Search This Blog

Friday, October 6, 2017

প্রাচীন_সপ্তাশ্চর্যের_খোঁজ (৮২-৮৩-৮৪-৮৫-৮৬-৮৭) সম্পূর্ণ অষ্টম অধ্যায় - কাবুলের কৃষ্ণাঙ্গ পুরোহিত - প্রতিম দাস

#প্রাচীন_সপ্তাশ্চর্যের_খোঁজ (৮২-৮৩-৮৪-৮৫-৮৬-৮৭)
সম্পূর্ণ অষ্টম অধ্যায় - কাবুলের কৃষ্ণাঙ্গ পুরোহিত 
প্রতিম দাস
০০০০০০০০০০০০০০

অষ্টম অধ্যায়
কাবুলের কৃষ্ণাঙ্গ পুরোহিত

আটলান্টিক মহাসাগরের ওপরের আকাশপথ
১৭ই মার্চ ২০০৬
টারটারাসের আগমনের তিনদিন আগে

গুয়ান্তানামো বে তে ঝটিকা আক্রমণের বারো ঘণ্টা পর জামাইকার প্রান্তিক এলাকা কিংস্টনের বাইরের এক এয়ার ফোরসের এলাকা থেকে হ্যালিকার নাসসাস উঠিয়ে নিলো উইজার্ড, লিলি আর হোরাস কে । প্রয়োজনীয় তেল এবং অন্যান্য সামগ্রীও নিয়ে নেওয়া হয়েছে । আপাতত উড়ে চলেছে আটলান্টিকের ওপর দিয়ে ইউরোপ-আফ্রিকা অভিমুখে ।
আবার সবাই বসে আছে মেইন কেবিনে । বৃত্তাকারে , ছড়িয়ে ।
সকলের নজর একটাই মানুষের দিকে – মুল্লাহ মুস্তাফা জাঈদ, কাবুলের ব্ল্যাক প্রিস্ট বা কৃষ্ণাঙ্গ পুরোহিত ।
গুয়ান্তানাম বে থেকে পালিয়ে আসার পর , ওয়েস্ট একটা লাঠির মতো দেখতে  এ এক্স এস-৯ ডিজিট্যাল স্পেক্ট্রাম অ্যানালাইজার দিয়ে জাঈদের পুরো শরীর স্ক্যান করে ।
স্বাভাবিক ভাবেই সন্ত্রাসবাদীটার ঘাড়ের কাছে লাঠিটা পৌছাতেই ওটাতে বিপদ সংকেত ধ্বনিত হয় । জানিয়ে দেয় নিশ্চিত ভাবেই একটা জিপিএস লোকেটর মাইক্রোচিপ জাইদের চামড়ার ভেতরে বসানো আছে।
সার্জারি করার দরকার পড়েনি । ওয়েস্ট একটা ডিস্যাব্লিং গান থেকে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ ছঁড়ে দিয়ে লোকেটর মাইক্রোচিটাকে নিষ্ক্রিয় করে দেয় । ওটা পরিণত হয়  একটা প্লাস্টিকের টুকরোতে   ।
জাঈদ আপাতত মেইন কেবিনে সবার নরের সামনে – সবার  চোখ ওর দিকে থাকলেও জাঈদ তাকিয়ে আছে লিলির দিকে।
একটা আহত হরিণ শিশুর দিকে একটা হায়েনা যে ভাবে তাকায় জাঈদের তাকানোর ধরনটাও সে রকম – মুখে চোখে ফুটে উঠছে এক জান্তব ক্ষিধে, ইচ্ছে । সাথেই এক ধরনের অবিশ্বাস, যা বলছে, আরে এরকম একটা খাদ্য এখানে ওর সামনে অবস্থান করছে!
জাঈদের শারীরিক গঠন ভয় পাইয়ে দেওয়ার মতন। যদিও এই মুহূর্তে ওকে স্নান করিয়ে পরিষ্কার জামা কাপড় পড়ানো হয়েছে।
কামানো মাথা,  খোঁচা খোঁচা দাড়ি সমেত ছুঁচলো থুতনি, কোটরাগত চোখ আর শীর্ণ চেহারা । মানুষের চেয়ে ওকে ভুত বললে বোধ হয় ঠিক বলা হবে। একটা হেঁটে চলে বেড়ানো কঙ্কাল । তিন বছর ধরে ক্যাম্প ডেল্টার সলিটারী কনফাইনমেন্ট মানুষকে কি করতে পারে তার জলজ্যান্ত প্রমান।
কেবিনের পরিষ্কার আলোতে একটা অদ্ভুত বিষয় সবার চোখে ধরা পড়েছে । জাঈদের বাঁ কানের অর্ধেকটা চেঁছে কাঁটা ।
সাময়িক ঘোর কাটার পর জাঈদ এক এক করে দলের বাকি সদস্যদের দিকে তাকিয়ে দেখলো ।
‘ আরে বাঃ! দারুন ব্যাপার! ইন্টারেস্টিং ব্যাপার,’ বললো । ইঁদুরের দল গর্জন করছে । এ বিশ্বের দুই সিংহ ইউরোপ আর আমেরিকার বিরুদ্ধে খেলায় নেমেছে।’
উইজার্ডের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘দেখতে পাচ্ছি কানাডাকে। আয়ারল্যান্ডও আছে,’ জো এর দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে বললো । ‘প্রাচীন লিপির বিদ্বান মানুষ আপনারা।’
স্ট্রেচকে দেখেই নেমে গেল গলার স্বর, ‘ ইজ্রায়েলকেও দেখতে পাচ্ছি । কাটসা কোহেন, মাস্টার স্নাইপারঅনেক দিন পর দেখা হলো আমাদের। শেষ বার দেখা হয়েছিল কান্দাহারে, ২০০০ গজের ভেতরে পেয়ে গিয়েছিলে আমাকে। কি করে মিস করেছিলে, এখনো ভাবনার বিষয়।’
স্ট্রেচ গলা খাঁকারী দিলো । মুখের ভাব দেখেই বোঝা গেল মুস্তাফা জাঈদের প্রতি ওর বিতৃষ্ণার পরিমাণ কতোটা ।
জাঈদ আধখানা কানের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো, ‘আর একটু হলেই কাম তামাম ।’
স্ট্রেচ গরগরে স্বরে বললো, ‘পরের বার সুযোগ পেলেই ...’
‘আহা... আহা, কাটসা, আমি এখন তোমার অতিথি এবং খুব দামী অতিথি । আমাকে যে কাজের   জন্য নিয়ে এসেছো ওহে ইহুদী’ – জাঈদের চোখে শীতল ভাব – ‘ তাতে তোমার ব্যবহার আরো ভদ্র সম্মানজনক হওয়া দরকার।’
এবার চোখ পড়লো পুহ বিয়ারের ওপর ।
‘ আহ, এই তো একজন ভালো মুসলমান । তুমি সেখ আনজার আব্বাসের ছেলে , তাই না ? গ্রেট ক্যাপ্টেন রশিদ আব্বাস । কম্যান্ডার, এলিট ইউ এ ই ফার্স্ট কম্যান্ডো রেজিমেন্টের ...’
‘ ভুল হচ্ছে, আমি সে নই,’ পুহ বিয়ার উত্তর দিলো । ‘রশিদ আব্বাস আমার দাদার নাম। আমি জাহির আব্বাস, অনুগত সার্জেন্ট এবং শেখের দ্বিতীয় সন্তান ।’
‘শেখ আল্লাহ’র একজন প্রকৃত পরিচারক,’ জাঈদ সম্মানের সাথে মাথা ঝুঁকালো। ‘ তার উত্তরাধিকারি হিসাবে তোমাকেও আমার সম্মান জানাই।’
সবার শেষে জাঈদ ওয়েস্টের দিকে ঘুরলো । হোরাস কে কাঁধে নিয়ে বসে ছিল ওয়েস্ট।
‘ আর আপনি, জন ওয়েস্ট জুনিয়র ক্যাপ্টেন জন ওয়েস্ট জুনিয়র , অস্ট্রেলিয়ান স্যাসের সদস্য। হান্টসম্যান। একটা নাম যা মিডল ইস্টে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় অশরীরীর মতো । আপনার কাজকর্মতো লেজেন্ডে পরিনত হয়েছে। বাসরা থেকে আপনার পালিয়ে যাওয়া হুসেনের মনে একটা দাগ ফেলে দিয়েছিল। জানেন নিশ্চয় । যেদিন ধরা পড়ে সেদিন অবধি ওনার মনে মনে একটা চাহিদা ছিলই বিমানটা ফেরত পাওয়া । কিন্তু  আপনিও  এক দীর্ঘ সময়ের জন্য একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেলেনপৃথিবীর বুক থেকেই যেন হারিয়ে গেলেনঅতি মাত্রায় অদ্ভুত একটা –’
‘অনেক বক বক হয়েছে,’ ওয়েস্ট  বললো। ‘জিউস এবং আরটেমিস আশ্চর্য দুটো কোথায় আছে?’
‘ আরে, তাইতো। আমি দুঃখিত । প্রাচীন আশ্চর্য । টারটারাস চলে এলো বলে । হুম ম ম । মাপ করবেন ক্যাপ্টেন ওয়েস্ট । আমি কিন্তু এখনো বুঝতে পারিনি আপনার এই বিশ্বাসের কারণটা কি যে, আমি আপনাকে প্রাচীন আশ্চর্যগুলো খোঁজার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবো।’
‘ ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা এর মধ্যেই তিনটে ক্যাপস্টোন টুকরো হাতে পেয়ে গেছে,’ ওয়েস্ট মুখস্ত বলার মতো বলে গেল। ‘ওরা এসব কাজ করার জন্য ওদের কাছে সবরকম তথ্য যেমন আছে তেমনি ওদের সরঞ্জাম ও   অতি উচ্চমাত্রার । আর এ সাহায্যে ওরা পুরো ক্যাপস্টোনটাই হাতিয়ে নিতে সক্ষম হবে। এটা শুনতে কেমন লাগছে?’
‘আর বেশি কিছু না বললেও চলবে,’ জাঈদ বললো । ‘তা আমেরিকান বাহিনীর নেতৃত্ব কে দিচ্ছে? মার্শাল জুডা?’
‘হ্যাঁ ।’
‘এক সাঙ্ঘাতিক শত্রু। বুদ্ধিমান এবং হিংস্র । সাথেই খুনি মানসিকতা । তা আপনি কি জানেন ওর একটা অদ্ভুত দুর্বলতা ও আছে?’
‘মানে?’
‘বেশি উঁচুতে উঠতে ভয় পায়। না আমি অন্য দিকে চলে যাচ্ছি। আপনি আমাকে আপনাদের কাজ কি রকম হয়েছে তার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন । আমার ধারনা আপনারা ক্যালিম্যাচুসের পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করছেন । তার মানে আপনারা কলোসাস কে খুঁজে পেয়েছেন সবার আগে? ডানদিকের লকেটাই ছিল ওটা তাই না?’
ইয়ে ... হ্যাঁ,’ ওয়েস্ট অবাক হয়ে বললো।
‘এর পরেই আপনারা গিয়েছিলেন বাতিঘর আর সমাধি মন্দিরের টুকরো দুটোর খোঁজে, তাই না?’
‘ এভাবে পর পর যেতে হবে আপনি জানলেন কি করে?’
জাঈদ নাটকীয় ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললো । ‘এটাই তো স্বাভাবিক । এভাবেই তো ওর বিন্যাস । ক্যালিম্যাচুসের পান্ডুলিপি লেখা হয়েছে থথের শব্দাবলী দিয়ে – সবচেয়ে প্রাচীন এবং জটিল ভাষা । এই ভাষার নির্মাণ হয়েছে পর পর সাতটি উন্নত এবং জটিল স্তরে , যদি বুঝতে চান । আপনাদের পক্ষের এই ভাষার অল্পবয়সী পাঠিকা’ – লিলির দিকে ইঙ্গিত করলো – ‘এক একবারে এক একটি লেখাই পড়তে পারছে, তাই না? এর কারন ক্যালিম্যাচুসের পান্ডুলিপি লেখা হয়েছে ক্রমশঃ জটিল হতে থাকা থথের ভাষায় । কলোসাসের বিষয়ে লেখা হয়েছিল “থথ ১” পদ্ধতিতে, যা সবচেয়ে সহজতর। বাতিঘরের সুত্র  “থথ ২”, যা সামান্য কঠিন। অর‍্যাকল সব ভাষাই পড়তে পারবে কিন্তু এক বারে নয় । ’
উইজার্ড উত্তেজনার চরমে পৌছে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি থথের শব্দাবলী পড়তে পারেন?’
‘হ্যাঁ, আমি ওটার প্রথম চারটে সুত্র ডিসাইফার করতে পেরেছি।’
