Search This Blog

Friday, October 13, 2017

#প্রাচীন_সপ্তাশ্চর্যের_খোঁজ (৮৮-৮৯-৯০-৯১-৯২-৯৩-৯৪-৯৫) নবম অধ্যায় - চতুর্থ অভিযান - জিউসের স্ট্যাচু এবং আরটেমিসের মন্দির[প্রথম ভাগ]

#প্রাচীন_সপ্তাশ্চর্যের_খোঁজ (৮৮-৮৯-৯০-৯১-৯২-৯৩-৯৪-৯৫ )
নবম অধ্যায় - চতুর্থ অভিযান
জিউসের স্ট্যাচু এবং আরটেমিসের মন্দির 
প্রতিম দাস
০০০০০০০০০০০০০০

নবম অধ্যায়
চতুর্থ অভিযান
জিউসের স্ট্যাচু এবং আরটেমিসের মন্দির
০০০
প্যারিস – রোম
১৮ই মার্চ , ২০০৬
টারটারাসের আগমনের ২ দিন আগে
০০০০০
দ্যা চ্যাম্প-এলিসেস
প্যারিস, ফ্রান্স
১৮ই মার্চ , ২০০৬, সকাল ১১টা
টারটারাসের আগমনের ২ দিন আগে
০০০০০

আর্ক ডে ট্রায়াম্পের চারপাশের বিরাট বিরাট মালটি লেনগুলোয় ভিড়ের ভেতরে চার চাকার এস ইউ ভি টা নিয়ে চক্কর মারছিল জ্যাক ওয়েস্ট জুনিয়র।
লিলি বসে আছে প্যাসেঞ্জার সিটে । পেছনে পুহ বিয়ার, স্ট্রেচ আর বিগ ইয়ার্স।
শ্ত্রুর  এলাকায় সাংঘাতিক রকমের কোন মিশনে যাওয়ার আগে যেমনটা  হয় সেরকম উদ্বিগ্নতায় ভরা মুখে নীরবে বসে ছিল ওরা।
প্যারিসের মধ্য  এলাকাটা দেখতে খ্রীস্টান ক্রশের মতো।
লম্বা অংশটা হল চ্যাম্পস-এলিসিস, যে পথ ধরে এগোলে আর্ক ডে ট্রায়াম্প থেকে সোজা প্যালিস ডে ল্যুভরে যাওয়া যায়। আর আনুভূমিক ভাবে থাকা ক্রশের ছোটো বাহুর একপ্রান্তে অবস্থান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলীর। আর অন্য প্রান্তে অসাধারন সুন্দর সেন্ট মেরী ম্যাগডালেন চার্চ।
আর এই দুই বাহুর সংযোগ স্থলটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই অবস্থান প্লেস ডে লা কনকর্ডের ।
ফরাসি বিদ্রোহের সময় এই জায়গাটা বিখ্যাত হয়ে যায় শতাধিক বিখ্যাত পুরুষ আর মহিলার মৃত্যুদন্ডের স্থান রুপে। প্লেস ডে লা কনকর্ডে হলো রক্তাক্ত গিলোটিনের এলাকা ।
এখন অবশ্য সেখানে, ঠিক একই জায়গায় ... প্যারিসের একেবারে হৃদয়ে – সব সময়ের জন্য যেদিকে সকলের নজর থাকে – সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা সুউচ্চ ইজিপশিয়ান ওবেলিস্ক।
লাক্সারের মন্দিরের দ্বিতীয় ওবেলিস্ক।
পৃথিবীতে যত অবেলিস্ক আছে – ইজিপ্টে বা অন্য কোথাও – প্যারিসের এই ওবেলিস্ক এক দিক থেকে একেবারে অদ্বিতীয় এক বিশেষ কারনে –
এর পিরামিডিয়নটা যা ওর একেবারে ওপরে অবস্থান করছে তার রঙ সোনালী ।
ইতিহাসবিদ দের এটা খুব পছন্দের জিনিষ। কারন প্রাচীন ইজিপ্টে ওবেলিস্কের মাথা এভাবেই রঙ করা থাকতো । সে সময়ে প্রত্যেক ওবেলিস্ক এর মাথার ক্ষুদ্র পিরামিডটা মোড়ানো থাকতো ইলেক্ট্রাম দিয়ে । রুপ আর সোনা দিয়ে বানানো এক বিরল সংকর ধাতু ।
লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হলো এই যে প্যারিসের ওবেলিস্কে সোনালী পিরামিডিয়নটা কয়েক বছর আগে স্থাপন করা হয়  - বিখ্যাত এই পাথরের সুঁচের ওপর ওটা স্থাপন করা হয় ১৯৯৮ সালে।
‘পুহ,’ ওয়েস্ট গাড়ী চালাতে চালাতেই জিজ্ঞেস করলো , ‘ভূগর্ভস্থ সমাধি কক্ষের এলাকা দেখা হয়েছে?’
‘হ্যাঁ দেখেছি । একেবারে ফাঁকা, চিন্তার কিছু নেই। ওখানে ঢোকার দরজা চারলস ডে গল ব্রিজের নিচে । টানেলটা চলে গেছে বুলেভারড ডীডেরট তলা ধরে দরজার তালাটা নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে।’
‘স্ট্রেচ ট্রেনের কি খবর?’
‘টিজিভি সার্ভিস। প্ল্যাটফর্ম ২৩। ১২টা ৪৪ এ ছাড়ে । প্রথম স্টপেজ ডিজনে ।’
‘বেশ, ভালো ।’
চ্যাম্প-এলিসেস দিয়ে গাড়ী চালানোর  সময় চয়া বুলেভারড দিয়ে সামনে তাকিয়ে ছিল প্যারিসের ওবেলিস্কটার দিকে । সমস্ত কিছুর মাথা টপকে প্রায় ছতলা বাড়ীর সমান উঁচু হয়ে দন্ডায়মান।
গাড়ীতে রয়েছে পাহাড়ে চড়ার সরঞ্জাম – দড়ি, হুক, পিটন, ক্যারাবাইনার – সব তৈরী ওই অতিকায় সুচে উঠে ওপরের জিনিষটাকে পরীক্ষা করে দেখার জন্য। যে বেশবাস আপাতত ওয়েস্ট ধারন করে আছে তাতে ওকে দেখে মনে হচ্ছে ও হল একজন বেপরোয়া থ্রিলারপ্রেমী । অতি দ্রুত কাজটা করতে পারলে পুলিস আসার আগেই সকান দিতে অসুবিধা হবে না। আর সেটা করেই ওরা চলে যাবে ল্যুভরে । আর বড় ও সাঙ্ঘাতিক কাজটা করার জন্য ।
কাছাকাছি পৌঁছে গেছে প্রায় এমন সময় , ট্র্যাফিকের ভী কিছুটা কমতেই –
‘ধ্যাত তেরে কি ...’ ওয়েস্ট বলে উঠলো ।
ওবেলিস্ক এর নিচের অংশটা বিশেষ কাঠামো দিয়ে ঘেরা । যা তিনটে স্তরে বিভক্ত এবং জাল দিয়ে ঘেরা । যার একটাই অর্থ ওখানে কন্সট্রাকশনের কাজ চলছে ।
আর ওই কাঠামোর ভেতরে ঢোকার একমাত্র পথে পাহারা দিচ্ছে ছয় জন সিকিঊরিটি গার্ড।
একটা বিরাট সাইন বোর্ড ঝোলানো আছে । যাতে ইংরেজি আর ফরাসী ভাষায় লেখা ‘অত্যাবশকীয় পরিষ্কার করনের কাজ চলিতেছে’।
স্ট্রেচ কিছু একটা সন্দেহ হচ্ছে এমন ভাবে বললো, ‘এটাকে পরিষ্কার করা হচ্ছে । ব্যাপারটা একটু কেমন কেমন মনে হচ্ছে না তোমার? আমার তো মনে হচ্ছে আমাদের ইউরোপিয়ান প্রতিদ্বন্দ্বীরা আসলে তাদের কাজ করছে।’
‘ অসমর্থিত সেন্ট মার্কের গসপেল খুব বাজে একটা জিনিষ । এ পৃথিবীতে ওটার আর অনেক কপি আছে ,’ ওয়েস্ট বললো। ‘নিশ্চিত ভাবেই ডেল পিয়েরোর কাছেও ওটার একটা কপি আছে । আর সেটা পড়েই ও ওবেলিস্ক এর ব্যাপারটা ধরে ফেলে এবং আসল ব্যাপারটাকে মেপে বার করে নিয়েছে । যেহেতু ওটা ওখান থেকে এখন আর  সরানো সম্ভব নয় তাই ওটার কাছে যাওয়ার পথটাই আটকে দিয়েছে। যাতে আমরা কিছু করতে না পারি। এর অর্থ – ধ্যাত তেরে কি... নিকুচি করেছে – ডেল পিয়েরো আলেকজান্ডারের সমাধির প্রায় কাছেই পৌছে গেছে । সবার ওপরে থাকা টুকরোটা  ওই...’
কাঠামো দিয়ে ঘেরা ওবেলিস্কটাকে দেখতে দেখতে ওয়েস্ট , নতুন করে ভাবছিল, নতুন করে পরিকল্পনা সাজাচ্ছিল, নতুন দিশা খুঁজছিল।
‘ সবকিছু উলটে পালটে গেলো । শোনো সবাই। পরিকল্পনা বদলাচ্ছি । এখন আর ওবেলিস্ক আমাদের প্রথম লক্ষ্য নয় । আমরা আগে যাবো ল্যুভরে । যে ভাবে কাজ করার কথা আছে সেটা করবো । তারপর ফিরে যাওয়ার সময় ওবেলিস্কটার ব্যাপারে মাথা ঘামাবো ।’
‘পাগল হলে নাকি, ‘ স্ট্রেচ বললো । ‘এর ফলে আমাদের জীবন সংশয় হবে । অর্ধেকের বেশী জেন্ডার মেরি আমাদের খোঁজে নেমে পড়বে ।’
‘স্ট্রেচ, এই মুহূর্তে ওবেলিস্ক দেখার চেষ্টা করে  ইউরোপিয়ান দের সাথে সরাসরি সং ঘর্ষে নামলে আরো বেশি  নজরে পড়ে যাব আমরা,’ ওয়েস্ট বললো । ‘আমি আশা করেছিলাম কেউ বুঝতে পারার আগেই আমি ওটাতে উঠতে এবং নামতে পারবো । যেটা এখন আর সম্ভব নয়। কিন্তু ল্যুভরে আমরা যেটা করতে চাই সেটা করলে গোটা প্যারিসের নজর ওই দিকে চলে যাবে – যে হইচই এর সৃষ্টি হবে সেটা আমাদের সুযোগ করে দেবে সিকিউরিটি গার্ডদের এড়িয়ে ওবেলিস্ক এর কাজটা সেরে নেওয়ার। আর সেটার ভাবনা থেকেই বুঝতে পারছি আমাদের পালিয়ে যাওয়ার গাড়িটা ভালোই কাজ দেবে।’
‘আমি ওটার ব্যাপারে কিছুই জানি ...’ স্ট্রেচ বললো ।
পুহ বিয়ার বলে উঠলো, ‘তুমি কি জানো আর কি জানো না সেটা এখন অপ্রয়োজনীয় বিষয়, ইজ্রায়েলী। সত্যি বলছি, তোমার সব ব্যাপারে সন্দেহ করাটা আমার মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। হান্টসম্যান যা বলছে সেটাই করো। এখানে ওই নেতৃত্ব দিচ্ছে ।’
স্ট্রেচ গম্ভীর মুখে পুহ এর দিক থেকে চোখ না নামিয়ে বললো, ‘ঠিক আছে ঠিক আছে। সেটাই হোক । আমি মেনে নিচ্ছি ।’
ওয়েস্ট বললো, ‘বেশ । ল্যুভর এর পরিকল্পনা যা ছিল সেটাই থাকছে । বিগ ইয়ার্স, তুমি আর লিলি আমার সাথে থাকবে। আমরা ভেতরে ঢুকবো । পুহ আর স্ট্রেচ তোমরা পালিয়ে যাওয়ার গাড়ি নিয়ে তৈরি থাকবে ঠিক জায়গায় যখন আমরা লাফ দেবো ।’
পুহ বিয়ার মাথা ঝুঁকিয়ে বললো, ‘ চিন্তা নেই অপেক্ষায় থাকবো হান্টস ম্যান।’

কুড়ি মিনিট বাদে, ওয়েস্ট, লিলি আর বিগ ইয়ার্স – বন্দুক ছাড়াই – মেটাল ডিটেক্টরের দরজা পার হয়ে ঢুকে গেল ল্যুভরের ভেতরে।
বিখ্যাত কাঁচের পিরামিডটা ঝুলছিল ওদের ওপরে । চত্বরটাকে ভরিয়ে রেখেছিল ঝকঝকে সূর্যের আলোতে।
কাঁচের পিরামিডটাকে দেখতে দেখতে বিগ ইয়ার্স বলে উঠলো, ‘আমার মনে হচ্ছে আমি যেন ড্যান ব্রাউনের গল্পের ভেতর ঢুকে পড়েছি ।’ 
ওয়েস্ট উত্তর দিলো, ‘ওরা সে সব করেনি যা আমরা করতে চলেছি দ্যা ভিঞ্চি কোডে।’
লিলি ওদের জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল সুরক্ষা কবচ। যতই হোক একটা ছোটো বাচ্চাকে সাথে নিয়ে নিশ্চিত ভাবেই কোনো ছিনতাইকারীর দল এখানে ঢুকবে না !
ওয়েস্টের সেল ফোন বেজে উঠলো ।
পুহ বিয়ার । ‘আমারা পালানোর গাড়ী পেয়ে গিয়েছি। দরকার মতো কাজ হয়ে যাবে।’
‘দশ মিনিট সময় দাও ,’ ওয়েস্ট কথাটা বলেই এগিয়ে গেল।

