Search This Blog

Monday, June 12, 2017

“রাতের ডাক”...[ ভৌতিক রোমাঞ্চ কাহিনী।]

  ভৌতিক রোমাঞ্চ কাহিনী।
“রাতের ডাক”...
[লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে পানকৌড়ি প্রকাশনের “একটু একটু গা ছম ছম” সংকলনে]
এই পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যার ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। আমি  নিজে একজন যুক্তিবাদী মানুষ।তাই এই কাহিনী প্রতাক্ষদর্শীর মুখ থেকে শুনেও বিশ্বাস করতে পারিনি। যার কাছে শোনা তিনি আমার খুব চেনা মানুষ। তার 

অনুমতি নিয়েই স্থান কাল পাত্র বদলে এটাকে কাহিনীর আকারে পেশ করলাম। বাকিটা আপনাদের ব্যাপার। - লেখক।
যদিও পেশায় ডাক্তার তবু সময় পেলেই ছবি আঁকে তিস্তা। তিস্তা চক্রবর্তী।। এই যেমন এখন আঁকছে।মরা চাঁদের আলোয় জমিদার বাড়ি। তিন মাস ধরে আছে এই অস্থায়ী আস্তানাটায়। এটা একটা আউট হাউস। আর তারই জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে শতাধিক বছরের পুরনো জমিদার বাড়িটাকে। এই আউট হাউসটা ওই জমিদারবাড়িরই অংশ। তৈরিও হয়েছিলো পারিবারিক চিকিৎসকদের থাকার জন্য। কিন্তু অজপাড়াগ্রামে ডাক্তার নিয়ে আসা হলেও থাকেনি কেও বেশী দিন। ভালো মাইনে পেলেও সম্ভবত বৈচিত্রহীন তার অভাবেই কেউ থাকেনি। এরপর সময় বদলেছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে।জমিদারী গেছে। গ্রামে গ্রামে তৈরী হয়েছে স্বাস্থ্য কেন্দ্র। নিয়মমাফিক তিস্তার মতো নতুন ডাক্তারদের আসতেও হচ্ছে এরকম গ্রামে। তবে বেশিদিন কোন ডাক্তারই এখানে থাকতে চায় না।  জমিদারবাড়িটা ফাঁকাই পড়ে আছে। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বংশধরেরা ছড়িয়ে গেছে দেশে বিদেশে। একাধিক অংশীদারের ঝামেলায় বাড়িটা বিক্রীও হচ্ছে না। যে তালাটা লাগানো আছে তার  চাবিটা বুড়ো মালির কাছে থাকলেও অনুমতি নেই ভেতরে ঢোকার।অবশ্য সেটা কেবল রটনা কিনা কে জানে। পুরোনো দিনের বাড়ি ফাঁকা পড়ে থাকলে যা হয় , লোকমুখে বেশ কিছু ভুতুড়ে কাহিনী তৈরী হয়েছে। যেগুলো ওই চিরাচরিত কাহিনীর মতই। নতুনত্ব কিছু নেই । বুড়ো মালি ছবিলাল অবশ্য বেশী কথা বলে না। তিস্তাকে একটাই কথা বলে ছিল এখানে আসার দ্বিতীয় দিনের মাথায় – রাতে যেই ডাকুক না কেন দরজা খুলবেন না দিদিমণি।
জীব বিজ্ঞানী বাবার মেয়ে এবং ডাক্তারি পড়ার সূত্রে তিস্তা যথেষ্টই শক্ত মানসিকতার মেয়ে। ফলে যখন এই  অজপাড়াগ্রামে ওকে যেতে হবে, এবং একা,  জানা গেল তখন ও সেটাকে চ্যালেঞ্জ হিসাবেই নিয়েছিল।মায়ের আপত্তি থাকলেও বাবার সম্মতি্তে খামতি ছিল না। না এখনও পর্যন্ত কোনও অশরীরীর আবির্ভাব ওর জীবন যাপনে বিঘ্ন ঘটায় নি। আর রাতেও আজ অবধি কোনও রকম আহবান আসেনি, না ভুতের না মানুষের। ডাক্তারি কল ও পায়নি।
গ্রামের মানুষগুলো খারাপ না। অতি কৌতূহলও কেউ দেখায়নি। স্বাস্থ্য কেন্দ্রর কাজ আর ছবি আঁকা এবং বিশ্ব সাহিত্যের বই পড়ে দিনগুলো ভালই কাটছে  তিস্তার।
আশেপাশের গোটা কতক নিসর্গ দৃশ্য আঁকার পর ও জমিদারবাড়িটাকে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে আঁকা শুরু করেছে। গল্প উপন্যাস বা সিনেমায় যে সমস্ত হন্টেড হাউস পড়া বা দেখা যায় তার সাথে এই বাড়ির এবং পরিবেশের দারুন মিল।  চারদিকে বড় বড় গাছ। সামনে অগোছালো বিরাট বাগান। অব্যবহৃত ফোয়ারা। ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া ১২-১৪ টা সিঁড়িতে জমে আছে মরা পাতা। বিশাল কালছে কাঠের দরজাটায় ঝুলছে এক ব্রিটিশ আমলের তালা। দিনেরবেলায় কাঁচ লাগানো জানলাগুলো ভেদ করে ভেতরের কিছু দেখা যায় না। বরং একাধিক ঘুলঘুলি দিয়ে আসা আবছা আলোয় ভেতরের আসবাবপত্রের অবয়বগুলো একটা শিরশিরে রোমাঞ্চ জাগায় শরীর মনে। আর রাতে তো  কথাই নেই। অপ্রাকৄত অনূভূতি এমনিই এসে যায়।
আজ দিনটা খুব ব্যস্ততায় কেটেছে তিস্তার। এর কম হয় এক এক দিন। একের পর এক রোগী আসতে থাকে। দুপুরে খেতে খেতে তিনটে বেজে গিয়েছিল। তারপর আবার যেতে হয়েছিল একটা বাড়িতে। দিনকয়েক আগে জন্মানো একটা শিশুকে দেখতে। সেখান থেকে আসার পথে উঠলো ঝড়। কাল বৈশাখীর। যখন থামল চারদিকে তার তান্ডবের চিহ্ন। ওই বাড়ির একজন অবশ্য পৌঁছে দিয়ে গেল তিস্তাকে। গুমোটভাবটা কেটে গিয়ে বেশ একটা স্বস্তি নেমেছে আব হাওয়ায় । শরীর ক্লান্ত থাকলেও মনটা ফুরফুরে হয়ে ছিল তিস্তার।  আকাশটাও ঝকঝকে। কদিন আগেই অমাবস্যা গেছে । কাটা চাঁদের আলো আঁধারীতে আশেপাশের গাছগাছালি নিয়ে জমিদারবাড়িটা গা ছমছমে একটা দৃশ্য সাজিয়ে বসে আছে।
এর একটা ছবি আঁকতেই হবে ঠিক করলো তিস্তা। সেটা করতে করতে রাত দশটা বাজলো। কিছু রাতচরা পাখির ডাক আর ঝিঁ ঝিঁ পোকার আওয়াজ ছাড়া সব নিস্তব্ধ। না এবার খেয়ে শুয়ে পড়াই ভালো। সারাদিনের খাটুনীতে চোখ জড়িয়ে আসছে।
রাতের রান্নাটা ওর কাজের মাসী করে দিয়ে যায় সকালেই। গ্যাস জ্বেলে একটু গরম করে নেয় তিস্তা প্রয়োজন মতো। লাগোয়া রান্না ঘরটায় গিয়ে সেটা করার সময়েই শব্দটা শুনতে পেল ও। মচ মচ মচ......শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতো।  একটা মৃদু শিরশিরানি আনুভব করলো তিস্তা। আসলে এটা একটা সময় আনুসারিক মানসিকতার । রোমাঞ্চ কাহিনী পড়ার ফল। এরকম সাতপাঁচ ভেবে তিস্তা নিজেকে শান্ত করলো।
ডাল আর তরকারিটা গরম করে নিয়ে যেই খেতে বসেছে জেনারেটরটা গেল বন্ধ হয়ে।
এ গ্রামে এখনও ইলেকট্রিকের লাইন ঢোকেনি। তাই মিনি জেনারেটরের ব্যবস্থা।
নিকষ কালো একটা অন্ধকারের চাদরে যেন ঢেকে গেল তিস্তা। ভেসে এলো একটা শীতল বাতাস রান্নাঘরের জানলা দিয়ে। কাল বৈশাখীর ঝড়ের পর এমনটা হয়েই থাকে। চাঁদের মৃদু আলোয় চোখটা একটু সইয়ে নিয়ে তিস্তা উঠে হাত ধুলো। জেনারেটরটায় দু চার চাপড়ে কোনও কাজ হল না দেখে অগত্যা টর্চ আনতে ঘরের দিকে গেল। ঠিক তখনি ওর কানে এলো পুরোনো কোনো দরজা খোলার সেই চিরপরিচিত “ ক্যাঁ... আ...অ্যাচ” শব্দ। অনেক বড়ো ও ভারি কোনো দরজা।
টর্চটা নিয়ে এসে  দুটো মোমবাতি জ্বালানোর পর একবার তাকাল জমিদারবাড়ির সদর দরজাটার দিকে। না এখান থেকে কিছু বোঝার উপায় নেই।
খাওয়া শেষে বাসন কোসনে জল ঢেলে, হাত মুখ ধুয়্‌ দুটোর একটা মোমবাতি নিভিয়ে একটা নিয়ে ঘরে ফিরে এলো। মশারী টাঙ্গানোর সময়েও চোখ গেল বাড়িটার দিকে। কেউ কি এলো জমিদারবাড়িতে? না বেশী ভেবে লাভ নেই। সকালে খোঁজ নিলেই হবে। গাছ পাতার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসে আওয়াজ, দূর থেকে ভেসে আসা শিয়ালের ডাক শুনতে শুনতে কখন যেন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল তিস্তা।
“ঠক ঠক... ঠক ঠক” আওয়াজে ঘুমটা ভেঙে গেল। প্রথমে মনে হয়েছিল স্বপ্ন দেখছে বোধ হয়। কিন্তু না আবার “ঠক ঠক” – দরজায় কে যেন টোকা দিচ্ছে। টেবিলে রাখা ডিজিট্যাল টেবিল ক্লকটার দিকে তাকালো তিস্তা। রাত ১টা ১৭। এতরাতে আবার কে এলো। অজান্তেই একটা মৃদু শিহরন জেনে খেলে গেল ওর মনে। রাতের ডাক??? মালির কথা মতো চুপ করে থাকবে নাকি...
অবশ্য লড়াইতে জয়ী হল ওর ডাক্তারি মন... বলা যায় না খুব অসুস্থ কোনো মানুষের জন্য কেউ এসেছেন।
-      কে?
গমগমে একটা পুরুষকণ্ঠ উত্তর দিল – মিস চক্রবর্তী, দরজাটা একবার খুলবেন, প্লিজ।
-কে আপনি?
-আমি শঙ্করনারায়ণ সিংহ। প্রতাপনারায়ন সিংহের পৌত্র।
-প্রতাপনারায়ন সিংহ ...মানে জমিদার প্রতাপনারায়ন সিংহ?
- হ্যাঁ। দয়া করে দরজাটা খুলুন , খুব দরকার।
- সে তো বুঝতেই পারছি ...কিন্তু এতো রাতে আপনি এখানে কি ভাবে?
-সব বলছি আগে দয়া করে দরজাটা খুলুন।
- ওকে ওকে... ওয়েট অ্যা মিনিট প্লিজ...
- ও ইয়েস।
জেনারেটর এর স্যুইচটা দুবার খুটখাট করে ওর মনে পড়লো ওটাতো বিকল হয়েছে । অগত্যা আবার মোম বাতি ।
রাতপোষাকের ওপর ঢোলা গেঞ্জীটা পড়ে নিয়ে দরজা খুল লো তিস্তা।
কাঁপতে থাকা মোমবাতির আলোয় দৃশ্যমান হলেন ফেল্ট ক্যাপ, সাদা জামা ও ধুসর কোনো এক রঙের প্যান্ট পড়া একটি মানুষ। মুখটা খুব ভালো দেখা না গেলেও সুদৃশ্য গোঁফজোড়া নজর এড়াল না তিস্তার।
-      বলুন কি দরকার ?
-      মিস চক্রবর্তী প্রথমে ধন্যবাদ দরজা এত রাতে বিশ্বাস করে খোলার জন্য। আর দরকারটা হল আপনাকে একবার আমার সাথে যেতে হবে।
-      যেতে হবে!! কোথায়??
-      জমিদারবাড়িতে।
আগামীকাল শেষ কিস্তি...
-      কোথায় !!! জমিদার বাড়িতে? সেতো তালা বন্ধ পড়ে আছে কবে থেকে?
-      হ্যাঁ ঠিকই বলেছেন আপনি। তবে আপাতত ওটা খোলা হয়েছে।
-      মানে?
-      আমরা কাল বিকেলেই এসে যেতাম। কাল বৈশাখীর ঝড়ে রাস্তায় আটকে পড়েছিলাম। আর সেই ঝড়ের সাথে হওয়া বৃষ্টিতে ভিজে আমার স্ত্রী একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ওর আবার শ্বাসটানের সমস্যা আছে। তাই আপনি যদি একটু দেখে আসেন বড় ভালো হয়।