‘কিন্তু, কিভাবে?’
‘আমি নিজে নিজে চেষ্টা করে শিখেছি,’ জাঈদ বললো । ‘ ধৈর্য আর নিয়মানুবর্তিতা ওহো  ভুলেই যাচ্ছিলাম পশ্চিমী সভ্যতায় তো আবার এ দুটোকে  ইদানীং কালে দক্ষতা রুপে সম্মান দেওয়া হয় না ।’
‘ আপনি কি করে জানতে পারলেন সমাধি মন্দিরের টুকরো বাতিঘরের টুকরোর সাথেই রাখা আছে?’ জো জানতে চাইলো ।
‘দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে বেনবেন এর সাথে সম্পর্কিত সব পুঁথি, খোদাই লিপি এবং নানান তথ্যাদি যা আমার নাগালে এসেছে আমি সব মন দিয়ে অধ্যয়ন করেছি। যার মধ্যে কিছু অত্যন্ত দুস্প্রাপ্য এবং বিখ্যাত ।    ক্যালিম্যাচুসের পাণ্ডুলিপিও ছিল সেখানে। নবম শতাব্দীর একটি কপি। এছাড়াও কত শত লেখনী। যেখানে মানুষেরা তাদের কাজের বিবরণ নথিভুক্ত করে গেছেন। কেউ জানিয়েছেন পুরো একটা নকল পাথুরে দেওয়ান বানানোর কথা, আবার কেউ লিখে গেছেন শ্বেত পাথরের স্তম্ভকে স্তিমিত থাকা আগ্নেওগিরির ভেতরে নিয়ে যাওয়ার বিবরণ। আমার সংগ্রহ তালিকা বিরাট।’
‘ক্যালিম্যাচুসের পান্ডুলিপি জিউস আর আরটেমিসের টুকরো খোঁজার ক্ষেত্রে কোনও সূত্রই দিতে অক্ষম,’ ওয়েস্ট বললো । ‘জিউসতো হারিয়ে গেছে । আর আমাদের ধারনা আরটেমিস এর টুকরো লুকানো  আছে  সেন্ট পিটারস ব্যাসিলিকার কোনো এক স্থানে। কিন্তু স্থানটা সঠিক ভাবে বুঝতে পারছি না। আপনি কি জানেন ও দুটো কোথায় আছে?’
‘জাঈদের চোখ কুঁচকে গেল । ‘সময় এবং যুদ্ধ এই দুটো টুকরোকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে গেছে । কিন্ত হ্যাঁ, আমি জানি , বিশ্বাস করি যে ওদুটো এখন কোথায় আছে।’
পুহ বিয়ার সামনের দিকে ঝুঁকে এলো । ‘আপমি যদি এতো কিছু জানতেন , তাহলে এগুলো উদ্ধার করার জন্য নিজে  কোনোদিন চেষ্টা করেন নই কেন?’
‘হে আমার মুসলিম বন্ধু, আমার সামর্থ্য থাকলে আমি অবশ্যই চেষ্টা করতাম,’ জাঈদ মোলায়েম স্বরে উত্তর দিলো । ‘ কিন্তু আমি সে সময়ে আজকের মতো সক্ষম ছিলাম না।’ কথাটা বলেই জাঈদ ডানপায়ের প্যান্ট ওপর দিকে ওঠালো । দেখা গেল আগুনে ঝলসে পুড়ে যাওয়া পায়ের নিম্নভাগ।
‘১৯৮৭ সালে সোভিয়েতদের ফ্র্যাগমেন্টেশন গ্রেনেডের উপহার । অনেক বছর আমি এর জন্য হাঁটা চলাই করতে পারিনি । আর যে মানুষ ঠিক মতো হাঁটতে পারেনা তার পক্ষে ফাঁদে ভরা এলাকা মোটেই ভালো কিছু নয় । ৯০ সালের ভেতর আমার পেশীগুলো পুনরায় ঠিকঠাক শক্তি ফিরে পায়। এসময়ের মধ্যে আমি ক্যাপস্টোন নিয়ে অনেক পড়াশোনা করে ফেলি। নিউ ইয়র্ক আর ওয়াশিংটন ডিসিতে যখন আক্রমণ হয় সে সময়ে আফগানিস্থানে আমি মুজাহিদিনদের একটা দলকে ট্রেনিং দিতেও শুরু করে ছিলাম ক্যাপস্টোনের টুকরোগুলো উদ্ধার করার জন্য। কিন্তু এর পরেই ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা ঘটে আর সারা আফগানিস্থানে শুরু হয় বিশৃঙ্খলা । আমি আমেরিকানদের হাতে ধরা পড়ি । এখন অবশ্য আমার পা অনেক শক্ত ।’
‘জিউস আর আরটেমিসের টুকরো দুটো,’ ওয়েস্ট বলে ওঠে, ‘এখন কোথায় আছে?’
জাঈদ একটা ধূর্ত হাসি হালো‘মজার ব্যাপার কি জানেন, ওই দুটো টুকরো কোথাও লুকানো ও নেই বা কিছুর আড়ালে রাখাও নেই। দুটোই একেবারে চোখের সামনে রাখা আছে – শুধু জানতে হবে ঠিক কোথায় তাকানো দরকার। আরটেমিসের টুকরোটা , হ্যাঁ, রোমের সেন্ট পিটারস এই রাখা আছে। আমুন-রা প্রথার সবচেয়ে   পবিত্র স্থানে । আর জিউসের টুকরোটা ...’
জাঈদ চেয়ারে হেলান দিয়ে স্মৃতি থেকে চেনা কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করলো –
‘কোনো বজ্রই ছিলনা তার হাতে, ছিল কোনো অভিশাপের জোর ,
কোনো জয়ই করেনি সে অর্জন ।
অবশ্যই সেই একমাত্র বিজয় যা তার ডান হাতে ছিল...   তাকে বানিয়েছিল
মহান,
ওহে ডানাওয়ালা মানবী, কোথায় যাচ্ছ তুমি উড়ে? ’
জাঈদ ওয়েস্টের দিকে তাকালো। ‘কেবলমাত্র ডান হাতের সেই বিজয় ওকে বানিয়েছিল মহান।’
ওয়েস্ট লাইনটার মানে এবার বুঝতে পারলো । ‘ অলিম্পিয়াতে জিউসের মূর্তির ডান হাতে ছিল আর একটা ছোট মূর্তি । “ডানা ওয়ালা বিজয়িনী” – গ্রিসের দেবী নাইকি। এক মহিলা যার পিঠে ডানা ছিল। পরীর মতো বা জাহাজের সামনে লাগানো মূর্তিগুলোর মতো । জিউসের মূর্তিটা ছিল অতিকায়, ফলে ডানাওয়ালা বিজয়িনীর মূর্তিটার মাপ ছিল প্রমান সাইজের একজন নারীর মতোই ।’
জাঈদ বললো, ‘একদম ঠিক । আর এই ডানাওয়ালা বিজয়িনীই যদি ওকে মহান বানিয়ে থাকে তাহলে আমাদের জিউসের দিকে নজর দেওয়ার দরকার নেই । এর পরেই কবিতায় জানতে চাওয়া হয়েছে , কোথায় সে উড়ে গেল?
‘এবার কথা লো , আমার মনে হয় আপনি জানেন প্রাচীন গ্রীসে এধরনের অনেক ডানাওয়ালা বিজয়িনীর মূর্তি পাওয়া গেছে । তবে জিউসের মূর্তির নির্মাতা ফিডিয়াস এর কাজের পর্যালোচনা করে আমি একটাই ডানাওয়ালা   বিজয়িনী মূর্তির খোঁজ পেয়েছি যাতে ওই মানের শিল্প আছে। নিখুঁত লাইন, নিখুঁত অবয়ব এবং শ্বেত পাথরের গায়ে ভিজে কাপড়ের এফেক্টের অসম্ভব নিপুণ খোদাই কর্ম ।
‘যে নমুনা আমি খুঁজে পেয়েছি সেটা বর্তমান পৃথিবীতে প্রাচীন গ্রীক স্কাল্পচারের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট কাজ । যদিও পশ্চিমী বিদ্বানরা ওটাকে কোন এক অজানা শিল্পীর কাজ বলেই ছাপ্পা মেরে দিয়েছেন। ১৮৬৩ সালে ওটার ওটা খুঁজে বার করেন এক ফরাসী প্রত্নতত্ববিদ , চারলস চ্যাম্পয়সিউ –’
‘এ হতেই পারে না ...’ উইজার্ড ঢোঁক গেলেন বিষয়টা বুঝতে পেরে । ‘এটা মোটেই হতে...’
জাঈদ মাথা ঝোঁকায় । ‘সেইটাই । চ্যাম্পয়সিউওটাকে খুঁজে পান স্যামোথ্রেস নামের এক গ্রীক দ্বীপে । যে কারনে আজ ওই স্ট্যাচুর পরিচিত নাম স্যামোথ্রেসের ডানাওয়ালা বিজয়িনী।
‘ওটাকে ফ্রান্সে নিয়ে যাওয়া হয় , যেখানে ওটার শিল্পের প্রকৃত মর্যাদা মেলে। যে কারনে ওটার স্থান হয় ল্যুভর মিউজিয়ামে। আজ অবধি ওটা ওখানে তার সব মহিমা নিয়ে বিরাজ করছে ডারু স্টেয়ারকেসের একেবারে ওপরে । প্যারিসে,  ল্যুভরের ডেনন উইং এর উঁচু গম্বুজাকৃতি ছাদের নিচে ।’
হ্যালিকারনাসসাস চললো ইউরোপ অভিমুখে ।
সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে দলকে দুভাগে ভাগ করা হবে ।
ওয়েস্ট এর নেতৃত্বে একটা দল যাবে প্যারিসে জিউসের টুকরোটা হাসিল করার জন্য । অন্যদিকে উইজার্ড যাবে ছোট দল নিয়ে রোমে । আরটেমিসের টুকরো উদ্ধারে। জাঈদ হ্যালিকারনাসসাসেই থাকবে স্কাই মনস্টারের সাথে । নিরাপদে ...বন্দী অবস্থায় ।
দলের সবাই আপাতত বিমানের এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। কেউ বিশ্রাম নিচ্ছে। কেউ গবেষনায় ব্যস্ত । আবার কেউ আগত মিশনের ভাবনায় মশগুল।
পুহ বিয়ার তার বন্দুকগুলো দেখে শুনে নিচ্ছিলো চেয়ারের সাথে হ্যান্ডকাফ বদ্ধ অবস্থায় থাকা  মুস্তাফা জাঈদের কাছে বসে ।
জাঈদ ফিসফিস করে ডাকলো, ‘হ্যালো, ভাই বেরাদর । আল্লাহ তোমায় অনেক রহমত করুন এবং সুখে রাখুন।’
‘আপনাকেও,’ পুহ বিয়ার অভ্যাসসিদ্ধ ভাবে একজন একনিষ্ঠ ধর্মীয় মানুষ রুপে উত্তর দিলো।
‘তোমার পিতা , শেখ , একজন খুব ভালো মানুষ,’ জাঈদ বললো। ‘একজন প্রকৃত মুসলমান।’
‘ কি বলতে চাইছেন বলুন তো?’
‘ওই ইহুদিটার উপস্থিতি আমার ঠিক ভালো লাগছে না,’ জাঈদ সোজাসুজি বললো , স্ট্রেচের দিকে মাথা নেড়ে । যে মেইন কেবিনের শেষের দিকে বসেছিল। ‘আমি বুঝতে পেরেছি যে তোমার  পিতা এই পশ্চিমীদের সাথে যুক্ত হয়েছেন ভালো কাজ করার জন্য । কিন্তু আমার বিশ্বাস হয়না উনি ওই ইহুদী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পছন্দ করতেন।’
পুহ বিয়ার উত্তর দিলো, ‘এই মিশনে ইজ্রায়েলিদের ডাকা হয়নি । যেকোনো ভাবেই হোক ওরা আমাদের মিশনের খোঁজ পেয়ে যায় – হুমকি দেয় আমাদের মিশনের কথা ফাঁস করে দেবে যদি না আমরা ওকে দলে নিই ।’
‘তাই নাকি? একেবারে যা ওদের স্বভাব সেটাই করেছে,’ জাঈদ হিসহিসে কন্ঠে বললো। ‘ বেরাদর আমি খুব খুশি যে তুমি এই মিশনে কাজ কছো। ক্যাপস্টোনকে দ্বিতীয়বার একত্র করাটা মানব ইতিহাসের এক বিশাল মুহূর্ত হিসাবেই ধরা যেতে পারে।  সব কিছু শেষ হয়ে যাওয়ার আগে , সকলেই যে যার নিজের আসল রুপটা দেখিয়ে দেবে। যখন সময় আসবে আল্লাহর অনুচরদের একসাথে কাজ করতে হবে।’
পুহ বিয়ার নিচের দিকে দৃষ্টি নামালো ।