মিনিট বাদে , দেখা গেল ওয়েস্ট আর বিগ ইয়ার্স দুজনের পরনেই সাদা  বিশেষ কভারঅল পোশাক । এটা পড়ে ল্যুভরের মেইন্টেন্যান্স কর্মীরা – মিউজিয়ামের নিচের ঘরে দুজন কর্মীকে অজ্ঞান করে এই পোশাক সংগ্রহ করা হয়েছে ।
ডেনন উইংএ প্রবেশ করলো ওরা এবং উঠতে শুরু করলো ডারু স্টেয়ারকেস ধরে । সিঁড়ি পথটা নানান দিকে এঁকেবেঁকে অনেক তোরনের স্তম্ভের পেছন দিয়ে ঘুরে গিয়ে পৌঁছেছে একটা চওড়া স্থানে । যেখানে রাখা আছে ...
... ডানাওয়ালা বিজয়িনী, উইংড ভিক্টরি অফ সামোথ্রেস ।
০০০০০
মূর্তিটা সত্যিই অসাধারন, মনোমুগ্ধকর ।
সামনে হাওয়ার দিকে বুক চিতিয়ে দেবী দাঁড়িয়ে আছেন । অতিশয় সুন্দর তাঁর ডানা দুটি পেছন দিকে অপেক্ষমাণ হাওয়া কেটে উড়ে যাওয়ার প্রতীক্ষায় । ভেজা পোশাক অনুপম দেহবল্লরীতে আটকে আছে । প্রতিটি ভাঁজ এবং খাঁজ নিপুণ নিখুঁত ভাবে শ্বেত পাথরের গায়ে ফুটিয়ে তুলেছেন দক্ষ শিল্পী ।
ছয় ফুট উঁচু । রাখা আছে পাঁচ ফুট উঁচু বেদীর ওপর । চারদিকে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যটকদের মাথা ছাড়িয়ে গর্বিত ভাবে নিজের অস্তিত্ব জাহির করে চলেছেন ডানাওয়ালা বিজয়িনী দেবী।
মাথা যথাস্থানে বর্তমান থাকলে ডানাওয়ালা বিজয়িনী ভেনাস ডি মেলো’র– যেটা ল্যুভরের আর এক আকর্ষণের বিষয়- মতই বিখ্যাত হয়ে যেতো । ভেনাসের চেয়ে সবদিক থেকে এই মূর্তির শৈল্পিক গুন অনেক অনেক বেশী উঁচুমানের ।
সাধারন দর্শক  সেটা না বুঝলেও ল্যুভরের ওপরওয়ালারা এটা নিশ্চিত ভাবেই বুঝেছেন । আর সেকারনেই এর অবস্থান এই ভবনের উচ্চতম স্থানে, দোতলায় । মোনালিসা থেকে খুব একটা দূরেও নয়। অন্য দিকে ভেনাসকে রেখে দেওয়া হয়েছে নিচের তলায় ।
যে বেদীটার ওপর দেবীকে রাখা আছে সেটা জাহাজের সামনের অংশের মতো সূঁচালো । কিন্তু এটা জাহাজের অনুকরন নয় মোটেই ।
এটা জিউসের সিংহাসনের হাতল । সামনের একটা ভাঙা অংশ ।
একটু ভালো করে দেখলে জিউসের দৈত্যাকার বুড়ো আঙ্গুলের অংশ ডানাওয়ালা বিজয়িনীর নিচে দেখতে পাওয়া যাবে
আর এর থেকেই যে অনুমানটা করা যায় তাতে চমকে যেতে হয় । যদি এই দেবী মূর্তি এতোটা বড় তাহলে জিউসের মূর্তিটা – মানে আসল আশ্চর্যটা , যা ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে গেছে – নিশ্চিতভাবেই অতি অতিকায় ছিল।
ডেনন উইং এর দোতলায় মূর্তিটার অবস্থান ওয়েস্টকে একটা সমস্যায় ফেলে দিলো ।
ল্যুভরের দোতলায় রাখা সমস্ত রকম দ্রষ্টব্য বস্তু লেজার দ্বারা সুরক্ষিত ।  কোনো মূর্তি বা ছবি একটু নড়লেই এক অদৃশ্য লেজার সংকেত এর সাহায্যে কাছের সমস্ত দরজাগুলোতে নেমে আসবে স্টিলের গ্রিল । ভেতরে আটকে যাবে চোর ।
দোতলায় আর একটা অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া আছে । দারু স্টেয়ারকেস বা সিঁড়িটা নানা দিক দিয়ে এঁকে বেঁকে এলেও ওটাকে সম্পূর্ণ ‘সিল’ করে দেওয়া যায় । অর্থাৎ ওর ভেতরেও চোরকে আটকে রাখা অসম্ভব  নয় । তুমি ডানাওয়ালা বিজয়িনীকে সাথে হয়তো নিতে পারবে কিন্তু এখান থেকে বের হওয়া “না মুমকিন” ।
মেইনটেন্যান্স কর্মীদের পোশাকে সজ্জিত ওয়েস্ট আর বিগ ইয়ার্স সোজা উঠে গিয়ে দাঁড়ালো মূর্তিটার সামনে।
খুব একটা ভিড় নেই আজকে সেই অর্থে । ওরা দুজনে কিছু গাছের টব স্থানান্তরিত করতে শুরু করলো । যা সেভাবে কেউ নজর দিয়ে দেখলো না।
ওয়েস্ট দুটো গাছকে মূর্তির বাম দিকে রাখলো । বিগ ইয়ার্স  দুটো গাছকে নিয়ে গিয়ে বেশ কিছুটা দূরে রাস্তার মাঝে দরজার তলায় রেখে দিলো । ওদিক দিয়ে দক্ষিন দিকে যাওয়া যায়। ওই দিকেই সীন নদী । লিলি ওই দরজাটার কাছেই দাঁড়িয়ে।
ওদের দিকে কারোর নজরই নেই।
ওরা দুজন মিউজিয়ামের কাজের লোক যারা এমন কিছু কাজ করছে যার খবর কেউ রাখে না, সম্ভবত ওপরওয়ালারা জানে।
ওয়েস্ট কছের একটা স্টোররুম থেকে দ্রুত “সারানোর কাজ চলছে” লেখা বোর্ড এনে মূর্তিটার সামনে রেখে দিলো দর্শকদের দিকে মুখ করে।
বিগ ইয়ার্সের দিকে তাকালো... বিগ ইয়ার্স  মাথা ঝোঁকালো ।
জ্যাক ওয়েস্ট জুনিয়র ঢোঁক গিললো ।
নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না ও কি করতে চলেছে।
একটা বড় করে শ্বাস নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো একেবারে শ্বেত পাথরের বেদীটার সামনে – যা জিউসের সিংহাসনের হাতল – মারলো এক ধাক্কা উইংগড ভিক্টরি অফ সামোথ্রেসের গায়ে ... ২২০০ বছরের প্রাচীন অমুল্য মূর্তিতে ... ওটা হেলে পড়লো মেঝের দিকে।
বেদী থেকে একটু নড়ে যেতেই শুরু হয়ে গেল সাইরেন বাজা এবং লাল আলোর নেভাজ্বলার ঝলকানি ।
প্রত্যেক দরজার মধ্যে নেমে এলো মোটা মোটা গ্রিলের আড়াল – ব্যাম! ব্যাম! ব্যাম! ব্যাম! – সম্পূর্ণ এলাকাটা “সিল” হয়ে গেল।
শুধু একটা দরজা বাদে ।
দক্ষিন দিকের দরজাটা ।
ওখানে গ্রিলটা বার বার নেমে এসেও আটকে যাচ্ছে দু ফুট উঁচুতে –
- আটকে যাচ্ছে কিছু আগে বিগ ইয়ার্সের রেখে দেওয়া টবদুটোর কাছে এসে ।
ওটাই বেরিয়ে যাওয়ার পথ ।
০০০০০
মূর্তিটা পড়লো দুটো গাছের টবের ওপর । যে টব দুটো ওয়েস্ট সেট করে রেখেছিল বাঁদিকে । পড়ার ধাক্কাটা অনেকটাই রুখে দিলো গাছের ডাল পালা ।
ওয়েস্ট দ্রুত ছুটে গেল মূর্তিটার কাছে। পরীক্ষা করে দেখল পা দুটো ... বা বলা যেতে পারে ছোট্ট ঘনক আকৃতির শ্বেত পাথরের টুকরো যার ওপর ওটার পা স্থিত ছিল।
মেইনটেন্যান্স রুম থেকে নিয়ে আসা বড় রেঞ্চটা বার করলো ।
‘বিশ্বের সমস্ত প্রত্নতত্ববিদরা আমাকে ক্ষমা করবেন,’ ফিসফিস করে বললো নিজের মনে এবং রেঞ্চটা দিয়ে দরকারি কাজটা শুরু করলো।
ক্যারাআআক! ক্যারাআআক!! ক্যারাআআআআআআআক !!!
আশে পাশে আটকে থাকা পর্যটকেরা বুঝতে পারছিল না কি হচ্ছে । দুজন এগিয়ে এসে দেখার চেষ্টা করছিল কি ঘটছে ভেতরে । বিগ ইয়ার্স অবশ্য চোখ পাকিয়ে তাদের ওখান থেকে সরিয়ে দেয়।
পর পর তিনটে জোরালো চাপের ফলে পায়ের তলার অংশটা আর রইলো না মূর্তিটার – কিন্ত্য তার বদলে দেখা গেল একটা সোনার ট্রাপেজয়েড টুকরোকে , ১৮ ইঞ্চি করে হবে এক একটা বাহু ।
ক্যাপস্টোনের তৃতীয় অংশ ।
 লুকানো ছিল বিজয়িনী মূর্তির পায়ের তলার ভিত্তিতে ।
‘লিলি!’ ওয়েস্ট ডাকলো। ‘চট করে এসে ভালো করে এটাকে দেখে নাও ! বলা যায় না এটাও যদি হাতছাড়া হয়!’
লিলি এলো, তাকালো ঝকমকে সোনালী ট্রাপেজয়েডটার দিকে । তারপর দেখল ওটার গায়ে খোদাই করা রহস্যময় চিহ্নগুলোকে ।
‘দুটো মন্ত্রের আরো কিছু লাইন,’ বললো লিলি ।
‘ বেশ । চলো এবার যাওয়া যাক,’ জানালো ওয়েস্ট   ।
টুকরোটা ঢুকে গেল বিগ ইয়ার্সের ব্যাকপ্যাকে । লিলি ছুটে গেল সবার আগে ... এক এক করে বুকে হেঁটে বেরিয়ে গেল দক্ষিন দিকের দরজাটার তলা দিয়ে টবদুটোর পাশ দিয়ে ।
তারপর জোরালো লাথি মেরে   টব দুটোকে ঢুকিয়ে দিল ভেতরে । সাথে সাথেই গ্রিল নেমে প্রকৃত ভাবেই সিল হয়ে গেল বিজয়িনীর এলাকা ।

একের পর এক লম্বা লম্বা করিডোর ধরে দৌড়ে চলছিল ওরা । পায়ে টান ধরছে, বুক ধরফর করছে ।
পেছন থেকে ভেসে আসছে – চিৎকার ফরাসী ভাষায় , মিউজিয়ামের রক্ষীরা তাড়া করে আসছে ।
ওয়েস্ট রেডিও মাইকে বললো , ‘ পুহ বিয়ার! যেখানে থাকার কথা সেখানে আছো তো?’
‘হ্যাঁ, আমরা অপেক্ষা করছি! আশা করি তুমি সঠিক জানলাটা খুঁজে পেয়েছো!’
‘খুব শিগগিরি আমরা ওটা খুঁজে নেবো!’
যে করিডোর ধরে ওয়েস্টরা দৌড়াচ্ছিল সেটা সহসাই শেষ হয়ে গেল ডান দিকের এক কোনায় । ওখান থেকে যেটা শুরু সেটা একটা বিরাট লম্বা হলওয়ে । আসলে এটা ল্যুভরের দক্ষিন অংশ । হলয়ের বাম দিকের দেওয়ালটায় পর পর টাঙানো আছে সব মাস্টারপিস পেইন্টিং। আর ফাঁকে ফাঁকে আছে উঁচু উঁচু ফরাসী স্থাপত্যের জানলা । যেখা দিয়ে দেখা যাচ্ছে সীন নদী ।
আরো একদল রক্ষীর আওয়াজ ভেসে এলো এবার খুব কাছ থেকে ।
ওয়েস্ট সেই বড় রেঞ্চটা দিয়ে প্রথম জানলার কাঁচে মারল এক ঘা । ভেঙে চুরমার হয়ে গেল ওটা কাঁচ । ছিটকে গেল চারপাশে।
উঁকি মারলো ওটা দিয়ে ।
দেখতে পেলো পুহ বিয়ার তাকিয়ে আছে ওর দিকে , সোজাসুজি ... কয়েক ফুট দূরে ...
...দাঁড়িয়ে আছে ছাদ খোলা একটা ডাবল-ডেকার বাসের ওপর!
ল্যুভর আর  সীন নদীর মাঝে একটা সরু রাস্তা আছে ... নাম কুয়াই ডেস টুইলেরিস। নদীর ধার ধরে চলা এ এক লম্বা রাস্তা । যা চলে গেছে নানান চড়াই উতরাই ধরে – খনো উঠে গেছে সেতুর ওপর আবার কখনো নেমে গেছে টানেল বা আন্ডারপাস রাস্তায় ।
আর সেই রাস্তাতেই পুহ বিয়ারের সদ্য চুরি করা ডাবল-ডেকার বাসটা এখন দাঁড়িয়ে , প্যালাইস  দ্যু ল্যুভরের গা ঘেঁষে। এটা সেই লাল রঙের ছাদ খোলা ডাব-ডেকার বাসগুলোর একটা, যা ভ্রমণকারীদের প্যারিস, লন্ডন বা নিউইয়র্ক ঘুরিয়ে দেখায় ।
‘ আরে! কিসের জন্য অপেক্ষা করছো তোমরা!’ পুহ বিয়ার চেঁচিয়ে বললো । ‘চলে এসো!’
‘হ্যাঁ, তাইতো!’
ওয়েস্ট লিলিকে আগে ছুঁড়ে দিলো । তারপর বিগ ইয়ার্সকে যেতে  দিলো টুকরোটা সমেত এবং নিজে ঝাঁপ মারলো দোতলার জানলা থেকে ডাবল-ডেকার বাসের ওপর – ওদিকে ধেয়ে আসা রক্ষীরা শুরু করে দিয়েছে গুলি চালানো।
ওয়েস্টের পা বাসের ওপর পড়তেই  ড্রাইভারের আসনে বসে থাকা স্ট্রেচ গ্যাসের স্যুইচ অন করে চালু করে দিলো বাস । শুরু হলো পালানো ।
বড়সড় লাল ডাবল-ডেকার বাসটাকে স্ট্রেচ যে গতিতে চালাতে শুরু করলো দুপুর বেলার প্যারিসের জনস্রোতের ভেতর দিয়ে সেই গতিতে ওই বাসটা কেউ কোনোদিন চালাবে বলে ভাবা হয়নি।
পেছন থেকে ভেসে আসছিল পুলিসের সাইরেন ।
ওয়েস্ট চিৎকার করে বললো, ‘ বাম দিকের পথটা ধরে এগোবে! ল্যুভরকে পাক মেরে যেতে হবে ! ওবেলিস্কটার কাছে!’
বাসটা বাম দিকে বেঁকলো দ্রুততার সাথে । ওয়েস্ট ওপর থেকে নিচে নেমে এসে স্ট্রেচের কাঁধের ওপর দিয়ে সামনের দিকে তাকালো।
‘ওখানে যাওয়ার পর , কি করবো?’ স্ট্রেচ জানতে চাইলো ।
ওয়েস্ট তাকালো – দেখতে পেল ওবেলিস্কটাকে বাঁদিকের গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে , তলাটা ঘেরা আছে বিশেষ কাঠামো দিয়ে ।
‘ আমি চাই যে তুমি সোজা গিয়ে ওই কাঠামোতে ধাক্কা মারো।’