তিস্তার আবার মাথায় খেলে গেল বুড়ো মালির সতর্কবাণী ...
-     কিন্তু এতো রাতে ....
-     কোনো চিন্তা করবেন না মিস চক্রবর্তী । মালিবাবা মানে ছবিলালই বললো আপনার কথা। আপনিইতো স্বাস্থ্যকেন্দ্রর নতুন ডাক্তার?
-     হ্যাঁ ... ওকে ছবিলাল যখন বলেছেন তখন ঠিকই আছে। আপনি একটু দাঁড়ান আমি রেডি হয়ে আসছি।

দ্রুত পোষাক বদলে নিয়ে ডাক্তারি ব্যাগটা নিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাইরে বেরিয়ে এলো তিস্তা। আগন্তুক তখন অস্থির পদচারনায় মগ্ন আউট হাউসের বারান্দায়। তিস্তাকে বের হতে দেখে এগিয়ে এসে হাত থেকে ব্যাগটা নিলে্ন শঙ্কর নারায়ন। দরজায় ছোট্ট তালাটা লাগিয়ে তিস্তা বললো – চলুন।
মিনিট দুয়েক হেঁটে ওরা পৌছালো জমিদারভবনে ওঠার সিঁড়িগুলোর সামনে। বিকেলের ঝড়েই সম্ভবত সব পাতা উড়ে গেছে। এদিক ওদিকে দুটো একটা পড়ে আছে। শঙ্কর নারায়ণ এতো দ্রুততার সাথে সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেলেন যে তিস্তার মনে হল যেন ভেসে গেলেন। অবচেতন মস্তিস্ক আবার প্রভাব বিস্তার করছে পরিবেশ অনুসারে এটা ভেবে তিস্তা নিজেকে শক্ত করলো। এই বাড়িটার ভেতরে ঢোকার ইচ্ছে সে এখানে আসার পর থেকে মনে মনে লালনপালন করে এসেছে। সুযোগটা এলো, তবে অদ্ভুত পরিস্থিতিতে।

“ক্যাঁ—অ্যা—চ” শব্দ করে দরজাটা যখন খুললেন শঙ্কর নারায়ণ তখন আর কোনো ভাবেই শরীরের কাঁপুনিটাকে আটকাতে পারলো না তিস্তা। গায়ের প্রতিটি রোমকনায় অনুভূত হল এক শিরশিরে ভাব। হৃদপিণ্ড লাফিয়ে প্রায় গলার কাছে পৌঁছে গেল।

ভেতরে হাল্কা আলো। দেওয়ালে লাগানো দেওয়াল গিরির ভেতর জ্বলছে আলো। শঙ্কর নারায়ণকে অনুসরণ করে তিস্তা প্রবেশ করলো একটা বিরাট কক্ষে। যার মধ্যে গোটা ছয়েক আউট হাউস ঢুকে যাবে। উত্তরপূর্ব কোনে এক বিশাল কাজ করা কাঠের পালঙ্ক।পাশে একটি কাঠের টেবিল। এদিক ওদিকে গুটিকয়েক চেয়ার।টেবিলে একটি তামাটে রঙের বাতিদানে দুটি মোমবাতি জ্বলছে। ঘর এবং সুউচ্চ ছাতের বেশীর ভাগটাই আঁধারে ঢেকে আছে। একদিকে একটি বড় তৈলচিত্র। একেবারে জীবন্ত,অন্তত মানুষটির চোখদুটো, দেখে মনে হচ্ছে যেন তাকিয়ে আছেন ওদের দিকে।