বিমানের শেষ প্রান্তে ওয়েস্টের অফিসের ভেতরে , উইজার্ড, জো, বিগ ইয়ার্স আর ওয়েস্ট- হ্যামিল কারের ভুলে যাওয়া বাসস্থানে পাওয়া -   বাদামি রঙের চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরিটা পড়ায় ব্যস্ত। হারম্যান হেসলারের নোট বুক। যেখানে বিস্তারিত ভাবে উনি লিখে গেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তাদের সাতটি প্রাচীন আশ্চর্য খোঁজার বিবরণী ।
জার্মান ভাষা থেকে অনুবাদ করার পর , ওরা অনেক ত থ্য খুঁজে পেলো যা ভালোই বোঝা যাচ্ছে –
থথের ভাষা – নানান ধরনের কথ্য ভাষার প্রয়োগ, ক্রমাগত জটিল ...
অর‍্যাক ল কে খুঁজে বার করতে হবে সঠিক অনুবাদ করার জন্য...
ক্যাথলিক চার্চ = আমুন-রা এর প্রাচীন ধর্ম বিশ্বাস
ক লোসাস – তৃতীয় লকেট
৮৫ খ্রিষ্ট পূর্বে হওয়া রহস্যময় ভবন অভিযান
·         ষষ্ঠ ইমহোটেপ + ১০,০০০ কর্মী
·         সকলেই গিয়েছিল পশ্চিম দিকে কার্থেজের কাছে কোন এক সামুদ্রিক গোপন এলাকায়
·         রসেট্টা তে এক কর্মীর কাছ থেকে একটা প্যাপিরাসের টুকরো পাওয়া যায় যা প্রমান দিচ্ছে ওই মানুষটি এর সাথে যুক্ত ছিল।
·         এক অভূতপূর্ব স্থাপত্য নির্মাণের কাজ । একটা সম্পূর্ণ সামুদ্রিক খাঁড়ি ফাটলের মুখকে অদৃশ্য করে দিয়ে পাথুরে দেওয়ালের ছদ্মবেশে ঢেকে দেওয়া।
·         যারা দুটো বিশেয়াহ ভাবে লুকানো গুপ্ত ধন কে এই পবিত্র ক ক্ষে রেখে আসে তাদের সবাই কে মেরে ফেলা হয় ।
·         বাতিঘর আর সমাধি মন্দিরের ক্যাপ স্টোন টুকরো ???
এর ভেতরেই পাওয়া গেলো একটি টেলিটাইপড আদেশপত্র যা পাঠিয়েছিলেন হাইনেরিখ হিম লার । যার মর্মার্থ – হেসলার কে অনুমতি দিচ্ছেন একটা ইউ-বোট নিয়ে পুরো উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয়  তট এলাকা পরীক্ষা করে নকল পাথুরে দেওয়াল খুঁজে দেখার।
ওখানে হাতে লেখা কিছু হিয়েরগ্লিফিক্স ও ছিল যার অর্থ উইজার্ড পড়ে শোনালেন –
‘ মানুষের পছন্দ
দুটোর ভেতরে থেকে যে  কো নো একটা আচার প্রথাকে বেছে নিতে হবে
একটা আনবে শান্তি
অন্যটা দেবে শক্তি
চুড়ান্ত দিনে
সিদ্ধান্ত নিতে হবে,
একটা পছন্দ বেছে নিতে হবে স্বয়ং রা’য়ের উপস্থিতিতে
যা নিশ্চিত করে দেবে মানুষের ভাগ্য কে।’
উইজার্ড হেলান দিয়ে বসলেন। ‘এটা সেই দুটো মন্ত্র পাঠের ইঙ্গিত – আচার প্রথাকেবল মাত্র একটা মন্ত্রকেই উপ্সথাপিত করা যাবে যখন ক্যাপ স্টোনকে রাখা হবে গ্রেট পিরামিডের ওপরে। 
ওরা আর কিছু লেখা পেলো । সেগুলোর কি অর্থ সেটা অবশ্য বোঝা গেল না । হয়তো কোন এক অশুভ মন্ত্রের কথা বলা হয়েছে –

তৃতীয় ইমহোটেপের সমাধি থেকে পাওয়া প্রথম লেখনী
“কি অবিশ্বাস্য কাঠামো অবয়ব ছিল এটা,
একেবারে আয়নার প্রতিবিম্ব যেন,
প্রবেশ এবং প্রস্থান একেবারে এক রকম।
আমার কাজটা আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে – এটাই আমার জীবনের সব সেরা কাজ – যাকে লুকিয়ে রেখে দিতে হচ্ছে ।
কিন্তু আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি।
আমরা বিরাট সেই আর্চ অয়েকে বন্ধ করে দিয়েছি ভুমিধ্বস ঘটিয়ে।
তবে আদেশানুসারে পুরোহিতের ঢোকার পথ খোলাই থাকলো যাতে তারা
ভেতরের জিনিষ পত্রের দেখভাল করতে পারে – পুরোহিত দের বলে দেওয়া হয়েছে
কিভাবে ফাঁদ গুলো সেট করা আছে ।”

তৃতীয় ইমহোটেপের সমাধি থেকে পাওয়া দ্বিতীয় লেখনী
“ কেবল মাত্র সাহসী আত্মা যাদের আছে
তারাই পার হতে পারবে ডানা ওয়ালা সিংহের কুয়ো ।
কিন্তু নিন গিজিডার খনি থেকে সাবধান থেকো
যারা প্রবেশ করবে  সর্প -প্রভুর গর্তে
আমি এটা ছাড়া আর কোন রকম উপদেশ দিচ্ছি না
সমস্ত আশা পরিত্যাগ করো
ওখান থেকে পালানোর যে কোনোই পথ নেই । ”
ডানাওয়ালা সিংহ – পারসিয়া/মেসোপটেমিয়াতে এধরনের আসিরিয়ান মূর্তি দেখা যায় ।
নিনগিজিডা – আসিরিয়ানদের সরীসৃপ এবং সাপের দেবতা।
সম্ভাব্য রেফারেন্স ব্যাবিলনের এইচ জি ???