ডাবল-ডেকার বাসটা প্লেস ডে লা কনকর্ডেতে ঢুকলো সশব্দে। স্পীডের চরম সীমায় উঠে ।
ওবেলিস্ক এর তলায় কাঠামোর আশে পাশে থাকা সিকিউরিটি গার্ডের দল প্রায় শেষ মুহূর্তে বুঝতে পারলো কি হতে চলেছে। পড়ি মরি করে ওরা সরে গেল ওখান থেকে। বাসটা গিয়ে সোজা ধাক্কা মারল কাঠামোটায়। ভেঙে ছিটকে গেল কিছুটা অংশ।
কাঁপতে কাঁপতে থামলো বাসটা –
- একই সাথে দেখা গেল বাসের ছাদের ওপর থেকে কাঠামোটার দ্বিতীয় ধাপে উঠে গেছে ওয়েস্ট। কাঁধে ঝুলছে দড়ি আর হাতে পাহাড়ে চড়ার সরঞ্জাম।
০০০০০
যত দ্রুত সম্ভব ওয়েস্ট উঠে গেল কাঠামোটার একেবারে ওপরে এবং ওবেলিস্কটাকে সামনাসামনি দেখলো।
একটা ঘণ্টা ঘরের মত আকারে, সারা গায়ে হিয়েরোগ্লিফিক্স এর আঁকিবুকি। মনে হচ্ছে আকাশ ফুঁড়ে উঠে গেছে ।
হিয়েরোগ্লিফিক্স অক্ষরগুলোর আকৃতি বেশ বড় বড় এবং আনুভুমিক লাইনে লেখা আছে –   এক লাইনে তিনটে চিত্রলিপি, দেখানো আছে ফ্যারাওদের অলংকৃতর ফ্রেম, ওসাইরিসের ছবি এবং কিছু পশুপাখি... বেশ কিছু ফ্যাল্কন, বোলতা এবং ওপর থেকে দ্বিতীয় লাইনে প্যাঁচা।
গভীরভাবে খোদাই করা হিয়েরোগ্লিফিক্স এর খাঁজ ধরে পায়ের চাপ দিয়ে ওয়েস্ট উঠতে থাকলো ওবেলিস্কটার গা বেয়ে। মনে হচ্ছিল একটা বাচ্চা ছেলে বিরাট একটা গাছে চড়ছে যেন।
স্ট্রেচের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ইয়ার পিসে। ‘ওয়েস্ট! চ্যাম্প-এলিসেস দিয়ে ছ’টা পুলিসের গাড়ী এগিয়ে আসছে!’
‘কতটা দূরে?’
‘খুব বেশি হলে ৯০ সেকেন্ড, যদি...’
‘ঠিক আছে খবর দিতে থাকো । অবশ্য আমার মনে হচ্ছে প্যারিসের পুলিসের থেকেও চিন্তাজনক কিছুর মুখোমুখী হতে চলেছি আমরা।’
ওয়েস্ট দ্রুত উঠতে থাকলো সুউচ্চ পাথরের সূঁচটায় ... উঠতে থাকলো ওপরে আর ওপরে ... এতটা ওপরে যে ওখান থেকে বিরাট বাসটাকে দেখাচ্ছিল ছোট্ট খেলনার মতো।
সময় পৌছালো শীর্ষে। মাটি থেকে ৭০ ফুটের বেশি ওপরে। সূর্যের আলোয় ওপরের ছোট্ট পিরামিডিয়নটা চোখ ঝলসে দেওয়ার মতো চকচক করছিল।
হেসলারের নোটবুকের কথাগুলো মনে করলো
“রা’য়ের ক্ষমতাকে সুত্র বদ্ধ করে মহান রামেসিসের চোখের মতো
সুউচ্চ মিনারের সুঁচে
দ্বিতীয় প্যাঁচাকে প্রথমে
আর তৃতীয়কে দ্বিতীয়ের স্থানে ...
...সেখানেই ইস্কেন্দারের সমাধি উন্মোচিত হবে ।”
জোরে জোরে বললো, ‘দ্বিতীয় ওবেলিস্ক এর তৃতীয় প্যাঁচা।’
নিশ্চিত ভাবেই , এই ওবেলিস্ক এর গায়ের দ্বিতীয় লাইনে– এটাই তো লাক্সার মন্দিরের দ্বিতীয় ওবেলিস্ক –তিনটে প্যাঁচা পাশাপাশি খোদাই করা আছে।
আর ওই তিনটে প্যাঁচার মধ্যে তৃতীয়টার মাথার কাছে একটা ছোট্ট গোল সূর্যকে নির্দেশ করছে।
ওয়েস্ট বুঝতে পারলো ইতিহাসের পাতায় খুব কম মানুষই এরকম কাছ থেকে এত উঁচুতে এবং ওপরের এই খোদাইগুলো দেখেছে – কিন্তু কাছ থেকে এই ডিস্কের মতো সূর্য ব্যাপারটা  বিসদৃশ । তার কারন ওটা একটা খোদাই করা ছবি নয় মোটেই । বরং বলা যায় ... যাকে বলে ... একটা কিছু ঢোকানো আছে প্লাগের মতো পাথরের গায়ে একটা ফুটোতে।
ওয়েস্ট ওই টুকরোটা ধরে মারলো টান, খুলে গেল ওটা –
-দু আঙুল চওড়া, নিখুঁত গোলাকৃতি একটা ক্ষুদ্র টানেল, যা এপাশ থেকে ওপাশে চলে গেছে ওবেলিস্কের।
নারকেল গাছে চড়ে তার গায়ে এক পাক মারার মতো করে অয়েস চলে গেল অন্য দিকটায় । ওদিকেও পাওয়া গেল একেবারে একই রকম একটা প্লাগ । ওটা খুলে নিতেই ওয়েস্ট ফু্টোটার ভেতর দিয়ে অন্য দিক দেখতে পেলো ।
‘ওয়েস্ট! জলদি! পুলিস প্রায় এসে গেল ...’
ওয়েস্ট ওর কথায় কান না দিয়ে জ্যাকেটের ভেতর থেকে দুটো হাই-টেক ডিভাইস বার করলো । প্রথমটা লেজার আল্টিমিটার। যা দিয়ে জমি থেকে ঠিক কতটা উঁচুতে এই ফুটো সেটা মাপা যাবে । আর দ্বিতীয়টা ডিজিটাল সারভের ইনক্লাইনোমিটার,  ফুটোটার আনুভূমিক এবং উলম্ব উভয় দিক থেকে সঠিক কৌনিক অবস্থান জানার জন্য ।
এই মাপগুলো জেনে নিয়ে ইজিপ্টের লাক্সারে গিয়ে “ভারচুয়ালি” একটা ওবেলিস্ক স্থাপন করে আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটের সমাধিস্থল খুঁজে নিতে অসুবিধা হবে না।
আল্টিমিটার বিপ শব্দ করে জানান দিলো উচ্চতার মাপ নেওয়া হয়ে গেছে।
এবার ইনক্লাইনোমিটারকে ফুটোটার ভেতর রাখলো। ওটাই বিপ শব্দ করে জানিয়ে দিলো কোনের মাপ নেওয়ার কাজ সমাপ্ত।
নামা যাক!
একজন দমকল কর্মী যে ভাবে মই এর দুপাশে পা রেখে সড় সড় করে নিচে নেমে আসে ওয়েস্ট সেভাবেই নেমে যেতে শুরু করলো ওবেলিস্কটার কানাত ধরে।
নিচে কাঠামোটায় ওয়েস্টের পা ঠেকা মাত্র  ছটা পুলিসের গাড়ী এসে ব্রেক কষে দাঁড়ালো  প্লেস ডে লা কনকর্ডের চত্বরে । গাড়ীগুলো থেকে বেরিয়ে এলো ডজন খানেক টুপি পড়া প্যারিসিয়ান পুলিস কর্মী ।
‘স্ট্রেচ! গাড়ী চালু করো! শুরু করে দাও পিছিয়ে যাওয়া ,’ বলেই ছুটতে শুরু করলো   কাঠামোটার ওপর দিয়ে  । ‘ আমি ঠিক উঠে পড়বো !’
বাসটা পিছিয়ে গেল কাঠামোটার কাছ থেকে , স্ট্রেচ এর দক্ষ চালনায় ঘুরলো বাসের মুখ । এগোতে শুরু করলো সামনের দিকে । ওদিকে ওয়েস্ট মারল এক লাফ কাঠামোর ওপর থেকে বাস লক্ষ্য করে ...
... ধপাস করে গিয়ে পড়লো বাসের ছাদের ওপর , ততক্ষনা ৎ চুড়ান্ত স্পিডে বাস ছুটে চললো সীন নদীর দিকে ।
 ল্যুভরে ওদের দুঃসাহসিক অভিযানের সাথে সাথেই সব ধরনের ফোরস নেমে পড়েছে তাদের কাজে।
ল্যুভরে চুরিটা সংগঠিত হওয়ার সাথে সাথেই খবরটা পুলিসের মাধ্যমে চলে গেছে অন্যান্য ফোরসের কাছে।
  স্ট্রেচ জানে না যে একই সাথে প্যারিস পুলিসের হাত থেকে বিষয়টা  উচ্চস্তরের বাহিনীর দায়িত্বে চলে গেছে ।
এখন ওদের খোঁজার দায়িত্ব ফ্রেঞ্চ আর্মির ।
 ঠিক যেমনটা ওয়েস্ট অনুমান করেছিল।
আর সেকারনেই বিধস্ত লাল রঙের ডাবল-ডেকার বাসটাকে ধাওয়া করে কোনও প্যারিস পুলিসের গাড়ী এলোনা ওদের পেছনে ওবেলিস্কের দিকে থেকে। ওরা কেবলমাত্র প্লেস ডে লা কনকর্ডের চত্বরটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকলো ।
একটু বাদেই পাঁচটা সবুজ রঙের দ্রূতগামী সশস্ত্র গাড়ী পুলিসদের গাড়ীগুলো পাশ দিয়ে হুস হুস করে  এগিয়ে গেল বাসটা যে পথে গেছে সেদিকে।
একই দিনে দ্বিতীয়বার কুয়াই ডেস টুইলেরিসের পথ ধরে তারস্বরে হর্ন বাজাতে বাজাতে সীন নদীর পাশ দিয়ে - পথ চলতি মানুষদের চমকে দিয়ে, রেড লাইটের সিগন্যাল না মেনে   একটা বিরাট রকমের হই চই পাকিয়ে ডাবল ডেকার বাসটা এগিয়ে চললো ।
ওদের পেছনেই আসছে ফ্রেঞ্চ আর্মির পাঁচটা গাড়ী।
প্যানহার্ড ভিবিএল নামের টার্বো চার্জড চারচাকার ডিজেল ইঞ্জিন যুক্ত সরু আকৃতির প্র্ত্যেকটা গাড়ীতে আছে তিনজন করে সেনা । অনেকটা স্পোর্টস ফোর ইন্টু ফোর গাড়ীর বর্ম পড়া সংস্করণ । অতি দ্রুতগামী এবং যে কোনোরকম রাস্তায় চলতে সক্ষম।
প্যানহার্ডগুলোতে নানান রকম আগ্নেয়াস্ত্র সেট করা আছে।  কোনোটায় লাগানো আছে ১২.৭ এম এম মেশিন গান , আবার কোনোটায় টি ও ডাবলু মিসাইল লঞ্চার।
বেশি সময় লাগলো না ওদের বাসটার নাগাল পেতে।
শুরু হয়ে গেল গুলি বর্ষণ। বাঁদিকের সব জানলাগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল – খানিকবাদেই একটা সুড়ঙ্গের ভেতর ঢুকে গেল বাসটা । সেনারা গুলি চালানো বন্ধ করতে বাধ্য হল।
দুটো প্যানহার্ড চেষ্টা করেছিল সুড়ঙ্গের ভেতর বাসের পাশ কাটিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার । স্ট্রেচ ওদেরকে চেপে দিলো দেওয়ালের গায়ে।
এগনোর পথ না পেয়ে গতির মাথায় দুটো গাড়ীই পিছলে গিয়ে উলটে গেল ... পাক খেতে খেতে ... উঠে গিয়ে ধাক্কা খেলো সুড়ঙ্গের ছাদে ।
ওপরে বাসের ছাদে , পুহ বিয়ার আর ওয়েস্ট চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলো বুলেটের জবাব বুলেট দিয়েই দেওয়ার । পুহ দেখতে পেলো একটা প্যানহার্ড গাড়ীতে টি ও ডাবলু মিসাইল লাগানো আছে।
চিৎকার করে বললো, ‘ওদের কাছে মিসাইল আছে !”
ওয়েস্ট বললো, ‘ চিন্তা নেই, ওরা ওটা ব্যবহার করবে না! ক্যাপস্টোনের টুকরো টা ধ্বংস হয়ে যাক এটা ওরা মোটেই চাইবে না।!’
‘ওয়েস্ট!’ স্ট্রেচের কণ্ঠ শোনা গেল রেডিও মাইকে । ‘আর কিছুক্ষনের ভেতরেই ওরা রাস্তায় ব্যারিকেড সাজিয়ে ফেলবে! তখন আমরা কি করবো?’
‘যত জোরে সম্ভব চালাও!’ ওয়েস্ট জবাব দিলো । ‘ আমাদের চার্লস ডে গল ব্রিজ –’
সুউউউউম-!
-সুড়ঙ্গ ছেড়ে ওরা আবার সূর্যের আলোয় বেরিয়ে এলো। সাথে সাথেই দেখতে পেলো দুটো ফ্রেঞ্চ আর্মি হেলিকপ্টার ওদের মাথার ওপরে  আকাশে ভাসছে।
দুটো আলাদা আলাদা রকমের চপার – একটা ছোট গ্যাজেল গান শিপ। আকারে ছোট, দ্রুতগামী বিভিন্ন রকম আগ্নেয়াস্ত্র আর মিসাইলে সাজানো।
দ্বিতীয়টা আকারে বেশ বড় এবং সাঙ্ঘাতিক ধরনের । সুপার পুমা ট্রুপ ক্যারিয়ার । আমেরিকার সুপার স্ট্যালিয়নের ফরাসী রুপ। অতিকায় এবং শক্ত পোক্ত। একসাথে ২৫ জন সেনাকে বয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম।
আর এখন ঠিক সেই ২৫ জন সেনাই আছে ওটার ভেতরে।
সীন নদীর উত্তর পাড় ধরে এগিয়ে চলা ডাবল-ডেকার বাসটার ওপর দিয়ে ওটা ওঠানামা করে ভেসে ভেসে যাচ্ছিলো রাস্তার ঢালের কারনে । মাঝে মাঝেই ওটার পাশের দরজা খুলে গিয়ে ঝুলতে শুরু করছিল দড়ি – ওদের পরিকল্পনা বুঝতে অসুবিধা নেই।
ওরা বাসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে – চলন্ত বাসে!
একই সাথে তিনটে প্যানহার্ড ঘিরে ধরে এগিয়ে চলেছে  তাল মিলিয়ে।
স্ট্রেচ বলে উঠলো, ‘যা মনে হচ্ছে আর কোনোভাবেই বাঁচার সুযোগ নেই।’
তাসত্বেও গাড়িটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো একই গতিতে ডানদিকের প্যানহার্ডটাকে মারল এক ধাক্কা ...রাস্তা থেকে সরে গিয়ে ওটা ধাক্কা খেলো নিচু উচ্চতার রেল লাইনের রেলিঙ এ ... তার পর নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ছিটকে উঠে গেল শূন্যে ... পড়লো গিয়ে সীন নদীর জলে ।

