ধ্বংস করেন  খান-ই-দৌরান এবং সেখানে একটি মহঃজিদ নির্মাণ করেন। কিন্তু জগন্নাথ মন্দিরে হাত পড়েনি। এর একমাত্র কারন এক বিপুল পরিমাণ কর সেখান থেকে আদায় হত।

১৬৭৬ সালে শায়িস্তা খান নতুন সুবাদার নিযুক্ত হন। পঞ্জী অনুসারে শায়িস্তা খানের পুত্র আবু নাসির জগন্নাথ মন্দির আক্রমণের উদ্দেশ্য নিয়ে পুরী রওনা দেন। কিন্তু পিপলির কাছে তার শিবিরে মুহুর্মুহ বজ্রপাত হয়। নাসির কটকে ফিরে যান। যদিও এই বিবরণের শক্তপোক্ত প্রমান মেলে না।

[বাহারিস্তান-ই-গাইবির লেখক নাথান শাহজাহানের দলে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি বিদ্রোভী সম্রাট পুত্রের সাথে খুর্দার রাজার সম্পর্কের কথা কিছু লেখেন নি।

রাজা মুকুন্দদেব ছিলেন এলাকা সমস্ত জমিদারদের মাথা। যার কথা বাকি জমিদারেরা মেনে চলতেন। তাকে দেবতার মত সম্মান দিতেন। তার কথা না মানাকে পাপ বলে মনে করতেন। এই কথা জে এন সরকার তার জার্নাল অফ বিহার অ্যান্ড উড়িষ্যা রিসার্চ সোসাইটি, জে এন সরকার, ২য় খন্ডতে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ১৯ শতকের কিছু নথি থেকে এটাও জানা যাচ্ছে উড়িষ্যার অনেক রাজা বা জমিদারই খুর্দার রাজাকে খুব একটা সম্মান দিতেন না।]

১৬৮৭ সালে এক্রাম খান নতুন সুবাদারের দায়িত্ব পান। তাবসিরাত-উল-মাইজিরিন থেকে উল্লেখ করে ডঃ রাজেন্দ্রলাল মিত্র জানাচ্ছেন, জগন্নাথ মন্দির আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিলেন সম্রাট আওরংজেব। মন্দির ভেঙ্গে দিয়ে মুর্তিটা তার কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। খুর্দার রাজা নবাব এক্রাম খানের কাছে জগন্নাথ মূর্তি সম্রাটের কাছে পাঠাতে রাজি হয়ে যান।  চন্দন কাঠ দিয়ে একটা মুর্তি বানিয়ে উনি পাঠিয়ে দেন। যার চোখে লাগান ছিল দুটি মূল্যবান পাথর। বিজাপুরে এই মূর্তি নিয়ে যাওয়া হয়সেখানেই ওই মূর্তি ভেঙে নষ্ট করে একটি মহঃজিদের ধাপ নির্মাণ করা হয়। 

মাদলা পঞ্জীতে এই ঘটনার উল্লেখ মিলেছে। “মুঘলদের কারনে রাজ্যে চরম সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। রাতের বেলায় সমস্ত মূর্তি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে চন্দন পুরে। নবাব এক্রাম খান তার ভাই মারস্তাম খান এবং পঞ্চাশ জন সেনা নিয়ে আক্রমণ করেন। প্রধান প্রবেশদ্বারের চুড়া এবং ভোগ মণ্ডপের ছাউনী ভেঙে দেয় তারা। কাঠ দিয়ে বানানো একটি জগন্নাথ মূর্তি তারা সাথে করে নিয়ে যান। নবাবের ভাই পবিত্র স্তম্ভটিকে ভেঙে দেন এবং মন্দিরের দরজা চিরকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়।”এ ঘটনা ঘটেছিল ১৬৯২ সালের মে মাসে। এই সময় থেকে পরের পনের বছর, আওরংজেবের মৃত্যু কাল অবধি, জগ্ননাথের মুল মূর্তি  চিল্কা হ্রদের এলাকায় বানপুরে লুকিয়ে রেখে দেওয়া হয় ।

১৭১৩ সালে, প্রথম মুর্শিদকুলি খাঁর জামাই সুজা-উদ-দ্দিন উড়িষ্যার ডেপুটি-সুবাদার নিযুক্ত হন। এই মানুষটি উদার মানসিকতার ছিলেন। ফলে জগন্নাথ মন্দির সংস্কারের অনুমতি প্রদান করেন।

১৭২৭ সালে সুজা-উদ-দীনের ছেলে তাকি খান তার পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। ইনি আবার এক্রাম খানের মতোই মানসিকতার মানুষ ছিলেন। সেই সময়ে খুর্দার রাজা দ্বিতীয় রামচন্দ্র দেবকে উনি গ্রেপ্তার করেন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহনে বাধ্য করেন।

বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে দ্বিতীয় রামচন্দ্র দেব ওরফে হাফিজ কাদির জগন্নাথ মন্দিরের দেখভাল চালিয়ে যেতে থাকেন ।

কিন্তু ইসলাম ধর্মে সাথে যুক্ত হওয়ার কারনে তাকে ধার্মিক সমস্যার মুখে পড়ে হয়। তাকি খানের রোষ থেকে বাঁচাতে জগন্নাথ মূর্তি আবার বানপুরে লুকিয়ে রাখা হয়। যা চলে যায় আথগড়ের জমিদারদের কাছে।

১৭৩৪ সালে তাকি খান মারা গেলে তার শালা দ্বিতীয় মুর্শিদ কুলি তার জায়গা নেন। জগন্নাথ দেবের মূর্তি মন্দিরে না থাকার কারনে বছরে নয় লক্ষ টাকা কর আদায় কমে গিয়েছিল। উপদেষ্টা মীর হাবিব, ডেপুটি সুবাদার দ্বিতীয় মুর্শিদ কুলিকে বলেন মূর্তি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে। পুরোহিতদের সেটাই জানানো হয়।

জগন্নাথ দেবের বার বার গোপন স্থানে যাওয়া এবার থামে। বাংলার সিংহাসন দখল করার পর, ১৭৪১ সালে  আলিবর্দী খান দ্বিতীয় মুর্শিদ কুলিকে পরাজিত করে উড়িষ্যা থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেন। মীর হাবিব মারাঠাদের সাথে যোগ দেয় এবং বাংলা আক্রমণের ছক কষে।

দ্বিতীয় রামচন্দ্র দেবের পুত্র বীর কেশরী দেব দ্বিতীয় মুর্শিদ কুলির পলায়নের সুযোগ নেন১৭৪৩ সালে যখন রঘুজী ভোঁসলে কটকের দিকে এগিয়ে আসতে থাকেন, তখন বীর কেশরী তার পেশকার বা দূত বাহাদুর খানকে উত্তর উড়িষ্যাতে পাঠান তার সাথে দেখা করার জন্য। বাহাদুর খান একটা ‘চিতাউ’ বা চিঠি পাঠান জগন্নাথ মন্দিরের পুরোহিত বা ‘সেবক’দের উদ্দেশ্যে। সেখানে উনি জানান মারাঠা আক্রমণ বিষয়ে তারা যেন অযথা ভয় না পান । নিয়মিত উপাসনাও যেন বন্ধ না হয়।

মুহম্মদ তাকি খান নিশ্চিত ভাবেই তার কবরের ভেতর নড়ে চড়ে উঠতেন, যদি জানতে পারতেন মাত্র দশ বছরের ভেতরেই একজন মুসলিম ডেপুটি সুবাদার জগন্নাথ মন্দিরের সংস্কারের আদেশ দিয়েছেন। কারন কর আদায় হচ্ছে না প্রভুত পরিমাণে। এবং জনৈক উচ্চপদস্থ মুসলিম কর্মচারী মহাপ্রভুর উপাসনা বন্ধ যেন না হয় তার নির্দেশ পাঠাচ্ছেন।

১৭৫১ সালে উড়িষ্যাতে মুসলিম শাসনের পাকাপাকিভাবে অবসান হয়। আলিবর্দি খানের সাথে মারাঠাদের চুক্তির মাধ্যমে। যদিও ১৭৫৯ সাল অবধি ডেপুটি সুবাদার পদে মুসলিম শাস্কদেরকেই দেখা গেছে।

১৭৬০ সালে সেও ভাট শাঠে উড়িষ্যার সুবাদার নিযুক্ত হন । এই সময় থেকে উড়িষ্যা চলে যায় মারাঠাদের হাতে।

তথ্যসূত্র

সীয়ার-উল-মুখতারিন পৃষ্ঠা ৪৯৮

রিয়াজ-আস-সালাতিন পৃষ্ঠা ৩০২-৩০৩

জার্নাল অফ বিহার অ্যান্ড উড়িষ্যা রিসার্চ সোসাইটি, জে এন সরকার, তৃতীয় খন্ড পৃষ্ঠা ৪২

মাদলা পঞ্জী [প্রাচী সংস্করণ] পৃষ্ঠা ৭৬

স্টাডিজ ইন হিস্ট্রি, আরকিওলজি অ্যান্ড আর্কাইভস – পি আচার্য, পৃষ্ঠা ২৪৩ 

০০০০০

History of the Jagannath Temple by Sir Hans Singer[editor]

এর  আমার করা অনুবাদ

[সম্ভবত মূল লেখাটি ১৯৫৮ সালে লিখেছিলেন অমর নাথ দ্বিবেদী]

 

*জলদি আসবে দ্বিতীয় অধ্যায় “ মারাঠা শাসনকালে জগন্নাথ মন্দিরের ইতিহাস”