কয়েকটা পাতার পর পাওয়া গেল দুটো হাতে আঁকা ছবি। যার ওপর লেখা আছে “ নিরাপদ রাস্তা”
এরপরে আছে আরো একটা লেখনী, যা দেখে উইজার্ড বলে উঠলেন, ‘আরে, এতো সেই প্রার্থনাগুলোর একটার বর্ণনা যা চরমতম দিনে পড়া আবশ্যক বলে মনে করা হয়
লেখনী –
“শক্তিলাভের আচার প্রথা
রা’য়ের সর্ব উচ্চ আসনে,
বলিপ্রদত্ত নির্বাচিতর হৃদয়ের নিচে
যে শুয়ে আছে প্রতিহিংসাকামী আনুবিশের হাতের ওপর,
ঢেলে দাও মৃত্যুর দেবতার হৃদয়ে
তোমার মাতৃভূমির কিছু পরিমাণ [ডেবেন] মাটি
পাঠ করো সেই শয়তানী শব্দ গুলো
তাহলেই এ জগতের সমস্ত ক্ষমতা হয়ে যাবে তোমার
এক হাজার বছরের জন্য ”
‘ “তোমার মাতৃভূমির কিছু পরিমাণ [ডেবেন] মাটি” ?’ বিগ ইয়ার্স ভ্রু উঁচিয়ে বললো, ‘এর মানে টা কি?’
জো জানালো, ‘ ডেবেন প্রাচীন ইজিপশিয়ানদের মাপের একক । মোটা মুটি ১০০ গ্রাম। আমার মনে হয় এর অর্থ –’
আর ঠিক তখুনি উইজার্ড প্রায় লাফিয়ে উঠে পড়ের লেখনীটা পড়তে শুরু করলেন
সেন্ট মার্ক এর গোপন গসপেল থেকে
বিচার দিবসের ভোরের বেলায়
সেই ভয়ঙ্করতম দিন,
একমাত্র মন্দির যা উভয়ের নাম বহন করে,
রা’য়ের ক্ষমতাকে সুত্রবদ্ধ করে মহান রামেসিসের চোখের মতো
সুউচ্চ মিনারের সুঁচে
দ্বিতীয় প্যাঁচাকে প্রথমে
আর তৃতীয়কে দ্বিতীয়ের স্থানে ...
... যেখানে ইস্কেন্দারের সমাধি উন্মোচিত হয় ।
সেখানেই খুঁজে পাবে প্রথম টুকরোটাকে ।
এই লেখনীর তলায় হেসলার নোট করেছেন –
ইস্কেন্দারের সমাধি – আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের কবরখানা । আলেকজান্ডারের সাথে সমাধি দেওয়া হয়েছিল প্রথম টুকরোটাকে।
উইজার্ড পেছন দিকে হেলান দিয়ে বসলেন, চোখ বিস্ফারিত।
‘সেন্ট মার্ক এর গোপন গসপেল।’ জো ওয়েস্টের দিকে তাকালো । ‘ যে গসপেল কে মানা হয় না।’
বিগ ইয়ার্স বললো, ‘একটু খুলে বলো ।’
ওয়েস্ট বললো, ‘ এ খবর খুব বেশি মানুষ জানে না। সেন্ট মার্ক যখন ইজিপ্টে ছিলেন তখন দুটো গসপেল লিখে ছিলেন প্রথম গসপেল যেটার কথা আপামর বিশ্ব জানে। যা বাইবেলে আছে। দ্বিতীয় গসপেল, যখন উনি সর্বসমক্ষে আনেন তখন সেটা এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি  করে । প্রায় সব কটি কপি পুড়িয়ে ফেলা হয়   খ্রিস্টান আন্দোলনের শুরুর সময়ে। আর স্বয়ং সেন্ট মার্ককে মানুষের ছোঁড়া পাথরের আঘাত সহ্য করতে হয়।’
‘কেন?’
জো উত্তর দেয়, ‘ কারন একটাই। এতে এমন অনেক অজানা ঘটনার কথা বলা হয়েছিল যা যীশু তার জীবনে করে ছিলেন। নানান আচার প্রথা পালন। মন্ত্র পাঠ । বিদঘুটে সব ব্যাপার স্যাপার । আর এর ভেতর ছিল তথাকথিত সমকামিতার উল্লেখ।’
‘কি?’ বিগ ইয়ার্স প্রায় চিৎকার করে উঠলো ।
জো বললো, ‘ওই গস পেলের একটা অধ্যায়ে আছে যীশু একজন অল্প বয়সী পুরুষের সাথে কোথাও চলে যান। মার্কের কথা অনুসারে  ওই অল্পবয়সী পুরুষকে ‘আদিম প্রাচীন পদ্ধতিতে” দীক্ষা দেন । কিছু বিকৃতমনা কল্পনাবিলাসী লেখক এটাকে সমকামিতা বলে দেখাতে চেয়েছেন। যদিও বিদ্বানরা একেই বলেছেন আমুন-রা প্রথার বিশেষ আচার পালন। আর এটাকেই পরে ফ্রিম্যাসনরা নিজেদের রীতি নীতির ভেতর সংযুক্ত করে। এর ফলে আর একটা সূর্য উপাসনার বিশ্বাসের জন্ম হয় প্রাচীন ইজিপ্টের ভাবনা চিন্তা থেকে।’
ওয়েস্ট বললো, ‘বুঝতে পারলে কেন একে মান্যতাহীন গসপেল বলা হয়?’
‘হুম,’ বিগ ইয়ার্স বললো। ‘ আমি তো জানতাম ফ্রি ম্যাসনরা অ্যান্টি-ক্যাথলিক
‘ঠিকই জানো,’ জো বললো । ‘কিন্তু ফ্রি ম্যাসনদের এই ঘৃণাটা অনেকটা ভাইবোনদের ভেতর থাকা ঘৃণার মতো । ওরা আসলে একে অপরের শত্রু ভাবাপন্ন ভাইয়ের মতো, যাদের জন্ম হয়েছে একই ধর্মের উৎস থেকে। ঠিক যেমনটা জেরুজালেম এক পবিত্র স্থান ইসলাম এবং ইহুদিদের কাছে । ঠিক সেভাবেই ক্যাথলিক আর ফ্রিম্যাসনরা এক আদি উৎস বহন করে চলেছে। দুটো বিশ্বাস, যার জন্ম একটাই বিশ্বাস থেকে – ইজিপশিয়ানদের সূর্য উপাসনা। একই পথের পথিক হয়েও ওরা নিজের নিজের বিশ্বাসকে দুটো আলাদা পদ্ধতিতে ব্যাখা করে। ’
ওয়েস্ট বিগ ইয়ার্সের বাহুটে আলগা চাপড় মেরে বললো, ‘একটু জটিল ব্যাপার, বাডি । ব্যাপারটাকে এই ভাবে ভাবো – আমেরিকা একটা ম্যাসোনিক দেশ এবং ইউরোপ একটা ক্যাথলিক দেশ । আর তারা আপাতত লড়াই করছে তাদের নিজ নিজ বিশ্বাসের সেরা উপহার পাওয়ার জন্য ... ক্যাপ স্টোন।’
বিগ ইয়ার্স বললো, ‘তুমি বলছো আমেরিকা একটা ম্যাসনিক দেশ। আমারতো মনে হয়ে দেশটা একটু বেশি মাত্রায় খ্রিস্টান ভাবাপন্ন। বাইবেল এর ব্যাপক ব্যবহার সেটাই বলে।’
জো উত্তর দেয়, ‘এর একমাত্র কারন জনগণের বেশীর ভাগ খ্রিস্টান । কিন্তু তার মানে এই নয় যে দেশটাও তাই। একটা দেশ আসলে কি? এক দল মানুষ যারা একটা কমন ঐতিহ্যর কারনে একত্রিত থাকে মিউচু্য়াল উন্নতি এবং সুরক্ষার স্বার্থে । আর ওখানেই আছে আসল কথা বা কিওয়ার্ডটা, সুরক্ষা । ভেবে দেখো, দেশের সেনা থাকে , ধর্মের থাকে না । সমগ্র সেনাবাহিনীকে আদেশ দেয় কে , কি নামে ডাকি তাকে ... ইউনাইটেড স্টেটস ?’
না,  নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এবং তার উপদেষ্টা মণ্ডলী।’
‘ঠিক তাই আমেরিকার মানুষেরা অবশ্যই সাচ্চা খ্রিস্টান । কিন্তু আমেরিকার নেতারা সেই জর্জ ওয়াশিংটনের সময় থেকে বেশীর ভাগ সময়েই ফ্রিম্যাসন। ওয়াশিংটন, জেফারস্ন, রুজভেল্ট , বুশেরা । ২০০ বছর ধরে ফ্রিম্যাসনেরা ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকার সেনাবাহিনিকে ব্যবহার করে চলেছে নিজেদের স্বার্থে নিজেদের কাজে । কি মজা তাহলে বোঝো , একটা ধর্মবিশ্বাসের নিজস্ব সেনা বাহিনী । আর তার কথা জনগন জানেই না ।’
ওয়েস্ট বললো, ‘তুমি একটু খুঁটিয়ে দেখলেই  আমেরিকার নানান জায়গায় ম্যাসোনিক পদ্ধতিতে ক্যাপস্টোনের উপাসনা দেখতে পাবে। তা নাহলে বছরের পর বছর ধরে কেন আমেরিকান ফ্রিম্যাসনরা সাতটা প্রাচীন আশ্চর্যর প্রতিরুপ বানিয়েই চলেছে ।’
‘ হতেই পারে না...’
ওয়েস্ট আঙ্গুলের কড় গুনে বলতে থাকলো, ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি বানিয়েছিলেন বিখ্যাত ফরাসী ফ্রিম্যাসন, ফ্রেডেরিখ-আউগুস্ত বারথোল্ডি । কলোসাস অফ রোডসের প্রায় প্রতিরুপ। এমন কি হাতে মশালটাও বাদ যায় নি । নিউইয়র্কের উলউওরথ বিল্ডিং  বাতিঘরের একেবারে কপি। ফোরটনক্স এর ফ্লোর প্ল্যান হুবহু হ্যালিকারনাসসাসেরর সমাধি মন্দিরের মতো। স্ট্যাচু অফ জিঊস , সিংহাসনে আসীন এক বিশাল মাপের অবয়ব , লিঙ্কন মেমোরিয়ালের মূর্তি । আরটেমিসের মন্দিরকে খুঁজে পাবে সুপ্রীম কোর্টে ।
‘ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের হুবহু বানানো হয়নি, এর একটাই কারন এটা ঠিক কেমন দেখতে ছিল কেউ জানে না । যে কারনে সেটাকে সম্মান জানিয়ে এক বিশেষ ধরনের বাগানের পরিকল্পনা করেন জর্জ ওয়াশিংটন। আর সেটা বানানো হয় হোয়াইট হাউসেআর সেটাকে প্রসারিত করেন থমাস জেফারসন এবং পরে ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট। জন এফ কেনেডি ছিলেন ক্যাথলিক প্রেসিডেন্ট। চেষ্টা করেছিলেন বাগানটাকে নিশ্চিহ্ন করার , পুরো পুরি পারেন নিউনি নেই কিন্তু বাগানটা থেকে গেছে। যাকে ইদানীং কালে রোজ গারডেন নামে ডাকা হয়।’
বিগ ইয়ার্স হাত  গুটিয়ে কোলের ওপর রেখে বললো, ‘আর গ্রেট পিরামিড,  সেটা কোথায় ? আমেরিকাতেতো কোথাও পিরামিডের মতো  কোনো স্থাপত্য দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। ’
‘একদম ঠিক বলেছো ’ ওয়েস্ট বললো । আমেরিকাতে বিশাল পিরামিডের মতো কিছু নেই। কিন্তু যখন ইজিপশিয়ানরা পিরামি বানানো বন্ধ করলো তখন ওরা কি বানানো শুরু করলো জানো?’
‘কি?’
‘ওবেলিস্ক। ওবেলিস্ক হয়ে দাঁড়ালো সূর্য-উপাসনার মূল চিহ্ন। আমেরিকা এরকমই এক অতিকায় ওবেলিস্ক বানিয়েছে – ওয়াশিংটন মনুমেন্ট । যার উচ্চতা ৫৫৫ ফুট । ইন্টারেস্টিং ব্যাপার এ যে গ্রেট পিরামিড ৪৬৯ ফুট লম্বা। ৮৬ ফুট ছোটো ওয়াশিংটন মনুমেন্ট এর চেয়ে । কিন্তু যে বেস বা গিজা  উপত্যকার ওপর গ্রেট পিরামিডের অবস্থান সেটার উচ্চতা সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৮৬ ফুট । যার অর্থ দুটোকে যোগ করলে সেই একই উচ্চতা পাওয়া যাচ্ছে।’
এইসব কথাবার্তা চলার মাঝেই উইজার্ড নোট বইটার পাতা উলটে উলটে দেখছিলেন।
‘একমাত্র মন্দির যা উভয়ের নাম বহন করে...’ বিড় বিড় করলেন । তারপরেই চোখ চক চক করে উঠলো । ‘এটা লাক্সর। লাক্সর এর মন্দির ।’
‘আরে হ্যাঁ, তাই তো। দারুন ভাবনা, ম্যাক্স । খুব ভালো!’ জো উইজার্ডের কাঁধে আলতো টোকা মেরে বললো ।
‘মনে হচ্ছে এটা ঠিকঠাক মিলে যাবে ...’ ওয়েস্ট বললো ।
‘কি মিলে যাবে ?’ বিগ ইয়ার্স আবার জিজ্ঞেস করলো কথার মাথামুণ্ডু বুঝতে না পেরে।
‘দক্ষিন ইজিপ্ট লাক্সারে আছে আমুন এর মন্দির, যাকে সকলে লাক্সারের মন্দির বলেই চেনে,’ জো জানালো । ‘ইজিপ্টের অন্যতম সবচেয়ে বড় ট্যুরিস্ট স্পট । বিখ্যাত মন্দিরটার মূল আকর্ষণ এর বিশাল আকৃতির  প্রবেশ পথ । দ্বিতীয় রামেসিসের দুটো অতিকায় বসে থাকা স্ট্যাচু আর ওদের সামনে দন্ডায়মান একাকী   ওবেলিস্ক। এর অবস্থান নীলনদের উত্তর প্রান্তে লাক্সারে , বা – সে সময়ে যে নামে ডাকা হতো – থিস।
‘লাক্সারের মন্দিরটা  নির্মিত হয়েছিল দ্বিতীয় রামেসিসের আগের কয়েকজন ফ্যারাও দ্বারা । পরে দ্বিতীয় রামেসিস একে পুন নির্মাণ করেন এবং নিজের বলে ঘোষনা করে দেন । কিন্তু বলা হয়ে থাকে এই মন্দির নির্মাণে আলেকজান্ডারেরও হাত ছিল । আর এই কারনেই –’
‘ – সারা বিশ্বে এটা একমাত্র মন্দির যেখানে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট কে ফ্যারাও বলে উল্লেখ করা আছে,’ উইজার্ড বললেন । ‘এক মাত্র লাক্সারেই আলেকজান্ডারের নাম হিয়েরোগ্লিফিক্স ভাষায় খোদাই করা আছে । গোলাকৃতি অলঙ্কৃত একটি ফ্রেমে । একমাত্র মন্দির যা উভয়ের নাম বহন করেলাক্সারের মন্দিরই একমাত্র মন্দির যা এক সাথে দ্বিতীয় রামেসিস আর আলেকজান্ডারের নাম ধারন করে আছে ।’
বিগ ইয়ার্স প্রশ্ন করলো  ‘ তাহলে ওই “রা’য়ের ক্ষমতাকে সুত্র বদ্ধ করে মহান রামেসিসের চোখের মতো সুউচ্চ মিনারের সুঁচে” কথার কি মানে?’
ওয়েস্ট বললো, ‘সুউচ্চ মিনারের সুঁচ ওই ওবেলিস্ক। রা এর ক্ষমতা , আমার ধারনা অনুসারে সূর্যের আলো । মহাবিচারের ভোরের সূর্যালোক – অর্থাৎ দিনটা টারটারাসের ঘূর্ণনের দিন । ওই কবিতা আমাদের জানান দিচ্ছে ভোরের সূর্যালোকে বেলিস্কগুলোর দুটো বিশেষ স্থানে অবস্থিত ফুটোর ভেতরে দিয়ে আলো গিয়ে পড়বে এমন এক স্থানে যা জানিয়ে দেবে সমাধির স্থান।’
বিগ ইয়ার্স জো এর দিকে তাকিয়ে বললো, ‘ আচ্ছা তুমি তো বললে লাক্সারে মাত্র একটাই  ওবেলিস্ক আছে ।’
জো মাথা ঝুঁকিয়ে বললো, ‘হ্যাঁ ঠিক কথা।’
‘ তাহলে তো আমরা প্যাঁচে পড়ে যাচ্ছি । দুটো বেলিস্ক না থাকলে, আমরাতো সূর্যের আলো ওদের ফুটোর ভেতরে দিয়ে যাওয়া দেখতে পাব না। ফলে আলেকজান্ডারের সমাধি খুঁজে বার করাও যাবে না।‘
‘ঠিক তা নয় ,’ উইজার্ড বললেন চকচকে চোখে  ওয়েস্ট আর জো এর দিকে তাকিয়ে।
ওরা উইজার্ডের দিকে তাকিয়ে হাস লো ।
শুধু বিগ ইয়ার্স কিছুই বুঝতে পারলো না।
‘কি? ব্যাপারটা কি?’
উইজার্ড বললেন, ‘লাক্সার মন্দিরের দ্বিতীয় ওবেলিস্কটাও এখনো আছে বিগ ইয়ার্স । শুধু নিজের জায়গায় নেই।’
‘কোথায় আছে তাহলে?’
উইজার্ড উত্তরে বললেন, ‘ প্রাচীন ইজিপ্টের অনেক ওবেলিস্কের মতোই এটাও একটা পশ্চিমী দেশকে দিয়ে দেওয়া হয় । তেরোটা ওবেলিস্ক রোমে চলে যায় , ক্যাথলিক চার্চের সূর্য উপাসকরা ওগুলো গ্রহণ করেন। দুটো যায় লন্ডন আর নিউইয়র্কে – এই দুটোকে একত্রে বলা হয়ে থাকে ক্লিওপেট্রার সূঁচ । লাক্সার মন্দিরের দ্বিতীয় ওবেলিস্কটাকে ১৮৩৬ সালে দিয়ে দেওয়া হয় ফ্রান্সকে। প্যারিসের একেবারে মাঝখানে প্লেস ডে লা কনকর্ডে যা এখন গর্বের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। ল্যুভর থেকে ৮০০ মিটার দূরে।’
‘জিউসের টুকরো আর বেলিস্ক,’ জো বললো । ‘যা বুঝছি তাতে ডাবল-ট্রাবল হতে চলেছে প্যারিসে।’
ওয়েস্ট নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো ।
‘প্যারিস!’ বললো, ‘জানে না   ওকে আঘাত করার জন্য কি বা কারা যাচ্ছে !
০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০
[সমাপ্ত অষ্টম অধ্যায় ।  নবম অধ্যায় -চতুর্থ অভিযানজিউসের স্ট্যাচু এবং আরটেমিসের মন্দির”  https://amarkolponarjogot.blogspot.com/2017/10/blog-post_13.html]