ওদিকে বাসের ছাদের ওপরে ভেসে থাকা সুপার পুমাটাকে গুলি করার চেষ্টা চালাচ্ছিল ওয়েস্ট । কিন্তু সহসাই গ্যাজেল গান শিপটা ওর দিকে গোঁত্তা মেরে নেমে এলো ফলে দ্রুত মেঝের ওপর শুয়ে পড়তে বাধ্য হলো ও । ওপরের প্রত্যেকটা আসন ঝাঁঝরা হয়ে গেছে বুলেটের বৃষ্টিতে ।
‘স্ট্রেচ! সম্ভব হলে আরো জোরে চালাও !’ চিৎকার করে উঠলো ওয়েস্ট, কিন্তু ততক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
দুন অসমসাহসী ফ্রেঞ্চ প্যারাট্রুপার সুপার পুমা থেকে চলন্ত বাসের ওপর ঝাঁপ দিয়ে নেমে দাঁড়িয়েছে ওর সামনে। কয়েক ফুট দূরে ।
দেখতে পেয়ে গেছে ওরা ওকে। শুয়ে আছে দুদিকের আসনের মাঝের ফাঁক টাতে ... আর কিছু করার নেই... সব শেষ । ওরা বন্দুক তাক করে হাত রাখলো ট্রিগারে –
-সাথে সাথেই সেনা দুজনের পায়ের নিচের বাসের ছাদের মেঝে বিস্ফোরিত হল একাধিক গর্ত  সৃষ্টি করে... বুলেট চালানোর গর্ত ওগুলো ... ওদের ঠিক নিচ থেকে উঠে আসছে ওগুলো।
দুজন প্যারা ট্রুপারই পড়ে গেল... মৃত... কয়েক সেকেন্ড বাদে , পুহ বিয়ারের মাথা দেখা গেল সিঁড়ির  কাছে ।
‘পেরেছি কি মারতে ওদের? পেরেছি কি? ওয়েস্ট তুমি ঠিক আছোতো?’ পুহ জানতে চাইলো।
‘আমি একদম ঠিক আছি,’ ওয়েস্ট কথাটা বলেই দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিচে চলে গেল। ‘কাম অন, যেভাবেই হোক আমাদের চার্লস ডে গল ব্রিজ পৌছাতেই হবে এই বাস থেমে যাওয়ার আগে!’
এরকম গতিতে চড়াই উৎরাই রাস্তায় নদীর ধার দিয়ে বাসে করে যাওয়াটা পর্যটকদের কাছে বেশ ভালোই উপভোগের বিষয় ; ল্যুভরকে পেছনে ফেলে আসার পর রাস্তাটা পাশ কাটিয়ে গেছে সীন নদীর ভেতর অবস্থিত দুটো আইল্যান্ডের একটাকে, নাম আইলে ডে লা সাইটে । ডানদিকে অনেকগুলো সেতু ওই দ্বীপের উদ্দেশ্যে গিয়েছে।
ওয়েস্টদের বাস এভাবে নদীর ধার ঘেঁষে চলতে থাকলে ওরা খুব তাড়াতাড়ি পয়ছে যাবে আর্সেনাল চত্বরে – যেখানে এক সময় ছিল বাস্তিল দুর্গ।
ওটার পরে আসবে দুটো সেতু – পন্ট ডি’ অস্টারলিৎজ এবং পন্ট চার্লস ডে গল । দ্বিতীয়টার পাশেই অবস্থান মিনিস্ট্রি অফ ইকোনমিক্স এর আধুনিক হেডকোয়ার্টারের । যার পাশেই আবার দক্ষিন পূর্ব ফ্রান্স এর দ্রুতগামি ট্রেনের সবচেয়ে বড় স্টেশন গারে ডে লিয়ন।
বিরাট লাল ট্যূরিস্ট বাসটা নদীর ধারের রাস্তা দিয়ে বুনো হাতির মতো মানুষ জনকে চমকে দিয়ে, আর্মির গাড়ীকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চললো ।
অনেকগুলো ওভারব্রিজের তলা দিয়ে যেতে হল ওদের।  আবার কখনো উঠতে হলো দুটো বা তিনটে রাস্তার সংযোগের ওপরে । একবার ডান পাশে দেখা গেল বিখ্যাত নোটরড্যাম গির্জাটাকে, সম্ভবত এটাই ছিল পৃথিবীর প্রথম ট্যুরিস্ট বাস যা থামলো না দৃশ্যটা দেখার জন্য।
ওয়েস্ট ওপর থেকে নিচে নেমে যাওয়া মাত্র , ফরাসী সেনার দল সুপার পুমা থেকে নেমে আসতে শুরু করলো নিচে –স্ট্রেচের  অ্যাঁকাব্যাঁকা ভাবে বাসটাকে  চালানোকে তোয়াক্কা না করেই ।
এক মিনিটের ভেতর নেমেও পড়লো ।
দুজন নামলো আগে...দড়ি ঝুলেই থাকলো ...নেমে এলো আরো দুজন ... আরো দুজন... তারপর আরো দুজন।
আটজন ফ্রেঞ্চ প্যারা ট্রুপার এগিয়ে চললো নিচে নামার সিঁড়ির দিকে। হাতে উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র । উদ্দেশ্য নিচেরতলাকে ছারখার করে দেওয়া...
... ঠিক তখন ওয়েস্ট নিচে বললো, ‘স্ট্রেচ! ছাদে অনেকেই নেমে পড়েছে! ওই একজিট র‍্যাম্পটার ওপর গাড়ী নিয়ে চলো !’
ওদের সামনেই ছিল একটা ওভারপাস রাস্তা ।  ডানপাশে জুড়ে আছে একটা একজিট র‍্যাম্প এই নদীর ধারের রাস্তার সাথে । একটা নিচু কংক্রিটের প্রাচীর এই রাস্তাটার সাথে ওভারপাসটার মধ্যে একটা বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ওর পরে ওভারপাসের অংশটা একটা সুড়ঙ্গের পথে বদলে গেছে।
স্ট্রেচ অবাক হয়ে বললো, ‘কি?’
‘যা বলছি সেটা করো!’ ওয়েস্ট চেঁচিয়ে উঠলো । ‘ যে যা আছে   হাতের কাছে সেটাকে জাপটে ধরো ! যতটা গায়ে জোর আছে সব কাজে লাগাও   !
একই গতিতে বাসটা একজিট র‍্যাম্পে ঢুকে পড়লো, সাথে সাথেই উঠতে থাকলো ওপরের দিকে –
-স্ট্রেচ বামদিকে স্টিয়ারিং ঘুরাতেই বাসটা বাম দিকে ঘুরে ধাক্কা খায় নিচু কংক্রিটের প্রাচীরটায় এবং ...
... ওটার ওপর উঠে যায় ।
অত বড় বাসটা ওপর দিকে সোজা মুখ করে উঠে গেল শূন্যে  কংক্রিটের প্রাচীরটায় সাপোর্ট পেয়ে । এক পালটি মেরে... সজোরে ছাদের দিকটা আছড়ে পড়লো রাস্তায় – ওপরে থাকা আট ফ্রেঞ্চ ট্রুপারের ভবলীলা সাঙ্গ হলো সাথে সাথেই।
এতেই অবশ্য সব কিছু থামলো না ।
দুরন্ত গতিতে উলটানো অবস্থায় পিছলেও এগিয়ে যেতে থাকলো সামনের দিকে ।
আরো একটা নিচু প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে আবার এক পালটি মেরে অবিশ্বাস্য ভাবে নিজের চাকার ওপর ফিরে এলো বা সটা । ৩৬০ ডিগ্রীর পাক দুবারে ...  আবার শুরু হলো চলা ... সোজা সুড়ঙ্গের উদ্দেশ্যে ।
০০০০০
বাসের ভেতরে ... যারা ছিল তাদের জগত টাও পাক মেরেছে ১৮০ ডিগ্রি করে দুবার – একে বারে ঝাঁকিয়ে দিয়েছে আগাপাস্তালা – লিলি স হ দলের বাকি সব সদস্য দের ।
এরকম একটা দুঃসাহসিক এবং চমকে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও ওরা বেঁচে আছে।
সকলেই বাসের মেঝেতে পড়ে থাকলেও ওয়েস্ট উঠে দাঁড়িয়েছে , এগিয়ে চলেছে পরবর্তী কাজের লক্ষ্যে।
স্ট্রেচের কাছ থেকে নিয়েছে গাড়ী চালানোর দায়িত্ব। ক্ষতবিক্ষত চেপ্টেচুপ্টে যাওয়া বাসটাকে সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে চালিয়ে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে আর্সেনাল এলাকায় । ওদিকে সুপার পুমা কিন্তু পিছু ছাড়েনি ।  নদীর ওপর দিয়ে নিচু হয়ে সমান্তরালভাবে বাসের সাথে সাথেই উড়ে চলেছে।
সামনেই দেখা যাচ্ছে কাঁচ এবং ষ্টীলের তৈরী এক আধুনিক স্থাপত্য । ইকোনমিক্স মিনিস্ট্রি হেড কোয়ার্টার ।
পুহ বিয়ার ওয়েস্টের কাঁধের ওপর দিয়ে উঁকি মেরে  বল লো, ‘সামনে যে ব্রিজটা দেখা যাচ্ছে ওর নাম পন্ট ডি’ অস্টারলিৎজ ।   চার্লস ডে গল ব্রিজ ওর পরেরটা !’
‘ঠিক আছে,’ ওয়েস্ট বললো। ‘ সবাইকে বলে দাও পনি বোতল আর মাস্ক নিয়ে বাসের দরজার কাছে গিয়ে যেন দাঁড়ায় । যাও!’
পুহ বিয়ার সেটাই করলো । লিলি, স্ট্রেচ আর বিগ ইয়ার্সকে সাথে নিয়ে ও গিয়ে দাঁড়ালো বাসের পেছনের দরজার কাছে ।
পন্ট ডি’ অস্টার লিৎজ   পার হয়ে বাস এগিয়ে চললো পন্ট চার্লস ডে গল অভিমুখে। অস্টারলিৎজ ব্রিজও যেমন ছিল ঠিক তেমনই চার্লস ডে গল ব্রিজটাও ডান দিকে বেরিয়েনদীর ওপর দিয়ে চলে গিয়েছে । ওর পেছনে  ইকোনমিক্স মিনিস্ট্রির গগনচুম্বী টাওয়ার দেখা যাচ্ছে।
চার্লস ডে গল ব্রিজ থেকে নদীর দিকে যাওয়া রাস্তা ঢালু হয়ে উঠে গেছে ওপরের দিকে । যা ওয়েস্টের পক্ষে লাভজনক।
অন্যান্য গাড়ি এই পথে যাওয়ার সময় তাদের গতি স্তিমিত করে কিন্তু ওয়েস্ট যতটা সম্ভব বাড়িয়ে দিলো ।
চমকপ্রদ গতিতে বাসটা উঠে গেল চার্লস ডে গল ব্রিজের ওপর । আর সাথে সাথেই দারুন ভাবে বিধ্বস্ত বাসটা শেষবারের মতো রাস্তার ছোঁয়ার অনুভুতি নিয়ে সোজা গিয়ে...
...ব্রিজের রাস্তার ধারের ফুটপাথে গোঁত্তা মেরে পুনরায় আকাশে উঠে এগিয়ে চললো সীন নদীর জলের দিকে । প্রায় উড়েই গেল বেশ খানিকটা পথ... তারপর একটা বিশাল অদৃশ্য বৃত্ত এঁকে চারকোনা বস্তুটা মুখ নিচু করে  শুরু করলো পড়তে ... ড্রাইভারের সিট থেকে ওয়েস্ট এবং পেছনের দরজা দিয়ে বাকি চারজন প্রায় একসাথে লাফ দিলো নদী বক্ষে । বিরাট একটা জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে ডাবল-ডেকার বাসটা পড়লো সীন নদীর জলে।
যখন সীনের জল ছুঁলো বাসটা একই সাথে ওয়েস্ট আর ওর দলবলও পড়লো জলে । ওদের পতনেও জলোচ্ছ্বাস হলো তবে সেগুলো অতি ছোটো বাস পতনের তুলনায়।
ফরাসী হেলিকপ্টার দুটোর আরোহীরা অবাক হয়ে দেখলো পাঁচজনের কেউই আর ভেসে উঠলো না ।
জলের তলায় অবশ্য চলছে হালচাল ।
কারোর কোনও ক্ষতি হয়নি । ওয়েস্ট এসে গেছে ওদের কাছে। সকলেই পড়ে আছে ডাইভিং মাস্ক ...শ্বাস নিচ্ছে পনি বোতল থেকে ।
বাদামী রঙা জলের তলা দিয়ে সাঁতার কেটে ওরা পৌছালো সীন নদীর উত্তরদিকের পাথরে মোড়া দেওয়ালের গায়ে । চার্লস ডে গল ব্রিজের নিচে ।
নদীর জলের তলায় এই মধ্যযুগীয় দেওয়ালের গায়ে একটা মরচে পড়া পুরোনো দরজা আছে যা ১৬০০ সালে লাগানো হয়েছিল ।
যে তালাটা ওতে লাগানো আছে সেটা নতুন এবং শক্তপোক্ত । কিন্তু ওইদিন সকালেই পুহবিয়ার বোল্টকাটার নিয়ে এসেছিল কিছু একটা করার জন্য। ভালো করে না তাকালে মনে হবে তালাটা ঠিকঠাকই নিজের জায়গায় ঝুলছে। পুহ বিয়ার ওটার পেছন দিকে কেটে রেখে গেছে । ফলে এখন হাত দিয়ে টানতেই ওটা খুলে গেল ।
গেটের পেছনে, একটা ইট দিয়ে বানানো প্যাসেজ ওয়ে দূরে আবছা আলোয় মিলিয়ে গেছে। ওরা সাঁতার কেটে এগিয়ে চললো পথটা দিয়ে – একেবারে শেষে বিগ ইয়ার্স, দরজাটা লাগিয়ে একটা নতুন তালা লাগিয়ে দিলো ভেতর থেকে। ঠিক একই রকম দেখতে যা লাগানো ছিলো আগে
কুড়ি গজ মতো যাওয়ার পর ভূগর্ভস্থ জল পথটা উঠে গেছে একটা সঙ্কীর্ণ ড্রেনের মতো সুড়ঙ্গে।
ওরা দাঁড়িয়ে ছিল দুর্গন্ধে ভরা সেই ড্রেনটায় হাঁটু অবধি ডুবে আছে নোংরা জলে।
‘একেবারে গথিক যুগ,’ স্ট্রেচ বললো ঠান্ডা গলায় ।
’১৭ শতকের খ্রিষ্টান ভূগর্ভস্থ সমাধি কুঠরি,’ পুহ বিয়ার বললো । ‘গোটা প্যারিসের তলায় এরকম জিনিষ ছড়িয়ে আছে । ২৭০ কিলোমিটার সুড়ঙ্গ আর ভূগর্ভস্থ সমাধি কুঠরি। এই সব সুড়ঙ্গগুলো সোজা চলে গেছে বুলেভারড ডিডেরোতে। এই পথ আমাদের নিয়ে যাবে ইকোনমিক্স মিনিস্ট্রি পার করে গারে ডে লিওনের কাছে ।’
ওয়েস্ট ঘড়ি দেখলো ।
দুপুর ১২টা বেজে ৩৫ মিনিট।
‘চলো এগোনো যাক,’ বললো । ‘ট্রেন ধরতে হবে আমাদেরকে ।’