তিস্তা এগিয়ে গেল পালঙ্কের দিকে। মোম বাতির নিস্প্রভ আলোয় হাল্কা রঙের শাড়ী পরিহিতা এবার নজরে এলো ওর। শঙ্কর নারায়ণের কাছ থেকে ব্যাগটা নিয়ে টেবিলে রাখতেই একটা চেয়ার এগিয়ে দিলেন শঙ্কর বাবু পালঙ্কের পাশে। বসার পর মহিলার হাতটা হাতে নিয়েই শিউরে উঠলো তিস্তা। একেবারে বরফের মতো ঠাণ্ডা। তাড়াতাড়ি ঝুঁকে নাকের কাছে হাতটা নিয়ে গেল ও। না, আশংকা অমূলক। নিঃশ্বাস পড়ছে তবে অতি মৃদু।
ব্যাগ থেকে স্টেথো বার করে আগে নাড়ির গতি পরীক্ষা করলো ।
-      এক গ্লাস জল চাই।
বলতে না বলতে ঝকঝকে কাঁসার গ্লাসে জল পৌঁছে গেল টেবিলে। কে দিলো ... কোথা থেকেই বা এলো সেটা ভাবার সময় নেই তিস্তার। ব্যাগ থেকে ট্যাবলেটের স্ট্রিপটা বার করে ডাকল শঙ্কর নারায়ণকে।
-      একটু এদিকে আসুন, ওনাকে তুলে ধরুন...ট্যাবলেটটা খাওয়াতে হবে।
খাওয়ানোর পর ট্যাবলেটের স্ট্রিপটা শঙ্কর নারায়নের দিকে এগিয়ে ধরে বললো – এতে আরো তিনটে থাকলো । মনে হয় না দরকার হবে। তবুও দিয়ে রাখলাম। কাল সকালে এসে আমি আবার দেখে যাবো।
হাত জোড় করে শঙ্কর নারায়ণ গমগমে স্বরে বললেন- অনেক অনেক ধন্যবাদ মিস চক্রবর্তী ।
তারপর প্রায় জাদু দেখানোর মতো করে একটা সাদা খাম বাড়িয়ে ধরলেন – আপনার ফিজটা।
-      ওটার প্রয়োজন নেই মিঃ সিংহ। এমনিতেই আপনাদের আউট হাঊসে ফ্রীতে আছি। সামান্য হলেও এটা করা আমার কর্তব্য।
-      সেটা আপনার মহানুভবতা । কিন্তু আমাদের বংশে বিনা পারিশ্রমিকে কিছু করানোর রেওয়াজ নেই। তার ওপর অসময়ে আপনাকে ...
শঙ্কর নারায়নের বলার ভঙ্গীতে আর কথা না বাড়িয়ে তিস্তা খামটা নিলো। বেশ মোটা। ঢুকিয়ে রাখলো ব্যাগে।
-      চলুন আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।
-      না না আপনাকে আর যেতে হবে না। আপনি বরং ওনার কাছে থাকুন। এটুকু পথ আমি চলে যেতে পারবো।
-      ওকে অ্যাজ ইউ উইশ। গুডনাইট মিস চক্রবর্তী। অ্যান্ড থ্যাঙ্কস এগেন।
-      ইউ আর ওয়েলকাম মিঃ সিংহ। গুডনাইট।

দ্রুত পায়ে ফিরে এসে দরজাটা কোনোমতে লাগিয়ে পোষাক না বদলেই বিছানায় শুয়ে পড়লো। রাতের ডাকে না যাওয়ার নিষেধাজ্ঞাটা অমান্য করলো বলেই না আজ ও জমিদার বাড়ির ভেতরে যাওয়ার সুযোগ পেল। কি মনে হতে উঠে একবার জানলার কাছে গেল। না কিছু বোঝা যাচ্ছেনা। আর পাঁচটা দিনের মতোই আবছা অন্ধকারের চাদর গায়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন ভবনটা।

ডিজিটাল ঘড়ির সময়মাফিক আওয়াজে ঘুম ভাঙল তিস্তার। টেবিলে রাখা ব্যাগটার দিকে নজর পরতেই গত রাতের ঘটনাবলী সিনেমার মতো চোখের সামনে ভেসে এলো। দ্রুত হাত মুখ ধুয়ে নিয়ে চললো মিসেস সিংহ কেমন আছেন সেটা জানার জন্য।

গোটা চত্বরটা কালকের বৃষ্টিতে কাদা কাদা হয়ে আছে। কাল রাতে তো বোঝা যায়নি। আসলে উত্তেজনায় এটা খেয়ালই করিনি ভাবলো তিস্তা।
সিঁড়ির কাছে পৌঁছে থমকে গেল ও। রাতে কি আবার ঝড় হয়েছিলো? এতো পাতাওতো কাল ছিলনা এখানে!!
স্তম্ভিত হওয়ার ষোলোকলা পূর্ণ হল দরজাটার দিকে তাকিয়ে। এটা কি করে সম্ভব?? একটা ঠাণ্ডা জলের স্রোত  বয়ে গেল তিস্তার শিরদাঁড়া দিয়ে। আদ্যিকালের সেই তালাটা একই ভাবে ঝুলছে। বেশ কিছুটা মাকড়শার জালসহ। একটা শুকনো পাতাও আটকে আছে জালে। মাথাটায় একরাশ প্রশ্ন নিয়ে তিস্তা দাঁড়িয়ে থেকে গেল।
-      কি দেখছেন ডাক্তার দিদি?
সম্বিৎ ফিরলো ছবিলালের আওয়াজে।
-      না মানে ... হ্যাঁ ... বলছি যে কাল রাতে কি এখানে কেও এসেছিল?
পরবর্তী ১০মিনিট একটানা বলে যাওয়া তিস্তার কথা চুপ করে শুনল ছবিলাল। তারপর বললো
– আমিতো আপনারে বারণই করেসিলাম রাতে কেও ডাইকলে দরজা খুইলবেন না। আপনার বাপ ঠাকুরদার পূইন্য আর আপনার মুনের জোর আপনারে বাঁচায়ে রাখেছে। ইয়ার আগে তিনজনকে জ্ঞানহারা  আর একজনকে ...। তবে এসব লিয়ে আমি বাপু বেশী কিছু বুইলতে চাই না। মাফ কইরবেন।

সত্যিই আর একটাও কথা বের হলোনা ছবিলালের মুখ দিয়ে।
ফিরে এলো ঘরে। চেয়ারে বসে থাকলো থম মেরে।  মাঝে মাঝেই শরীরটা শিহরিত হচ্ছিল। ওর যুক্তিবাদী মনটা ওকে বললো আসলে ও একটা স্বপ্ন দেখেছে। তাহলে কি ছবিলালের কথা সব সাজানো???

না স্বপ্ন তিস্তা দেখেনি। তার  দুটো প্রমান ওর হাতে।  এক, ওর ব্যাগে একটা ট্যাবলেটের স্ট্রীপ কম এবং দুই, এই নোটগুলো। যা ছিল শঙ্কর নারায়নের দেওয়া সাদা খামে। এই ধরনের ১০ টাকার নোট কেবলমাত্র বই এর ছবিতে বা সংগ্রাহকদের কাছেই দেখতে পাওয়া যায়। অন্ততঃ ১০০ বছর আগে এগুলোর চল ছিল। তাহলে?????

সমাপ্ত






Sunday, June 11, 2017

কঙ্গোর একটি উপকথা - “সময়ের কাজ সময়ে করো”

আজ কঙ্গোর একটি উপকথা

হাও নাসসি[গ্যাজেল] গট ম্যারিড
গল্প সূত্র রিচারড এডওয়ার্ড ডেন্নেট এর “নোটস অন দ্য ফোকলোর অফ দ্য ফোরট”
 বঙ্গানুবাদ “সময়ের কাজ সময়ে করো”