Thursday, September 28, 2017

#প্রাচীন_সপ্তাশ্চর্যের_খোঁজ (৭৮-৭৯-৮০-৮১) স প্তম অধ্যায় - লিলি নামের একটি মেয়ে - ২য় পর্ব - প্রতিম দাস

 #প্রাচীন_সপ্তাশ্চর্যের_খোঁজ (৭৮-৭৯-৮০-৮১)
স প্তম অধ্যায় - লিলি নামের একটি মেয়ে - ২য় পর্ব
 প্রতিম দাস

সপ্তম অধ্যায়
**লিলি একটা মেয়ের নাম**
দ্বিতীয় পর্ব
ভিক্টোরিয়া স্টেশন, কেনিয়া
২০০৩-২০০৬
০০০০০
ভিক্টোরিয়া স্টেশন
দক্ষিন কেনিয়া
২০০৩-২০০৬
কেনিয়াতে ওয়েস্টদের দল যখন ছিল তখন একটা বড় কাঁচের জার রাখা থাকতো কিচেনের রান্না ঘরের বেঞ্চের ওপর।
এটার নাম ছিল ‘শপথ জার’ । যখনই দলের কোনও সদস্য লিলির সামনে নিজেকে কোনো কারনে গালাগাল দিতো বা কোনো কারনে দিব্যি কাটতো তখনই তাকে ওই জারে একডলার করে ফেলতে হতো জরিমানা রুপে।
আর যেহেতু দলের সবাই সেনা বাহিনীর লোক তাই জারটা ভরে উঠতে খুব একটা সময় নিতো না। জারে যে অর্থ জমতো তা দিয়ে লিলির জন্য খেলনা, বই বা ব্যালের পোশাক কেনা হতো ।
স্বাভাবিক ভাবেই , যেহেতু ওই জারে অর্থ জমলে ওর নিজের লাভ হবে এটা লিলি বুঝে গিয়েছিল তাই ওর একটা মজার খেলাই ছিল সদস্যদের দিকে নজর রাখা আর ডলার জমানোর ব্যবস্থা করা। সেরকম কোনও শব্দ সদস্যদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসলেই লিলি চেঁচিয়ে উঠতো - ‘শপথ জার!’
ফার্মে নানান কাজ করার জন্য লিলি পকেট মানিও পেতো ।
এটা ওয়েস্ট আর উইজার্ডের চিন্তা ভাবনার ফসল। ওর চাইছিলো ওর উন্নতি – যা অবশ্য অতিরিক্ত মাত্রাতেই হচ্ছিল – যদিও সেটা লিলিকে দেখা বোঝা যেতনা । মনে হতো এসব ওর কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার। অন্যান্য সদস্যদের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে ফার্মের কাজ করা – বিগ ইয়ার্সের সাথে গিয়ে কাঠ নিয়ে আসা ... পুহ বিয়াকে তার কাজের জিনিষপত্র পরিষ্কার করতে সাহায্য করা ... আবার কখনো কখনো ভাগ্য ভালো হলে ওয়েস্টের অনুপস্থিতিতে হোরাসকে খাওয়ানোর সুযোগ পাওয়া এসব করে লিলি যেন ভাবতে পারে সেও সবার মতো কিছু না কিছু কাজ করছে এটাই ছিল উইজারড আর ওয়েস্টের ভাবনা। পরিবারের অন্যতম সদস্য রুপে সেও তার দায়িত্ব পালন করছে। এসবের ফলে লিলি সেরা মানুষে পরিনত হওয়ার সুযোগ পাবে।
০০০০০
লিলি যত বড় হতে থাকলো, ততই বাড়তে থাকলো ওর কৌতূহল । আর এর কারনেই ওর আশেপাশে থাকা দলীয় সদস্যদের বিষয়ে অনেক কিছুই জেনে ফেললো ও
উদাহরণ স্বরুপ জেনে গেল, সংযুক্ত আরব আমীরশাহীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর শেখের দ্বিতীয় সন্তান পুহ বিয়ার।
উইজার্ড কোন এক সময়ে ক্যাথলিক যাজক হওয়ার জন্য পড়াশোনা শুরু করেছিলেন কিন্তু বেশি দূর এগোননি।
জানতে পেরেছিল জো একসময়ে সেনা বাহিনী থেকে বিশেষ ভাবে ডাবলিনের ট্রিনিটী কলেজে ভর্তি হয়েছিল উইজার্ডের কাছে প্রত্নতত্ব নিয়ে পড়ার জন্য।
জ্যাক ওয়েস্ট ও একই সময়ে ওখানে পড়াশোনা করেছিল জো এর সাথে - ওকেও ওর দেশ থেকে পাঠানো হয়েছিল কানাডিয়ান প্রফেসরের কাছে শিক্ষালাভ করার জন্য।
ওয়েস্টের নিজের দেশ । অস্ট্রেলিয়া।
লিলির অস্ট্রেলিয়া বিষয়েও খুব কৌতূহল । কৌতূহলের মধ্যে ছিল আবার অনেক সংশয়ওই দেশটার ৮০ ভাগ এলাকা প্রায় মরুভূমি । তবু ওখানেই নাকি আছে সুপার মডার্ন, সিডনীর মতো সব শহর । বেলস আর বন্ডীর মতো নামকরা সমুদ্রতট ।  উলুরু এবং গ্রেট ব্যারিয়ার রীফের মতো অসাধারন প্রাকৃতিক সৃষ্টি লিলি এটাও জানতে পেরেছে শেষেরটা আবার আধুনিক প্রাকৃতিক আশ্চর্যের তালিকার   অন্তর্ভুক্ত ।
সময়ের সাথে সাথে লিলির ভেতর আর অনেক প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার বিষয়ে । আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এর অবস্থান কেমন সেটার সম্বন্ধে । অস্ট্রেলিয়াতে মাত্র ২০ মিলিয়ন মানুষ বসবাস করে । অথচ এটা একটা বিশাল আকারের মহাদেশ , যাকে আবার বিশ্বের মানচিত্রে একটা ছোট দে বলে বিবেচনা করা হয় ।
এ দেশের মিলিটারি ব্যবস্থাও বেশ ছোটো আকারের, তবু তার একটা বিশেষ গুরুত্ব আছে , পরিচিতি আছে বিশ্বের কাছে – বলা হয়ে থাকে এক সময় এ দেশেই জন্ম নিয়েছিল বিশ্বের সবসেরা স্পেশ্যাল ফোরস, এস এ এস – যেটার সদস্য ছিল ওয়েস্ট ।
আর একটা বিষয় লিলিকে আকর্ষণ করে – বিশ শতকের সময়ে, অস্ট্রেলিয়া ছিল আ্মেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ এবং অনুগত সহযোগী। ২য় বিশ্ব যুদ্ধের সময় , কোরিয়া, ভিয়েতনাম, কুয়েত, অস্ট্রেলিয়া ছিল প্রথম সারির দেশ যারা আমেরিকার পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছিল ।
আর এখন সে অবস্থা নেই।
এটাই ধাঁধায় ফেলে দেয় লিলিকে । ও ঠিক করে ওয়েস্টের কাছেই জানতে চাইবে এ বিষয়ে।
বৃষ্টি ঝরা একটা দিনে লিলি গিয়ে ধকে ওয়েস্টের স্টাডিতে । দেখে অন্ধকারে পেন মুখে ধরে  কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে একমনে তাকিয়ে [ হোরাস বসে আছে চেয়ারের পেছনের উঁচু জায়গাটায়] গভীরভাবে কিছু একটা চিন্তা করছে ওয়েস্ট ।
লিলি ঘরটায় এদিক ওদিক ঘুরে দেখতে থাকলো । মাঝে মাঝে এটা সেটা বই নামিয়ে দেখছিল বুক সেলফ থেকে। এর মাঝেই চোখ গেল হোয়াইট বোর্ডের সেই লেখাটার দিকে – ‘আমার  জীবনের চারটে হারিয়ে যাওয়া দিন – করোনাডো?’ এখনো আছে ওটা । একই সাথে লক্ষ্য করলো সেই মরচে লাল রঙের জিনিষ ভরা জারটা সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
ওয়েস্ট সম্ভবত ওর উপস্থিতি বুঝতে পারেনি, একভাবে কমপিউটার মনিটরের দিকেই তাকিয়ে ছিল।
লিলি আস্তে আস্তে ওয়েস্টের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো । তাকালো স্ক্রিনের দিকে । কোনো একটা দেওয়ালের গায়ে খোদাই করা বিরাট মাপের কিছু হিয়েরোগ্লিফিক্স লেখার ছবি দেখা যাচ্ছে ওখানে। লিলি ঝটপট মনে মনে লেখাগুলোর মানে করে ফেললো –
স্ব ইচ্ছায় প্রবেশ করো আনুবিসের আলিঙ্গনে, তবেই তুমি বেঁচে থাকবে রা’য়ের আগমনের পরেও । ইচ্ছার বিরুদ্ধে যদি প্রবেশ করো , তোমার লোকজনেরা এক হাজার বছর ধরে শাসন করবে সব কিছু । কিন্তু তুমি বেঁচে থাকবে না । ভেতরে যদি একেবারেই প্রবেশ না করো না এখানে, তাহলে এ জগতও থাকবে না।
‘কি মনে হচ্ছে লেখাটার কি মানে লিলি ?’ ওয়েস্ট সহসাই জিজ্ঞেস করলো, মাথা না ঘুরিয়ে ।
লিলি চমকে গেলথমকে গেল বলাই ভালো পাথরের মূর্তির মতো । ‘আ...আমি জা...জানি না...’
ওয়েস্ট ঘুরলো । ‘আমার মনে হচ্ছে এখানে মৃত্যু এবং তার পরবর্তী জীবন নিয়ে কিছু বলা হয়েছে। আমুনের তরফ থেকে যীশুর মতো এক চরিত্র হোরাসকে উদ্দেশ্য করে । “আনুবিসের আলিঙ্গন” এর একটাই অর্থ মৃত্যু । যদি হোরাস স্বইচ্ছায় মৃত্যু বরন করে, তাহলে সে আবার জীবিত হবে এবং সেটা তার প্রজাদের পক্ষে মঙ্গলজনক হবে । অনেকটাই যীশুর ক্রুশ বিদ্ধ হওয়ার মতো ব্যাপার । যাকগে ওসব কথা থাক। কিড্ডো, কিছু দরকার আছে নাকি আমার সাথে?’
এরপর ওদের মধ্যে লো এক বিস্তৃত আলোচনা অস্ট্রেলিয়া-আমেরিকা সম্পর্ক নিয়ে । কিভাবে আমেরিকা একক সুপার পাওয়ারে পরিনত হলো এবং অস্ট্রেলিয়া বুঝে গেল তার বন্ধু এখন পরিনত হয়েছে বিশ্বের স্বঘোষিত অভিভাবকে । ‘ কোনো সময়ের এক ভালো বন্ধুর,’ ওয়েস্ট বললো, ‘ ভালোবাসাটা বড্ড চাপে ফেলে দেয় । আসলে শত্রুর কাছ থেকে কঠিন  কোনো শিক্ষা লাভ করার থেকে সেটা বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়াই ভালো । ’
তারপর ই ওয়েস্ট বিষয় বদলে ফেললো । ‘লিলি , তোকে একটা কথা বলার ছিল। যেমন ভাবে সব কিছু ভেবে রেখেছি সেগুলো যদি সব ঠিকঠাক ভাবে হয়ে যায় ... হবেও আশা করছি । তাহলে আমি বেশ কিছু দিনের জন্য দূরে কোথাও চলে যাবো –’
‘দূরে কোথাও মানে?’ লিলি অবাক হয়ে কিছু একটা সন্দেহ করে জানতে চাইলো।
‘ হ্যাঁ । দূরে কোথাও , এমন কোনো জায়গা যেখানে কেউ আমাকে খুঁজে পাবে নাঅদৃশ্য হয়ে যাবো।’
‘’ অদৃশ্য ...’ লিলি ঢোঁক গিললো।
‘তবে, লিলি আমি চাইবো, তুই আমাকে খুঁজে বের করবি,’ ওয়েস্ট বললো হাসি মুখে। ‘এখন, আমি বলতে পারবো না আমি কোথায় যাচ্ছি । তবে তোকে আমি সুত্র দিয়ে যাবো সেখানে পৌছানোর। যদি তুই এই ধাঁধাটার উত্তর বার করতে পারিস তবেই আমাকে খুঁজে পাবি।’
ওয়েস্ট লিলিকে একটা কাগজ দিলো, যেটার ওপর লেখা ছিল-
যেথায় আমার নতুন নিবাস সেথায় একসাথে থাকে বাঘ আর কুমীর
খুঁজে পেতে সেই স্থান মাঝিকে দাও অর্থ, এবার চলো সফরে, নাও সুযোগ
মৃত্যুর হাঁয়ের ভেতর,
নরকের মুখ গহ্বরে ।
সেখানেই মিলবে আমার দেখা, এক বিরাট মাপের খলনায়কের ছত্রছায়ায় ।

‘সব কিছুই ওতে বলা আছে কিড্ডো । চলো মাথা খাটানো শুরু হয়ে যাক ।’
লিলি এক ছুটে বেরিয়ে গেল ওয়েস্টের স্টাডি থেকে, হাতে কাগজের টুকরোটা ।
ওয়েস্টের ধাঁধা নিয়ে কয়েক মাস ধরে মাথা ঘামিয়ে চললো – এমন কি একটা একটা করে অক্ষর সার্চ করলো গুগলে – যদি কিছু বার করা যায়।

ওর মনে আরো অনেক প্রশ্ন ছিল, যদিও, সে সবের উত্তরও পেয়েও গেল।
যেমন ওয়েস্ট কোথা থেকে হোরাসকে পেয়েছিল ।
‘হোরাসের আগের মালিক ছিল হান্টসম্যানের শিক্ষক,’ আফ্রিকার সূর্যের আলো উপভোগ করতে করতে উইজার্ডের কাছ থেকে এটা জানতে পারলো লিলি
‘ সেই জঘন্য লোকটার নাম ছিল মার্শাল জুডা । জুডা একজন আমেরিকান কর্নেল । ওয়েস্টকে করোনাডো নামের এক স্থানে শিক্ষা দিচ্ছিলো কি করে আর ভালো সেনা হওয়া যায় ।
‘কাঁধে হোরাসকে বসিয়ে নিয়ে   করোনাডোর ঘাঁটিতে ঘুরে বেড়াতো জুডা । মাঝে মাঝেই বাজখাঁই চিৎকার করে সেনাদলকে সতর্ক করে দিতো । সাথে সাথেই নির্দেশ মতো কাজ না করলে হোরাসকে কষ্টদায়ক শাস্তি দিতো সেনাদের দেখিয়ে দেখিয়ে। বলতো, ‘আনুগত্য পাওয়ার একমাত্র উপায় নিয়মানুবর্তিতা আর জান্তব শক্তি প্রদর্শন।!’
‘ হান্টসম্যান এসব পছন্দ করতো না। ফ্যাল্কন টার ওপর জুডার নিষ্ঠুরতাও ওর ভালো লাগত না। যে কারনে করোনাডো থেকে চলে আসার সময় , জুডার অফিসে রাখা খাঁচা থেকে পাখিটাকে চুরি করে নিয়ে আসে হান্টসম্যান। তারপর থেকে জ্যাক হোরাসকে ভালোবাসা আর আদর দিয়ে ট্রেনিং দেয় । আর তার প্রতিদানে হোরাস ফিরিয়ে দেয় নিজের আনুগত্য যতটা ওই ছোট্ট প্রানের পক্ষে দেওয়া সম্ভব ।
‘লিলি তুমি যখন বড় হয়ে যাবে, তখন বুঝতে পারবে এই পৃথিবীর সব মানুষ মোটেই ভালো নয় । তারা ভালোবাসার চেয়ে নিষ্ঠুরতা বেশী পছন্দ করে। ভাগ করে নেওয়ার বদলে শাসরাতেই তাদের বেশি অভিরুচি । বোঝে কম রাগ করতে জানে বেশী ।
‘এই সব মানুষেরা নিজেদের কথাই বেশি ভাবে সব সময়। ওরা সব সময় চায় অন্যদের ওপর শাসন চালাতে । আর সেটা মতেই বাকিদের ভালোর জন্য নয় , কেবলমাত্র নিজেদের ক্ষমতার চাহিদা চরিতার্থ করার জন্য । লিলি একদিন তুমি খুবই  বড় ক্ষমতার অধিকারী হবে – বিরাট ক্ষমতার – আমি আশা করি তুমি আমাদের এখান থেকে আর কিছু শিখতে পারো বা না পারো , এটা মনে রাখতে পারবে যে সত্যিকারের ভালো মানুষেরা অন্যের কথা ভাবে আগে তারপর ভাবে নিজের কথা ।
‘আর তার উদাহরণ হিসাবে বলতে পারি বেশী দূর যেতে হবে না হান্টসম্যান আর হোরাসকেই দ্যাখো। একটা নির্যাতিত পাখি তার নিষ্ঠুর মালিককে মেনে চলত শুধু মাত্র ভয়ে । কিন্তু একজন সত্যিকারের প্রভুর জন্য ওই পাখি প্রান দিতেও দ্বিধা করবে না।’