চার্লস ডে গল ব্রিজের ওপর ফ্রেঞ্চ আর্মির বাকি তিনটে প্যানহার্ড এসে দাঁড়ায়। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে ওর আরোহীরা । জলের মধ্যে তখনো পুরো ডুবে যায়নি বিরাট লাল বাসটা ।
চপার দুটো দুর্ঘটনার এলাকাটাকে ঘিরে চক্কর মেরেই চলেছে। যদি কারো দেখা মেলে।
ব্রিজে জমেছে কৌতূহলী প্যারিসিয়ানদের ভিড়।
অতিরিক্ত কম্যান্ডো টিম পাঠানো হয়েছে মিনিস্ট্রী কমপ্লেক্সে এবং  সীন নদীর দক্ষিন দিকে চার্লস ডে গল ব্রিজের সাথে সরাসরি যুক্ত বিরাট রেল স্টেশন গারে ডি’ অস্টারলিৎজ এ ।
যে সমস্ত ট্রেন এখনো স্টেশন ছেড়ে যায়নি তাদের আটকে দেওয়া হয়েছে ওখানেই। বিশেষ সতর্কতা হিসাবে গারে ডে লিওনের – যা অবশ্য অনেকটাই উত্তর দিকে , তবু সুযোগ থাকতেই পারে – ট্রেনগুলোকেও আটকে দেওয়া হয়েছে।
দুপুর ১২টা ৪৪ এ গারে ডে লিওন থেকে শেষ ট্রেন ছেড়েছে । টিজিভি এক্সপ্রেস, প্যারিস টু জেনিভা, প্রথম স্টপেজ ডিজন ।

আর এক ঘন্টা বাদে,  শুকনো পোশাক পড়া , ওয়েস্ট আর ওর দল ট্রেন থেকে নামলো ডিজন স্টেশনে । মুখে হাসি, উৎফুল্ল তার ছাপ ।
ওখান থেকে একটা স্পেনের উদ্দেশ্যে আগে থেকে ঠিক করে রাখা বিমানে চেপে বসলো । ওখানে অপেক্ষা করে আছে স্কাই মনস্টার আর হ্যালিকারনাসসাস । ওটায় চেপে ওরা আবার ফিরে যাবে কেনিয়াতে ।
মুখের হাসি, উৎফুল্ল তার ছাপ জানান দিচ্ছিল সাফল্যর
পর পর দুটো প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর – বা তিনটে বলা যেতে পারে সমাধি মন্দিরের টুকরোটাকে ধরলে – ওরা অবশেষে ক্যাপ স্টোনের একটা টুকরো হাসিল করতে সমর্থ হয়েছে ।
এবার ওরাও এই প্রতিযোগিতায় ছিনিয়ে নিয়েছে কিছুটা জমি।
সত্যি করেই এবার এই মরণ খেলায় ওরাও সমর্থ প্রতিদ্বন্দ্বী।


০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০
[  চতুর্থ অভিযানের শেষ পর্ব - ভ্যাটিক্যান অভিযান  

Friday, October 6, 2017

প্রাচীন_সপ্তাশ্চর্যের_খোঁজ (৮২-৮৩-৮৪-৮৫-৮৬-৮৭) সম্পূর্ণ অষ্টম অধ্যায় - কাবুলের কৃষ্ণাঙ্গ পুরোহিত - প্রতিম দাস

#প্রাচীন_সপ্তাশ্চর্যের_খোঁজ (৮২-৮৩-৮৪-৮৫-৮৬-৮৭)
সম্পূর্ণ অষ্টম অধ্যায় - কাবুলের কৃষ্ণাঙ্গ পুরোহিত 
প্রতিম দাস
০০০০০০০০০০০০০০