নেনপেট্রোর দুই বউ এক সাথে একই দিনে দুটি মেয়ের জন্ম দিলো। নেনপেট্রো দারুন ধনী । যে কারনে মেয়েদের জন্মের সাথে সাথেই ঠিক করে রাখলো যখন এদের বিয়ে দেবে তখন এক মুদ্রাও অর্থপণ নেবে না জামাই এর পরিবারের কাছ থেকে। অবশ্য তারজন্য যার সাথে এদের বিয়ে হবে তাকে বলতে হবে এদের কি নামে ডাকা হয়।
ওদের নাম রাখা হলো লাঙ্গা আর লেঙ্গা।
মেয়ে দুটি যখন বড় হলো বিয়ের বয়স হলো তখন   অ্যান্টিলোপ হরিণ গোত্রের একজন এলো ওই মেয়েদের বিয়ে করার জন্য। অনেক দামী দামী কাপড় চোপড় আর গয়না গাঁটি উপহার রুপে রাখলো এবং মেয়েদের বিয়ে করতে চাইলো।
নেনপেট্রো বললো, ‘ওসবের কোনও দরকার নেই। ওদের বিয়ে করতে হলে ওদের কি নামে ডাকা হয় সেটা বলতে হবে।’
এর কোন জবাব বিবাহপ্রার্থীর কাছে ছিল না ফলে বিদায় নিতে হলো বেচারাকে।
এবার এলো গ্যাজেল গোত্রের রাজকুমার নাসসি নিজের অতি অনুগত কুকুরকে সাথে নিয়ে। একই আবেদন জানালো। নেনপেট্রো একই কথা বললো।
‘বাপু হে আমার মেয়েদের নাম জানো কি?’
‘নাতো! কি নাম ওদের?’
‘সেটাতো আমি বলবো না। ওটা তোমাকেই জানতে হবে, তবেই ওদের সাথে তোমার বিয়ে হতে পারে।’
একথা শুনে নাসসি খুবই হতাশ হলো। আর সেই দুঃখের ভার মনে নিয়ে ফিরে গেল সে। ভুলেই গেল সাথে করে নিজের কুকুরটাকে এনেছিল। এদিকে সব কথাবার্তা মন দিয়ে শুনেছিল কুকুরটা। প্রভুকে দুঃখিত মনে ফিরে চলে দেখে সে ঠিক করলো যে ভাবেই হোক নেনপেট্রোর মেয়েদের নাম জেনে নিয়ে প্রভুকে বলবে।
অনেকটা সময় বসে থাকলো কুকুরটা। সন্ধে হয় হয় এমন সময় নেনপেট্রো তার মেয়েদের খেতে ডাকলো নাম ধরে। সেটা শুনে নিলো কুকুরটা। মনে মনে বললো – এইতো জেনে গিয়েছি। এবার ফিরে যেতে হবে।
যাওয়ার জন্য উদ্যোগ নিতেই ওর মাথাটা ঝিম ঝিম করে উঠলো। আসলে সেই কোন সকালে এখানে এসেছে। তারপর থেকে কিছু খাওয়া হয়নি । অতএব একটু এদিক ওদিক ঘুরে ও একটা বুনোবিড়ালের বাচ্চা শিকার করে খেয়ে নিলো । তারপর খুশী মনে নাম দুটো মনে করতে গিয়ে দেখলো, এই যাঃ ও তো ভুলে গেছে ! কি হবে? আপাতত আবার অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন পথ  নেই। আর একবার কি ডাকবে না নেনপেট্রো ওর মেয়েদের নাম ধরে?
পরের দিন সকালে নেনপেট্রো বাড়ীর বাইরে এসে কুকুরটাকে দেখতে পেয়ে মেয়েদের ডাকলো । ‘ও লাঙ্গা! ওরে  লেঙ্গা ! তাড়াতাড়ি বাইরে আয় কি সুন্দর একটা কুকুর দেখে যা।’
ওরা বেরিয়ে এসে দেখলো। কিছু খাবার আর জল দিল খেতে। কুকুরটা মেয়ে দুটোর নাম জপ করতে করতে খাবার আর জল খেয়েই মারলো ছুট।
একদমে এসে পৌছালো নাসসির কাছে। নাসসি ওকে দেখে ভারভার গলায় বললো, ‘আরে তুই ফিরে এসেছিস। তোকে ফিরে পাওয়ার মতো যদি কেউ ওই মেয়ে দুটোর নাম জানাতো তাহলে দারুন মজা হতো রে।’
কুকুরটা বললো, ‘প্রভু আমি জেনে এসেছি ওদের নাম।’
‘সেকি রে ! সত্যি! কি নাম? কি নাম? শিগগিরি বল?’
‘উহু তার আগে আমার পুরষ্কার চাই।’
নাসসি একটা ভালো শুকর শিকার করে ওকে খেতে দিলো । কুকুরটাও জানালো ওকে নাম দুটো। এই আনন্দে নাসসি বন্ধুদের নিয়ে ভোজ সভা বসালো। হলো খানাপিনা।
এই আনন্দ উচ্ছাসের পরের দিন সকালে ওরা গেল নেনপেট্রোর কাছে। নেনপেট্রো একই প্রশ্ন করলো। কিন্তু নাসসি গতরাতের অত্যধিক পানাহারের ফলে ভুলে গেছে নাম দুটো। ফলে বলতে পারলো না । একরাশ হতাশা নিয়ে পুনরায় ফিরে আসতে হলো নাসসিকে। সব জেনে কুকুরটা আবার গেলো নেনপেট্রোর বাড়ীর কাছে। নামগুলো আবার শুনে নিয়ে ফিরে এলো প্রভুর কাছে।
এবার আর কোনও আনন্দ উল্লাস নয়। তৎক্ষণাৎ সোজা নাসসি গেল নেনপেট্রোর কাছে। বললো,   লাঙ্গা আর লেঙ্গাকে এখানে ডাকুন।আমি ওদের বিয়ে করতে চাই ।’
নেনপেট্রো খুশী মনে মেয়েদের তুলে দিলেন নাসসির হাতে।
আমার গল্প ফুরালো নটে গাছটি মুরালো।