একদিন, লিলি উইজার্ডকে সাহায্য করছিল প্রাচীন কিছু পুঁথি গুছিয়ে রাখার কাজে।
পাথর বা মাটির ট্যাবলেট , ভূর্জ পত্রের পুঁথি ইত্যাদি   পুরনো জিনিষপত্র ওর খুব পছন্দের বিষয়। ওর কাছে এ সবের অর্থ প্রাচীন জগতের নানান রহস্যের চাবিকাঠি।
ওই বিশেষ দিনে উইজার্ড সেই সমস্ত পুঁথিগুলো একত্র করছিল যাদের সাথে প্রাচীন স্থপতি ইমহোটেপের নাম জড়িয়ে আছে।
লিলি দেখতে পেলো কিছু নকসা নুবিয়া নামে এক স্থানের একটি খনি এলাকার । যার ভেতরে চারটে স্তর আছে এবং অনেক রকম বুবি ট্র্যাপের উল্লেখ করা আছে। সব ট্র্যাপ বা ফাঁদগুলো বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ  লেখা আছে ওখানে। আবার লুকানো স্টেপিং স্টোন থাকলে তাকে মোকাবিলা করার সুত্রও। যেমন একটায় লিলি দেখতে পাচ্ছে ইজিপশিয়ান হিয়েরগ্লিফিক্সে লেখা আছে পাঁচটা নম্বর – ১-৩-৪-১-৪ । উইজার্ড সেটাকে রাখল একটা বিশেষ ফাইলে যার নাম “ইমহোটেপ পঞ্চম”।
একইসাথে ও দেখতে পেলো একটা খুবই পুরোনো  আঁকা । যেটাকে দেখে প্রাচীন দিনের কোন সাপ লুডো খেলার ছক মনে হচ্ছিল। ওটার গায়ে লেখা ছিল  “ জলপ্রপাতের প্রবেশ পথ – টলেমী সোতেরের সময় ইমহোটেপ তৃতীয় দ্বারা এর নবনির্মাণ হয়েছে ”।