অষ্টম অধ্যায়
কাবুলের কৃষ্ণাঙ্গ পুরোহিত

আটলান্টিক মহাসাগরের ওপরের আকাশপথ
১৭ই মার্চ ২০০৬
টারটারাসের আগমনের তিনদিন আগে

গুয়ান্তানামো বে তে ঝটিকা আক্রমণের বারো ঘণ্টা পর জামাইকার প্রান্তিক এলাকা কিংস্টনের বাইরের এক এয়ার ফোরসের এলাকা থেকে হ্যালিকার নাসসাস উঠিয়ে নিলো উইজার্ড, লিলি আর হোরাস কে । প্রয়োজনীয় তেল এবং অন্যান্য সামগ্রীও নিয়ে নেওয়া হয়েছে । আপাতত উড়ে চলেছে আটলান্টিকের ওপর দিয়ে ইউরোপ-আফ্রিকা অভিমুখে ।
আবার সবাই বসে আছে মেইন কেবিনে । বৃত্তাকারে , ছড়িয়ে ।
সকলের নজর একটাই মানুষের দিকে – মুল্লাহ মুস্তাফা জাঈদ, কাবুলের ব্ল্যাক প্রিস্ট বা কৃষ্ণাঙ্গ পুরোহিত ।
গুয়ান্তানাম বে থেকে পালিয়ে আসার পর , ওয়েস্ট একটা লাঠির মতো দেখতে  এ এক্স এস-৯ ডিজিট্যাল স্পেক্ট্রাম অ্যানালাইজার দিয়ে জাঈদের পুরো শরীর স্ক্যান করে ।
স্বাভাবিক ভাবেই সন্ত্রাসবাদীটার ঘাড়ের কাছে লাঠিটা পৌছাতেই ওটাতে বিপদ সংকেত ধ্বনিত হয় । জানিয়ে দেয় নিশ্চিত ভাবেই একটা জিপিএস লোকেটর মাইক্রোচিপ জাইদের চামড়ার ভেতরে বসানো আছে।
সার্জারি করার দরকার পড়েনি । ওয়েস্ট একটা ডিস্যাব্লিং গান থেকে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ ছঁড়ে দিয়ে লোকেটর মাইক্রোচিটাকে নিষ্ক্রিয় করে দেয় । ওটা পরিণত হয়  একটা প্লাস্টিকের টুকরোতে   ।
জাঈদ আপাতত মেইন কেবিনে সবার নরের সামনে – সবার  চোখ ওর দিকে থাকলেও জাঈদ তাকিয়ে আছে লিলির দিকে।
একটা আহত হরিণ শিশুর দিকে একটা হায়েনা যে ভাবে তাকায় জাঈদের তাকানোর ধরনটাও সে রকম – মুখে চোখে ফুটে উঠছে এক জান্তব ক্ষিধে, ইচ্ছে । সাথেই এক ধরনের অবিশ্বাস, যা বলছে, আরে এরকম একটা খাদ্য এখানে ওর সামনে অবস্থান করছে!
জাঈদের শারীরিক গঠন ভয় পাইয়ে দেওয়ার মতন। যদিও এই মুহূর্তে ওকে স্নান করিয়ে পরিষ্কার জামা কাপড় পড়ানো হয়েছে।
কামানো মাথা,  খোঁচা খোঁচা দাড়ি সমেত ছুঁচলো থুতনি, কোটরাগত চোখ আর শীর্ণ চেহারা । মানুষের চেয়ে ওকে ভুত বললে বোধ হয় ঠিক বলা হবে। একটা হেঁটে চলে বেড়ানো কঙ্কাল । তিন বছর ধরে ক্যাম্প ডেল্টার সলিটারী কনফাইনমেন্ট মানুষকে কি করতে পারে তার জলজ্যান্ত প্রমান।
কেবিনের পরিষ্কার আলোতে একটা অদ্ভুত বিষয় সবার চোখে ধরা পড়েছে । জাঈদের বাঁ কানের অর্ধেকটা চেঁছে কাঁটা ।
সাময়িক ঘোর কাটার পর জাঈদ এক এক করে দলের বাকি সদস্যদের দিকে তাকিয়ে দেখলো ।
‘ আরে বাঃ! দারুন ব্যাপার! ইন্টারেস্টিং ব্যাপার,’ বললো । ইঁদুরের দল গর্জন করছে । এ বিশ্বের দুই সিংহ ইউরোপ আর আমেরিকার বিরুদ্ধে খেলায় নেমেছে।’
উইজার্ডের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘দেখতে পাচ্ছি কানাডাকে। আয়ারল্যান্ডও আছে,’ জো এর দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে বললো । ‘প্রাচীন লিপির বিদ্বান মানুষ আপনারা।’
স্ট্রেচকে দেখেই নেমে গেল গলার স্বর, ‘ ইজ্রায়েলকেও দেখতে পাচ্ছি । কাটসা কোহেন, মাস্টার স্নাইপারঅনেক দিন পর দেখা হলো আমাদের। শেষ বার দেখা হয়েছিল কান্দাহারে, ২০০০ গজের ভেতরে পেয়ে গিয়েছিলে আমাকে। কি করে মিস করেছিলে, এখনো ভাবনার বিষয়।’
স্ট্রেচ গলা খাঁকারী দিলো । মুখের ভাব দেখেই বোঝা গেল মুস্তাফা জাঈদের প্রতি ওর বিতৃষ্ণার পরিমাণ কতোটা ।
জাঈদ আধখানা কানের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো, ‘আর একটু হলেই কাম তামাম ।’
স্ট্রেচ গরগরে স্বরে বললো, ‘পরের বার সুযোগ পেলেই ...’
‘আহা... আহা, কাটসা, আমি এখন তোমার অতিথি এবং খুব দামী অতিথি । আমাকে যে কাজের   জন্য নিয়ে এসেছো ওহে ইহুদী’ – জাঈদের চোখে শীতল ভাব – ‘ তাতে তোমার ব্যবহার আরো ভদ্র সম্মানজনক হওয়া দরকার।’
এবার চোখ পড়লো পুহ বিয়ারের ওপর ।
‘ আহ, এই তো একজন ভালো মুসলমান । তুমি সেখ আনজার আব্বাসের ছেলে , তাই না ? গ্রেট ক্যাপ্টেন রশিদ আব্বাস । কম্যান্ডার, এলিট ইউ এ ই ফার্স্ট কম্যান্ডো রেজিমেন্টের ...’
‘ ভুল হচ্ছে, আমি সে নই,’ পুহ বিয়ার উত্তর দিলো । ‘রশিদ আব্বাস আমার দাদার নাম। আমি জাহির আব্বাস, অনুগত সার্জেন্ট এবং শেখের দ্বিতীয় সন্তান ।’
‘শেখ আল্লাহ’র একজন প্রকৃত পরিচারক,’ জাঈদ সম্মানের সাথে মাথা ঝুঁকালো। ‘ তার উত্তরাধিকারি হিসাবে তোমাকেও আমার সম্মান জানাই।’
সবার শেষে জাঈদ ওয়েস্টের দিকে ঘুরলো । হোরাস কে কাঁধে নিয়ে বসে ছিল ওয়েস্ট।
‘ আর আপনি, জন ওয়েস্ট জুনিয়র ক্যাপ্টেন জন ওয়েস্ট জুনিয়র , অস্ট্রেলিয়ান স্যাসের সদস্য। হান্টসম্যান। একটা নাম যা মিডল ইস্টে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় অশরীরীর মতো । আপনার কাজকর্মতো লেজেন্ডে পরিনত হয়েছে। বাসরা থেকে আপনার পালিয়ে যাওয়া হুসেনের মনে একটা দাগ ফেলে দিয়েছিল। জানেন নিশ্চয় । যেদিন ধরা পড়ে সেদিন অবধি ওনার মনে মনে একটা চাহিদা ছিলই বিমানটা ফেরত পাওয়া । কিন্তু  আপনিও  এক দীর্ঘ সময়ের জন্য একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেলেনপৃথিবীর বুক থেকেই যেন হারিয়ে গেলেনঅতি মাত্রায় অদ্ভুত একটা –’
‘অনেক বক বক হয়েছে,’ ওয়েস্ট  বললো। ‘জিউস এবং আরটেমিস আশ্চর্য দুটো কোথায় আছে?’
‘ আরে, তাইতো। আমি দুঃখিত । প্রাচীন আশ্চর্য । টারটারাস চলে এলো বলে । হুম ম ম । মাপ করবেন ক্যাপ্টেন ওয়েস্ট । আমি কিন্তু এখনো বুঝতে পারিনি আপনার এই বিশ্বাসের কারণটা কি যে, আমি আপনাকে প্রাচীন আশ্চর্যগুলো খোঁজার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবো।’
‘ ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা এর মধ্যেই তিনটে ক্যাপস্টোন টুকরো হাতে পেয়ে গেছে,’ ওয়েস্ট মুখস্ত বলার মতো বলে গেল। ‘ওরা এসব কাজ করার জন্য ওদের কাছে সবরকম তথ্য যেমন আছে তেমনি ওদের সরঞ্জাম ও   অতি উচ্চমাত্রার । আর এ সাহায্যে ওরা পুরো ক্যাপস্টোনটাই হাতিয়ে নিতে সক্ষম হবে। এটা শুনতে কেমন লাগছে?’
‘আর বেশি কিছু না বললেও চলবে,’ জাঈদ বললো । ‘তা আমেরিকান বাহিনীর নেতৃত্ব কে দিচ্ছে? মার্শাল জুডা?’
‘হ্যাঁ ।’
‘এক সাঙ্ঘাতিক শত্রু। বুদ্ধিমান এবং হিংস্র । সাথেই খুনি মানসিকতা । তা আপনি কি জানেন ওর একটা অদ্ভুত দুর্বলতা ও আছে?’
‘মানে?’
‘বেশি উঁচুতে উঠতে ভয় পায়। না আমি অন্য দিকে চলে যাচ্ছি। আপনি আমাকে আপনাদের কাজ কি রকম হয়েছে তার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন । আমার ধারনা আপনারা ক্যালিম্যাচুসের পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করছেন । তার মানে আপনারা কলোসাস কে খুঁজে পেয়েছেন সবার আগে? ডানদিকের লকেটাই ছিল ওটা তাই না?’
ইয়ে ... হ্যাঁ,’ ওয়েস্ট অবাক হয়ে বললো।
‘এর পরেই আপনারা গিয়েছিলেন বাতিঘর আর সমাধি মন্দিরের টুকরো দুটোর খোঁজে, তাই না?’
‘ এভাবে পর পর যেতে হবে আপনি জানলেন কি করে?’
জাঈদ নাটকীয় ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললো । ‘এটাই তো স্বাভাবিক । এভাবেই তো ওর বিন্যাস । ক্যালিম্যাচুসের পান্ডুলিপি লেখা হয়েছে থথের শব্দাবলী দিয়ে – সবচেয়ে প্রাচীন এবং জটিল ভাষা । এই ভাষার নির্মাণ হয়েছে পর পর সাতটি উন্নত এবং জটিল স্তরে , যদি বুঝতে চান । আপনাদের পক্ষের এই ভাষার অল্পবয়সী পাঠিকা’ – লিলির দিকে ইঙ্গিত করলো – ‘এক একবারে এক একটি লেখাই পড়তে পারছে, তাই না? এর কারন ক্যালিম্যাচুসের পান্ডুলিপি লেখা হয়েছে ক্রমশঃ জটিল হতে থাকা থথের ভাষায় । কলোসাসের বিষয়ে লেখা হয়েছিল “থথ ১” পদ্ধতিতে, যা সবচেয়ে সহজতর। বাতিঘরের সুত্র  “থথ ২”, যা সামান্য কঠিন। অর‍্যাকল সব ভাষাই পড়তে পারবে কিন্তু এক বারে নয় । ’
উইজার্ড উত্তেজনার চরমে পৌছে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি থথের শব্দাবলী পড়তে পারেন?’
‘হ্যাঁ, আমি ওটার প্রথম চারটে সুত্র ডিসাইফার করতে পেরেছি।’
‘কিন্তু, কিভাবে?’
‘আমি নিজে নিজে চেষ্টা করে শিখেছি,’ জাঈদ বললো । ‘ ধৈর্য আর নিয়মানুবর্তিতা ওহো  ভুলেই যাচ্ছিলাম পশ্চিমী সভ্যতায় তো আবার এ দুটোকে  ইদানীং কালে দক্ষতা রুপে সম্মান দেওয়া হয় না ।’
‘ আপনি কি করে জানতে পারলেন সমাধি মন্দিরের টুকরো বাতিঘরের টুকরোর সাথেই রাখা আছে?’ জো জানতে চাইলো ।
‘দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে বেনবেন এর সাথে সম্পর্কিত সব পুঁথি, খোদাই লিপি এবং নানান তথ্যাদি যা আমার নাগালে এসেছে আমি সব মন দিয়ে অধ্যয়ন করেছি। যার মধ্যে কিছু অত্যন্ত দুস্প্রাপ্য এবং বিখ্যাত ।    ক্যালিম্যাচুসের পাণ্ডুলিপিও ছিল সেখানে। নবম শতাব্দীর একটি কপি। এছাড়াও কত শত লেখনী। যেখানে মানুষেরা তাদের কাজের বিবরণ নথিভুক্ত করে গেছেন। কেউ জানিয়েছেন পুরো একটা নকল পাথুরে দেওয়ান বানানোর কথা, আবার কেউ লিখে গেছেন শ্বেত পাথরের স্তম্ভকে স্তিমিত থাকা আগ্নেওগিরির ভেতরে নিয়ে যাওয়ার বিবরণ। আমার সংগ্রহ তালিকা বিরাট।’
‘ক্যালিম্যাচুসের পান্ডুলিপি জিউস আর আরটেমিসের টুকরো খোঁজার ক্ষেত্রে কোনও সূত্রই দিতে অক্ষম,’ ওয়েস্ট বললো । ‘জিউসতো হারিয়ে গেছে । আর আমাদের ধারনা আরটেমিস এর টুকরো লুকানো  আছে  সেন্ট পিটারস ব্যাসিলিকার কোনো এক স্থানে। কিন্তু স্থানটা সঠিক ভাবে বুঝতে পারছি না। আপনি কি জানেন ও দুটো কোথায় আছে?’
‘জাঈদের চোখ কুঁচকে গেল । ‘সময় এবং যুদ্ধ এই দুটো টুকরোকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে গেছে । কিন্ত হ্যাঁ, আমি জানি , বিশ্বাস করি যে ওদুটো এখন কোথায় আছে।’
পুহ বিয়ার সামনের দিকে ঝুঁকে এলো । ‘আপমি যদি এতো কিছু জানতেন , তাহলে এগুলো উদ্ধার করার জন্য নিজে  কোনোদিন চেষ্টা করেন নই কেন?’
‘হে আমার মুসলিম বন্ধু, আমার সামর্থ্য থাকলে আমি অবশ্যই চেষ্টা করতাম,’ জাঈদ মোলায়েম স্বরে উত্তর দিলো । ‘ কিন্তু আমি সে সময়ে আজকের মতো সক্ষম ছিলাম না।’ কথাটা বলেই জাঈদ ডানপায়ের প্যান্ট ওপর দিকে ওঠালো । দেখা গেল আগুনে ঝলসে পুড়ে যাওয়া পায়ের নিম্নভাগ।
‘১৯৮৭ সালে সোভিয়েতদের ফ্র্যাগমেন্টেশন গ্রেনেডের উপহার । অনেক বছর আমি এর জন্য হাঁটা চলাই করতে পারিনি । আর যে মানুষ ঠিক মতো হাঁটতে পারেনা তার পক্ষে ফাঁদে ভরা এলাকা মোটেই ভালো কিছু নয় । ৯০ সালের ভেতর আমার পেশীগুলো পুনরায় ঠিকঠাক শক্তি ফিরে পায়। এসময়ের মধ্যে আমি ক্যাপস্টোন নিয়ে অনেক পড়াশোনা করে ফেলি। নিউ ইয়র্ক আর ওয়াশিংটন ডিসিতে যখন আক্রমণ হয় সে সময়ে আফগানিস্থানে আমি মুজাহিদিনদের একটা দলকে ট্রেনিং দিতেও শুরু করে ছিলাম ক্যাপস্টোনের টুকরোগুলো উদ্ধার করার জন্য। কিন্তু এর পরেই ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা ঘটে আর সারা আফগানিস্থানে শুরু হয় বিশৃঙ্খলা । আমি আমেরিকানদের হাতে ধরা পড়ি । এখন অবশ্য আমার পা অনেক শক্ত ।’
‘জিউস আর আরটেমিসের টুকরো দুটো,’ ওয়েস্ট বলে ওঠে, ‘এখন কোথায় আছে?’
জাঈদ একটা ধূর্ত হাসি হালো‘মজার ব্যাপার কি জানেন, ওই দুটো টুকরো কোথাও লুকানো ও নেই বা কিছুর আড়ালে রাখাও নেই। দুটোই একেবারে চোখের সামনে রাখা আছে – শুধু জানতে হবে ঠিক কোথায় তাকানো দরকার। আরটেমিসের টুকরোটা , হ্যাঁ, রোমের সেন্ট পিটারস এই রাখা আছে। আমুন-রা প্রথার সবচেয়ে   পবিত্র স্থানে । আর জিউসের টুকরোটা ...’
জাঈদ চেয়ারে হেলান দিয়ে স্মৃতি থেকে চেনা কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করলো –
‘কোনো বজ্রই ছিলনা তার হাতে, ছিল কোনো অভিশাপের জোর ,
কোনো জয়ই করেনি সে অর্জন ।
অবশ্যই সেই একমাত্র বিজয় যা তার ডান হাতে ছিল...   তাকে বানিয়েছিল
মহান,
ওহে ডানাওয়ালা মানবী, কোথায় যাচ্ছ তুমি উড়ে? ’
জাঈদ ওয়েস্টের দিকে তাকালো। ‘কেবলমাত্র ডান হাতের সেই বিজয় ওকে বানিয়েছিল মহান।’
ওয়েস্ট লাইনটার মানে এবার বুঝতে পারলো । ‘ অলিম্পিয়াতে জিউসের মূর্তির ডান হাতে ছিল আর একটা ছোট মূর্তি । “ডানা ওয়ালা বিজয়িনী” – গ্রিসের দেবী নাইকি। এক মহিলা যার পিঠে ডানা ছিল। পরীর মতো বা জাহাজের সামনে লাগানো মূর্তিগুলোর মতো । জিউসের মূর্তিটা ছিল অতিকায়, ফলে ডানাওয়ালা বিজয়িনীর মূর্তিটার মাপ ছিল প্রমান সাইজের একজন নারীর মতোই ।’
জাঈদ বললো, ‘একদম ঠিক । আর এই ডানাওয়ালা বিজয়িনীই যদি ওকে মহান বানিয়ে থাকে তাহলে আমাদের জিউসের দিকে নজর দেওয়ার দরকার নেই । এর পরেই কবিতায় জানতে চাওয়া হয়েছে , কোথায় সে উড়ে গেল?
‘এবার কথা লো , আমার মনে হয় আপনি জানেন প্রাচীন গ্রীসে এধরনের অনেক ডানাওয়ালা বিজয়িনীর মূর্তি পাওয়া গেছে । তবে জিউসের মূর্তির নির্মাতা ফিডিয়াস এর কাজের পর্যালোচনা করে আমি একটাই ডানাওয়ালা   বিজয়িনী মূর্তির খোঁজ পেয়েছি যাতে ওই মানের শিল্প আছে। নিখুঁত লাইন, নিখুঁত অবয়ব এবং শ্বেত পাথরের গায়ে ভিজে কাপড়ের এফেক্টের অসম্ভব নিপুণ খোদাই কর্ম ।
‘যে নমুনা আমি খুঁজে পেয়েছি সেটা বর্তমান পৃথিবীতে প্রাচীন গ্রীক স্কাল্পচারের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট কাজ । যদিও পশ্চিমী বিদ্বানরা ওটাকে কোন এক অজানা শিল্পীর কাজ বলেই ছাপ্পা মেরে দিয়েছেন। ১৮৬৩ সালে ওটার ওটা খুঁজে বার করেন এক ফরাসী প্রত্নতত্ববিদ , চারলস চ্যাম্পয়সিউ –’
‘এ হতেই পারে না ...’ উইজার্ড ঢোঁক গেলেন বিষয়টা বুঝতে পেরে । ‘এটা মোটেই হতে...’
জাঈদ মাথা ঝোঁকায় । ‘সেইটাই । চ্যাম্পয়সিউওটাকে খুঁজে পান স্যামোথ্রেস নামের এক গ্রীক দ্বীপে । যে কারনে আজ ওই স্ট্যাচুর পরিচিত নাম স্যামোথ্রেসের ডানাওয়ালা বিজয়িনী।
‘ওটাকে ফ্রান্সে নিয়ে যাওয়া হয় , যেখানে ওটার শিল্পের প্রকৃত মর্যাদা মেলে। যে কারনে ওটার স্থান হয় ল্যুভর মিউজিয়ামে। আজ অবধি ওটা ওখানে তার সব মহিমা নিয়ে বিরাজ করছে ডারু স্টেয়ারকেসের একেবারে ওপরে । প্যারিসে,  ল্যুভরের ডেনন উইং এর উঁচু গম্বুজাকৃতি ছাদের নিচে ।’
হ্যালিকারনাসসাস চললো ইউরোপ অভিমুখে ।
সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে দলকে দুভাগে ভাগ করা হবে ।
ওয়েস্ট এর নেতৃত্বে একটা দল যাবে প্যারিসে জিউসের টুকরোটা হাসিল করার জন্য । অন্যদিকে উইজার্ড যাবে ছোট দল নিয়ে রোমে । আরটেমিসের টুকরো উদ্ধারে। জাঈদ হ্যালিকারনাসসাসেই থাকবে স্কাই মনস্টারের সাথে । নিরাপদে ...বন্দী অবস্থায় ।
দলের সবাই আপাতত বিমানের এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। কেউ বিশ্রাম নিচ্ছে। কেউ গবেষনায় ব্যস্ত । আবার কেউ আগত মিশনের ভাবনায় মশগুল।
পুহ বিয়ার তার বন্দুকগুলো দেখে শুনে নিচ্ছিলো চেয়ারের সাথে হ্যান্ডকাফ বদ্ধ অবস্থায় থাকা  মুস্তাফা জাঈদের কাছে বসে ।
জাঈদ ফিসফিস করে ডাকলো, ‘হ্যালো, ভাই বেরাদর । আল্লাহ তোমায় অনেক রহমত করুন এবং সুখে রাখুন।’
‘আপনাকেও,’ পুহ বিয়ার অভ্যাসসিদ্ধ ভাবে একজন একনিষ্ঠ ধর্মীয় মানুষ রুপে উত্তর দিলো।
‘তোমার পিতা , শেখ , একজন খুব ভালো মানুষ,’ জাঈদ বললো। ‘একজন প্রকৃত মুসলমান।’
‘ কি বলতে চাইছেন বলুন তো?’
‘ওই ইহুদিটার উপস্থিতি আমার ঠিক ভালো লাগছে না,’ জাঈদ সোজাসুজি বললো , স্ট্রেচের দিকে মাথা নেড়ে । যে মেইন কেবিনের শেষের দিকে বসেছিল। ‘আমি বুঝতে পেরেছি যে তোমার  পিতা এই পশ্চিমীদের সাথে যুক্ত হয়েছেন ভালো কাজ করার জন্য । কিন্তু আমার বিশ্বাস হয়না উনি ওই ইহুদী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পছন্দ করতেন।’
পুহ বিয়ার উত্তর দিলো, ‘এই মিশনে ইজ্রায়েলিদের ডাকা হয়নি । যেকোনো ভাবেই হোক ওরা আমাদের মিশনের খোঁজ পেয়ে যায় – হুমকি দেয় আমাদের মিশনের কথা ফাঁস করে দেবে যদি না আমরা ওকে দলে নিই ।’
‘তাই নাকি? একেবারে যা ওদের স্বভাব সেটাই করেছে,’ জাঈদ হিসহিসে কন্ঠে বললো। ‘ বেরাদর আমি খুব খুশি যে তুমি এই মিশনে কাজ কছো। ক্যাপস্টোনকে দ্বিতীয়বার একত্র করাটা মানব ইতিহাসের এক বিশাল মুহূর্ত হিসাবেই ধরা যেতে পারে।  সব কিছু শেষ হয়ে যাওয়ার আগে , সকলেই যে যার নিজের আসল রুপটা দেখিয়ে দেবে। যখন সময় আসবে আল্লাহর অনুচরদের একসাথে কাজ করতে হবে।’
পুহ বিয়ার নিচের দিকে দৃষ্টি নামালো ।