ফিরে আসবো কয়েক দিনের মধ্যেই আবার কোনও এক দেশের কাহিনী নিয়ে।

Friday, June 9, 2017

মনস্তাত্বিক অপরাধ কাহিনী... নাম

মনস্তাত্বিক অপরাধ কাহিনী...  
নাম
প্রতিম দাস

টিউশ্যনী ছিল না। তাতাইরা নেই। মামাতো দাদার বিয়েতে গেছে। কলকাতা। হাত মুখ ধুয়ে বাড়িতে চা না খেয়ে গেলাম বাপিনদার দোকানে। সকালে ওখানে জড়ো হয় পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা। চা খাওয়ার সাথে সাথে জমে ওঠে আড্ডা। টিউশ্যনী থাকে বলে আমার যাওয়া হয় না তবে এরকম ফাঁক পেলে সুযোগটা নষ্ট করি না। গিয়ে দেখলাম আড্ডা জমজমাট। ব্রিজের তলায় আবার একটা বডি লেগে আছে। তারই খেই ধরে কে কবে কোথায়  এরকম জলে ভেসে আসা ‘বডি’ দেখেছে তার ব্যাখ্যান দিছিল।
এই মফস্বল শহরটায় বয়ে যাওয়া নদীটার বাঁকে ব্রিজটা তৈরি হওয়ার পর থেকে প্রায়ই এরকম বেশ কিছু জলে ডোবা মৃতদেহ এসে আটকে যায়। প্রথম প্রথম লোকে দল বেঁধে দেখতে যেত। তারপর যা হয় – উৎসাহে ভাঁটা পড়েছে – এখন শুধু আলোচনাই জমে ওঠে।
ভেসে আসা বডিটা যে কার কে জানে...কোথা থেকেই বা এল...নাম ই বা কি? এসব কথা বার্তার মধ্যেই শোনা গেল ক্লাবের সিনিয়র সদস্য বুদ্ধুদার গলা – যেটা ভেসে এসেছে সেটা কোন হতভাগ্যর শরীর তা হয়তো কোনদিনই জানা যাবে না। কিন্তু ব্রিজটা তৈরি হওয়ার পর প্রথম যে দেহটা এসে আটকে ছিল সেটার কথা হয়তো অনেকেরই মনে আছে। তোরা বোধ হয় শুনিসওনি সেটার ব্যাপারে-
বাপিনদা বললো, বুদ্ধু সেই ব্যাঙ্কের পাওনা আদায়কারী লোকটার কথা বলছিস তো?
তোর মনে আছে বাপিন?
থাকবে না। বাব্বা! তখন যা হইচই হয়েছিল। কাগজেও তো বের হয়েছিল কয়েক দফায় ঘটনাটা।
তা আমরাও একটু শুনি কি হয়েছিল, বললো সুজয়।
নামটা আমার ঠিকঠাক মনেও নেই।ঘাঘু পাব্লিক। যে ব্যাঙ্কে কাজ করতো সেই ব্যাঙ্কেরই টাকা মেরে দেয়। বছর ২৭ আগের ঘটনা । ৪ লক্ষ টাকা। যদিও টাকাটার কি হলো তার হদিশ করা যায়নি। লোকটা নিজেই ধরা দিয়েছিল। বছর পাঁচেকের জেল হয়। ছাড়া পাওয়ার মাসখানেক বাদে এখানে পাওয়া গিয়েছিল লোকটার মৃতদেহ। জলে ডোবা কেস। কোন আঘাতের চিহ্ন ছিল না দেহে। গলায় একটা লকেট ছিল। তার সাহায্যেই পুলিস লোকটার পরিচয় বার করে।
এই সাধারণ ঘটনাটা আবার কাগজে বার হয়েছিল, মন্তব্য করলো আইনের ছাত্র রাজা।
ডিস কেবল ইন্টারনেটের  যুগে এ খবর তোদের কাছে গুরুত্বহীন।কিন্তু সে সময়ে খবরটা যথেষ্টই আলোড়ন তুলেছিল। তার সঙ্গে ছিল অত টাকার ঘাপলা।
এরপর একথা সেকথায় বয়ে গেল সময়। বাড়ি আসার পর সারাদিন মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকলো ঘটনাটা। এক সাংবাদিক বন্ধুকে ফোন করলাম। যদি আরো কিছু তথ্য জানা যায় এই আশায়। কিন্তু লোকটার নাম আর আধা সরকারী ব্যাঙ্কটার নাম ছাড়া আর কিছু বেশি জানা গেল না  বুদ্ধুদার বলা তথ্যর বাইরে।
দুদিন কেটে গেল মাথা থেকে কিছুতেই ঝেড়ে ফেলতে পারছিলাম না বিষয়টা। শেষে খাতা কলম নিয়ে বসেই পড়লাম। যুক্তি বাস্তবের যেখানে শেষ সেখানেই তো কল্পলোকের জন্ম।
*****
আদর্শ সৎ কর্মচারী বলতে লোকেরা ভবানীপ্রসাদ রায় এর নাম করে। গত বারো বছরে নিজের দায়িত্ব একনিষ্ঠ ভাবে পালন করে চলেছে। ম্যানেজার খুব প্রশংসা করেন ওর। করবেন নাই বা কেন? আজ পর্যন্ত এক পয়সার গণ্ডগোল হয়নি খাতা পত্রের হিসাবে। যদিও কাজটা খুব লোভসৃষ্টকারী। সরাসরি ঋণ গ্রহীতাদের কাছ থেকে ঋণ কিস্তি পরিশোধের টাকা আদায় করে আনা। কোন কোন দিন টাকার অঙ্কটা ৭০-৮০ হাজারে হয়ে যায়।
বেশ চলছিল কাজকর্ম। হঠাৎই ভবানী প্রসাদ খবর পেল লাখ চারেক টাকা আদায় হবে। আর তার জন্য ওকে যেতে হবে পাশের জেলা শহরে। এতদিনের বিশ্বস্ত কর্মচারীর মানসিকতা পথভ্রষ্ট হল। এজন্যই বোধ হয় বলে মন না মতিভ্রম। অবশ্য এরকম কোনও বড় সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল কিনা ভবানী রায় সেটা ওপরওয়ালাই জানেন। অনেক হিসেব নিকেষ করে এক প্ল্যান কষলো টাকাটা হাতানোর। এমতাবস্থায় ভবানী রায়ের সামাজিক অবস্থানটা একটু দেখে নেওয়া যাক। ছোটবেলায় এক দুর্ঘটনায় বাবা মা একসঙ্গে মারা যান। ভাইবোন ছিল না। কাকার কাছে লাথিঝ্যাঁটা খেয়ে মানুষ। নিজ অধ্যাবসায়ে এই কাজটা জুটিয়েই সে পাট চুকিয়ে ভবানী চলে আসে এই প্রান্তিক শহরটায়। ব্যাঙ্কের কয়েকজন মানুষ, দুধওয়ালা, কাজের মাসি আর পাড়ার চায়ের দোকানদার ছাড়া আর কারও সঙ্গে তেমন মেলামেশা করত না। অবশ্য কাজের চাপে সময়ও পেত না। সাধাসিধা জীবন যাপনে ছিল না কোনও উচ্চাশার ছোঁয়া।
ম্যানেজারের কাছ থেকে কাজটার বিস্তৃত হাল হকিকত জেনে নিয়ে  পাঁচদিনের ছুটির আবেদন করল ভবানী।সাথেই জানালো একেবারে টাকাটা নিয়ে এসেই  পুনরায় জয়েন করবে। ১২ বছরের চাকরী জীবনে প্রথম ছুটির আবেদন। মঞ্জুর হতে বেশি সময় লাগলো না।
ছুটির প্রথমদিনটা বাড়িতেই কাটালো ভবানীপ্রসাদ। প্ল্যানটা বারবার খতিয়ে দেখলো। দ্বিতীয় দিন সকালে গেল জেলা শহরটায়। খুঁজে বার করল এমন একটা ল'ফার্ম যারা ওর মতই বিশ্বস্ততা আর গোপনীয়তা বজায় রেখে কাজ করে। রাতটা ওখানকারই একটা হোটেলে কাটিয়ে ফিরে এল নিজের চাকুরিস্থলে। অফিসে গেল । জানাল ওর কাজ মিটে গেছে। শুধু শুধু কাজে ফাঁকি দিয়ে কী হবে। কাজকে ভালোবাসার আরও একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করল ভবানী প্রসাদ রায়।
এসে গেল আদায় করতে যাওয়ার দিন। ম্যানেজার জানালেন আদায় শেষে ওই দিন শেষ বাস ধর ফিরে আসতে পারবে ভবানী।
ওখানে কার্যত সেটা হলো না। ভাগ্যর সহায়তায় টাকাটা হাতে পেতে পেতে পেরিয়ে গেল শেষ বাস ছাড়ার সময়। ফলে একটা মিথ্যে কম বলতে হল ওকে। পে বুথ থেকে ফোন করে জানিয়ে দিল  ফিরতে না পারার কারণটা ।
রাতে ভবানী গেল সেই ল ফার্মটায়। দেখা করল আসল মালিকের সাথে।
-বলুন কি প্রয়োজন আপনার?
ভবানী ইতিমধ্যে আগের দিনের হোটেলটায় আবার ঘর ভাড়া নিয়েছে। এখানে আসার আগে ওখানে গিয়ে একটি বিশেষ প্যাকেট বানিয়ে মধ্যে টাকাটা ঢুকিয়ে গালা সিল করে নিয়ে এসেছে। সেই প্যাকেটটা টেবিলের উপর রেখে বলল – এটা অনির্দিষ্ট কালের জন্য আপনার ফার্মে গচ্ছিত রাখতে চাই।
-অনির্দিষ্ট কাল মানে!?
-মানে, আমি একটা বিশেষ কাজের জন্য বাইরে যাচ্ছি। কবে ফিরব সেটা ঠিক জানা নেই। এই প্যাকেটের জিনিষটা সঙ্গে নিয়ে ঘোরাটা আমার পক্ষে বিপজ্জনক। আর আমার সেরকম কোনও আত্মীয়স্বজন নেই যার কাছে এটা রেখে যেতে পারি।
-বুঝলাম। কিন্তু এরকম কাজের ফিজ তো বেশ মোটা রকম।
- সে নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আপনার ফিজের কয়েক গুন দামী জিনিষ ওতে আছে।
- ঠিক আছে। কোনও চিন্তা করবেন না। বলুন কি নামে রিসিপ্ট দেব।
 রিসিপ্ট! ভবানী  ভাবল, রিসিপ্ট নিয়ে কোথায় রাখব? কাছে তো রাখাই যাবে না। আর কোন জায়গাও নেই ওর।
আইনজীবি মানুষটি আবারও বললেন – বলুন কি নাম লিখব রিসিপ্টে?
-     দেখুন এরকম কি করা যায় যে রিসিপ্টটাও আপনার কাছেই থাকবে।
-     সে আবার কি কথা?
-      আপনি আমায় একটা কোড নম্বর বলুন। আমি ফিরে এসে ওটা বলব এবং সঙ্গে আমার নামটাও, তবেই আপনি আমায় প্যাকেট ফিরিয়ে দেবেন। সঠিক নাম ও নম্বর না বললে কেও ওটা নিতে পারবে না। এর জন্য যা এক্সট্রা লাগবে আমি দেব।
-     -হুম ... ওকে...কিন্তু...
-     -কোনও কিন্তু নয়। রিস্ক ফ্যাক্টর যা থাকছে তা তো আমার দিক থেকে। আপনার তো কোনও চিন্তা নেই। শুধু সুরক্ষিতভাবে এটাকে রাখা ছাড়া। আশা করি এটুকু বিশ্বাস বা ভরসা আপনার ফার্মকে করাই যায়।
ল ফার্মের মালিক একটু ভাবলেন তারপর বললেন – ওকে আপনার যা ইচ্ছে তাই হোক তা আপনার নামটা তো বলবেন এবার?
-     পুন্ডরীকাক্ষ পতিতুন্ড... নির্বিকার কণ্ঠে বলল ভবানী প্রসাদ রায়।
-     আপনার জন্ম তারিখ বলুন ওটাই হবে আপনার কোড নম্বর।
*****
আরও আধ ঘণ্টা বাদে ভবানী প্রসাদকে দেখা গেল হোটেলের বিছানায় শায়িত অবস্থায়। ওর পরিকল্পনার প্রথম পর্ব নির্বিঘ্নেই মিটেছে।