ওটা দেখতে এরকম
উইজার্ড লিলির এসব বিষয়ে আগ্রহ দেখে ওকে বিভিন্ন ইমহোটেপদের বিষয়ে অনেক কিছু জানালেন।
তৃতীয় ইমহোটেপ ছিলেন আলেকজান্ডার দ্যা গ্রে এবং তার বন্ধু প্রথম টলেমির সময়ের মানুষ। ওনাকে বলা হতো “দ্য মাস্টার মোট বিল্ডার” বা  সবসেরা পরিখা নির্মাণকারী– উনি নিজের দরকারে নদীদের পথ বদলে দিতে সক্ষম ছিলেন পরিখা বা বাঁধ বানিয়ে ।
‘এটা জলপ্রপাতের প্রবেশ পথ,’ উইজার্ড বললেন, ‘প্রাচীন ব্যাবিলনে নিশ্চিত ভাবেই এটা ছিল অলংকৃত এক জলপ্রপাত। যার অবস্থান ছিল আজকের আধুনিক বাগদাদের কাছে। ওই দাগগুলো জলের ধারার গতিপথ নির্দেশ করছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো ব্যাবিলন এলাকায় অনেক খোঁড়াখুঁড়ি করেও এর কোন হদিশ মেলে নি
লিলি দিনের বাকি অংশটা উইজার্ডের স্টাডিরুমের এক কোনে রাখা বাক্স গুলো নাড়াচারা করে কাটালো । অনেক পান্ডুলিপি পড়ে ফেললো , আবিষ্ট হয়ে থাকলো ওগুলো নিয়েই।
কানেই ঢুকলো না জো এসে উইজার্ডের সাথে কথা বলা শুরু করেছে। কিন্তু ওয়েস্টের নাম যেই উচ্চারিত হলো সঙ্গে সঙ্গে কান চলে গেল ওদের আলোচনায়।
জো বললো, ‘অনেকদিন পর আবার ওয়েস্টের দেখা পেয়ে ভালো লাগছে। অনেক বদলে গেছে যদিও সেই দিনগুলোর তুলনায় যখন আমারা একসাথে ডাবলিনে পড়া শোনা করতাম। আগে তো কম কথা বলতোই , ইদানীং আরো চুপচাপ হয়ে গেছে। আমি শুনেছি ও নাকি আর্মি থেকে অবসর নিয়েছে।’
লিলি সব শুনছিল, যদিও ভান করছিল ও যেন পুঁথিগুলো পড়া আর দেখায় মেতে আছে।
উইজার্ড হেলান দিয়ে বসলেন। ‘বাপরে, কবে কার কথা, ডাবলিন। কোন বছর যেন ছিল – ১৯৮৯? তোমরা দুজনেই তখন কত অল্প বয়েসী । তার পর থেকে জ্যাক কত কত পথ পার করলো জীবনের ।’
‘বলুন না আমাকে ওর কথা ।’
‘ ডেজারট স্টরম এর অভিযানের কিছু দিন পরেই ও আর্মি থেকে সরে আসে । ওয়েস্ট কেন এই সিদ্ধান্ত নিলো এটা বুঝতে হলে তোমাকে আগে জানতে হবে কেন ও আর্মিতে যোগ দিয়েছিল । এর একমাত্র কারন ছিল  বাবাকে খুশি করা এবং সাথে সাথেই আক্রোশ
‘জ্যাকের বাবা ছিলেন তাঁর সময়ের একজন সেরা সৈনিক । কিন্তু ওর থেকেও জ্যাক অনেক বেশি দক্ষ। ওর বাবা চেয়েছিলেন হাই স্কুলের পাঠ শেষ করেই যেন জ্যাক সোজা মিলিটারিতে যোগ দেয় । কিন্তু জ্যাকের ইচ্ছে ছিল আরো পড়াশোনা করার, ইউনিভারসিটিতে যাওয়ার । কিন্তু ও বাবার ইচ্ছেকেই মর্যাদা দেয় ... এবং খুব দ্রুতই বাবার থেকেও একজন দক্ষ সেনায় পরিনত হয় ।
‘এস এ এস রেজিমেন্টে  জ্যাকের র‍্যাঙ্ক ক্রমশঃ ওপরের দিকে উঠতে থাকে  । মরুভূমি এলাকার অভিযানে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিতে থাকে জ্যাক । ডেজারট সারভাইভ্যাল কোর্স করার সময় নতুন রেকর্ড স্থাপন করে – ৪৪দিন ও সবার নাগাল এড়িয়ে থাকতে সমক্ষ হয় ।
‘কিন্তু ওর বাবার মতো জ্যাকের মোটেই ভালো লাগে এই জীবনটা। এই জীবনযাত্রা ওকে যে ধরনের মানুষে - একটা মারন যন্ত্র- পরিনত করতে থাকে তা ওর পছন্দ হয় না । যদিও ওর দক্ষতা ওকে বানিয়ে দিয়েছিল অতিরিক্ত মাত্রার সফল মারন যন্ত্রে । ওর ওপরওয়ালারা এই ব্যাপারটা ভালো ভাবেই জানতো, ফলে ওরা চিন্তাতেই ছিল যে ওয়েস্ট হয়তো আর্মি ত্যাগ করবে – আর এই সময়েই ওরা ওকে পাঠায় আমার কাছে পড়াশোনা করার জন্য, ডাবলিনে। ওরা আশা করেছিল এর ফলে ওয়েস্টের বুদ্ধিবৃত্তিগত চাহিদা মিটবে । মন শান্ত হবে এবং ও আবার আর্মিতে ফিরে যাবে আর আমি মনে করি কিছু সময়ের জন্য সত্যিই ওর চাহিদা মিটেছিল ।’
‘দাঁড়ান দাঁড়ান,’ জো বলে ওঠে । ‘জ্যাকের বিষয়ে কিছু পুরনো কথা আমার জানতে ইচ্ছে হচ্ছে । ও একবার বলেছিল ওর বাবা আমেরিকান । কিন্তু   তাহলে অস্ট্রেলিয়ান আর্মিতে যোগ দিলো কেন?’
‘সঠিক প্রশ্ন,’ উইজার্ড বল লো, ‘ঘটনা হল এই যে জ্যাকের মা কিন্তু আমেরিকান নন। বাবাকে খুশি করতে মিলিটারীতে যোগ দিলেও , সেই পিতার ভাবনার ওপর আক্রোশ থেকেই ও সিদ্ধান্ত নেয় মায়ের দেশ অস্ট্রেলিয়ার আর্মিতে যোগ দেবে।‘
‘আচ্ছা ... বুঝলাম,’ জো বললো ।
উইজার্ড বললেন, ‘ যাই হোক, তুমি তো জানোই জ্যাকের মনের স্তরটা অতি উচ্চমাত্রার। ভাবনার তীক্ষ্ণতাও অনেক বেশী। আর সেটা থেকেই ও আর্মির জীবনটাকেমালোচনার চোখে দেখতে শুরু করে। ব্যাক্তিগতভাবে আমার মনে হয় এর থেকেই ও ঝুঁকে পড়ে  প্রাচীন ইতিহাস এবং প্রত্নতত্ব নিয়ে পড়াশোনার দিকে।
‘এর পর স্বাভাবিক ভাবেই এ বিষয়ে জ্যাকের মানসিকতা আরো কঠোর হয়ে যায় যখন ওর ওপরওয়ালারা ওকে পর পর কয়েকটা মাল্টি ন্যাশন্যাল স্পেশ্যাল ফোরসের এক্সারসাইজ এর জন্য করোনাডোতে পাঠায় ১৯৯০ সালে – এগুলোর পরিচালনার দায়িত্বে থাকে আমেরিকানরা তাদের “সিল” ঘাঁটিতে । যেখানে ওরা ওদের সমস্ত মিত্র দেশগুলোকে ডেকে পাঠায় এক অতি উচ্চ মানের ওয়ার-গেমসে অংশ নেওয়ার জন্য। ছোট দেশগুলোর কাছে এগুলো ছিল দারুন রকমের সু্যোগ । অস্ট্রেলিয়া পাঠায় ওয়েস্টকে । ১৯৯০ সালে এসব এক্সারসাইজগুলো নিয়ন্ত্রন করার দায়িত্ব ছিল মার্শাল জুডার ওপর । যার চোখে খুব সহজেই জ্যাকের দক্ষতা ধরা পড়ে।
‘ কিন্তু এও করোনাডোতেই কিছু একটা ঘটেছিল যার খবর আমিও ঠিক মতো জানিনা। জ্যাক আহত হয় একটা হেলিকপ্টার আযক্সিডেন্টে । অজ্ঞান অবস্থান ওকে নিয়ে আসা হয় বেস হাসপাতালে । চারদিন ওখানে অজ্ঞান অবস্থাতেই পড়ে থাকে জ্যাক।  জ্যাকের জীবনের চারটে হারিয়ে যাওয়া দিন। ওর জ্ঞান ফিরলে ওকে দেশে ফেরত পাথান হয়। তেমন কোনো বড় আঘাত ছিল না শরীরে । কয়েক মাস পরেই ও আবার কাজে যোগ দেয় । আর সেই সময়টা ছিল ১৯৯১ সালের ডেজারট স্টরম অভিযানের সময় ।
‘ জ্যাক ওয়েস্ট ছিল ১৯৯১ সালে ইরাকের মাটিতে সেইসব প্রথম মানুষদের একজন , যারা কমিউনিকেশন টাওয়ারগুলো ধ্বংস করেছিল। দু সপ্তাহ বাদে ও দেখতে পায় ওকে কাজ করতে হচ্ছে জুডার অধীনে। যতটা জানি জুডা নিজেই নাকি পেন্টাগনের কাছে আবেদন করেছিল জ্যাককে ওর অধীনে পাঠানোর জন্য । অস্ট্রেলিয়া – চিরদিনই আমেরিকার অনুগত ছিল – চাহিদা মেনে নেয়।
‘ডেজারট স্টরম অভিযানে জ্যাক নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়ে নাম কামায় । শত্রু ব্যুহের ভেতর ঢুকে কিছু অবিশ্বাস্য কাজ করে । যার ভেতর ছিল বাসরর স্কাড বেশ থেকে ধারণাতীত উপায়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হওয়া। জুডা আর তার আমেরিকান বাহিনী ওকে একা ফেলে চলে আসে ও মারা গেছে ধরে নিয়ে ।