বিমানের শেষ প্রান্তে ওয়েস্টের অফিসের ভেতরে , উইজার্ড, জো, বিগ ইয়ার্স আর ওয়েস্ট- হ্যামিল কারের ভুলে যাওয়া বাসস্থানে পাওয়া -   বাদামি রঙের চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরিটা পড়ায় ব্যস্ত। হারম্যান হেসলারের নোট বুক। যেখানে বিস্তারিত ভাবে উনি লিখে গেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তাদের সাতটি প্রাচীন আশ্চর্য খোঁজার বিবরণী ।
জার্মান ভাষা থেকে অনুবাদ করার পর , ওরা অনেক ত থ্য খুঁজে পেলো যা ভালোই বোঝা যাচ্ছে –
থথের ভাষা – নানান ধরনের কথ্য ভাষার প্রয়োগ, ক্রমাগত জটিল ...
অর‍্যাক ল কে খুঁজে বার করতে হবে সঠিক অনুবাদ করার জন্য...
ক্যাথলিক চার্চ = আমুন-রা এর প্রাচীন ধর্ম বিশ্বাস
ক লোসাস – তৃতীয় লকেট
৮৫ খ্রিষ্ট পূর্বে হওয়া রহস্যময় ভবন অভিযান
·         ষষ্ঠ ইমহোটেপ + ১০,০০০ কর্মী
·         সকলেই গিয়েছিল পশ্চিম দিকে কার্থেজের কাছে কোন এক সামুদ্রিক গোপন এলাকায়
·         রসেট্টা তে এক কর্মীর কাছ থেকে একটা প্যাপিরাসের টুকরো পাওয়া যায় যা প্রমান দিচ্ছে ওই মানুষটি এর সাথে যুক্ত ছিল।
·         এক অভূতপূর্ব স্থাপত্য নির্মাণের কাজ । একটা সম্পূর্ণ সামুদ্রিক খাঁড়ি ফাটলের মুখকে অদৃশ্য করে দিয়ে পাথুরে দেওয়ালের ছদ্মবেশে ঢেকে দেওয়া।
·         যারা দুটো বিশেয়াহ ভাবে লুকানো গুপ্ত ধন কে এই পবিত্র ক ক্ষে রেখে আসে তাদের সবাই কে মেরে ফেলা হয় ।
·         বাতিঘর আর সমাধি মন্দিরের ক্যাপ স্টোন টুকরো ???
এর ভেতরেই পাওয়া গেলো একটি টেলিটাইপড আদেশপত্র যা পাঠিয়েছিলেন হাইনেরিখ হিম লার । যার মর্মার্থ – হেসলার কে অনুমতি দিচ্ছেন একটা ইউ-বোট নিয়ে পুরো উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয়  তট এলাকা পরীক্ষা করে নকল পাথুরে দেওয়াল খুঁজে দেখার।
ওখানে হাতে লেখা কিছু হিয়েরগ্লিফিক্স ও ছিল যার অর্থ উইজার্ড পড়ে শোনালেন –
‘ মানুষের পছন্দ
দুটোর ভেতরে থেকে যে  কো নো একটা আচার প্রথাকে বেছে নিতে হবে
একটা আনবে শান্তি
অন্যটা দেবে শক্তি
চুড়ান্ত দিনে
সিদ্ধান্ত নিতে হবে,
একটা পছন্দ বেছে নিতে হবে স্বয়ং রা’য়ের উপস্থিতিতে
যা নিশ্চিত করে দেবে মানুষের ভাগ্য কে।’
উইজার্ড হেলান দিয়ে বসলেন। ‘এটা সেই দুটো মন্ত্র পাঠের ইঙ্গিত – আচার প্রথাকেবল মাত্র একটা মন্ত্রকেই উপ্সথাপিত করা যাবে যখন ক্যাপ স্টোনকে রাখা হবে গ্রেট পিরামিডের ওপরে। 
ওরা আর কিছু লেখা পেলো । সেগুলোর কি অর্থ সেটা অবশ্য বোঝা গেল না । হয়তো কোন এক অশুভ মন্ত্রের কথা বলা হয়েছে –

তৃতীয় ইমহোটেপের সমাধি থেকে পাওয়া প্রথম লেখনী
“কি অবিশ্বাস্য কাঠামো অবয়ব ছিল এটা,
একেবারে আয়নার প্রতিবিম্ব যেন,
প্রবেশ এবং প্রস্থান একেবারে এক রকম।
আমার কাজটা আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে – এটাই আমার জীবনের সব সেরা কাজ – যাকে লুকিয়ে রেখে দিতে হচ্ছে ।
কিন্তু আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি।
আমরা বিরাট সেই আর্চ অয়েকে বন্ধ করে দিয়েছি ভুমিধ্বস ঘটিয়ে।
তবে আদেশানুসারে পুরোহিতের ঢোকার পথ খোলাই থাকলো যাতে তারা
ভেতরের জিনিষ পত্রের দেখভাল করতে পারে – পুরোহিত দের বলে দেওয়া হয়েছে
কিভাবে ফাঁদ গুলো সেট করা আছে ।”

তৃতীয় ইমহোটেপের সমাধি থেকে পাওয়া দ্বিতীয় লেখনী
“ কেবল মাত্র সাহসী আত্মা যাদের আছে
তারাই পার হতে পারবে ডানা ওয়ালা সিংহের কুয়ো ।
কিন্তু নিন গিজিডার খনি থেকে সাবধান থেকো
যারা প্রবেশ করবে  সর্প -প্রভুর গর্তে
আমি এটা ছাড়া আর কোন রকম উপদেশ দিচ্ছি না
সমস্ত আশা পরিত্যাগ করো
ওখান থেকে পালানোর যে কোনোই পথ নেই । ”
ডানাওয়ালা সিংহ – পারসিয়া/মেসোপটেমিয়াতে এধরনের আসিরিয়ান মূর্তি দেখা যায় ।
নিনগিজিডা – আসিরিয়ানদের সরীসৃপ এবং সাপের দেবতা।
সম্ভাব্য রেফারেন্স ব্যাবিলনের এইচ জি ???