আগামী পরশু বিকেলে শুরু হবে দ্বিতীয় পর্ব। অফিসে গিয়ে সব কথা খুলে বলা। যার একটাই পরিণতি অফিস দ্বারা পুলিসের হাতে সমর্পণ। আদালতের রায়ে বেশ কয়েক বছর কারাবাস। তার পর মুক্তি এবং নতুন নামে ......
পরবর্তী দিনে নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যেতেই কপালে ভাঁজ পড়ল ম্যানেজারের। জেলা শহরে ঋণ গ্রহীতাকে ফোন করলেন। জানা গেল ভবানী প্রসাদের কথামতই গতকাল পেমেন্ট হয়েছে এবং দিতে বেশ দেরীই হয়েছিল। কপালের ভাঁজ পুরো কমল না ম্যানেজার বাবুর। তবুও গত ১২ বছরের কথা ভেবে আরও খানিকটা সময় অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন উনি।
সে সময়ও চলে গেল। ব্যাঙ্ক পরিচালন কমিটিকে বলতে বাধ্য হলেন ঘটনাটা। ওরা পুলিসে খবর দিলেন। ভবানীপ্রসাদের জানানো হোটেলটিতে খোঁজ নেওয়া হলো। জানা গেল সকালেই চেকআউট করেছে ভবানী।
প্ল্যানমাফিক বিকেলে ছুটির কিছু আগে ব্যাঙ্কে এল ভবানী। চুল উসকো খুসকো। মুখ চোখ শুকিয়ে গেছে। ওকে দেখেই গুজুর গুজুর শুরু হলো । সে সবে কান না দিয়ে ভবানী সোজা গিয়ে ঢুকল ম্যানেজারের ঘরে। বেশী হইচই না হওয়ার এটাই সবচেয়ে ভালো পথ ও জানে। ওকে দেখেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পড়ায় চেঁচিয়ে উঠলেন – ওফঃ ভবানী! তুমি তো আমায় মেরেই ফেলেছিলে হে। তা কি ব্যাপার এত দেরী?
অন্য কেউ হলে কী গল্প শোনাতো কে জানে। ভবানী কিন্তু সত্যি কথাই বলল ওর প্ল্যান অনুসারে। একটু মিশেল দিয়ে।
-     স্যার লোভ সামলাতে না পেরে টাকাটা নিয়ে আমিই ট্রেনে চেপে বিহার পালাচ্ছিলাম। কিন্তু চিরকালই আমার ভাগ্য খারাপ। ট্রেনে যেতে যেতে একটি লোকের সাথে পরিচয় হয়। সে চায়ের সাথে  কী মিশিয়ে যে খাইয়ে দিয়েছিল জানি না। মরন ঘুমে পেয়েছিল আমায়। সে ঘুম যখন ভাঙল তখন জামা কাপড়টা ছাড়া আর কিছুই সঙ্গে ছিল না। আমার আর কিছুই বলার নেই। এবার আপনার যা বিবেচনা...
হতভম্ব স্তম্ভিত ম্যানেজার যন্ত্রের মতো হাত বাড়ালেন টেলিফোনের দিকে। পুলিস এল। গ্রেপ্তার করল ভবানীপ্রসাদকে। হাজার জেরাতেও ভবানী তার রচনা করা গল্প থেকে এক পা নড়ল না। আদালত ব্যাঙ্কের তরফে বলা গত ১২ বছরের কলঙ্কহীন রেকর্ড শুনে ওকে ৭ বছরের বদলে ৫ বছরের জন্য কারাদন্ডে দণ্ন্ডিত করল। হয়তো আপীল করলে রায় ভবানীর পক্ষে যেত। কারন কোনও শক্তপোক্ত প্রমাণ ওকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য ছিল না। কিন্তু ও সেটা করল না। সরকারী উকিলের সহায়তাও  ও নিতে রাজী হয়নি ।
 জেলখানাতেও আদর্শ কয়েদীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো ভবানী প্রসাদ। কোনোরকম ঝুটঝামেলা না করে কেবলমাত্র শরীরটার যত্ন নিয়ে সময় কাটাতে থাকল। বড় দাঁও মারার জন্য ও মনেমনে এই কারাবাসটাকে তার মাসুল হিসাবেই মেনে নিয়েছিল। সাথেই ছকে নিয়েছিল ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। এখান থেকে মুক্তি পেয়ে দূরের কোন শহরে  গিয়ে সঠিক অর্থেই ভালো মানুষ  রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। গচ্ছিত টাকার বেশ খানিকটা ব্যয় করবে নাম কামানোর জন্য। আর বাকি টাকা ঠিকঠাক লগ্নি করার হাজার উপায় সে জানে ব্যাঙ্কে কাজ করার সূত্রেই। ফলে বাকি জীবনটা পায়ের ওপর পা তুলেই কাটবে। চাকরি করে সারা জীবনেও ও সেটা কোনোদিনই করতে পারত না।
কিন্তু মানুষ যা ভাবে তা কি সব সময় হয়? ধর্মের কলটা কোন এক অজানা বাতাসে ঠিক নড়ে যায়।
মুক্তি পেল ভবানী প্রসাদ রায়। গত পাঁচ বছরের মেহনতে শরীর হয়েছে সুগঠিত। সযত্নে দাড়ি গোঁফ রেখে বদলে ফেলেছে মুখের ভোল। চুল এখন আঁচড়ায় ব্যাকব্রাশ করে। সেটাও আবার কাঁধ ছোঁয়া। চট করে দেখলে চেনা মুশকিল ৫ বছর আগের ভবানীকে। ছাড়া পেয়েই কিন্তু ও সেই আইনজীবীর কাছে ছুটল না। বলা যায় না পুলিসের নজর থাকতেই পারে ওর গতিবিধির ওপর। ৪ লক্ষ টাকা বলে কথা। কারাবাসে এতদিন কাজ করে যে পারিশ্রমিক পেয়েছিল সে অর্থে একটা অতি সস্তার হোটেলে একটা মাস কাটিয়ে দিল ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন দেখতে দেখতে।
মাসখানেক পর...
পাঁচ বছরে ল- ফার্মটার পসার বেড়েছে। বদলেছে অফিসের ঠিকানা। সাথে সাথেই হয়েছে আরও একটা বদল। যার কাছে ভবানী ওর প্যাকেট গচ্ছিত রেখেছিল সেই মানুষটি মারা গিয়েছেন।এখন অফিসের দায়িত্বে ওর মেজ ছেলে। ঠিকানা খুঁজে বের করতে বেশি সময় লাগল না ভবানীর। বাসে আসতে আসতে ভাবছিল ওকে চিনতে পারবে তো সেই আইনজীবী ভদ্রলোক। এখন মালিকানা বদল হয়েছে জেনে বেশ খানিকটা উৎকণ্ঠা ওকে গ্রাস করল।
স্লিপ পাঠানোর পর আধঘণ্টা বসে থেকে তবে ডাক পেল ভবানী।
-     বসুন। বলুন কি দরকার?
-     আর একজন ভদ্রলোক ...মানে আমি যখন ৫ বছর আগে...
-     হ্যাঁ, উনি আমার বাবা। তিনবছর আগে ... আপনি নিশ্চিন্তে আপনার কথা বলতে পারেন।
সব কথা খুলে বলল ভবানী। উত্তরও পেল সদর্থক।
-আরে আপনই সেই মানুষ!! বাবা আমাকে বলেছিলেন আপনার কথা সেই দিনই যে দিন আপনি ওটা রেখে যান। যাক এতদিনে তাহলে সময় হল আপনার।
বিগলিত একটা হাসি উপহার দিল ভবানী।  সঙ্গে সঙ্গেই গোটা শরীরটা রোমাঞ্চিত হলো ওর। প্ল্যান সাকসেসফুল। আর কিছুক্ষন বাদেই আমি হয়ে যাব প্রায় চার লাখ টাকার মালিক।
-     এবার তাহলে আমার জিনিষটা ফিরিয়ে দিন।
-     অবশ্যই। সেটাই তো আমাদের কাজ। কিন্তু তার আগে আপনাকে প্রমাণ দিতে হবে যে আপনিই সেই মানুষটা।
-     মানে?
-     বাবা বলেছিলেন আপনি আপনার নাম আর একটা নম্বর বলবেন । যদি সেটা মেলে তবেই আমি ওটা আপনাকে দেব। একটু বসুন আমি রেজিস্টারটা নিয়ে আসি......
হ্যাঁ নম্বরটা বলুন আগে।

-     জন্ম তারিখটা বলল ভবানী।
-     হুম, একদম ঠিক। এবারে আপনার নাম?
অভ্যাস মতো ভবানী উত্তর দিল – ভবানীপ্রসাদ রায়।
-     এখানে এরকম কোনও নাম তো লেখা নেই। ... চশমার ওপর দিয়ে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন আইনজীবী।
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো ভবানীর। তাই তো ... এ নাম তো সে বলেনি সেই সময়। নামটা... কি যেন?... গত পাঁচ বছর এক মাস ধরে অন্যসব কিছু নিয়ে চিন্তা করলেও নামটা নিয়ে একবারও মাথা ঘামায়নি ও। মনের পাতা থেকে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সেদিনের বলা সেই নামটা, বিজ্ঞানের সুত্র মেনেই।
-     আই অ্যাম সরি মিঃ...
-     হৃদপিণ্ড সজোরে লাফিয়ে উঠল ভবানীর। ঝিম ঝিম করে উঠলো মাথাটা। শরীরটা যেন কেমন অবশ হয়ে আসছে। বিড় বিড় করে বললো – নামটা হল... নামটা...
-     আই  থিঙ্ক ইউ ক্যন লিভ নাও মিস্টার ফ্রড। না হলে পুলিস ডাকতে বাধ্য হবো।

পুলিশ শব্দটা ভবানীর অবশতা কাটিয়ে দিল এক নিমেষে। জীবনের ৫টা বছর ও বলি দিয়েছে যার জন্য সেটা এখন ওর এত কাছে, অথচ একটা নামের জন্য সেটাই ওর ধরা ছোঁয়ার বাইরে। মাতালের মতো পদক্ষেপে অফিসটা থেকে বেরিয়ে এল ও। মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই প্রশ্ন ... নামটা কী?
উদভ্রান্তের মতো হাঁটতে হাঁটতে, একে তাকে ধাক্কা মেরে, পথচলতি যানবাহনের ধাক্কা থেকে কোনোক্রমে বেঁচে, অজস্র গালিগালাজ গিলে, যা অবশ্য ঐ মুহূর্তে ওর মাথাতেও ঢুকছিল কিনা সন্দে্‌ এক সময় ভবানী পৌঁছে গেল শহরের এক প্রান্ত দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর ধারে। সান্ধ্যকালীন বাতাসে কিছুটা স্বস্তি পেল ওর শরীর মন। চিন্তাটা যদিও তালবাদ্য বাজিয়ে চলেছে ওর মস্তিষ্কে।