‘কিন্তু সব কিছু সমাপ্ত হলে দেখা যায় জ্যাক নিজের দেশে ফিরে এসেছে। সোজা যায় নিজের কম্যান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনেরাল পিটার কসগ্রোভের কাছে  । জানায় সে আর রেজিমেন্টের সাথে নিজের কন্ট্র্যাক্ট রিনিঊ করতে রাজি নয় ।
‘কসগ্রোভ আর আমার মধ্যে চেনা শোনা ছিল অনেক দিন থাকেই। খুব বুদ্ধিমান মানুষ । আমার কাছ থেকেই জানতে পারে  আমাদের এই আগত মিশনের ব্যাপারে । প্রায় সাথে সাথেই সগ্রোভ ওয়েস্টকে স্বস্তিতে রাখার নিরাপদে রাখার প্ল্যান করে ফলে এবং ওয়েস্টকে আমার দলে অন্তর্ভুক্ত করে দেয় । এক দীর্ঘকালীন গুরুত্বপূর্ণ মিশনে । যে মিশনের সুত্রে জ্যাক আমার সাথে শুরু করে প্রত্নতাত্বিক গবেষনা ক্যাপস্টোন খুঁজে বার করার।
‘আর এভাবেই ওয়েস্ট আর আমি আবার একসাথে কাজ করার সুযোগ পাই । এভাবেই আমরা খুঁজে বার করি আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগারের দুষ্প্রাপ্য পুঁথি গুলো এবং খুঁজে পাই লিলিকে আর ওর দুর্ভাগ্যের শিকার হওয়া মাকে । আর এই জন্যেই ওয়েস্ট আজ এই মিশনে আমার সাথে কাজ করছে।’
এরপর আর অনেক এটা সেটা কথা বলে জো চলে যায়।
উইজার্ড তার কাজে মন দেন ... এই সময়েই তার মনে পড়ে লিলি এখনো ওই কোনাতেই বাক্সগুলোর কাছে বসে আছে। তাকান ওর দিকে।
‘আরে , লিলি , আমি তো একেবারে ভুলেই গিয়েছিলাম তুমি ওখানে আছো । একেবারে ইঁদুরের মতো লুকিয়ে চুপচাপ বসেছিলে । আমি জানি না আমাদের কথা তোমার কানে গেছে কিনা, যদি গিয়ে থাকে তাহলে ভালোই হয়েছে।   হান্টসম্যান বিষয়ে এসব কথা তোমার জানা দরকার। কারন ও অত্যন্ত ভালোমানুষখুবই ভালো মানুষ ।     কোনও সময় নিজে মুখে হয়তো বলে না কিন্তু জেনে রাখো লিলি জ্যাক কিন্তু তোমাকে অবিশ্বাস্য রকমের ভালবাসে – সেই দিন থেকে যেদিন ও প্রথম তোমাকে হাতে তুলে নিয়েছিল  আগ্নেওগিরির ভেতরে । জ্যাক তোমার কথা যতটা ভাবে ততটা এ বিশ্বের আর কিছুর কথা ভাবে না।’
০০০০০
ওটা ছিল লিলির কাছে অনেক কিছু জানার ও বোঝার দিন।
তবে সবচেয়ে আনন্দের দিন ছিল সেটা যেদিন ও ওয়েস্টের প্লেনটার  বিষয়ে নানান তথ্য জানতে পারে ।
হ্যালিকারনাসসাস অনেক দিন ধরেই একটা বিষ্ময়ের ব্যাপার লিলির কাছে। যেদিন থেকে ও জাম্বো জেট ব্যাপারটা কি বুঝতে পেরেছে সেদিন থেকে – আর এর দাম কিরকম হতে পারে সেটা জানার পর থেকে – আর সেটাই ওকে অবাক করে দিয়েছে একটা মানুষ কি করে একটা ৭৪৭ বিমানের মালিক হতে পারে।
একদিন ব্রেকফাস্টের সময় লিলি জানতে চেয়েছিল, ‘ওই প্লেনটা আপনি কোথা থেকে পেলেন?’
টেবিলে বসে থাকা জো, স্ট্রেচ আর উইজার্ড প্রশ্ন টা শুনে হাসি চাপার চেষ্টা করছিল ।
ওয়েস্টের মুখটায় ছিল দুষ্টুমির ছাপ । ‘কাউকে বলে দিও না কিন্তু, আমি ওটা চুরি করেছি।’
‘আপনি ওটা চুরি করেছেন? একটা গোটা এরোপ্লেন আপনি চুরি করেছেন! চুরি করাটা কি ভালো কাজ?’
‘না মোটেই ভালো কাজ নয়,’ জো বললো ‘তবে হান্টসম্যান হ্যালিকারনাসসাসকে চুরি করেছিল খুব খারাপ একজন মানুষের কাছ থেকে ।’
‘কে সে?’
‘উইজার্ড উত্তর দিলো, ‘সাদ্দাম হুসেন নামের একজন মানুষ । ইরাকের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, সাঙ্ঘাতিক ধরনের একজন মানুষ । ১৯৯১ সালে হান্টসম্যান ওটা চুরি করে ।’
লিলি জানতে চাইলো, ‘আপনি মিঃ হুসেনের প্লেন চুরি করেছিলেন কেন?’
ওয়েস্ট একটু সময় নিলো উত্তর দেওয়ার জন্য। আসলে লিলিকে বলার জন্য কথা গুলো সাজিয়ে নিলো সাবধান ভাবে।
‘সেই সময়ে আমি ছিলাম এমন একস্থানে যার নাম বাসরা । ভালোই ঝামেলায় পড়ে গিয়েছিলাম। আর সেই ঝামেলা থেকে বেঁচে  বেরিয়ে আসার একমাত্র রাস্তা ছিল মিঃ হুসেনের ওই প্লেন। ওই প্লেনটা ওখানে রাখা ছিল যদি দেশ ছেড়ে মিঃ হুসেনের পালানোর দরকার পড়ে সেজন্য।’ ওয়েস্ট চোখ টিপলো । ‘ আমি এটাও জানতাম ইরাকের বিভিন্ন স্থানে এরকম প্লেন বেশ কিছু রাখা ছিল ওই একই কারনে ব্যবহার করার জন্য । ফলে এই একটা বিমান ওর কাছ থেকে নিয়ে নিলে ওনার তেমন কোন সমস্যা হবে না বলেই আমার মনে হয়েছিল।’
‘প্লেন টার নাম হ্যালিকারনাসসাস দিয়েছেন কেন? ওই নামের জায়গাতেই তো একটা সমাধি মন্দির আছে , তাই না?’
ওয়েস্ট হাসলো লিলির অতি সহজে ইতিহাসের সুত্র টেনে আনা দেখে। ‘আমি ঠিক জানি না , থাকলেও থাকতে পারে। মিঃ হুসেন ওটাকে ওই নামেই ডাকতেন । আমিও ওই নামটাই রেখে দিয়েছি। আমি জানিনা কেন উনি এই নামটা রেখেছিলেন। তবে মিঃ হুসেন নিজেকে মনে করতেন পারস্যের একজন সেরা শাসক । ওই মৌসোলাস বা নেবুচ্যাডনেজারের মতো । যদিও উনি মোটেই ওদের মতো ছিলেন না। একজন বড়সড় গুন্ডা বলা যেতে পারে ওনাকে ।’
ওয়েস্ট উইজার্ডের দিকে ঘুরে তাকালো । ‘হ্যালিকারনাসসাসের কথায় মনে পড়লো , নতুন করে সাজানোর কাজ কতো দূর? মার্ক ৩ রেট্রোগ্রেডগুলো লাগানোর ব্যবস্থা করেছেন?’
‘প্রায় হয়ে এসেছে,’ উইজার্ড বলেন। আমরা ওটার ওজন তিনভাগের একভাগ কমাতে পেরেছি। আটটা এক্সটারনাল রেট্রোগ্রেড থ্রাস্টার লাগানো হয়েছে। পরীক্ষা করে দেখাও হয়েছে । আর মার্ক ৩ গুলো ৭৪৭ এর পুরোনো ইঞ্জিনের সাথে ভালোই কাজ করছে –ওটার ভারসাম্য সত্যিই অসাধারন । ভি টি ও এল এর জন্য দারুন, যদি তোমার কাছে পর্যাপ্ত ফুয়েল থাকে। এই শনিবার আমি আর স্কাই মনস্টার কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করবো। ওই দিন ইয়ার প্লাগ পড়ে থেকো সবাই।’
‘অবশ্যই। আমাকে জানিয়ে দিও আগেভাগে।’
লিলি বুঝতে পারলো না ওরা কি নিয়ে কথা বলছেন।

ও, আর একটা কথা... ব্যালের প্রতি লিলির উৎসাহ একই রকম বজায় আছে।
ও অনেকগুলো শো করেছে – এমন শো যেখানে ওর জন্য বানানো হয়েছিল ছোট্ট স্টেজ । ব্যবস্থা ছিল কারটেন খোলা বন্ধর। সবকটা শো দেখেই দলের সদস্যরা দারুন ভাবে হাততালি দিয়ে ওকে উৎসাহিত করেছেন।
এরকম এক শোয়ে , লিলি বড়মুখ করে ঘোষণা করে ও ব্যালে নাচের এক কঠিন মুদ্রা বুড়ো আঙ্গুলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা টানা এক মিনিট ধরে করে দেখাবে। যদিও ৪৫ সেকেন্ডের বেশী পারেনি, আর তার ফলে বেচারি খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিল।
সকলেই অবশ্য অনেক অনেক প্রশংশা করেছিল।
যেমন একটি পরিবারের সদস্যরা করে থাকে অন্যদের জন্য।
০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০
[সপ্তম অধ্যায় শেষ ।   অষ্টম অধ্যায় কাবুলের কৃষ্ণাঙ্গ পুরোহিত https://amarkolponarjogot.blogspot.com/2017/10/blog-post.html