কয়েকটা পাতার পর পাওয়া গেল দুটো হাতে আঁকা ছবি। যার ওপর লেখা আছে “ নিরাপদ রাস্তা”
এরপরে আছে আরো একটা লেখনী, যা দেখে উইজার্ড বলে উঠলেন, ‘আরে, এতো সেই প্রার্থনাগুলোর একটার বর্ণনা যা চরমতম দিনে পড়া আবশ্যক বলে মনে করা হয়
লেখনী –
“শক্তিলাভের আচার প্রথা
রা’য়ের সর্ব উচ্চ আসনে,
বলিপ্রদত্ত নির্বাচিতর হৃদয়ের নিচে
যে শুয়ে আছে প্রতিহিংসাকামী আনুবিশের হাতের ওপর,
ঢেলে দাও মৃত্যুর দেবতার হৃদয়ে
তোমার মাতৃভূমির কিছু পরিমাণ [ডেবেন] মাটি
পাঠ করো সেই শয়তানী শব্দ গুলো
তাহলেই এ জগতের সমস্ত ক্ষমতা হয়ে যাবে তোমার
এক হাজার বছরের জন্য ”
‘ “তোমার মাতৃভূমির কিছু পরিমাণ [ডেবেন] মাটি” ?’ বিগ ইয়ার্স ভ্রু উঁচিয়ে বললো, ‘এর মানে টা কি?’
জো জানালো, ‘ ডেবেন প্রাচীন ইজিপশিয়ানদের মাপের একক । মোটা মুটি ১০০ গ্রাম। আমার মনে হয় এর অর্থ –’
আর ঠিক তখুনি উইজার্ড প্রায় লাফিয়ে উঠে পড়ের লেখনীটা পড়তে শুরু করলেন
সেন্ট মার্ক এর গোপন গসপেল থেকে
বিচার দিবসের ভোরের বেলায়
সেই ভয়ঙ্করতম দিন,
একমাত্র মন্দির যা উভয়ের নাম বহন করে,
রা’য়ের ক্ষমতাকে সুত্রবদ্ধ করে মহান রামেসিসের চোখের মতো
সুউচ্চ মিনারের সুঁচে
দ্বিতীয় প্যাঁচাকে প্রথমে
আর তৃতীয়কে দ্বিতীয়ের স্থানে ...
... যেখানে ইস্কেন্দারের সমাধি উন্মোচিত হয় ।
সেখানেই খুঁজে পাবে প্রথম টুকরোটাকে ।
এই লেখনীর তলায় হেসলার নোট করেছেন –
ইস্কেন্দারের সমাধি – আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের কবরখানা । আলেকজান্ডারের সাথে সমাধি দেওয়া হয়েছিল প্রথম টুকরোটাকে।
উইজার্ড পেছন দিকে হেলান দিয়ে বসলেন, চোখ বিস্ফারিত।
‘সেন্ট মার্ক এর গোপন গসপেল।’ জো ওয়েস্টের দিকে তাকালো । ‘ যে গসপেল কে মানা হয় না।’
বিগ ইয়ার্স বললো, ‘একটু খুলে বলো ।’
ওয়েস্ট বললো, ‘ এ খবর খুব বেশি মানুষ জানে না। সেন্ট মার্ক যখন ইজিপ্টে ছিলেন তখন দুটো গসপেল লিখে ছিলেন প্রথম গসপেল যেটার কথা আপামর বিশ্ব জানে। যা বাইবেলে আছে। দ্বিতীয় গসপেল, যখন উনি সর্বসমক্ষে আনেন তখন সেটা এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি  করে । প্রায় সব কটি কপি পুড়িয়ে ফেলা হয়   খ্রিস্টান আন্দোলনের শুরুর সময়ে। আর স্বয়ং সেন্ট মার্ককে মানুষের ছোঁড়া পাথরের আঘাত সহ্য করতে হয়।’
‘কেন?’
জো উত্তর দেয়, ‘ কারন একটাই। এতে এমন অনেক অজানা ঘটনার কথা বলা হয়েছিল যা যীশু তার জীবনে করে ছিলেন। নানান আচার প্রথা পালন। মন্ত্র পাঠ । বিদঘুটে সব ব্যাপার স্যাপার । আর এর ভেতর ছিল তথাকথিত সমকামিতার উল্লেখ।’
‘কি?’ বিগ ইয়ার্স প্রায় চিৎকার করে উঠলো ।
জো বললো, ‘ওই গস পেলের একটা অধ্যায়ে আছে যীশু একজন অল্প বয়সী পুরুষের সাথে কোথাও চলে যান। মার্কের কথা অনুসারে  ওই অল্পবয়সী পুরুষকে ‘আদিম প্রাচীন পদ্ধতিতে” দীক্ষা দেন । কিছু বিকৃতমনা কল্পনাবিলাসী লেখক এটাকে সমকামিতা বলে দেখাতে চেয়েছেন। যদিও বিদ্বানরা একেই বলেছেন আমুন-রা প্রথার বিশেষ আচার পালন। আর এটাকেই পরে ফ্রিম্যাসনরা নিজেদের রীতি নীতির ভেতর সংযুক্ত করে। এর ফলে আর একটা সূর্য উপাসনার বিশ্বাসের জন্ম হয় প্রাচীন ইজিপ্টের ভাবনা চিন্তা থেকে।’
ওয়েস্ট বললো, ‘বুঝতে পারলে কেন একে মান্যতাহীন গসপেল বলা হয়?’
‘হুম,’ বিগ ইয়ার্স বললো। ‘ আমি তো জানতাম ফ্রি ম্যাসনরা অ্যান্টি-ক্যাথলিক
‘ঠিকই জানো,’ জো বললো । ‘কিন্তু ফ্রি ম্যাসনদের এই ঘৃণাটা অনেকটা ভাইবোনদের ভেতর থাকা ঘৃণার মতো । ওরা আসলে একে অপরের শত্রু ভাবাপন্ন ভাইয়ের মতো, যাদের জন্ম হয়েছে একই ধর্মের উৎস থেকে। ঠিক যেমনটা জেরুজালেম এক পবিত্র স্থান ইসলাম এবং ইহুদিদের কাছে । ঠিক সেভাবেই ক্যাথলিক আর ফ্রিম্যাসনরা এক আদি উৎস বহন করে চলেছে। দুটো বিশ্বাস, যার জন্ম একটাই বিশ্বাস থেকে – ইজিপশিয়ানদের সূর্য উপাসনা। একই পথের পথিক হয়েও ওরা নিজের নিজের বিশ্বাসকে দুটো আলাদা পদ্ধতিতে ব্যাখা করে। ’
ওয়েস্ট বিগ ইয়ার্সের বাহুটে আলগা চাপড় মেরে বললো, ‘একটু জটিল ব্যাপার, বাডি । ব্যাপারটাকে এই ভাবে ভাবো – আমেরিকা একটা ম্যাসোনিক দেশ এবং ইউরোপ একটা ক্যাথলিক দেশ । আর তারা আপাতত লড়াই করছে তাদের নিজ নিজ বিশ্বাসের সেরা উপহার পাওয়ার জন্য ... ক্যাপ স্টোন।’
বিগ ইয়ার্স বললো, ‘তুমি বলছো আমেরিকা একটা ম্যাসনিক দেশ। আমারতো মনে হয়ে দেশটা একটু বেশি মাত্রায় খ্রিস্টান ভাবাপন্ন। বাইবেল এর ব্যাপক ব্যবহার সেটাই বলে।’
জো উত্তর দেয়, ‘এর একমাত্র কারন জনগণের বেশীর ভাগ খ্রিস্টান । কিন্তু তার মানে এই নয় যে দেশটাও তাই। একটা দেশ আসলে কি? এক দল মানুষ যারা একটা কমন ঐতিহ্যর কারনে একত্রিত থাকে মিউচু্য়াল উন্নতি এবং সুরক্ষার স্বার্থে । আর ওখানেই আছে আসল কথা বা কিওয়ার্ডটা, সুরক্ষা । ভেবে দেখো, দেশের সেনা থাকে , ধর্মের থাকে না । সমগ্র সেনাবাহিনীকে আদেশ দেয় কে , কি নামে ডাকি তাকে ... ইউনাইটেড স্টেটস ?’
না,  নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এবং তার উপদেষ্টা মণ্ডলী।’
‘ঠিক তাই আমেরিকার মানুষেরা অবশ্যই সাচ্চা খ্রিস্টান । কিন্তু আমেরিকার নেতারা সেই জর্জ ওয়াশিংটনের সময় থেকে বেশীর ভাগ সময়েই ফ্রিম্যাসন। ওয়াশিংটন, জেফারস্ন, রুজভেল্ট , বুশেরা । ২০০ বছর ধরে ফ্রিম্যাসনেরা ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকার সেনাবাহিনিকে ব্যবহার করে চলেছে নিজেদের স্বার্থে নিজেদের কাজে । কি মজা তাহলে বোঝো , একটা ধর্মবিশ্বাসের নিজস্ব সেনা বাহিনী । আর তার কথা জনগন জানেই না ।’
ওয়েস্ট বললো, ‘তুমি একটু খুঁটিয়ে দেখলেই  আমেরিকার নানান জায়গায় ম্যাসোনিক পদ্ধতিতে ক্যাপস্টোনের উপাসনা দেখতে পাবে। তা নাহলে বছরের পর বছর ধরে কেন আমেরিকান ফ্রিম্যাসনরা সাতটা প্রাচীন আশ্চর্যর প্রতিরুপ বানিয়েই চলেছে ।’
‘ হতেই পারে না...’
ওয়েস্ট আঙ্গুলের কড় গুনে বলতে থাকলো, ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি বানিয়েছিলেন বিখ্যাত ফরাসী ফ্রিম্যাসন, ফ্রেডেরিখ-আউগুস্ত বারথোল্ডি । কলোসাস অফ রোডসের প্রায় প্রতিরুপ। এমন কি হাতে মশালটাও বাদ যায় নি । নিউইয়র্কের উলউওরথ বিল্ডিং  বাতিঘরের একেবারে কপি। ফোরটনক্স এর ফ্লোর প্ল্যান হুবহু হ্যালিকারনাসসাসেরর সমাধি মন্দিরের মতো। স্ট্যাচু অফ জিঊস , সিংহাসনে আসীন এক বিশাল মাপের অবয়ব , লিঙ্কন মেমোরিয়ালের মূর্তি । আরটেমিসের মন্দিরকে খুঁজে পাবে সুপ্রীম কোর্টে ।
‘ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের হুবহু বানানো হয়নি, এর একটাই কারন এটা ঠিক কেমন দেখতে ছিল কেউ জানে না । যে কারনে সেটাকে সম্মান জানিয়ে এক বিশেষ ধরনের বাগানের পরিকল্পনা করেন জর্জ ওয়াশিংটন। আর সেটা বানানো হয় হোয়াইট হাউসেআর সেটাকে প্রসারিত করেন থমাস জেফারসন এবং পরে ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট। জন এফ কেনেডি ছিলেন ক্যাথলিক প্রেসিডেন্ট। চেষ্টা করেছিলেন বাগানটাকে নিশ্চিহ্ন করার , পুরো পুরি পারেন নিউনি নেই কিন্তু বাগানটা থেকে গেছে। যাকে ইদানীং কালে রোজ গারডেন নামে ডাকা হয়।’
বিগ ইয়ার্স হাত  গুটিয়ে কোলের ওপর রেখে বললো, ‘আর গ্রেট পিরামিড,  সেটা কোথায় ? আমেরিকাতেতো কোথাও পিরামিডের মতো  কোনো স্থাপত্য দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। ’
‘একদম ঠিক বলেছো ’ ওয়েস্ট বললো । আমেরিকাতে বিশাল পিরামিডের মতো কিছু নেই। কিন্তু যখন ইজিপশিয়ানরা পিরামি বানানো বন্ধ করলো তখন ওরা কি বানানো শুরু করলো জানো?’
‘কি?’
‘ওবেলিস্ক। ওবেলিস্ক হয়ে দাঁড়ালো সূর্য-উপাসনার মূল চিহ্ন। আমেরিকা এরকমই এক অতিকায় ওবেলিস্ক বানিয়েছে – ওয়াশিংটন মনুমেন্ট । যার উচ্চতা ৫৫৫ ফুট । ইন্টারেস্টিং ব্যাপার এ যে গ্রেট পিরামিড ৪৬৯ ফুট লম্বা। ৮৬ ফুট ছোটো ওয়াশিংটন মনুমেন্ট এর চেয়ে । কিন্তু যে বেস বা গিজা  উপত্যকার ওপর গ্রেট পিরামিডের অবস্থান সেটার উচ্চতা সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৮৬ ফুট । যার অর্থ দুটোকে যোগ করলে সেই একই উচ্চতা পাওয়া যাচ্ছে।’
এইসব কথাবার্তা চলার মাঝেই উইজার্ড নোট বইটার পাতা উলটে উলটে দেখছিলেন।
‘একমাত্র মন্দির যা উভয়ের নাম বহন করে...’ বিড় বিড় করলেন । তারপরেই চোখ চক চক করে উঠলো । ‘এটা লাক্সর। লাক্সর এর মন্দির ।’
‘আরে হ্যাঁ, তাই তো। দারুন ভাবনা, ম্যাক্স । খুব ভালো!’ জো উইজার্ডের কাঁধে আলতো টোকা মেরে বললো ।
‘মনে হচ্ছে এটা ঠিকঠাক মিলে যাবে ...’ ওয়েস্ট বললো ।
‘কি মিলে যাবে ?’ বিগ ইয়ার্স আবার জিজ্ঞেস করলো কথার মাথামুণ্ডু বুঝতে না পেরে।
‘দক্ষিন ইজিপ্ট লাক্সারে আছে আমুন এর মন্দির, যাকে সকলে লাক্সারের মন্দির বলেই চেনে,’ জো জানালো । ‘ইজিপ্টের অন্যতম সবচেয়ে বড় ট্যুরিস্ট স্পট । বিখ্যাত মন্দিরটার মূল আকর্ষণ এর বিশাল আকৃতির  প্রবেশ পথ । দ্বিতীয় রামেসিসের দুটো অতিকায় বসে থাকা স্ট্যাচু আর ওদের সামনে দন্ডায়মান একাকী   ওবেলিস্ক। এর অবস্থান নীলনদের উত্তর প্রান্তে লাক্সারে , বা – সে সময়ে যে নামে ডাকা হতো – থিস।
‘লাক্সারের মন্দিরটা  নির্মিত হয়েছিল দ্বিতীয় রামেসিসের আগের কয়েকজন ফ্যারাও দ্বারা । পরে দ্বিতীয় রামেসিস একে পুন নির্মাণ করেন এবং নিজের বলে ঘোষনা করে দেন । কিন্তু বলা হয়ে থাকে এই মন্দির নির্মাণে আলেকজান্ডারেরও হাত ছিল । আর এই কারনেই –’
‘ – সারা বিশ্বে এটা একমাত্র মন্দির যেখানে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট কে ফ্যারাও বলে উল্লেখ করা আছে,’ উইজার্ড বললেন । ‘এক মাত্র লাক্সারেই আলেকজান্ডারের নাম হিয়েরোগ্লিফিক্স ভাষায় খোদাই করা আছে । গোলাকৃতি অলঙ্কৃত একটি ফ্রেমে । একমাত্র মন্দির যা উভয়ের নাম বহন করেলাক্সারের মন্দিরই একমাত্র মন্দির যা এক সাথে দ্বিতীয় রামেসিস আর আলেকজান্ডারের নাম ধারন করে আছে ।’
বিগ ইয়ার্স প্রশ্ন করলো  ‘ তাহলে ওই “রা’য়ের ক্ষমতাকে সুত্র বদ্ধ করে মহান রামেসিসের চোখের মতো সুউচ্চ মিনারের সুঁচে” কথার কি মানে?’
ওয়েস্ট বললো, ‘সুউচ্চ মিনারের সুঁচ ওই ওবেলিস্ক। রা এর ক্ষমতা , আমার ধারনা অনুসারে সূর্যের আলো । মহাবিচারের ভোরের সূর্যালোক – অর্থাৎ দিনটা টারটারাসের ঘূর্ণনের দিন । ওই কবিতা আমাদের জানান দিচ্ছে ভোরের সূর্যালোকে বেলিস্কগুলোর দুটো বিশেষ স্থানে অবস্থিত ফুটোর ভেতরে দিয়ে আলো গিয়ে পড়বে এমন এক স্থানে যা জানিয়ে দেবে সমাধির স্থান।’
বিগ ইয়ার্স জো এর দিকে তাকিয়ে বললো, ‘ আচ্ছা তুমি তো বললে লাক্সারে মাত্র একটাই  ওবেলিস্ক আছে ।’
জো মাথা ঝুঁকিয়ে বললো, ‘হ্যাঁ ঠিক কথা।’
‘ তাহলে তো আমরা প্যাঁচে পড়ে যাচ্ছি । দুটো বেলিস্ক না থাকলে, আমরাতো সূর্যের আলো ওদের ফুটোর ভেতরে দিয়ে যাওয়া দেখতে পাব না। ফলে আলেকজান্ডারের সমাধি খুঁজে বার করাও যাবে না।‘
‘ঠিক তা নয় ,’ উইজার্ড বললেন চকচকে চোখে  ওয়েস্ট আর জো এর দিকে তাকিয়ে।
ওরা উইজার্ডের দিকে তাকিয়ে হাস লো ।
শুধু বিগ ইয়ার্স কিছুই বুঝতে পারলো না।
‘কি? ব্যাপারটা কি?’
উইজার্ড বললেন, ‘লাক্সার মন্দিরের দ্বিতীয় ওবেলিস্কটাও এখনো আছে বিগ ইয়ার্স । শুধু নিজের জায়গায় নেই।’
‘কোথায় আছে তাহলে?’
উইজার্ড উত্তরে বললেন, ‘ প্রাচীন ইজিপ্টের অনেক ওবেলিস্কের মতোই এটাও একটা পশ্চিমী দেশকে দিয়ে দেওয়া হয় । তেরোটা ওবেলিস্ক রোমে চলে যায় , ক্যাথলিক চার্চের সূর্য উপাসকরা ওগুলো গ্রহণ করেন। দুটো যায় লন্ডন আর নিউইয়র্কে – এই দুটোকে একত্রে বলা হয়ে থাকে ক্লিওপেট্রার সূঁচ । লাক্সার মন্দিরের দ্বিতীয় ওবেলিস্কটাকে ১৮৩৬ সালে দিয়ে দেওয়া হয় ফ্রান্সকে। প্যারিসের একেবারে মাঝখানে প্লেস ডে লা কনকর্ডে যা এখন গর্বের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। ল্যুভর থেকে ৮০০ মিটার দূরে।’
‘জিউসের টুকরো আর বেলিস্ক,’ জো বললো । ‘যা বুঝছি তাতে ডাবল-ট্রাবল হতে চলেছে প্যারিসে।’
ওয়েস্ট নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো ।
‘প্যারিস!’ বললো, ‘জানে না   ওকে আঘাত করার জন্য কি বা কারা যাচ্ছে !
০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০
[সমাপ্ত অষ্টম অধ্যায় ।  নবম অধ্যায় -চতুর্থ অভিযানজিউসের স্ট্যাচু এবং আরটেমিসের মন্দির”  https://amarkolponarjogot.blogspot.com/2017/10/blog-post_13.html]