আশেপাশে মানুষ নেই কোনও। ভবানী ভাবল, মুখে চোখে জল দিলে একটু শান্ত হবে মনটা।  তারপর ঠাণ্ডা মাথায় ভাবলেই মনে পড়ে যাবে নামটা।
এগিয়ে গেল জলের দিকে। পাড়ে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে জলের দিকে হাত বাড়াল।  সঙ্গে সঙ্গে একটা শিহরন জাগানো ভাবনা ওকে কাঁপিয়ে দিল ... যদি আর কখনই মনে না পড়ে নামটা, তাহলে? গোটা শরীরটা আবার অবশ হয়ে এল ভবানীর। বুঝতে পারল ওর পা নিয়ন্ত্রন হারাচ্ছে ওর শরীরের ভারবহনের।
ঝপ করে একটা শব্দ হল। হাঁচড়পাঁচড় করে জলের ভেতর থেকে মাথা তুলল ভবানী। কিন্তু জুতো পড়া পায়ে নদীর তলার জমিতে দাঁড়ানোর সুযোগটা পেল না অবসন্ন শরীরটা। ঠিক মতো টাল সামলানোর আগেই আবার ডুবে গেল ও। একরাশ  কাদাজল ঢুকে গেল ওর নাকেমুখে। অদম্য শক্তিতে চেষ্টা করল নিজেকে ভাসিয়ে তোলার। সাঁতার না জানা থাকায় যেটা সম্ভব হলো না। আর এই টানাপোড়েনে ৫ বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া  মস্তিষ্ক কুঠরির দরজাটা খুলে গেল। নামটা মনে পড়লো ভবানীর। পু ন্ড রী কা ক্ষ  প তি তু ন্ড। সর্বশক্তি দিয়ে ও বলার চেষ্টা করলো “মিঃ লইয়ার, আমার মনে পড়েছে নামটা...সেটা হলো...”
এরফলে আরও কিছুটা জল ঢুকে গেল ওর নাক মুখ দিয়ে।
চোরা স্রোতের টান নাকি নিয়তির অলঙ্ঘনীয় নিয়ম কে জানে , শরীর আর সাথ দিল না ভবানীর। চরম শান্তি দিতে চিরকালীন ঘুমের কাজল মাখানোর জন্য কলকল ছলছল করে বয়ে যাওয়া নদী তার নিজের কোলে টেনে নিল একটি অতৃপ্ত জীবনকে।

সমাপ্ত।

 


Wednesday, June 7, 2017

আমেরিকান মিথস অ্যান্ড লেজেন্ডস - দেবতা হেরে গেলেন

গ্লুস্ক্যাপ অ্যান্ড দ্য বেবি
বাংলা অনুবাদ
প্রতিম দাস
দেবতা হেরে গেলেন
অ্যাল্গন কুইয়ান উপজাতিদের বিশ্বাস অনুসারে  মহান গ্লুস্ক্যাপ প্রথম মানুষ, কালচারাল হিরো, জাদুকর এবং দেবতা।
মায়া শক্তির অধিকারী দৈত্য প্রজাতি কেওয়াওকুকে হারিয়ে দিলেন গ্লুস্ক্যাপ। পরাজিত করলেন হিংস্র ডাইনীবিদ্যার অধিকারী মেদেকলিনকে। রাতের ভয়ঙ্করী আত্মা পামোলা  যে আবার গবলিন, নরখাদক
এবং কালোজাদুর অধিকারিণীদের বন্ধু তাকেও বশ মানালেন । তারপর এক বিশেষ মহিলাকে গ্লুস্ক্যাপ বললেন ,আর আমার করার মতো কোন কাজ নেই। সব কিছুই এখন আমার অধীনে।
মহিলাটি মুচকি হেসে  বললেন, ‘আপনি নিশ্চিত তো প্রভু? এখনো কিন্তু এমন একজন আছে যাকে আপনি হারাতে পারেন নি। আর তাকে কেউ আজ অবধি হারাতে পারেনি। সে যা করতে চায় সেটাই করে।’
গ্লুস্ক্যাপ কথাটা শুনে অবাক হয়ে গেলেন এবং জানতে চাইলেন কে সেই অমিত শক্তির অধিকারী।
মহিলাতি উত্তর দিলেন, ‘তাকে ওয়াসিস নামে ডাকা হয়। তবে প্রভু আমার বিনীত অনুরোধ আপনি শুধু শুধু ওর সাথে বিবাদে জড়ানোর চেষ্টা না করলেই ভালো হয়।’
ওয়াসিস আসলে একটা ছোট্ট বাচ্চা। মাটির ওপর বসে সে একটা লজেন্স জাতীয় বস্তু চুষছিল আর গুনগুন করে কি সব বকে যাচ্ছিল নিজে মনে । মহান গ্লুস্ক্যাপ ছিলেন অবিবাহিত। ফলে তার নিজের কোন সন্তান ছিল না। আর তাই জানাও ছিল না কিভাবে বাচ্চাদের সাথে মিশতে হয় । তবু উনি ওয়াসিসের দিকে তাকিয়ে হাসলেন এবং কাছে আসার জন্য ডাকলেন। বাচ্চাটা সে ডাক শুনে হাসলো কিন্তু নড়লো না নিজের জায়গা ছেড়ে। গ্লুস্ক্যাপ সিটি বাজিয়ে পাখির ডাক নকল করে ওকে শোনালেন। ওয়াসিস তাতে ভ্রুক্ষেপ না করে সেই লজেন্সটা খাওয়ার দিকেই বেশি মন দিলো। এরকম অবাধ্যতার সাথে গ্লুস্ক্যাপের পরিচয় ছিল না। উনি খুব রেগে গেলেন এবং চিৎকার করে আবার বাচ্চাটিকে ডাকলেন ওনার কাছে আসার জন্য । না এলে খুব খারাপ হবে এরকম ধমক ও দিলেন। ওয়াসিস তাতেও কোন ভ্রুক্ষেপ করলো না । বরং এমন এক চিল চিৎকার ছাড়লো যে স্বয়ং দেবতা গ্লুস্ক্যাপের আওয়াজ চাপা পড়ে গেল।
গ্লুস্ক্যাপ এবার উঠে দাঁড়িয়ে তার সমস্ত জাদুশক্তিকে আহ্বান জানানোর ভয় দেখালেন। বললেন, তিনি  ভয়ানক সব মন্ত্র, সাঙ্ঘাতিক সব অভিশাপ  উচ্চারন করবেন যদি ওয়াসিস তার কাছে না আসে।   । এমন গান গাইবেন যা শয়তানের কবল থেকে মরাকেও জ্যান্ত করে দিতে সক্ষম। কিন্তু ওয়াসিসকে দেখে মনে হলোনা এসব ব্যপারে তার কোন আগ্রহ আছে। বরং মুখ দেখে মনে হচ্ছিল এসবে সে মোটেই ভয়ও পাচ্ছে না বা মজা।
অবশেষে হাল ছড়ে দিয়ে গ্লুস্ক্যাপ  ওখান থেকে চলে গেলেন। আর এটা দেখে ওয়াসিস বলে উঠলো, ‘গুউউ!! গুউউ!!’ আর সেই থেকে আজ অবধি রেড ইন্ডিয়ানরা বিশ্বাস করে যখন কোনো বাচ্চা ‘গুউউ!! গুউউ!!’ বলে আসলে সে মহান গ্লুস্ক্যাপকে দেখতে পায় ।

[অনুবাদকের কথা- খুবই সাধারন একটি গল্প। কিন্তু আসল কথা হলো পরিবেশ পরিস্থিতি না বুঝে তুমি যদি কোন কাজ করতে চাও তাহলে সে তুমি যত বড় শক্তিমান হওনা কেন, জেতার আশা নেই বলাই চলে। বাচ্চা ওয়াসিস যে আসলে তার শত্রু নয় এবং তার কোন কথাই সে বুঝতে পারছে না এটা গ্লুস্ক্যাপ বুঝতেই পারেন নি। শুধুমুধুই নিজের কিছু উদ্যম ক্ষয় করে ওখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।]

আমেরিকান মিথস অ্যান্ড লেজেন্ডস - আদি মাতা

করন[Corn] মাদার
নিউ ইংল্যান্ড উপজাতির কাহিনী
বাংলা অনুবাদ – প্রতিম দাস।
আদি মাতা
 সব কিছু বানিয়ে ছিল যে তার নাম ক্লোস্কুরবে। সে যখন এই পৃথিবীতে ছিল তখন একটাও মানুষ ছিল না। কিন্তু যেদিন সূর্য অনেক উঁচুতে উঠে গেল তখন এক তরুনের আবির্ভাব হলো এবং সে ক্লোস্কুরবেকে ডাকলো, ‘মামা!’ সম্বোধন করে । ছেলেটির জন্ম হয়েছে সমুদ্রের ফেনা থেকে। হাওয়ার ফলে একত্র হয়েছে আর সূর্যের তাপে হয়েছে শক্ত ও উষ্ণ । আর এই উষ্ণতা কারনেই ও পেয়েছে জীবন। এরপর তরুণটি ক্লোস্কুরবের প্রধান সহকারীরুপে থেকে গেল।
ওরা দুজন কতো কিছু বানাল এই পৃথিবীর জন্য । এরকম সময়ে একদিন যখন সূর্য আবার একেবারে মাথার ওপর ওদের কাছে এল এক সুন্দরী কন্যা।  এক ফোঁটা শিশির ঝরে পড়েছিল একটি সবুজ গাছের পাতায়। তাকে উষ্ণতা দিয়েছিল সূর্য। আর তার ফলেই প্রান পায় এই কন্যা।
‘আমি হলাম ভালোবাসা,’ বললো কন্যা। ‘আমি শক্তিদায়িনী। আমি সব কিছুর পালিকা। আমিই সমস্ত মানুষ আর প্রানীর রুপদানকারিনী। ওরা সবাই আমাকে ভালোবাসে।’
ক্লোস্কুরবে অজানা মহাশক্তির উদ্দেশ্যে ধন্যবাদ জানালো এই কন্যাকে ওদের কাছে পাঠানোর জন্য। আর সেই তরুণের সাথে ওর বিয়ে দিলো । ওদের একটি বাচ্চা হলো। ওই কন্যা হল এ ধরাতলের প্রথম মানবী মা । ক্লোস্কুরবে ওদের শেখালেন মানুষদের কি কি দরকার হয় বেঁচে থাকার জন্য সেই বিষয়ে। ওদের সন্তানদেরকেও দিলেন অনেক রকম শিক্ষা জীবন ধারনের। এরপর চলে গেলেন উত্তরের দিকে। জানিয়ে গেলেন ফিরে আসবেন যদি কোনোদিন দরকার পরে।
এরপর পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বাড়লো । সবাই খাবারের জন্য শিকার করতো । কিন্তু এর ফলে কমে যেতে থাকলো শিকার করার মতো প্রানী। এক সময় ঠিকঠাক শিকার না পেয়ে অনেককেই অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছিল। আর এটা দেখে সেই প্রথম মানবী মা খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন।
ছোটো ছোটো শিশুরা তার কাছে বললো, ‘আমাদের খুব খিদে পেয়েছে গো! আমাদের কিছু খেতে দাও!’ কিন্তু দেওয়ার মতো কিছুই ছিল না সেই মানবীর কাছে । কিছু দিতে না পেরে উনি কেঁদে ফেললেন। তারপর কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, ‘তোরা অপেক্ষা কর বাছারা। আমি কিছু খাবারের ব্যবস্থা করছি যাতে তোদের পেট ভরে।’
স্ত্রীকে কাঁদতে দেখে ক্লোস্কুরবের ভাগ্নে বললো, ‘তুমি কাঁদছো কেন? কি করলে আমি তোমার মুখে হাসি ফোটাতে পারি সেটা বলো?’
‘একটাই উপায় আছে এই কান্না থামানোর।’
‘আমায় বলো, কি সেই উপায়?’
একটু চুপ করে থেকে মানবী বললেন, ‘একটাই উপায়। আর সেটা হলো তুমি আমাকে হত্যা করো।’
‘এ কি বলছো তুমি! এ আমি পারবো না!’
‘তোমাকে পারতেই হবে গো। তা না হলে আমার এই কান্না কোনো দিনই থামবে না ।’
কোন উত্তর না দিয়ে প্রথম পিতা  ওখান থেকে চলে গেলেন । তারপর অনেক পথ ভ্রমণ করে পৌছালেন পৃথিবীর শেষপ্রান্তে । দেখা পেলেন তার গুরু তার মামা মহান নির্দেশক ক্লোস্কুরবের। জানতে চাইলেন এখন তার কি করা উচিত।
উনি বললেন, ‘তোমার সেটাই করা উচিত যা ওই মানবী চায়।’
প্রথম পিতা ফিরে এলেন নিজের আস্তানায়। ভবিষ্যৎ কাজটির কথা ভেবে এবার উনি নিজেই কেঁদে ফেললেন। কিন্তু সেই মহান মানবী মা বললেন, আগামি কাল সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর উঠবে তুমি আমায় হত্যা করবে। তারপর আমার দুই সন্তানকে বলবে আমার চুল আর পা ধরে চারদিকের জমির ওপর যেন ঘষটে ঘষটে নিয়ে যায় । এই করতে করতে একসময় আমার সব মাংস দেহ থেকে খসে যাবে । পড়ে থাকবে শুধু হাড়। সেই হাড়গুলো একসাথে করে মাটির তলায় পুঁতে দেবে । তারপর সেখান থেকে চলে আসবে।’
মানবী মা এবার একটু হাসলেন, বললেন, ‘সাত মাস অপেক্ষা করার পর ওইখানে যাবে । দেখতে পাবে আমার দেহ থেকে খসে যাওয়া মাংস আবার ফিরে এসেছে । সেই মাংস যা ভালোবাসা থেকে জন্ম নিয়েছে । সেই মাংস যা তোমাদের লালন পালন করবে আর শক্তি দেবে চিরটাকালের জন্য।’
প্রথম পিতা পালন করলেন তার স্ত্রীর নির্দেশ। তার ছেলেরাও সেটাই করলো যা তাদের মা বলেছিলেন। গোটা পৃথিবী ঢেকে গেল প্রথম মানবী মায়ের মাংসে । তারপর একেবারে মাঝখানে ওরা পুঁতে দিলেন হাড়গুলোকে  এবং ফিরে এলেন কাঁদতে কাঁদতে।
সাত মাস পর প্রথম পিতা, তার ছেলেরা, তাদের সন্তানরা সবাই মিলে হাঁটা দিলেন সেই স্থানের দিকে যেখানে পোঁতা হয়েছিল হাড়গুলো। যাওয়ার পথে ওরা দেখতে পেলেন রুক্ষ শুষ্ক ধরাতল আর নেই। সব জায়গায় গজিয়েছে লম্বা লম্বা সরু গাছ । আর সেই সব গাছের ফলেছে এক অদ্ভুত ফল । সোনালী হলুদ রঙের ছোট্ট ছোট্ট দানায় লম্বাটে সেই ফলের গা ভর্তি। হ্যাঁ, সে ফল হলো ভুট্টা। প্রথম মানবী মায়ের দেহের মাংস আবার ফিরে এসেছে । এই ফলের রুপ ধরে । যাতে তার সন্তানেরা খাবার পায় শক্তি পায় । ওরা খেয়ে দেখলো সেই ফল । আহা কি মিষ্টি, কি সুস্বাদু । মনে হচ্ছে যেন মাতৃ দুগ্ধের স্বাদ আবার তারা নতুন করে পাচ্ছে। ওদের মা বলে গিয়েছিলেন সব ফল যেন ওরা খেয়ে নষ্ট না করে । কিছুটা গাছেই ছেড়ে যেতে  বলেছিলেন। ওরা সেটাই করলো ।
এরপর থেক প্রতি সাত মাস অন্তর ওই ভুট্টা গাছগুলো নতুন নতুন করে জন্মালো আর এই পৃথিবীর প্রথম মানব প্রজাতির সন্তানদের খাবার অভাব থাকলো না।
যেখানে প্রথম মানবী মায়ের হাড়গুলো পোঁতা হয়েছিল সেখানে জন্ম নিয়েছিল এক আলাদা গাছ । তার বড়ো বড়ো পাতা এবং সুন্দর গন্ধ যুক্ত। এই গন্ধ আসলে তাদের মায়ের নিঃশ্বাস। আর সেই নিঃশ্বাসের তালে শোনা গেল তাদের মা বলছেন, “এই পাতাগুলোকে পোড়াও। তার যে ধোঁয়া সেটা টেনে নাও নিঃশ্বাসের সাথে  । এটা অতি পবিত্র । এই গন্ধ তোমাদের মনকে পরিষ্কার করবে । প্রাথনায় মনোনিবেশ করতে সাহায্য করবে। হৃদয়কে আনন্দ প্রদান করবে।”
প্রথম পিতা প্রথম গাছগুলির নামকরন করলেন স্কারমুনাল বা করন বা ভুট্টা। আর দ্বিতীয় গাছটির নাম দিলেন উতারমার-ওয়াইয়ে বা টোবাকো বা তামাক।
প্রথম পিতা তার সন্তানাদিকে বললেন, ‘এই কথা সব সময় মনে রাখার চেষ্টা করবে  যে এই স্কারমুনাল তোমাদের মায়ের শরীর। এর যত্ন নিয়ো। ওতে মিশে আছে ওর সব ভালোটুকু । সাথেই যত্ন নিয়ো এই উতারমার-ওয়াইয়ের । কারন এর মাধ্যমে তোমরা তোমাদের আদিমায়ের ভালোবাসার নিঃশ্বাস নিজের শরীরে গ্রহন করার সুযোগ পাবে। সব সময় খাওয়ার আগে তার উদ্দেশ্যে জানাবে তোমাদের কৃতজ্ঞতা। ভালোবাসা । তিনি নিজের প্রান দিয়েছিলেন বলেই আজ তোমরা বেঁচে আছো । আসলে উনি কিন্তু মারা যান নি । বেঁচে আছেন আমাদের সবার মধ্যে।’
[অনুবাদকের কথা – অনেকের হয়তো মনে হবে এই কাহিনী ধুম্রপান করাকে উৎসাহ দিতে লেখা হয়েছে বা হয়েছিল বা প্রচার করা হতো । আমার  ও যে সেটা মনে হয়নি তা নয় । মনে রাখতে হবে দেশ কাল আচারের প্রেক্ষিতে আমাদের কাছে ব্যাপারটা অন্য রকম মনে হলেও নেটিভ রেড ইন্ডিয়ান কালচার অনুসারে ধুম্রপান টা বিশেষ সম্মানের ব্যাপার। হয়তো এ কাহিনী প্রচারের সাথে কোন এক সময়ে ব্যবসায়িক স্বার্থ কিছু জড়িয়ে ছিল যা আজ আর জানা সম্ভব নয়।]